12/06/2026
আজকের লেখা: প্রবাসী কার্ডের বিস্তারিত ও ভেতরের আসল সত্য!
পাসপোর্ট আর BMET কার্ড থাকতে প্রবাসীদের জন্য নতুন 'কার্ডের' নাটক কেন? প্রবাসীদের 'টাকার মেশিন' ভাবা বন্ধ করুন; আগে প্রবাসীদের পেনশন, সন্তানদের নিরাপত্তা ও শিক্ষা-চিকিৎসা এবং সম্পদ রক্ষার ব্যবস্থা করুন!
ইদানিং বাংলাদেশের সংসদে প্রবাসীদের নিয়ে খুব আলোচনা শুনছি। নতুন সরকার নাকি প্রবাসীদের জন্য বিশেষ কার্ড দেবে! সেই কার্ড দিয়ে দেশে টাকা পাঠানো যাবে, ব্যাংক থেকে টাকা তোলা যাবে, আর সরকারি অফিসে নাকি 'ফ্যাসিলিটি' পাওয়া যাবে।
একজন দীর্ঘদিনের প্রবাসী হিসেবে সরকারের এই নীতি নির্ধারকদের কাছে আমার কিছু বাস্তব, যৌক্তিক ও জোরালো প্রশ্ন:
১. 'প্রবাসী' শুনলেই ঘুষ-খরচ ৪ গুণ বেড়ে যায় কেন? এই জুলুম বন্ধ করবে কে?
সরকার কার্ড দিয়ে বিশেষ সুবিধার গল্প শোনাচ্ছে, অথচ বাস্তব চিত্রটা কী? দেশের যেকোনো সরকারি অফিস, থানা কিংবা হাসপাতাল হোক—যেই তারা শোনে যে লোকটা 'প্রবাসী' বা প্রবাসীর পরিবার, অমনি তাদের চোখ চকচক করে ওঠে। তারা মনে করে প্রবাসীরা টাকার মেশিন! একটা সাধারণ মানুষের কাজ যেখানে ১ টাকার খরচে হয়, প্রবাসীর কথা শুনলেই সেই ঘুষ বা খরচের হার ২ থেকে ৪ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়! এই মগের মুল্লুক বন্ধ করার কোনো আইন কি এই নতুন কার্ডে আছে?
২. প্রবাসীদের জমিজমা ও কষ্টার্জিত সম্পদের নিরাপত্তা কোথায়?
একজন প্রবাসী বিদেশের মাটিতে নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে দিন-রাত এক করে টাকা খাটায় দেশে এক টুকরো জমি কেনা বা সম্পদ গড়ার জন্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রবাসীরা দেশে না থাকার সুযোগে তাদের জমিজমা, বাড়ি-ঘর বা সম্পত্তি প্রায়ই জাল দলিলের মাধ্যমে বা দাঙ্গাবাজদের দ্বারা দখল হয়ে যায়। আদালতে বছরের পর বছর মামলা লড়েও প্রবাসীরা তাদের নিজেদের সম্পদ ফিরে পায় না। সরকার নতুন কার্ডের নাটক না করে প্রবাসীদের জমিজমা ও সম্পদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা আইনি সেল গঠন করুক।
৩. প্রবাসী অভিভাবক দেশে থাকে না বলে সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসায় চরম জুলুম-অবিচার কেন?
আমরা প্রবাসীরা বিদেশে বুক ফেটে কষ্ট করি শুধু এই বুকভরা আশা নিয়ে যে আমাদের সন্তানেরা দেশে ভালো চিকিৎসা আর সুশিক্ষা পাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রবাসী অভিভাবক (গার্জিয়ান) দেশে থাকে না বলে এই সন্তানদের ওপর চারপাশ থেকে জুলুম আর অবিচার করা হয়! স্কুল-কলেজে শিক্ষকেরা প্রবাসীর সন্তান শুনলেই পড়ালেখায় অবহেলা করে, কারণে-অকারণে মানসিক চাপ দেয় এবং টাকার জন্য অতিরিক্ত ফি দাবি করে। আবার হাসপাতাল বা প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে গেলে ভালো চিকিৎসার বদলে প্রবাসীর সন্তানদের একা পেয়ে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট আর হাজার হাজার টাকার অতিরিক্ত বিলের ফাঁদে ফেলে অবিচার করা হয়। অভিভাবকহীন মনে করে প্রবাসীর সন্তানদের ওপর এই মানসিক ও আর্থিক জুলুম বন্ধে সরকারের কোনো মাথাব্যথা আছে কি?
