31/08/2026
"তাওয়াক্কুল: আমি জানি না কী হবে, কিন্তু আমি জানি—আল্লাহ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণে"
আল্লাহ তা'আলা কুরআনের কোথাও বলেননি যে, ঈমানদার হলে আমাদের জীবন সবসময় সুখে কাটবে। তিনি এমনও প্রতিশ্রুতি দেননি যে, নামাজ পড়লে, কুরআন তিলাওয়াত করলে, মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করলে, সৎ ও দয়ালু হলে জীবনে আর কোনো কঠিন সময় আসবে না।
বরং কুরআন আমাদের জানায় যে, মুমিনদেরও পরীক্ষা করা হবে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫
অর্থাৎ, ইসলাম আমাদের এমন কোনো জীবন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় না যেখানে কোনো দুঃখ থাকবে না, কোনো ব্যর্থতা থাকবে না, কোনো বিপদ আসবে না।
ঈমানের অর্থ ঝড় আসবে না—এমন নয়।
ঈমানের অর্থ হলো, ঝড়ের মধ্যেও আমরা জানব কে আমাদের রব।
জীবনে কখনো চাকরি হারানোর আশঙ্কা আসবে, কখনো ব্যবসায় ক্ষতি হবে, কখনো সম্পর্ক ভেঙে যাবে, কখনো অসুস্থতা বা অন্য কোনো বিপদ সামনে আসবে। কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, যার কোনো পূর্বাভাসই আমাদের কাছে ছিল না।
তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—
“এটা আমার সাথেই কেন হলো?”
“এরপর কী হবে?”
“আমি কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে বের হব?”
ইসলাম আমাদের শেখায়—সব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা থাকা জরুরি নয়।
আমরা জানি না আগামীকাল কী হবে।
আমরা জানি না কোন দরজা খুলবে।
আমরা জানি না কোন দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।
আমরা জানি না এই পরীক্ষার শেষ কোথায়।
কিন্তু আমরা জানি—আল্লাহ জানেন।
আর একজন মুমিনের জন্য এই বিশ্বাসই অনেক বড় শক্তি।
আল্লাহ বলেন:
“হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আর হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় পছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:২১৬
তাই জীবনে কোনো কিছু আমাদের ইচ্ছামতো না ঘটলেই ধরে নেওয়া উচিত নয় যে আল্লাহ আমাদের ছেড়ে দিয়েছেন।
বরং কখনো কখনো আমরা যে পথটি বন্ধ হয়ে যেতে দেখি, আল্লাহ সেই পথের মধ্যেই এমন কিছু দেখেন যা আমরা দেখতে পাই না।
তাওয়াক্কুল কী?
তাওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়।
তাওয়াক্কুল মানে এই নয় যে, আমরা কোনো চেষ্টা করব না এবং শুধু বলব—“আল্লাহ ভরসা।”
বরং আমাদের দায়িত্ব হলো সাধ্যমতো চেষ্টা করা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং এরপর ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।
আল্লাহ বলেন:
“তুমি যখন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।”
— সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে তাওয়াক্কুল করতে, তাহলে তিনি তোমাদের রিজিক দিতেন যেমন পাখিদের দেন; তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় পরিতৃপ্ত হয়ে ফিরে আসে।”
— জামে‘ আত-তিরমিজি, ২৩৪৪
পাখি বাসায় বসে থাকে না। সে বের হয়, চেষ্টা করে, খাবার খোঁজে। তারপর আল্লাহ তার রিজিকের ব্যবস্থা করেন।
সুতরাং—
চেষ্টা করা আমাদের দায়িত্ব।
ফলাফল আল্লাহর হাতে।
জীবনের সমুদ্র ও আমাদের জাহাজ
