01/08/2026
হারিয়ে যাওয়া মিলনায়তন
ইয়াসিন সজীব
টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই শিক্ষক মিলনায়তনের দরজা খুলে একে একে সবাই ঢুকলেন। কিন্তু ঘরজুড়ে অদ্ভুত এক নীরবতা। কেউ চায়ের কাপ হাতে বসে আছেন, কেউ জানালার পাশে। সবার চোখ এক জায়গায়—মোবাইলের পর্দায়। আঙুল চলছে, স্ক্রিন বদলাচ্ছে, কিন্তু মুখে কোনো কথা নেই। একই ঘরে বসেও যেন সবাই আলাদা আলাদা পৃথিবীর বাসিন্দা।
এ দৃশ্য দেখে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মাহবুব হোসেন স্যার মৃদু হেসে বললেন, “এই ঘরটা একসময় এত চুপচাপ ছিল না।”
পাশে বসা এক তরুণ শিক্ষক কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন ছিল স্যার?”
স্যার যেন স্মৃতির দরজা খুলে দিলেন।
“আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে টিফিনের ঘণ্টা মানেই ছিল প্রাণের উৎসব। কেউ নতুন বইয়ের গল্প শোনাতেন, কেউ শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তর্কে মেতে উঠতেন। সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, খেলাধুলা কিংবা দেশের সমকালীন ঘটনা—কোনো বিষয়ই আলোচনার বাইরে থাকত না। মতের অমিল ছিল, কিন্তু মনোমালিন্য ছিল না। তর্ক শেষে সবাই একসঙ্গে চা খেতাম, হাসতাম। সম্পর্কগুলো ছিল নির্মল, মুহূর্তগুলো ছিল প্রাণবন্ত।”
কথা শেষ হতেই মিলনায়তনে আবার নীরবতা নেমে এল। তবে সেই নীরবতা আর আগের মতো ছিল না। যেন প্রত্যেকেই নিজের ভেতরে কোথাও ফিরে গেল। ধীরে ধীরে কয়েকটি মোবাইলের পর্দা নিভে গেল। কেউ একজন মুখ তুলে পাশের সহকর্মীকে বললেন, “এক কাপ চা হবে?” আরেকজন মৃদু হেসে বললেন, “অনেক দিন তো গল্পই করা হয়নি!” মুহূর্তেই জমে উঠল ছোট্ট এক আড্ডা। হাসির শব্দে মিলনায়তনের দেয়ালগুলো যেন আবার বহু বছর আগের সেই চেনা প্রাণ ফিরে পেল।
হয়তো সময়কে আর পেছনে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। কিন্তু মানুষের পাশে বসে মানুষের কথা শোনার অভ্যাসটুকু আজও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কারণ সম্পর্কের উষ্ণতা কখনো কোনো প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে না; তা জন্ম নেয় একটি আন্তরিক হাসিতে, এক কাপ ভাগাভাগি করা চায়ে, আর হৃদয় থেকে হৃদয়ে পৌঁছে যাওয়া কিছু সহজ-সরল কথোপকথনে। মানুষের সঙ্গে মানুষের এই সংযোগই মানুষের বেঁচে থাকার চিরকালীন প্রেরণা। এই অনুভূতিটুকু চিরকাল বহমান থাকুক জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রাপ্তি হিসেবে।