10/07/2024
আর্জেন্টিনা ৩৬ বছর বিশ্বকাপ শূন্য ছিল। ২৮ বছর ট্রফিলেস ছিল। আমরা ৫ বছরই আছি মাত্র। হেন তেন। এসব হয়তো একটা বিতর্কে জেতার পয়েন্ট। কিন্তু দিনশেষে এটা মানতেই হবে যে, ব্রাজিলের ফুটবল চরম দুর্দশার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
পাঁচ বিশ্বকাপের নাম ভাঙিয়ে খেতে খেতে আর্জেন্টিনা ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলে ফেলেছে। তাও নিজেদের মাঠে নয়। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের মাঠে। ব্রাজিলের মাঠে। আর আমরা?
২০১৪ সালে ব্রাজিলের বেকারত্ব। মুদ্রাস্ফীতি। এসবের মাঝেও আয়োজিত হওয়া বিশ্বকাপটা নিয়ে একটা এক্সপেক্টেশন ছিল সেখানকার লোকেদের। বিশ্বকাপে ভালো কিছু করার। আর বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বার্থকতা প্রমাণ করার। এক যুগের অপেক্ষার অবসান করার। কিন্তু কি করলাম আমরা?
আঠারো গেছে। বাইশ গেছে। আর্জেন্টিনার দুটো বিশ্বকাপের ফাইনাল। তন্মধ্যে একটা বিশ্বকাপ জিতে চলে গেলো। আমরা এখনো অতীত অর্জনের নাম ভাঙিয়ে চলছি।
২০০৬ এবং ২০২৪ এর মধ্যে আমাদের কোন পার্থক্য নেই।
আমরা এখনো কুড়ি বছর পিছিয়ে রয়ে গেলাম সত্যি বলতে।
ফুটবলের দর্শক হিসেবেও কুড়ি বছর পার হয়েছে আমার। সে হিসেবে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। একটা তিক্ত ব্যপার। আর বেদনাদায়ক পালাবদল দেখেছি আমি। বিষয়টা হলো,
২০০৬ বিশ্বকাপ যখন জার্মানিতে। দোকান থেকে ব্রাজিলের পোস্টার এনে বাসায় টাঙালাম। তখন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন এর তকমাটা আমাদের। সদ্য জেতা বিশ্বকাপের বিদ্যুৎ আমার গায়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে।
আর আর্জেন্টিনা ফ্যান হওয়া বন্ধুদের দেখে মনে হতো বহু অপেক্ষা। বহু তিতিক্ষা। বহু বেদনার সম্মুখীন। একটা হতাশাগ্রস্ত আর ভগ্নহৃদয় নিয়ে প্রতিবার তর্ক এড়িয়ে যাচ্ছে।
এবার ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে দিলাম।
২০২৪ সাল। আঠারো বছর শেষ। আর পরিস্থিতি পুরোপুরি অদলবদল।
সদ্য বিশ্বকাপ জেতার গৌরব নিয়ে এখন চায়ের টেবিল গরম করা আর্জেন্টিনার ফ্যান ভাই বন্ধুরা। যেখানে আঠারো বছর আগে আমরা ছিলাম।
আর হতাশা। বেদনা। ভগ্নহৃদয় আর একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে তর্ক এড়িয়ে যাওয়া একজন ব্রাজিল সমর্থক। যেখানে ঠিক আঠারো বছর আগে তারা ছিলো।
এটা কি দল! কোন দল! কিরকম দলের খেলা আজ আমরা দেখছি৷ ভাবলে স্মৃতিকাতর হয়ে যাওয়া লাগে।
বাবার সাথে সাদাকালো টেলিভিশনে হলদে জার্সিতে একটা বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরা দেখেছিলাম। একজন দুর্দান্ত অধিনায়ক। একজন অসীম মানসিকতার প্রতিজ্ঞা। একজন কাফুকে রাইট ব্যাক পজিশনে দেখেছিলাম আমার শৈশবে। আর আজ সে জায়গায় কাকে দেখছি?
