19/06/2025
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত মিথ্যা খবরের বিষয়ে ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা রিউমর স্ক্যানার এবং অন্যান্য সূত্রে উল্লেখিত তথ্যের ভিত্তিতে নিচে ৩০টি মিথ্যা খবরের তালিকা দেওয়া হলো। যদিও রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদনে ২০২৪ সালে ১৩৭টি মিথ্যা প্রতিবেদনের উল্লেখ আছে, তবে নির্দিষ্ট ১৩টি প্রধান গুজবের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত উদাহরণগুলো সাম্প্রতিক প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্যের ভিত্তিতে সংকলিত হয়েছে।প্রধান মিথ্যা খবরের তালিকা:
১।লালমনিরহাটে চীনের সহায়তায় বিমানঘাঁটি নির্মাণ: ভারতীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ চীনের সহায়তায় লালমনিরহাটে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানঘাঁটি নির্মাণ করছে। রিউমর স্ক্যানার নিশ্চিত করেছে, লালমনিরহাটের বিমানবন্দর ৬০ বছর ধরে বন্ধ, এবং এটি পুনরায় চালুর কোনো উদ্যোগ নেই।
২।ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আইসিইউতে ভর্তির গুজব: ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচার করা হয় যে ড. ইউনূস অসুস্থ হয়ে আইসিইউতে ভর্তি। একটি হাসপাতালের ছবি প্রকাশিত হলেও, রিউমর স্ক্যানার জানায়, ছবিটি ড. ইউনূসের নয় এবং সাম্প্রতিক বা বাংলাদেশের নয়।
৩।শেখ হাসিনার নামে ভুয়া খোলা চিঠি: শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর তার নামে একটি ভুয়া চিঠি ফেসবুকে ছড়ায়, যা ভারতের ‘ত্রিপুরা ভবিষ্যৎ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এতে দাবি করা হয়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষমতাচ্যুতির জন্য দায়ী করেছেন। রিউমর স্ক্যানার নিশ্চিত করেছে, চিঠিটি মিথ্যা।
৪। মুসলিম ব্যক্তিকে হিন্দু দাবি করে প্রচার: ২০১৩ সালে বাবুল হাওলাদার নামে একজন মুসলিম ব্যক্তির নিখোঁজ ছেলের জন্য মানববন্ধনের ভিডিওকে হিন্দু ব্যক্তির ঘটনা দাবি করে প্রচার করা হয়। এটি এএনআই, এনডিটিভি, এবং দৈনিক জাগরণে প্রকাশিত হয়।
৫। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি: বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়। রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
৬।পাকিস্তানি জাহাজে অস্ত্র আনার দাবি: ভারতীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, পাকিস্তানের ‘সোয়াত’ নামের একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্র নিয়ে এসেছে। রিউমর স্ক্যানার জানায়, জাহাজটি ‘এমভি ইউয়ান জিয়ান ফা ঝং’, যা বাণিজ্যিক জাহাজ এবং কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য বহন করছিল।
৭। ড. ইউনূস ফ্রান্সে পালিয়ে গেছেন: ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয়ের পর ভারতীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, ড. ইউনূস ফ্রান্সে পালিয়ে গেছেন। রিউমর স্ক্যানার এটিকে মিথ্যা বলে নিশ্চিত করেছে।
৮। নিহত আইনজীবীকে চিন্ময় কৃষ্ণের আইনজীবী দাবি: চট্টগ্রামে নিহত আইনজীবী সাইফুল ইসলামকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবী হিসেবে প্রচার করা হয়, যা মিথ্যা ছিল।
৯। বাংলাদেশে ভারতীয় চ্যানেল বন্ধের গুজব: ভারতীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে ভারতীয় টিভি চ্যানেল বন্ধ করা হয়েছে। এটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
১০। হিন্দু মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের দাবি: ভারতের প্রতিমা বিসর্জনের ভিডিও ব্যবহার করে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে মুসলিমদের হামলায় হিন্দু মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
১১। শ্যামলী পরিবহনের বাসে হামলার মিথ্যা তথ্য: বাংলাদেশে শ্যামলী পরিবহনের বাসে হামলার দাবি করে ভারতীয় গণমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়।
১২। চিন্ময় কৃষ্ণের আইনজীবীর উপর হামলার ভুয়া দাবি: চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবী রমেন রায়ের উপর হামলার দাবি করে হাসপাতালের একটি ছবি ছড়ানো হয়, যা মিথ্যা ছিল।
১৩। যুক্তরাজ্যের ভ্রমণ সতর্কতা নিয়ে বিভ্রান্তি: বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাজ্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর খবর প্রচার করা হয়।
১৪। ইসকনকে উগ্রবাদী সংগঠন দাবি: ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়, বাংলাদেশ সরকার ইসকনকে ‘উগ্রবাদী সংগঠন’ আখ্যা দিয়েছে। এটি অতিরঞ্জিত এবং ভুল তথ্য ছিল।
১৫। হিন্দু নির্যাতনের অতিরঞ্জিত প্রতিবেদন: শত শত হিন্দু মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর এবং হিন্দুদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের দাবি করে ভারতীয় গণমাধ্যমে অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশিত হয়।
