24/12/2025
এই পেট্যার জন্যই
দুনিয়াডা হাভাতের লোকদর্শন
লেখক - শংকর অধিকারী
পৃথিবীতে সমস্ত প্রাণ এবং প্রাণী বৈচিত্র্যের প্রথম এবং প্রধান চাহিদা হল খাদ্য। মানুষ ব্যাতীত প্রায় সব প্রাণীই শুধুমাত্র খাবারের জন্যই জীবিত থাকে কিংবা একান্ত ওই মৌলিক চাহিদাটির মাধ্যমেই টিকে থাকে, টিকে থাকতে চায়,মূলতঃ তাদের আর কোন বিশেষ চাহিদা নেই, তাদের সমস্ত আনন্দ অভিযোগ বেদনা সবকিছুই এই মৌল উপাদান খাদ্যকে ঘিরেই, তাছাড়াও বড়জোর জীবিত থাকার জন্যই,জৈবিকতা সচল রাখতে যা যা তার প্রয়োজন তাই সে করতে চায়,এই প্রয়োজনের বাইরে সে ঘারটিও নাড়াতে চায়না।এজন্যই মানুষের মত তাকে মুনাফাখোর হতে হয় না,সুদখোর হতে হয় না,ডাকাতি করতে হয় না,দূর্নীতি করতে হয়না,অভ্যাস থাকলে মাঝে মধ্যে বারে যেতে হয় না।এসব কিছুই করতে হয় না তাকে।সে যা করে এতোটুকু প্রাণ ধারনের জন্যই।
কিন্তু মানুষ, সে শুধু জীবনধারনের জন্য এইটুকু খাদ্য পেয়েই সন্তুষ্ট থাকেনি,সে নিজের প্রয়োজনেই সৃষ্টি করেছে সভ্যতা,দীর্ঘ বিবর্তনীয় শ্রমের ইতিহাস রয়েছে তার,নিজের প্রয়োজনই সে সৃষ্টি করেছে সুউচ্চ ইমারত,বেঁচে থাকার বিশাল আশ্চর্য আয়োজন, জীবনকে আরো আনন্দময় করে তুলতে সৃষ্টি করেছে বৈচিত্র্যপূর্ণ নিপুন শিল্পকলা। মানুষ শুধু খাদ্য কিংবা জৈবিক চাহিদাকাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে কখনই পৌঁছুতে পারতোনা আজকের এই গর্বিতা সাফল্যচূড়ায়।একমাত্র মানুষেরই রয়েছে ক্ষুরধার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন উদ্ভাবনী চেতনাশক্তি,আর এই উদ্ভাবনী চেতনাশক্তিই মানুষকে পৃথক করেছে অনান্য প্রাণী কিংবা পশুস্তর থেকে। বিবর্তনের ইতিহাসের দেখলে বোঝা যায় মানুষ আদিম পশুস্তর পেরোনোর পর শুধুমাত্র খাদ্যই তার কাছে মূখ্য চাহিদা হয়ে থাকেনি।তার চাহিদা উদ্দেশ্য ক্রমেই হয়ে উঠে জীবনকেন্দ্রীক সুদুরপ্রসারি আয়োজনের দিকে।
কিন্তু আমরা, মানুষেরাই যখন কেউ কেউ বলে বসি..." এই পেট্যার জন্যই দুনিয়াডা" তখন অনেকটা অবচেতনভাবেই আমরা নিজেদের একাত্ব করে ফেলি পশুস্তর কিংবা চেতনাশক্তিহীন প্রাণীদের সাথে। এই হতদরিদ্র লোকদর্শনটি আমরা সিন্ধুউপকূলবাসীরা ছাড়াও অনেক হতদরিদ্র অঞ্চলবাসীরাও চর্চা করে থাকি অল্পবেশীরকমভাবে, এর অনেক কারণও রয়েছে। সভ্যতার এই সর্বাধুনিক লগ্নে এসেও কেন এরকম বাক্য উচ্চারণ করে থাকি আমরা! কেনো এই প্রধান মৌলিক চাহিদাটির জন্যই দিনরাত বিরামহীন সগ্রাম আমাদের! এর প্রধান দুটি কারন চিন্হিত করতে পারি , ১. আমাদের মৌলিক কয়েকটি চাহিদার মধ্যে প্রথমত খাদ্যচাহিদাই এখনো পূরন হচ্ছে না যথাযত ভাবে ২. খাদ্যগ্রহন ছাড়াও অনান্য আনন্দদায়ক জীবনায়োজন সম্পর্কে অসচেতনতা কিংবা মূর্খতা। কারন দুটির মধ্যে প্রথমটিই আসলে মূখ্য। এই কারনটিই শতাব্দী পরম্পরায় আমাদের চেতনালোক এবং অধিকারবোধকে এগুতে দেয়নি,জীবনচেতনাকে প্রধানত করে তুলেছে খাদ্যকেন্দ্রীক।শতাব্দী ভরে খাদ্যচাহিদা ছাড়াও যে আমাদের আরো,বিভিন্ন চাহিদা কিংবা জৈবনিক উপাদান থাকতে পারে তা মনেই হয়নি।শুধুমাত্র সামান্য খাদ্যচাহিদা পূরন করতে না পেরে আর এর অভাব দেখতে দেখতে জীবনের সমস্ত লক্ষ্য উদ্দেশ্য এমনকি কেন্দ্র হয়ে উঠে ওই চাহিদা অর্থাৎ খাদ্যকে ঘিরেই।এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ব্যার্থতা এবং একই সাথে লজ্জা হচ্ছে, আমাদের মৌলিক চাহিদার প্রথমটি ; খাদ্যচাহিদাই পূরন হচ্ছে না এখনো! খেটে খাওয়া একজন হতদরিদ্র মানুষকে সারাজীবন ধরে তার সমস্ত মেধা শ্রম বুদ্ধিমত্তা সবকিছুই ব্যায় করতে হয় ওই একটি চাহিদার পেছনেই।বিলাসবহুল জীবন যাপন তো দূরের কথা, একটু আনন্দদায়ক জীবন উপাদানের কথা ভাবার অবসরেই পেয়ে উঠে না সে! তাই আমাদের হাভাতি চেতনালোকে এই একটি অভাবই স্থায়ী ও থিতু হয়ে বসে গেছে। " এই পেট্যার জন্যই দুনিয়াডা" এই করুণ বাক্যটি প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে একটি অভাবী লোকদর্শন হিসেবেই। এই লোকদর্শনটিই আমাদের অনান্য মৌলিক চাহিদা সম্পর্কে করে তুলেছে অধিকারবোধহীন।মৌলিক চাহিদা পূরনে ব্যার্থ একটি রাষ্ট্র মাত্রই ব্যার্থ রাষ্ট্র, আমরা এখনো একটি ব্যার্থ রাষ্ট্রের নাগরিক তো নয়ই, হতদরিদ্র স্থায়ী বাসিন্দা মাত্র! অবকাঠামোগত দিক দিয়ে অনেকাংশেই উন্নত একটি ভূখণ্ড দিয়ে কি করবো আমরা, যদি সংখ্যাগুরুর মৌলিক চাহিদা এমনকি খাদ্যচাহিদাই পূরন না হয়! এজন্যই কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন " ভাত দে হারামজাদা, তা নাহলে মানচিত্র চিবিয়ে খাব"।
মৌলিক চাহিদা শুধু চাহিদা নয় এগুলো একই সাথে আমাদের অধিকার।আমরা এই শতাব্দীর কাছে শর্তহীনভাবে অন্ততঃ আমাদের মৌলিক অধিকারগুলো পূরণের জোড় দাবী জানাই।।
১১.০৫.২৪