জীবনকে একটি বিশাল সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করা যায়।
আপনি একটি জাহাজে আছেন।
কখনো সমুদ্র শান্ত।
কখনো বিশাল ঢেউ।
কখনো ঝড়।
কখনো চারপাশ অন্ধকার।
আপনি জানেন না পরবর্তী ঢেউটি কত বড় হবে। জানেন না ঝড় কখন থামবে। জানেন না আপনার গন্তব্যে পৌঁছাতে আর কত সময় লাগবে।
কিন্তু আপনার একটি বিশ্বাস আছে—
“আমার রব জানেন আমি কোথায় আছি।”
এটাই তাওয়াক্কুল।
তাওয়াক্কুল মানে এই নয় যে জাহাজে কোনো ঢেউ আঘাত করবে না।
তাওয়াক্কুল মানে হলো—ঢেউ এলেও আপনি জানবেন, আল্লাহ আপনার রব।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।”
— সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩
মুমিনের জন্য কষ্টও কল্যাণের হতে পারে
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“মুমিনের ব্যাপারটি কতই না আশ্চর্য! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর।”
তার সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য এলে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে—এটা তার জন্য কল্যাণকর। আর বিপদ এলে সে ধৈর্য ধারণ করে—সেটাও তার জন্য কল্যাণকর।
— সহিহ মুসলিম, ২৯৯৯
তাই একজন মুমিনের জীবন অন্যদের জীবন থেকে আলাদা এই অর্থে নয় যে তার কোনো কষ্ট থাকবে না।
বরং পার্থক্য হলো—
কষ্টের মধ্যেও তার একজন রব আছেন।
সে জানে, তার কষ্ট আল্লাহর অজানা নয়।
সে জানে, তার কান্না আল্লাহ দেখেন।
সে জানে, তার দোয়া আল্লাহ শোনেন।
সে জানে, তার ভবিষ্যৎ তার নিজের হাতে না থাকলেও আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়।
মুসা (আ.)-এর শিক্ষা
কুরআনে মুসা (আ.)-এর একটি ঘটনা তাওয়াক্কুলের অসাধারণ শিক্ষা দেয়।
সামনে সমুদ্র, পেছনে ফিরআউনের বাহিনী। মানুষের দৃষ্টিতে যেন কোনো পথ নেই।
তখন মুসা (আ.) বললেন:
“কখনোই নয়! নিশ্চয়ই আমার রব আমার সঙ্গে আছেন; তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।”
— সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:৬২
পরিস্থিতি বলছিল:
“কোনো পথ নেই।”
কিন্তু ঈমান বলছিল:
“আমার রব আছেন।”
এটাই তাওয়াক্কুলের শক্তি।
তাই মনে রাখুন
আপনি জানেন না আগামীকাল কী হবে।
কিন্তু আল্লাহ জানেন।
আপনি জানেন না কোন দরজা খুলবে।
কিন্তু আল্লাহ জানেন কোন দরজা আপনার জন্য ভালো।
আপনি জানেন না এই ঝড় কখন থামবে।
কিন্তু আল্লাহ ঝড়েরও রব।
আপনি জানেন না আপনার জাহাজ কত দূর যাবে।
কিন্তু আল্লাহ জানেন আপনার গন্তব্য কোথায়।
তাই যখন জীবন অস্থির হয়ে যায়, যখন সামনে কোনো পথ দেখা যায় না, যখন মনে হয় সবকিছু হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে—তখন নিজেকে বলুন:
“আমি জানি না কী হবে।
কিন্তু আমি জানি—আল্লাহ জানেন।
আমি জানি না পথ কোথায়।
কিন্তু আমি জানি—আল্লাহ পথ দেখাতে পারেন।
আমি জানি না এই ঝড় কখন থামবে।
কিন্তু আমি জানি—আল্লাহ ঝড়েরও রব।
আমি জানি না আমার জাহাজ কত দূর যাবে।
কিন্তু আমি জানি—আল্লাহ আমার রব।”
এটাই তাওয়াক্কুল।
এটাই মুমিনের শক্তি।
এটাই অন্তরের প্রশান্তি।
আল্লাহ আমাদের সত্যিকারের তাওয়াক্কুলকারী বানান, বিপদের সময় সবর করার এবং নেয়ামতের সময় শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক দিন।
আমীন.....
( সংগৃহীত )