05/08/2026
একদিন বাস্তবতাকে জিজ্ঞেস করিলাম, "মানুষের এত অশান্তির মূল কোথায়?" বাস্তবতা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া কহিল, "অভাবে নয়, অতৃপ্তির অন্ধকারে। যে মানুষ এক মুঠো ভাত খাইয়াও হাসিতে পারে, সে ধনী; আর যে সোনার থালায় খাইয়াও আরও চায়, সে চিরকাল ভিখারি।"
এই যুগে মানুষের ঘর বড় হইয়াছে, কিন্তু হৃদয় ছোট হইয়াছে। আলমারিতে কাপড়ের স্তূপ, ব্যাংকে অর্থের অঙ্ক, হাতে সর্বাধুনিক যন্ত্র—সবই বাড়িয়াছে; কেবল কমিয়া গিয়াছে শান্তির পরিমাণ। মানুষ আজ নিজের প্রয়োজনের জন্য নয়, অন্যের চোখে বড় হইবার জন্য বাঁচে। সমাজ এমন এক আয়না বানাইয়াছে, যেখানে মানুষ নিজের মুখ দেখে না; দেখে কেবল অন্যের জীবন।
আজকের পৃথিবীতে ভালোবাসাও হিসাবের খাতায় লেখা হয়। সম্পর্কের আগে মানুষ জিজ্ঞেস করে—"সে কী দিতে পারবে?" চরিত্রের মূল্য কমিয়া গিয়াছে, আয়ের মূল্য বেড়িয়াছে। বিশ্বস্ততার চেয়ে সৌন্দর্য, সততার চেয়ে পরিচিতি, আর মমতার চেয়ে স্বার্থকে মানুষ বেশি সম্মান করে। তাই সম্পর্ক ভাঙে শব্দে নয়, নীরবতায়; বিশ্বাস মরে প্রতারণায় নয়, লোভের কাছে মাথা নত করায়।
মানুষ এখন সময়কে নয়, সময় মানুষকে ব্যবহার করে। ভোর হয় মোবাইলের পর্দায়, রাত শেষ হয় অচেনা মানুষের জীবন দেখে। নিজের সন্তানের হাসির চেয়ে অপরিচিত মানুষের ছবিতে বেশি সময় ব্যয় হয়। পাশের ঘরে বসে থাকা মানুষটি একা, অথচ হাজার মাইল দূরের মানুষের সঙ্গে কথোপকথনে আমরা ব্যস্ত। প্রযুক্তি আমাদের পৃথিবীকে কাছে আনিয়াছে, কিন্তু হৃদয়কে দূরে সরাইয়া দিয়াছে।
বর্তমান সমাজে সত্য বলার মানুষের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু সত্য শুনিবার মানুষের সংখ্যা ভীষণ কম। সবাই প্রশংসা চায়, কিন্তু উপদেশ নয়; সবাই সম্মান চায়, কিন্তু সম্মানযোগ্য হইতে চায় না। মানুষ আজ নিজের ভুলের বিচারক নয়, অন্যের ভুলের বিচারপতি।
অর্থের প্রয়োজন আছে, কিন্তু অর্থকে ঈশ্বর বানানোই মানুষের সর্ববৃহৎ ভুল। কারণ অর্থ ঘর বানায়, সংসার নয়; বিছানা কিনে, ঘুম নয়; ওষুধ কিনে, সুস্থতা নয়; মানুষ ভাড়া করে, আপনজন নয়। অথচ এই সামান্য সত্য মানুষ সবচেয়ে দেরিতে বুঝে।
আজকের সভ্যতা বাহ্যিক আলোয় উজ্জ্বল, কিন্তু অন্তরে গভীর অন্ধকার। মানুষ নিজের পরিচয় হারাইয়া ফেলিয়াছে। সে আর নিজেকে প্রশ্ন করে না—"আমি কেমন মানুষ?" বরং জিজ্ঞেস করে—"মানুষ আমাকে কেমন দেখছে?" এই একটি প্রশ্নই তাকে সারাজীবন অন্যের বন্দী করিয়া রাখে।
লোভের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক এই যে, সে কখনো বলে না—"এবার যথেষ্ট।" সে প্রতিদিন নতুন চাহিদার জন্ম দেয়। একটি স্বপ্ন পূরণ হইলে আরেকটি স্বপ্নকে অভাবের পোশাক পরায়। তাই লোভের শেষ নেই; কেবল মানুষের জীবনটাই শেষ হইয়া যায়।
প্রকৃতি কিন্তু অন্য শিক্ষা দেয়। নদী নিজের জন্য জল জমায় না; বৃক্ষ নিজের ফল নিজে খায় না; সূর্য নিজের আলো নিজের জন্য রাখে না। অথচ মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে যত পায় তত আঁকড়ে ধরে। শেষে যখন মৃত্যুর দরজায় দাঁড়ায়, তখন বুঝিতে পারে—যাহা সারাজীবন নিজের বলিয়া জমাইয়াছিল, তাহার একটিও সঙ্গে নেওয়া যায় না।
মৃত্যু পৃথিবীর সবচেয়ে নিরপেক্ষ দার্শনিক। সে রাজা ও ভিখারিকে একই মাটির নিচে শুইয়ে দেয়। তখন কারও পরিচয় থাকে না, থাকে কেবল কর্মের স্মৃতি। মানুষ যে নাম, যে পদ, যে অর্থ লইয়া এত অহংকার করিয়াছিল, সময় একদিন তাহার সবকিছুর উপর ধুলোর আস্তরণ ফেলিয়া দেয়।
অতএব, বাস্তবতার সবচেয়ে কঠিন সত্য এই—মানুষের প্রকৃত দারিদ্র্য অর্থের অভাব নয়, সন্তুষ্টির অভাব। যে নিজের ভেতর শান্তি খুঁজিয়া পায় না, পৃথিবীর সমস্ত সম্পদও তাহাকে ধনী করিতে পারে না। আর যে অল্পে তৃপ্ত হইতে শেখে, তাহার হৃদয়ই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাজপ্রাসাদ।
তাই জীবনকে জয় করিতে চাইলে সম্পদের পেছনে নয়, চরিত্রের পেছনে দৌড়াও; মানুষের করতালির জন্য নয়, নিজের বিবেকের প্রশান্তির জন্য বাঁচো। কারণ সময়ের আদালতে ধন-সম্পদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না—সেখানে কেবল মানুষের কর্ম, সততা এবং হৃদয়ের ওজনই বিচার হয়।
লেখক আরফান সাদিক হিমু