03/06/2025
জানো মা মাধবী যখন সারের জন্য নাস্তা নিয়ে যায়, সার তখন ড্যাবড্যাব করে মাধবীর দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, মাধবী কে আস্ত গিলে খাবে এমন ভঙ্গি। স্যারের নজর এতো টা খারাপ, মায়ের সামনে অভিযোগ করায় মা ও ক্ষেপে যায়। রেগে রেগে জবাব দেয়,
শুধু কি মাধবীর দিকেই নজর দেয় না-কি তোর দিকেও কুনজর দেয়?
মা সুহানা খাতুনের প্রশ্নের উত্তরে মেয়ে সাবিহা বলল,
কি যে বলো মা! বলতেও লজ্জা লাগে। ও শুধু মাধবী কে না,মাধবী যখন কোমর বাঁকা করে সারের সামনে নাস্তা রাখে তখন তার শরীরের দিকেও তাকিয়ে থাকে।
যাক বাবা! ভণ্ড মাস্টার তাহলে তোকে নজর দেয়নি!
নাহহ মা, আমি তো ওর মতো এতো সুন্দরী না। যে আমার দিকে নজর দিবে। এই মেয়ে বাসায় থাকলে আমার বিয়েই হবেনা।
তুই ঠিক বলেছিস। তোর ওই লু*ইচ্চা স্যারের সাথে ওর বিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বিদায় করে দিবো ওকে।
মা মেয়ের কথা আড়াল থেকে শুনে মাধবীলতার চোখ দুটো দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। এ এক বোবা কান্না, সারাজীবন কাঁদতে হবে, কেউ দেখবেও না, জানবেও না, শান্তনা দেওয়া তো দূরেই থাক।
পরেরদিন,
স্যারের পড়ানো প্রায়ই শেষ এই সময় সুহানা খাতুন মাধবীর হাতে নাস্তার প্লেট ধরিয়ে দেয়। নাস্তা বলতে, দুইটা টোস্ট বিস্কুট আর এক কাপ চা।
মাধবী বুঝতে পারছে হয়তো বিরাট কোন ঝড় আসতে চলছে তার জীবনে, মা বাবা হীন এতিম মেয়েকে এমন বিপদ থেকে রহ্মা করার মতো কেউ নেই একমাত্র আল্লাহ চাড়া। সব বুঝতে পারছে মাধবী তবুও বিস্কুট এর প্লেট এক হাতে, অন্য হাতে চায়ের কাপ ধরে স্যারের সামনে গেল।
এদিকে রুহেল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাধবীর দিকে,
মাধবী চোখের দিকে তাকিয়ে
আনমনে বলছে।
আমি দেখছি চেয়ে চেয়ে
তোমার দিঘল কালো কেশে
ওগো এলোকেশী মেয়ে
তুমি কাহার পথ চেয়ে,
মেলেছিলে ঐ কেশ?
তোমার ভোমর কালো চোখে
যখন পড়লো আমার চোখ
অমন অথৈ জ্বলে রোজ,
আমার ডুব সাঁতারটা হোক।
শোনো কাজল চোখের মেয়ে, আমি তোমার হব ঠিক
তুমি অথৈ সাগর বলেই ,
আমি একরোখা নাবিক।
রুহেল এখনো তাকিয়ে আছে মাধবীলতার দিকে এদিকে মাধবীলতা ও রুহেলের চোখাচোখি হতেই মাধবী চোখ সরিয়ে কোনরকম প্লেট আর চায়ের কাপ রেখেই ঘুরে আসতে যাবে তখনি সাবিহা চিল্লিয়ে বললো,
আপনি তো বড় অসভ্য স্যার, প্রতিদিন মাধবীর শরীরের দিকে নজর দেন, আজ আবার কোমরেও নজর পড়লো! আপনার কুনজর এ তো মেয়েটার বিয়েই হবেনা!
সাবিহার কথা শেষ হওয়া মাত্রই সুহানা ঘরে ঢুকে। মাধবীর গালে থাপ্প,ড় বসিয়ে দেয়,আর বলতে শুরু করে,
কি রে হারামজাদি. শরীর দেখিয়ে পয়সা ইনকাম শুরু করবি নাকি! এসব নোং,রামি এ বাড়িতে চলবেনা
বলেই স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল,
তোমরা ও পারো বটে, দু টাকার মাস্টার, লজ্জা শরম খুইয়ে মেয়েদের দিকে তাকাও। লজ্জা থাকা উচিৎ।
রুহেল থতমত খেয়ে যায়, কি হচ্ছে এসব! কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসুক ভাবে বলল,
কি সব বলছেন আন্টি? আমি পড়াই ঠিকই, কিন্তু কখনো এতো খারাপ দৃষ্টি দিই নি৷ মিথ্যা অপবাদ কেন দিচ্ছেন?
মিথ্যা অপবাদ মানে! আমি প্রতিদিন খেয়াল করি। আর কতো মিথ্যে বলবেন আপনি? শাক দিয়ে মাছ ঢাকছেন?
সাবিহা চিৎকার করে বলল।
সাবিহার বজ্র কন্ঠে,চিল্লাচিল্লি শুনে পাশের বাসার আন্টি চলে আসে। পাশাপাশি ফ্লাট, এ বাড়িতে কি হয় ও বাড়ির সবাই টের পায়। ও বাড়ির যা খবর এই বাড়িতে বসেই জানতে পারে সবাই৷
এসেই রুহেল কে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই লেখা বেগম বললেন,
ছিঃ ছিঃ ছিঃ, এই জন্যই শিক্ষক সমাজ আজ ঘৃণিত। মেয়েরা এদের কাছে পড়া শিখবে নাকি যৌ*ন..!
