03/06/2026
রাত তিনটা। ঘরে সবাই ঘুমাচ্ছে।
একজন মা জেগে আছেন। কোলে তাঁর ছোট্ট শিশু, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। মা একহাতে বাচ্চাকে বুকে চেপে ধরেছেন, আরেক হাতে মাথায় পানি দিচ্ছেন। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। ঠোঁট নড়ছে, দোয়া করছেন। আল্লাহর কাছে কাঁদছেন।
এই মুহূর্তে কেউ দেখছে না তাঁকে। স্বামী ঘুমাচ্ছেন, পাড়া-প্রতিবেশী জানে না, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো পোস্ট নেই।
কিন্তু আল্লাহ দেখছেন।
এবং এই মুহূর্তটা, এই কান্না, এই ক্লান্তি, এই ভালোবাসা, কোথাও লেখা হয়ে যাচ্ছে। এমন জায়গায়, যেখান থেকে কিছু মুছে যায় না।
আমি আজ সেই মায়েদের জন্য লিখছি, যারা প্রতিদিন দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করে না "তুমি কেমন আছ?" যারা সংসারের সবার খেয়াল রাখেন, কিন্তু নিজের কথা বলার সময় পান না। যারা ভাবেন, এত কষ্ট করে কী হলো আমার?
তাদের বলতে চাই, অনেক কিছু হলো। আল্লাহর কাছে অনেক কিছু জমা পড়ে গেছে।
সন্তান লালন-পালনের প্রতিটি কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ যা দেবেন, সেটা জানলে আপনি হয়তো আর কখনো নিজেকে "শুধু একজন মা" বলবেন না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "মা-এর পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।" (নাসাই, ইবনে মাজাহ)
এই কথাটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে এই জান্নাতের দরজা খোলে মায়ের সেবার মাধ্যমে। আর সেই সেবার বিনিময়ে মায়ের জন্যও জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়।
আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, "আমি মানুষকে তার মা-বাবার ব্যাপারে তাকিদ করেছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছেন।" (সূরা লুকমান: ১৪)
আল্লাহ নিজে স্বীকার করেছেন মায়ের কষ্টের কথা। এই স্বীকৃতি কম কিছু নয়। সৃষ্টিকর্তা নিজে বললেন, আমি জানি তুমি কতটা কষ্ট করেছ।
গর্ভাবস্থার প্রতিটি দিন, প্রতিটি বমি, প্রতিটি ব্যথা, প্রতিটি রাত যখন পাশ ফেরানো যাচ্ছিল না, এই সবকিছু আল্লাহর কাছে ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, গর্ভবতী নারী রোজাদার, নামাজি এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমান সওয়াব পান। (তাবারানি)
শুধু গর্ভ ধারণ করার কারণে। শুধু সন্তানকে বুকের মধ্যে বহন করার কারণে।
সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রতিটি মুহূর্তে মা সওয়াব পাচ্ছেন। রাতে ঘুম ভেঙে উঠছেন, খাওয়াচ্ছেন, এটুকুও আল্লাহর কাছে নেকি। আলেমরা বলেছেন, দুধ খাওয়ানোর প্রতিটি চুমুকের বিনিময়ে একটি করে নেকি লেখা হয়। এবং যে রাতগুলোতে মা ঘুমাতে পারেননি শুধু সন্তানের কারণে, সেই রাতগুলো তাহাজ্জুদের রাতের মতো মূল্যবান হতে পারে, কারণ নিয়ত ছিল আল্লাহর দেওয়া আমানত রক্ষা করার।
একটি কথা আমার মনে গেঁথে গেছে। এক মা আমাকে বলেছিলেন, আমি কখনো মনে করিনি আমার সংসারের কাজের কোনো দাম আছে। মনে হতো আমি শুধু খাটছি।" আমি তাঁকে বললাম, আপনি কি জানেন সন্তানকে ভালোবেসে একটু আদর করলেও সওয়াব হয়? তিনি অবাক হয়ে তাকালেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "যে ব্যক্তি তার সন্তানকে আদর করে, আল্লাহ তার জন্য নেকি লিখে দেন।" (তাবারানি)
মায়ের প্রতিটি চুম্বন, প্রতিটি জড়িয়ে ধরা, প্রতিটি মাথায় হাত বুলানো, সবকিছু আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
সন্তান যখন বড় হয়ে নামাজ পড়বে, সেই নামাজের সওয়াবের একটি অংশ মায়ের আমলনামায় যাবে। সন্তান যখন কাউকে সাহায্য করবে, সেই ভালো কাজের একটি অংশ মায়ের কাছে পৌঁছাবে। কারণ মা-ই তাকে মানুষ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "মানুষ মারা যাওয়ার পর তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি জিনিস ছাড়া। তার মধ্যে একটি হলো নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।" (মুসলিম)
একজন মা সারাজীবন কষ্ট করে যে সন্তান গড়লেন, সেই সন্তান মায়ের মৃত্যুর পরেও তাঁর জন্য দোয়া করতে থাকবে। মা কবরে শুয়ে আছেন, আর সওয়াব আসতেই থাকবে। এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?
এবং সবশেষে, জান্নাত। আল্লাহ তাঁর নবীর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন, যে মা সবরের সাথে সন্তান লালন-পালন করেছেন, তাঁর জন্য জান্নাত অপেক্ষা করছে। সেই জান্নাতে ক্লান্তি নেই, কান্না নেই, অবহেলা নেই। শুধু আছে শান্তি, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।
তাই প্রিয় মা, আপনি যখন পরের বার রাত তিনটায় জেগে থাকবেন, যখন সারাদিনের ক্লান্তিতে মনে হবে আর পারছেন না, একবার মনে করবেন। এই মুহূর্তটা বৃথা যাচ্ছে না। আল্লাহ দেখছেন। এবং আল্লাহ কখনো কোনো মায়ের কষ্টকে বেহিসাব রাখেন না।
আপনার প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি নিদ্রাহীন রাত, প্রতিটি চোখের পানি, একদিন পুরস্কার হয়ে ফিরে আসবে। এমন এক জায়গায়, যেখানে কোনো কষ্ট নেই।
শুধু সবর করুন। আল্লাহ আপনাকে দেখছেন।
*আল্লাহ সকল মাকে সুস্বাস্থ্য, সবর এবং জান্নাত দান করুন। আমীন।*