৪. ১০ লাখ টাকা খরচ করে এসে ৭৫ দিনার বেতন! visa সিন্ডিকেট ভাঙবে কে?
সরকার কাগজে-কলমে খরচ নির্ধারণ করে দিয়েছে ১ লাখ বা ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? একটা সাধারণ নরমাল কোম্পানিতে কুয়েতে আসতে একজন প্রবাসীর খরচ হচ্ছে ৮ লাখ টাকা! আর একটু ভালো মানের কোম্পানিতে আসতে লাগছে ১০ লাখ টাকা! অথচ এখানে এসে একজন প্রবাসী বেতন পাচ্ছে মাত্র ৭৫ দিনার! এত টাকা লাগার কারণ কী? এই যে মাঝখান থেকে দালাল আর এজেন্সির সিন্ডিকেট প্রবাসীদের রক্ত চুষে খাচ্ছে, এটা কি সরকার দেখে না?
৫. ২৫-৩০ বছর প্রবাস জীবনের পর পেনশনের ব্যবস্থা কোথায়?
প্রবাসীরা যৌবনের পুরোটা সময় বিদেশের মাটিতে রক্ত পানি করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠায়। কিন্তু জীবনের শেষ বয়সে যখন শূন্য হাতে দেশে ফিরে যায়, তখন তাদের দেখার কেউ থাকে না। প্রবাসীদের জন্য কোনো পেনশনের ব্যবস্থা নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নেই! সরকার কার্ড দেওয়ার বাহানা না করে প্রবাসীদের জন্য একটা টেকসই পেনশন স্কিম চালু করুক, যাতে শেষ বয়সে কোনো প্রবাসীকে চরম কষ্টে দিন কাটাতে না হয়।
৬. এম্বাসির অফিস কক্ষে ও কাউন্টারে গেলে কাজ হয় না, বাইরের দালালের হাতে টাকা দিলে কীভাবে সাকসেস হয়?
সরকার আমাদের কার্ডের গল্প শোনাচ্ছে, অথচ প্রবাসে আমাদের নিজেদের যে এম্বাসি, সেখানে গিয়ে সাধারণ প্রবাসীরা কাউন্টারে বা ভেতরের কর্মকর্তাদের অফিস কক্ষে গেলেও কোনো কাজ হয় না। কর্মকর্তারা সামনাসামনি নানান সমস্যা, জটিলতা আর নিয়মের বাহানা দেখিয়ে ফাইল আটকে দেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো—খোদ এম্বাসির বড় বাবুরা যে কাজ "হবে না" বলে ফিরিয়ে দেন, অফিসের বা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দালালের কাছে টাকা ধরায় দিলেই সেই কাজই আবার শতভাগ সাকসেস হয়ে যায়! এই ওপেন সিক্রেট দুর্নীতি আর এম্বাসির ভেতরের সিন্ডিকেট আগে বন্ধ করুন, প্রবাসীদের হয়রানি থামান!
৭. লাশ হলে ৩৫ হাজার আর ৩ লাখ টাকা তো প্রবাসীদের নিজেদের জমানো ফান্ড, সরকারের দয়া নয়!
কোনো প্রবাসী ভাই যখন বিদেশে মারা যায়, তখন এয়ারপোর্টে লাশ নামার পর তাৎক্ষণিক দাফন-কাফনের খরচ বাবদ ৩৫,০০০ টাকা ক্যাশ এবং পরবর্তীতে ফ্যামিলিকে ৩,০০,০০০ টাকা দেওয়া হয়। অনেকে মনে করে এটা সরকার দয়া করে নিজের পকেট থেকে দেয়। কিন্তু আসল সত্যি হলো—এটা প্রবাসীরা বিদেশ আসার সময় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (BMET) সংস্থায় যে নিজস্ব টাকা জমা দিয়ে মেম্বারশিপ নেয়, এটা সেই প্রবাসীদের নিজেদের ফান্ডের টাকা! অথচ হাসপাতালে চিকিৎসার বিল বা কোনো কারণে লাশ দেশে পাঠানোর জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারের স্থায়ী কোনো ফ্রি ব্যবস্থা থাকে না।
৮. কুয়েতের সিস্টেমে বাংলাদেশের কার্ড চলবে কীভাবে?
