06/08/2022
☘️☘️ ২২ শ্রাবণে শ্রদ্ধাঞ্জলি☘️☘️
রবী আছে বাঙালির জীবন সৃজনে
সংলাপ ॥ বাঙালির প্রাণের এ কবি লোকান্তরিত হলেও তাঁর অসামান্য রচনা ও কাজের মধ্যে আজও বেঁচে আছেন বাঙালি জাতির জীবন সৃজনে প্রেরণাদাতা হয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুমুখী সৃজনশীলতা বাংলা সাহিত্য ও শিল্পের প্রায় সবকটি শাখাকে স্পর্শ করেছে, সমৃদ্ধ করেছে। তার লেখা গান বাঙালির হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয় আজো। আনন্দে, বেদনায়, দ্রোহে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির প্রেরণার উৎস। রবীন্দ্রনাথ আমাদের মন-মানসিকতা গঠনের, চেতনার উন্মেষের প্রধান অবলম্বন। তিনি কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় নন্দিত। বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন। রবীন্দ্রনাথের লেখা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে সম্মানের আসনে পৌঁছে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক চেতনা ছিল শুধু নিজের শান্তি ও নিজের আত্মার মুক্তির জন্য ধর্ম নয়। মানুষের কল্যাণের জন্য যে সাধনা তাই ছিল তার ধর্ম। তার দর্শন ছিল মানুষের মুক্তির দর্শন। মানবতাবাদী এই কবি বিশ্বাস করতেন বিশ্বমানবতায়। জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেই দর্শনের অন্বেষণ করেছেন তিনি। তার কবিতা, গান, সাহিত্যের অন্যান্য শাখার লেখনি মানুষকে আজো সেই অন্বেষণের পথে, তার অন্বিষ্ট উপলব্ধির পথে আকর্ষণ করে।
রবীন্দ্রনাথ বাংলার দিকপাল কবি, ঔপন্যাসিক, সঙ্গীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক। তিনি কি ছিলেন না তা-ই বলা মুশকিল। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি প্রথম কবিতা লেখেন। ১৮৮৭ সালে মাত্র ষোল বছর বয়সে ‘ভানুসিংহ’ ছদ্মনামে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। তার লেখা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’ ভারতের জাতীয় সঙ্গীতও তাঁরই লেখা।
১৯১৩ সালে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাশীল নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন আমাদের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের নোবেল-বিজয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে তথা বাঙালি জাতিকেই এনে দিয়েছে বিশ্ব পরিচিতি ও বিরল সম্মান। এই সূত্র ধরেই আজো আমরা সারা পৃথিবীর মানুষের সামনে গর্ব করে বলতে পারি- আমরা বাঙালি, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, এই ভাষাতেই রচিত হয়েছে সেরা সাহিত্য।
রবি ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যের জন্যে। গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের একটুখানি ইতিহাস আছে। রবীন্দ্রনাথ ১৯১২ সালে যাচ্ছেন বিলেতে। সঙ্গে পুত্র রথীন্দ্রনাথ এবং পুত্রবধু প্রতিমা দেবীও আছে। কবি এর আগেও বিলেতে গেছেন দু’বার। একবার লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে। আরেকবার মধ্য যৌবনে, বেড়াতে। বেড়াতে যাবেন, খালি হাতে? তাই কখনো হয়! বাঙালির শিষ্টতা বলেও একটা ব্যাপার আছে। কী নেবেন কবি বিলেতের জন্যে? জাহাজে বসে গান লিখছেন, দু’চারটি কবিতাও আসছে। গীতাঞ্জলি থেকে দু-দশ পাতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন নিজের মতো করে; সেগুলো নাড়াচাড়া করতে গিয়ে মনে হলো- কেমন হয় এগুলোই যদি ওদের হাতে দিই! লন্ডনে কবির পরিচিতদের মধ্যে আছে এক ভক্ত রোডেনস্টাইন। ভালো ছবি আঁকে, সাহিত্য রসিক। মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা নামক গল্পের অনুবাদ পড়ে এতই মুগ্ধ হয় যে, বছর দুই আগে জোড়া সাঁকোর বাড়িতে এসে কবির সঙ্গে পরিচিত হয়ে যায় এবং চিঠিপত্রে বারবার বিলেত ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানায়। এবার কবি লন্ডনে পৌঁছে প্রথমে সেই ভক্ত রোডেনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করেন এবং গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের খাতা তুলে দেন তার হাতে। কবিতাগুলো পাঠ করে অভিভূত রোডেনস্টাইন সেই খাতা দিয়ে আসে ইংরেজি ভাষার বিখ্যাত কবি ইয়েট্সের কাছে। ব্যাস্! আর পেছনে তাকাতে হয়নি। অনুবাদ পাঠে মুগ্ধ ইয়েট্স নিজে ছুটে এসে রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা জানালেন। জর্জ বার্নাড শ, রবার্ট ব্রিজেস, এজ্রা পাউন্ড, জন মেসফিল্ডসহ কত যে গুণীজনের সঙ্গে পরিচয় হলো। কবি ইয়েট্সের সভাপতিত্বে একদিন সংবর্ধনা সভাও হয়ে গেল। সেখানে গীতাঞ্জলির ওই অনুবাদের ভূয়সী প্রশংসা করলেন।
ইংল্যান্ডের ইন্ডিয়া সোসাইটি থেকে প্রকাশিত হয়েছে গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ। অসাধারণ ভূমিকা লিখেছেন কবি ইয়েট্স। ইংল্যান্ডে ফিরে রবীন্দ্রনাথ দেখলেন বিভিন্ন কাগজে গীতাঞ্জলির সপ্রশংস আলোচনা। সেবার প্রায় এক বছর চার মাস ইংল্যান্ড-আমেরিকা ঘুরে দেশে ফিরলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯১৩ সালের ১৫ নভেম্বর টেলিগ্রাম পেয়ে কবি জানলেন যে এ বছর সাহিত্যে নোবেল প্রাইজের জন্যে দু’দিন আগে তাঁরই নাম ঘোষিত হয়েছে এবং সেটা ওই গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের সূত্রেই ঘটেছে। নোবেল ফাউন্ডেশন তাঁর এই কাব্যগ্রন্থটিকে বর্ণনা করেছিল একটি ‘গভীরভাবে সংবেদনশীল, উজ্জ্বল ও সুন্দর কাব্যগ্রন্থ’ রূপে।
নোবেল পুরস্কারের সম্মান যেমন সুউচ্চ, অর্থমূল্যও কম নয়। রবীন্দ্রনাথ এই অর্থ খরচ করেন শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজে। নানান রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিষয়কে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে তাঁর উপন্যাস, ছোটগল্প, সঙ্গীত, নৃত্যনাট্য, পত্রসাহিত্য ও প্রবন্ধসমূহ। তাঁর হাতেই বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক ছোটগল্পের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা উপন্যাসকে তিনি আধুনিক ও সার্থক উপন্যাসে তুলে এনেছেন। তাঁর লেখা ঘরে বাইরে, গোরা প্রভৃতি উপন্যাস; রক্তকরবী, অচলায়তন, বিসর্জন প্রভৃতি নাটক যে কোন সময়ের মানুষের কাছে সাম্প্রতিক ঘটনা হয়ে উপস্থাপিত হয়। শুধু সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় নয়, অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে তার ভাবনাও তাঁকে অত্যন্ত উঁচু স্থানে নিয়ে গিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতিটি শিল্প কর্মে প্রকাশ করেছেন -‘এক সত্যকে’। সত্যের সাথে একাত্মতা অর্জন করাই ছিল তাঁর সাধনা। আত্মিক উন্নতির সাধনাতেই তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন নিরন্তর।
রবীন্ত্রনাথের কবিতা ও গানে বিভাসিত হয়েছে সীমার মাঝে অসীমের পরিচয় লাভের আকুতি। তিনি ভালোবেসেছেন সত্যকে, লালন করেছেন সত্যকে। তাই তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে - ‘সত্য যে কঠিন বড়/ কঠিনেরে ভালবাসিলাম/ সে কখনো করে না বঞ্চনা।’