02/07/2026
# তোমার হাসিতেই আমার পৃথিবী 💔🌸
আরিফ প্রথমবার মেয়েটিকে দেখেছিল কলেজের লাইব্রেরির সামনে।
সাদা পোশাক, হাতে কয়েকটা বই, আর মুখে এমন একটা হাসি—যেটা দেখে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তে দূর হয়ে যেতে পারে।
মেয়েটির নাম ছিল মায়া।
সেদিন মায়া শুধু বলেছিল,
"মাফ করবেন, সময়টা বলবেন?"
আরিফ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় বলেছিল, কিন্তু সত্যি বলতে সে সময়টা মনে রাখেনি।
সে শুধু মনে রেখেছিল মেয়েটির হাসিটা।
কারণ সেই হাসিতেই যেন তার পৃথিবী আটকে গিয়েছিল।
দিন যেতে লাগল।
বন্ধুত্ব হলো।
বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা।
কলেজ শেষে বিকেলের চায়ের দোকান, বৃষ্টির দিনে একসাথে ভেজা, পরীক্ষার আগে রাত জেগে নোট তৈরি—সবকিছুতেই যেন তারা একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল।
একদিন নদীর পাড়ে বসে মায়া বলেছিল,
"যদি কোনোদিন আমি হারিয়ে যাই, আমাকে খুঁজবে?"
আরিফ হেসে বলেছিল,
"তুমি হারিয়ে গেলে পুরো পৃথিবী খুঁজে ফেলব।"
মায়া মুচকি হেসেছিল।
"তাহলে পৃথিবী খুঁজতে হবে না। আমার হাসিটা মনে রাখলেই আমাকে খুঁজে পাবে।"
আরিফ তখন কথাটার গভীরতা বুঝতে পারেনি।
---
তিন বছর পর—
সবকিছু বদলে যেতে শুরু করল।
মায়া আগের মতো ফোন করত না।
মেসেজের উত্তর দিতে দেরি হতো।
দেখা করার অজুহাত কমতে লাগল।
আরিফ ভাবত, হয়তো ব্যস্ততা।
হয়তো সময়ের চাপ।
হয়তো সাময়িক দূরত্ব।
এক বিকেলে মায়া দেখা করতে বলল।
শহরের সেই পুরোনো পার্কে।
মায়া সেদিন অদ্ভুত শান্ত ছিল।
সে বলল,
"আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।"
আরিফ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
"তুমি মজা করছ?"
"না।"
"তুমি না করে দাও।"
মায়া ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
"সব ভালোবাসা এক হওয়ার জন্য হয় না।"
"তাহলে এতদিন?"
মায়ার চোখ ভিজে উঠল।
"কিছু মানুষ জীবনে আসে থেকে যাওয়ার জন্য না, বদলে দেওয়ার জন্য।"
সেদিন মায়া চলে গিয়েছিল।
আরিফ ভেবেছিল, সে প্রতারণার শিকার হয়েছে।
সে মায়াকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিল।
অন্তত চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু যে মানুষটার হাসিতে নিজের পৃথিবী খুঁজে পেয়েছিল, তাকে ঘৃণা করা কি এত সহজ?
---
পাঁচ বছর কেটে গেল।
আরিফ চাকরি পেল।
জীবন এগিয়ে গেল।
কিন্তু কিছু শূন্যতা কখনো ভরে না।
এক বর্ষার রাতে হঠাৎ তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
ওপাশ থেকে একটি নারীকণ্ঠ বলল,
"আপনি কি আরিফ?"
"জি।"
"আমি মায়ার বড় বোন।"
আরিফের বুক কেঁপে উঠল।
"মায়া আপনাকে একটা চিঠি দিয়ে যেতে বলেছিল। যদি কোনোদিন সাহস পাই, তাহলে যেন আপনাকে দিই।"
পরদিন আরিফ সেই চিঠিটা হাতে পেল।
কাঁপা হাতে খাম খুলল।
ভেতরে মায়ার লেখা—
> "আরিফ,
>
> যখন তুমি এই চিঠিটা পড়বে, তখন হয়তো আমি অনেক দূরে।
>
> তুমি যেদিন ভেবেছিলে আমি তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি, সেদিনই আমি জানতে পেরেছিলাম আমার রক্তের ক্যান্সার হয়েছে।
>
> ডাক্তার বলেছিলেন আমার হাতে খুব বেশি সময় নেই।
>
> আমি চাইনি তুমি হাসপাতালের করিডোরে বসে আমার শেষ দিনগুলোর সাক্ষী হও।
>
> আমি চাইনি তোমার সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলো স্যালাইন আর ওষুধের গন্ধে ভরে যাক।
>
> তাই আমি খারাপ মানুষ হওয়ার অভিনয় করেছি।
>
> তুমি আমাকে ঘৃণা করো, এই প্রার্থনাই করেছিলাম।
>
> কিন্তু একটা কথা জানবে—
>
> তোমার হাসি দেখে যেমন আমি বাঁচতে শিখেছিলাম,
> তেমনি তোমার ভালোবাসা নিয়েই আমি পৃথিবী ছেড়েছি।
>
> আর হ্যাঁ,
> তুমি একদিন বলেছিলে আমার জন্য পুরো পৃথিবী খুঁজবে।
>
> খুঁজতে হবে না।
>
> তোমার হাসিতেই আমার পৃথিবী ছিল।
>
> আর তোমার পৃথিবীটাও যেন হাসতে ভুলে না যায়।"
চিঠির ভেতর একটি ছবি ছিল।
কলেজের প্রথম দিনের ছবি।
লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে মায়া হাসছে।
আরিফ অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বহু বছর পর প্রথমবারের মতো সে কাঁদল।
বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছিল।
হয়তো আকাশও সেদিন কাউকে হারিয়েছিল।
আজও যখন বৃষ্টি নামে, আরিফ সেই ছবিটা বের করে।
ছবির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে—
"তুমি ঠিকই বলেছিলে, মায়া।
তোমার হাসিতেই আমার পৃথিবী ছিল।
আর আজও আছে।"