১৬। চিন্ময় কৃষ্ণের গ্রেপ্তার নিয়ে মিথ্যা আখ্যান: চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তারকে (নভেম্বর ২০২৪) হিন্দুদের উপর নিপীড়নের অংশ বলে প্রচার করা হয়, যা মিথ্যা ছিল।
১৭।বাংলাদেশে অস্থিরতার অতিরঞ্জিত চিত্র: আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে বিশৃঙ্খলার চিত্র অতিরঞ্জিত করে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়।
১৮। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিক্ষোভ নিয়ে মিথ্যা তথ্য: হিন্দু সম্প্রদায়ের বিক্ষোভকে মুসলিম-বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করে ভারতীয় গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার করা হয়।
১৯। চীনের প্রভাব বাড়ছে দাবি: বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়ছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে অতিরঞ্জিত ও ভিত্তিহীন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
২০।পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ছে দাবি: পাকিস্তানি জাহাজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। এটি মিথ্যা ছিল।
২১।বাংলাদেশে ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের দাবি: ভারতীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায় ত্রাণ বিতরণে বঞ্চিত হচ্ছে, যা ভিত্তিহীন ছিল।
২২।অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের দাবি: ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার ভারত-বিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত, যার কোনো প্রমাণ নেই।
২৩। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমতায় আসার গুজব: জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে ক্ষমতায় ফিরে এসেছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে মিথ্যা দাবি প্রচারিত হয়।
২৪। বাংলাদেশে হিন্দু বাড়িতে লুটপাটের দাবি: হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে ব্যাপক লুটপাটের দাবি করে ভারতীয় গণমাধ্যমে অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশিত হয়।
২৫। বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্য বয়কটের মিথ্যা তথ্য: ভারতীয় পণ্য বয়কটের ব্যাপক আন্দোলন চলছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার করা হয়।
২৬। চিন্ময় কৃষ্ণের গ্রেপ্তারে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দাবি: চিন্ময় কৃষ্ণের গ্রেপ্তারের পর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়েছে বলে মিথ্যা প্রচার করা হয়।
৩৭। বাংলাদেশে ভারতীয় দূতাবাসে হামলার গুজব: ভারতীয় দূতাবাসে হামলার দাবি করে ভারতীয় গণমাধ্যমে ভুয়া খবর ছড়ানো হয়।
২৮। বাংলাদেশে হিন্দু নেতাদের গ্রেপ্তারের মিথ্যা তথ্য: বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে হিন্দু নেতাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে মিথ্যা দাবি প্রচারিত হয়।
২৯। বাংলাদেশে মুসলিমদের হিন্দু বিরোধী বিক্ষোভের দাবি: হিন্দু বিরোধী বিক্ষোভের দাবি করে ভারতীয় গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার করা হয়।
৩০। বাংলাদেশে বিদেশি জঙ্গিদের প্রবেশের গুজব: বিদেশি জঙ্গিরা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে ভিত্তিহীন দাবি প্রচারিত হয়।
বিশ্লেষণ ও প্রেক্ষাপট: প্রচারের পরিমাণ: রিউমর স্ক্যানারের তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালে ভারতের ৭২টি গণমাধ্যমে ১৩৭টি মিথ্যা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যা ২৫ কোটি বার ভিউ হয়েছে। এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২৭১টি ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রধান গণমাধ্যম: রিপাবলিক বাংলা , হিন্দুস্তান টাইমস, জি নিউজ, লাইভ মিন্ট, এবং ইন্ডিয়া টুডে, এবিপি আনন্দ, আজতক এই মিথ্যা প্রচারে অগ্রণী ছিল।
উদ্দেশ্য: বিশ্লেষকদের মতে, এই মিথ্যা প্রচারণার লক্ষ্য ছিল হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা তৈরি, এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিন্দু ভোটব্যাংককে প্রভাবিত করা।
সাম্প্রদায়িক ইস্যু: ১৪৮টি মিথ্যা তথ্যের মধ্যে ১১৫টি ছিল সাম্প্রদায়িক ইস্যু-কেন্দ্রিক, যা প্রধানত এক্স প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়েছে।
উপরের তালিকাটি রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদন, অল্ট নিউজের বিশ্লেষণ, এবং অন্যান্য সূত্রের ভিত্তিতে সংকলিত। আরও বিস্তারিত তথ্যের জন্য রিউমর স্ক্যানার (www.rumorscanner.com) বা অল্ট নিউজ (www.altnews.in) এর ওয়েবসাইট দেখতে পারেন।