মাধবী কানে আঙুল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুহানা খাতুন মাধবীর গালে আরেকটা চড় মেরে দেয়। আর চিৎকার করে বলল,
এক হাতে কি তালি বাজে! এই হা*রামি মাইয়ার র ও দোষ আছে। বাপ মা নেই, শাসন করবে কে?
মাধবী মাত্রই এসএসসি দিয়েছে, আর সাবিহা সামনের বছর দিবে৷ সাবিহা ও এইবার এস এস সি দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু টেস্ট পরীক্ষা এলাউ হয়নি তাই আগামী তে দিবে। এমন মেয়ে কিভাবে তাকে অপমান করছে। মাধবীর মন চাচ্ছে মাটি খুঁড়ে নীচে ঢুকে যায়। কিংবা গলায় দড়ি দিয়ে উপরে চলে যায়। বাপ মা মরা মেয়ে গুলোর কপাল হয়তো এমন পোড়াই হয়৷
রুহেল জোর গলায় বললো,
দেখুন আন্টি, আপনাদের ভুল হচ্ছে। হ্যাঁ,আমি ওই মেয়ের দিকে তাকিয়েছি, কিন্তু শুধু চোখ দেখতাম। কখনো আপনাদের মতো নীচু মন মানসিকতা নিয়ে দেখিনি।
আন্টি আবার চিল্লাতে চিল্লাতে বললো,
আইছে আমার সাধু পুরুষ, সব গুলারে আমার চেনা আছে।
সুহানা খাতুন বলল,
এই ছেমরি রে আমি ঘরে রাখতে পারবোনা, ওরে এখুনি এই ভণ্ড মাস্টারের লগে বিয়ে দিয়ে বিদায় করে দেন ভাবী৷
যেই বলা সেই শুরু, রুহেলকে আটকে রেখে বাসার কয়েকজন প্রতিবেশী মিলে বিয়ের আয়োজন করে বসে৷ মাধবীকে ও রুহেলের পাশে জোরকরে বসিয়ে রাখা হয়েছে৷ বিয়ে করতে না চাইলেও জোর করে বিয়ে দিবেই এমন পরিস্থিতির স্বীকার রুহেল৷ কি ভুল টাই না করেছে এই মেয়ের চোখ দেখে৷ মেয়েটার চোখে একটা নেশা আছে, কালো চোখের মনির ভিতর অনেক কষ্ট লুকিয়ে আছে। সেই গভীর কালো গর্তে ডুব দিয়ে কষ্ট গুলো খুঁজে পেতে তার সমাধান করতে খুব ইচ্ছে করতো। চোখ দুটো তে একপ্রকার মায়া আছে। একদম মায়াজাল, যে জালে একবার আটকে যাবে, কখনো ছুটতে পারবেনা। মায়ার অতলে আরও ডুবে যেতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু সব ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে নেই বলে একপলক দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিতো রুহেল। কে জানতো এই একপলক দৃষ্টি তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। তাহলে কখনোই ওভাবে দেখত না রুহেল।
অবশেষে রুহেলের সাথে মাধবীলতা ওরফে মাধবীর বিয়ে হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে বিয়ে করাতে একপ্রকার রেগে যায় রুহেল। বিয়ের পর যখন সবাই মাধবীর হাত তার হাতে তুলে দেয়, তখন রেগে গিয়ে মাধবীর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
জোর করে বিয়ে করতে বাধ্য করলে আমাকে। না বউ হিসেবে মানবো, না তোমাকে নিয়ে সংসার সম্ভব।
মাধবী বুঝে যায়, এতিমের কপালে কখনো সুখ আসবার নয়। শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।
অল্প কিছু কাপড় আর মাধবীর ব্যবহার্য জিনিসপত্র একটা ব্যাগে দিয়ে দেয় সাবিহা। একপ্রকার দুজন কে বাড়ি থেকে বের করে যেনো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সুহানা।
রুহেল খুব জোরে জোরে হাটছে, মাধবী ওর সাথে হাটতে পারছেনা। কিন্তু অবলম্বন একমাত্র রুহেলই । আর যাওয়ার কোন যায়গা নেই বলে একপ্রকার দৌড়াচ্ছে রুহেলের সাথে।
চারিদিকে খাঁ খাঁ রোদ, দু’জনেই ঘেমে নেয়ে একাকার। হঠাৎ ফুটপাতের উপর দাঁড়িয়ে পড়ে রুহেল। মাধবী ও দাঁড়ালো৷ রুহেল চিৎকার করে বলল,
আমার পিছনে আসছিস কেন? চলে যা আমার আশেপাশে থেকে।
কোথায় যাবো?
এবার আর মাধবীর মায়া ভরা চোখের দিকে না তাকিয়েই বলল,
জাহান্নাম থেকে এসেছিস নাকি, যে যাওয়ার জায়গা নেই! তাহলে সেখানেই চলে যা।
বাপ মা মরা মেয়ের যাওয়ার জায়গা থাকে না। আচ্ছা, আমি আমার ব্যবস্থা করে নিবো। আপনি চলে যান৷ আর আপনার সাথে সাথে হাটবো না।
রুহেল হাঁটতে শুরু করে, আর মাধবী একবার রুহেলের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফুটপাতের উপর বসে পড়ে। কি আর করার, যাবেই বা কোথায়?
চলবে.....
কাজল_চোখের_মেয়ে
হাফিজ_মাহমুদ
সূচনা_পর্ব