30/08/2026
সাগর-রুনি হত্যা মামলা: জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীকে ঘিরে নতুন ক্লু উন্মোচন!
একটি গুমের ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের নতুন কিছু ক্লু খুঁজে পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এতে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীকে ঘিরে তদন্তের একটি নতুন মোড় উন্মোচিত হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিতর্কিত সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের সঙ্গে যুক্ত একটি গুমের ঘটনার তদন্তকালেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তদন্তকারীরা এসব তথ্য পান।
ওই তদন্তের অংশ হিসেবে একটি মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ডস (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে একজন সেনা সার্জেন্টের সন্ধান পান তদন্তকারীরা।
পরবর্তীতে ওই সার্জেন্টকে নজরদারিতে রাখা হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার জিজ্ঞাসাবাদ থেকেই অপ্রত্যাশিতভাবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত তথ্য বেরিয়ে আসে, যা গত ১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা এ মামলায় নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
আইসিটির একজন তদন্তকারী জানান, সাংবাদিক দম্পতি খুন হওয়ার ঠিক কিছুদিন আগে জিয়াউল আহসান ওই সার্জেন্টকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
ওই তদন্তকারী বলেন, “সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঠিক দুই দিন আগে (১১ ফেব্রুয়ারি), অর্থাৎ ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সাবেক মেজর (অব.) জিয়াউল আহসান ওই সার্জেন্টকে ডাকেন। জিয়াউল আহসান তাকে সতর্ক করে বলেন, ‘আগামী দুই দিনের মধ্যে বড় কিছু ঘটতে পারে। প্রস্তুত থেকো।’”
তদন্তকারীর মতে, ঠিক সেদিনই জিয়াউল ওই সার্জেন্টকে রোকেয়া প্রাচীর কাছ থেকে দুটি ডিস্ক সংগ্রহ করার নির্দেশ দেন।
নির্দেশ অনুযায়ী সার্জেন্ট পরবর্তীতে তার কাছ থেকে দুটি ডিস্ক সংগ্রহ করেন জানিয়ে ওই তদন্তকারী আরও বলেন, জিয়াউল ও প্রাচী নিয়মিত যোগাযোগে ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ বা উদ্দেশ্যের সঙ্গে এই ডিস্কগুলোর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তদন্তকারীরা এখন তা পরীক্ষা করে দেখছেন।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর সাগর ও রুনির দুটি ল্যাপটপ এবং সাগরের মোবাইল ফোনটি নিখোঁজ হয়। তবে রুনির মোবাইল ফোন এবং প্রচুর পরিমাণে সোনার গয়না ফ্ল্যাটে অক্ষত অবস্থায় পড়ে ছিল।
প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম রবিবার প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেছেন যে, অন্য একটি তদন্তে সিডিআর বিশ্লেষণ করার সময় তদন্তকারীরা এক ‘সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের’ সঙ্গে সাগর-রুনি মামলার একটি সম্ভাব্য সংযোগ খুঁজে পেয়েছেন।
এক সংবাদ সম্মেলনে আমিনুল বলেন, “আমি এটুকুই বলতে পারি, আমাদের সিডিআর পর্যালোচনায় আমরা এক 'সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের' সঙ্গে সাগর-রুনি ঘটনার একটি সংযোগ পেয়েছি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা যে তথ্য পেয়েছি তা আমাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।”
আমিনুল জানান, সাগর-রুনি মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে এবং ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব তদন্তে পাওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সহায়তা পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তাকে প্রদান করবে।
প্রসিকিউশন স্পষ্ট করেছে যে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড একটি ব্যক্তিগত হত্যা মামলা, তাই এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত নয়। এর বিচার দেশের বিদ্যমান ফৌজদারি আইনের অধীনে সংশ্লিষ্ট দায়রা আদালতে অনুষ্ঠিত হবে।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসা থেকে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার এবং তার স্ত্রী এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় আটজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।
মামলাটি প্রথমে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তদন্ত করে এবং পরে তা র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স এবং পিবিআই যৌথভাবে মামলার তদন্ত পরিচালনা করছে।
হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তদন্তকারীরা এখনও আদালতে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি। গত ২৭ আগস্ট আদালত এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা ১২৯ বারের মতো বাড়িয়ে নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।