সরকার বলছে এই কার্ড দিয়ে নাকি দেশে টাকা পাঠানো যাবে! তারা কি প্রবাসের বাস্তব নিয়মকানুন একটুও জানে? আমরা যারা কুয়েত বা মধ্যপ্রাচ্যে আছি, তারা খুব ভালো করেই জানি—এখানে প্রতিটা মানি এক্সচেঞ্জে টাকা পাঠাতে হলে কুয়েত সরকারের দেওয়া 'সিভিল আইডি' (Civil ID) লাগে। সিভিল আইডি ছাড়া ওদের কম্পিউটারের সিস্টেমে টাকাই ঢোকানো যায় না। তদুপরি, প্রতিটা এক্সচেঞ্জকে আলাদা ফি দিতে হয়। এখন বাংলাদেশ সরকার একটা কার্ড দিলেই কি কুয়েত সরকার তাদের দেশের আইন ও সিস্টেম পরিবর্তন করে আমাদের কার্ড গ্রহণ করবে? এটা প্রবাসীদের বোকা বানানোর একটা ফালতু বাহানা ছাড়া আর কিছু না!
৯. টিকিটের সিন্ডিকেট ও সরকারি খরচের জুলুম:
আমাদের অলরেডি পাসপোর্ট আছে, বিদেশ আসার সময় লাখ টাকা খরচ করে যে বিএমইটি (BMET) স্মার্ট কার্ড নিই, সেটাও আছে। অথচ নতুন করে আরেকটা কার্ডের নাম করে কোটি কোটি টাকা লোপাটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। একজন প্রবাসী যখন দেশ থেকে বিদেশে আসে, তখন ম্যানপাওয়ার অফিস আর আনুষঙ্গিক সরকারি প্রসেসিং করাতেই ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা শেষ হয়ে যায়। তার ওপর বিমান টিকিটের সিন্ডিকেট! কুয়েত থেকে দেশে যেতে টিকিট লাগে ৩০-৩৫ হাজার টাকা, আর বাংলাদেশ থেকে যখন কর্মস্থলে ফিরি, তখন টিকিটের দাম ৮০ হাজার, ৯০ হাজার, এমনকি ১ লাখ ২০-৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে যায়! এই পকেট কাটা বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ আছে?
রেমিট্যান্সের চাকা সচল রাখা প্রবাসীদের ভাগ্য কাগজের নতুন কার্ড দিয়ে বদলাবে না। দেশে ফেরার সময় এয়ারপোর্টে দালাল আর হয়রানি, টিকিটের সিন্ডিকেট আর সরকারি অফিসের টেবিলে টেবিলে ভোগান্তি ও ঘুষ ছাড়া আমরা কিছুই পাই না।
সরকারের কাছে অনুরোধ, প্রবাসীদের বোকা বানানোর এই নাটক বন্ধ করুন। যদি সত্যিই প্রবাসীদের উপকার করতে চান, তবে:
প্রবাসী অভিভাবক দেশে থাকে না বলে প্রবাসীদের সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসায় যে জুলুম-অবিচার করা হয়, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন।
প্রবাসীদের নাম শুনলেই সব জায়গায় যে চারগুণ ঘুষ ও খরচের জুলুম চালানো হয়, তা বন্ধ করুন।
এম্বাসির কাউন্টার ও ভেতরের অফিস কক্ষের ফাইল আটকে রেখে বাইরের গেটের দালালি ও কর্মকর্তাদের গোপন সিন্ডিকেট চিরতরে বন্ধ করুন।
প্রবাসীদের জমিজমা ও কষ্টার্জিত সম্পদের স্থায়ী সরকারি নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।
প্রবাসীদের জন্য স্থায়ী পেনশনের ব্যবস্থা করুন।
৮-১০ লাখ টাকার এই visa সিন্ডিকেট ও সরকারি ভেতরের দুর্নীতি বন্ধ করুন।
বিমান টিকিটের দাম কমান এবং সিন্ডিকেট ভাঙুন।
নতুন কার্ডে প্রবাসীদের কোনো লাভ নেই, আমাদের দরকার আমাদের রক্ত পানি করা টাকার সঠিক মূল্যায়ন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান!