24/01/2017
উপমহাদেশের ইতিহাসে শতবর্ষের ঐতিহ্যে লালিত আনন্দ মোহন কলেজ বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কলেজগুলোর অন্যতম। এ কলেজের রয়েছে এক সমৃদ্ধ ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আনন্দ মোহন কলেজ ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯০৯ সালে।
এই মহান উদ্যোগের সঙ্গে যাঁর নাম জড়িয়ে আছে, তিনি হচ্ছেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সমাজসংস্কারক ব্যারিস্টার আনন্দমোহন বসু। তিনি ১৮৮৩ সালের ১ জানুয়ারি ময়মনসিংহ শহরের রাম বাবু রোডে তাঁর পৈত্রিক বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ময়মনসিংহ ইনস্টিটিউশন’।
আনন্দমোহন বসু ১৮৮২ সালে ভারত সরকার কর্তৃক গঠিত প্রথম শিক্ষা কমিশনের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। তাছাড়া তিনি কলকাতার সিটি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। কলকাতার বেশকিছু গণ্যমান্য শিক্ষাবিদ নিয়ে গঠিত একটি কাউন্সিল সিটি কলেজ পরিচালনা করতেন, আনন্দমোহন বসু ছিলেন সেই কাউন্সিলের সভাপতি।
১৯৮০ সালের এপ্রিল মাস থেকে ময়মনসিংহ ইনস্টিটিউশন ‘ময়মনসিংহ সিটি কলেজিয়েট স্কুল’ নামে অভিহিত হয়। ১৮৯৯ সালে আনন্দমোহন বসু কলকাতা থেকে ময়মনসিংহ এলে ময়মনসিংহের স্থানীয় উৎসাহী অধিবাসীগণ ছাড়াও ‘‘ময়মনসিংহ সভা’’ এবং ‘‘আঞ্জুমানে ইসলামিয়া’’ এর যৌথ আবেদনে ময়মনসিংহে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবী জানানো হয়। এ দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা সিটি কলেজ কাউন্সিলের সভাপতি আনন্দমোহন বসু ১৯০১ সনের ১৮ জুলাই সিটি কলেজিয়েট স্কুলকে ‘ময়মনসিংহ সিটি কলেজ’ নামে দ্বিতীয় শ্রেণীর কলেজে রূপামত্মর করেন এবং একে কলকাতার সিটি কলেজের সাথে যুক্ত করেন। প্রাথমিক অবস্থায় কলকাতা সিটি কলেজ কাউন্সিলের আর্থিক সহযোগিতায় ময়মনসিংহ সিটি কলেজ পরিচালিত হতো, পরের বছর ১৯০২ সালের এপ্রিল মাসে এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক দ্বিতীয় গ্রেডের কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ইতোমধ্যে স্থানীয় অধিবাসীদের অর্থ সাহায্যে কলেজের পুরোভাগে রাসত্মার পাশে কলেজের জন্য পাকা ভবন নির্মিত হয়।
১৯০৬ সালে আনন্দমোহন বসুর মৃত্যুর পর ময়মনসিংহ সিটি কলেজ নানাবিধ সংকটের মুখোমুখি হয়। ১৯০৮ সালে কলকাতায় সিটি কলেজ কাউন্সিল কলেজটি তুলে দেয়। কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে প্রিন্সিপাল বৈকুণ্ঠনাথ চক্রবর্তী কলেজটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। তিনি তত্কালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জে আর ব্ল্যাকউডের শরণাপন্ন হন। ব্ল্যাকউড এবং উকিল রায় বাহাদুর শ্যামাচরণ রায়ের উদ্যোগে কলেজটি পুনুরুজ্জীবিত হয়ে ময়মনসিংহ কলেজ নামে চালু হয়। সেই সঙ্গে চলতে থাকে কলেজের জন্য অর্থ সংগ্রহ ও নতুন জায়গা সংগ্রহের চেষ্টা। কলেজের জন্য জায়গা দিতে রাজি হন ময়মনসিংহ শহরের কৃতীসন্তান মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহম্মদ। ‘ময়মনসিংহ কলেজ’টি আনন্দমোহন কলেজে পরিণত হওয়ার ইতিহাসে মৌলভী হামিদ উদ্দিনের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তিনি ছিলেন সেই সময়ে জেলার প্রথম মুসলিম গ্র্যাজুয়েট আইনজীবী ও বিদ্যানুরাগী। মৌলভী হামিদ উদ্দিন ও আনন্দমোহন বসু কলকাতা কলেজে অধ্যয়নকালে পরস্পর সহপাঠী এবং বন্ধু ছিলেন। ১৯০৮ সালের শেষের দিকে হামিদ উদ্দিন সাহেবের সহযোগিতায় কাচিঝুলিতে (বর্তমানে কলেজ রোড) কলেজটি স্থানান্তরিত হয়। কলেজের নাম হয় আনন্দমোহন কলেজ।
শুরুর সময়ে কলেজের শিক্ষার্থীসংখ্যা ছিল ১৭৮ জন এবং শিক্ষক ছিলেন ৯ জন। কয়েক বছরের মধ্যেই প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হয় প্রতিষ্ঠানটি। ১৯১৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আনন্দমোহন কলেজকে প্রথম গ্রেডের কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আনন্দমোহন কলেজের খ্যাতি ও শিক্ষার্থীসংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। ১৯৬৪ সালের অক্টোবরে কলেজটিকে সরকারীকরণ করা হয়। স্বাধীনতার পর কলেজের অবকাঠামো এবং পাঠদান কার্যক্রমে নতুন গতি আসে। কলেজের উন্নয়ন এবং বিভিন্ন বিষয় চালু করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হয় ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ২০টি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু আছে। আছে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিও। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার।
দেশ-বিদেশের বহু গুণী ব্যক্তিত্ব আনন্দমোহন কলেজে পড়েছেন আবার অনেকে শিক্ষকতাও করেছেন। ১৯১১ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত গণিত বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন রাধা বিনোদ পাল, যিনি পরবর্তীকালে একাধারে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতের অন্যতম বিচারক নিযুক্ত হয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯৪৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন এ প্রতিষ্ঠান থেকে। পরবর্তী সময়ে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপকও ছিলেন তিনি। ইতিহাসবিদ ড. সিরাজুল ইসলাম ও প্রখ্যাত লেখক ও সাহিত্যিক ড. শফিউদ্দিনের মতো বরেণ্য ব্যক্তিরা এ কলেজে শিক্ষককতা পেশায় যুক্ত ছিলেন।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ জনের মতো গুণী ব্যক্তি অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। যিনি ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিষ্ঠার শুরুতে অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন শ্রী বৈকুণ্ঠ কিশোর চক্রবর্তী। এখানে পড়াশোনা করা অনেক ছাত্রছাত্রী দেশ-বিদেশের নানা ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এবং প্রতিভা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এসব প্রাক্তন ছাত্রের মধ্যে রয়েছেন ইতিহাসবিদ ড. নীহাররঞ্জন রায়, প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, জাদুকর পি সি সরকার, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর নুরুন্নবী, সাংবাদিক ও লেখক রাহাত খান, সাহিত্যিক ও গবেষক যতীন সরকার, কবি নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখ। বর্তমানে অধ্যক্ষের দায়িত্বে আছেন এ কলেজেরই প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রফেসর মো. জাকির হোসেন। উপাধ্যক্ষ পদে আছেন ড. গাজী হাসান কামাল।
কলেজে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট কার্যক্রম চালু রয়েছে। একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি খেলাধুলা, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা প্রভৃতি শিক্ষা সহায়ক কর্মকান্ডের ব্যবস্থা রয়েছে।