দানিলো? আমাদের এলাকায় নদীর ধারে লোকাল পোলাপান ফুটবল খেলে। তাদেরকেও আমার কাছে বল পায়ে দানিলোর চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী মনে হয়।
টপ লেভেলের ফুটবল খেলছে দশ বছরেরও বেশি। কিন্তু দশ বছরের বাচ্চার ফুটবল নলেজও দেখলাম না সদ্য সমাপ্ত পুরো টুর্নামেন্টে।
রাবার্তো কার্লোস ফ্রিকিক নিলে গোলকিপার ভয় পেতো। কখন না জানি গোলকিপারকে সহ নিয়ে গোলের বক্সে ঢুকিয়ে দেয়। আর আজ খেলতে দেখি ওয়েন্ডেলকে।
গতি। এট্যাকিং এপ্রোচ। ডিফেন্ডিং কনফিডেন্স। কোন কিছুই নাই। মুখের এক্সপ্রেশন দেখলে মনে হয় চার পাঁচটা ডিফল্ট হওয়া ওভারডিউ ব্যাংক লোন মাথায় নিয়ে ঘুরছে।
কাকা। দিনহো। এদেরকে বাদই দিলাম।
ওরা আন এক্সপেক্টেড। ২০১০ বিশ্বকাপে দুঙ্গার ডিজাস্টারের আন্ডারে খেলা এলানো টাইপের মিডফিল্ডারও দেখিনা এ দলে। কিন্তু পটেনশিয়াল প্লেয়ারের অভাব নেই ক্লাবে। অথচ খেলায় সেই আলু কচুদের।
জাপান কোরিয়া বিশ্বকাপের রিভালদো আর ক্লেভারসনকে মাঝেমধ্যে ইউটিউবে দেখি। আর ইউটিউব বন্ধ করে টিভির পর্দায় দেখি পাকুয়েতাকে।
কিছুদিন আগে দারাজ থেকে একবার একটা ভালো কোমরের বেল্ট অর্ডার করেছিলাম। পেয়েছিলাম ফোর্থ লেভেলের লো কোয়ালিটির বেল্ট। ট্রাস্ট মি সেটার কোয়ালিটির প্রতি আমার এখন অনেক সম্মান বেড়ে গেছে যখন পাকেতার কোয়ালিটির মিডফিল্ডার ব্রাজিলের মাঝমাঠে দেখেছি।
রোনালদো লিমার কথা তো বাদই দিলাম। ছোটবেলায় শুনতাম, লিমা মাঠে নামলে নাকি মাঠও কাঁপে। বলবেই তো, আটানব্বই বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের মতো ইস্পাত-দৃঢ় ডিফেন্সকে রীতিমতো কাঁদিয়ে ছেড়েছিলেন।
অলিভার কান জাপান কোরিয়া বিশ্বকাপে গোলপোস্টে সিমেন্ট ঢালাই দিয়ে রেখেছিলেন পুরো টুর্নামেন্টে। তাকে ফাইনালে গুড়িয়ে দিয়েছিলেন স্রেফ বুটের আলতো টোকায়।
আজকের রিচার্লিশন। জেসুস। এন্ড্রিক।
এদেরকে ডি বক্সে দেখলে মনে হয় বিনা দাওয়াতে মেজবান খেতে এসেছে। না পারছে বসতে। না পারছে দাঁড়াতে। এতিম বাচ্চার মতো লোকচক্ষুর আড়ালে আড়ালে ঘুরছে।
আজ এই দল দেখলে মনে হয়,
একটা বড় ধোঁকাবাজি হয়ে গেছে আমার সাথে। মারিয়া শারাপোভাকে দেখিয়ে, ব্লু ফাইরি লায়লাকে গছিয়ে দিল আমায়।
পাশ্ববর্তী আর্জেন্টিনা তাদের ইতিহাসের সেরা সময় পার করছে। আর আমরা পার করছি আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে সময়।
এই দলের উন্নতি হবার নয় ভাই। হলেও সেটা মিরাকল ছাড়া কিচ্ছু নয়। কারণ আমি আপনি ওটি'র সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়াল ভেঙে ফেললেও হবেনা। রোগীকে সুস্থ করার ভূমিকাটা ডাক্তারকেই পালন করতে হবে।
আমরা সমর্থক হিসেবে মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলছি। কিন্তু ব্রাজিল ফুটবল অথোরিটির সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপই নাই।
পাঁচ বিশ্বকাপ জয়ীদের এখন ব্যর্থতার পাঁচটা এডিশন পূর্ণ হয়েছে। গত হয়েছে দুইটা দশক। তবুও এদের টনক নড়েনি। ফুটবলের খোঁজখবর রাখা উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রটাও একটা ইউরোপিয়ান কোচের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। অথচ সিবিএফ করছেনা।
তারা রয়ে গেছে চল্লিশ বছর পেছনে। নাম দেয় ঐতিহ্যের। ৫টা বিশ্বকাপ তো ব্রাজিলের কোচেরাই এনে দিয়েছে। তাইলে বাইরের কোচ কেন নিয়োগ দেবে?
ষাটের দশকে সাপে কামড়ালে ওঝা আনতো। সত্তরের দশকে কলেরা হলে ঝাড়ফুঁক করাতো। আজ কাউকে যদি রাসেল ভাইপার কামড়ায়। তাইলে সে যদি বলে আগের যুগে ওঝারা তো সাপের বিষ নামিয়েছে। আমার হাসপাতালে নিয়ে যাবার দরকার নাই। ওঝা ডাকেন।
তাইলে লোকে পাগল বলবে না?
দিনে দিনে চিকিৎসা বিজ্ঞান উন্নত হয়েছে। জীবনযাপন বদলে গেছে। অতীত ভুলে মানুষ যুগের সাথে তাল মেলাতে যুগোপযোগী চিন্তাভাবনা পোষণ করছে। ফুটবল পাল্টে গেছে। ফুটবলে উন্নয়নশীল ইউরোপিয়ানরা ফুটবলটাকেই নিজেদের জমিদারি বানিয়ে ফেলেছে। তবুও ব্রাজিল ফুটবল অথোরিটির এই গণ্ডমূর্খগুলো রয়ে গেছে সিরাজুদ্দৌলার যুগে।
পারমাণবিক বোমার যুগেও এরা হাতে কোমরে বেঁধে রয়েছে ঢাল আর হাতে ধরে রয়েছে মান্ধাতার আমলের তলোয়ার।
দরিবাল জুনিয়র আবার দায়িত্ব পেয়েছেন ২৬ অবধি। আবারো সেই ক্ষয়ে যাওয়া টিপিক্যাল অচল মস্তিষ্ক। পুরনো নিয়ম। পুরনো নীতি। পুরনো বেইজ্জতি সামনে অপেক্ষমাণ।
সুবুদ্ধি ফিরুক এই হতচ্ছাড়াদের। আরো একটা ডিজাস্টার এর মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই এগিয়ে যাবো সামনে। ততদিনে সাক্ষী হতে হবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের উড়ন্ত সময়ের। দুরন্ত অর্জনের।
আর্জেন্টিনার জন্য শুভকামনা। তারা যোগ্য দল হিসেবে। যোগ্য কোচের হাতেই এগিয়ে যাচ্ছে।
সংগ্রহীত।