14/02/2022
"বিবেক"
-এস. এম. তামিম
লাঞ্চ ব্রেকের আগে একজন ফিটফাট , মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক এক কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করলেন,
- শওকত সাহেবের রুম কোনদিকে?
- স্যারের রুম ঐদিকে , কিন্তু স্যার এখন দেখা করবেন না। আপনি ব্রেকের পরে আসুন।
- তোমার স্যারকে বলো মনিরুল হক নামের কেউ দেখা করতে চায়। আর্জেন্ট।
দেড় মিনিট পর কর্মচারী ফিরে এসে উনাকে নিয়ে গেলেন শওকত হোসেনের অফিসে। টেলিফোনে কথা বলতে থাকা শওকত হোসেনের চোখ ভদ্রলোককে দেখেই জ্বলজ্বল করে উঠলো। ফোন রেখে দিলেন।
- আসসালামুয়ালাইকুম শওকত সাহেব।
- ওয়ালাইকুমুসসালাম। আপনার সব কাগজ তো তৈরি , আপনার অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছিলাম।
- আর বলবেন না , যা ব্যস্ত থাকি সারাদিন। জানেনই তো।
- তা আর বলতে... দেখে নিন সব ঠিক আছে কিনা।
ভদ্রলোক শওকত সাহেবের দেওয়া কাগজগুলো দেখলেন না। আশেপাশে একবার চোখ ফিরিয়ে তার হাতে থাকা কালো রঙের ব্রিফকেসটি শওকত সাহেবের হাতে দিলেন। শওকত সাহেব সামান্য অজানা ভয়ের সাথে ব্রিফকেসটি নিয়ে নিজের টেবিলের নিচে রাখলেন। পরক্ষণে মনিরুল নামক ভদ্রলোকটি উনার সাথে আরো দুইয়েক বাক্য খরচ করে এরপর যাবার জন্য উঠে দাড়ালেন। দরজার সামনে গিয়ে মৃদু কন্ঠে বললেন ,
- PIN : 8883
মুহুর্তের মাঝেই কক্ষে শুধু শওকত সাহেব আর কালো ব্রিফকেস। ভদ্রলোকটি চলে গিয়েছে।
সন্ধে বেলা , শওকত সাহেব সযত্নে ব্রিফকেস নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। প্রতিদিনের মত CNG তে যাবার সাহস পেলেন না। আজ Uber ডেকে পাঠালেন।
পড়ন্ত সন্ধ্যা , মাগরিবের আজানের সময় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে Uber এর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো তখনো জ্বলেনি। ব্যস্ত শহরের মাঝেও রাস্তাটি বেশ ফাঁকা। Uber আরো ৭ মিনিট আগে আসার কথা , এখনও এসে পৌঁছায়নি। তার মনে হলো হঠাৎ কেউ এসে ঠিক তার পেছনে দাড়িয়েছে। তিনি পেছনে ফিরে তাকানোর আগেই হঠাৎ কে একজন আচমকা সজোড়ে আঘাত করলো তার ঘাড়ে। উনি মুহুর্তের মাঝেই জ্ঞান হারালেন , জ্ঞান হারানোর ঠিক আগ মুহূর্তেই দেখলেন এক এক করে সোডিয়াম বাতি গুলো জ্বলে উঠছে।
- শওকত সাহেব! শওকত সাহেব!
- কে? কে?
- উঠুন।
- আমার চোখ বেধে রেখেছন কেন? কোথায় এনেছেন আমাকে?
- সেটা জানা জরুরী নয় , তা কেমন আছেন আপনি?
- আপনি কি চান?
- আপাতত জানতে চাই আপনি কেমন আছেন।
- দেখুন , আমার সাথে রসিকতা করবেন না দয়া করে। আমাকে কেন নিয়ে এসেছেন আপনি?
- ব্রিফকেস টায় কি আছে ?
- কোন ব্রিফকেস?
শওকত সাহেব ব্রিফকেসের কথা এতক্ষণ আসলেই ভুলে গিয়েছিলেন। হঠাৎ ব্রিফকেসের কথা মাথায় এলে তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। মৃদু কাশি শুরু হয় শওকত সাহেবের। উনার অ্যাজমা সহ আরো নানা রোগ আছে।
- উহহু! উহহু!
- আজ পকেটে নেই?
- উহহু! আপনি কিসের কথা বলছেন?
- ইনহেলার , যেইটা প্রতিদিন বাম পকেটে রাখেন , "Salbutamol"
শওকত সাহেবের কাশি আচমকা থেমে গেলো। ঘামে ভেজা শরীর কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে গেলো। ঠান্ডা শরীরে ঘাম থাকায় উনার যেন শীত আরেকটু বেশি করতে লাগলো।
- আপনি জানলেন কিভাবে?
অজ্ঞাত লোকটি উত্তর দিলো না।
- তা শওকত সাহেব , আপনার ব্রিফকেসে তো ১২ লাখ থাকার কথা। ৩ হাজার কম আছে দেখছি।
- আপনি কিভাবে জানেন আমার কাছে ১২ লাখ থাকার কথা? আপনি PIN কিভাবে পেলেন?
প্রতিবারের মত এবারও কোনো উত্তর এলো না অজ্ঞাত লোকটির পক্ষ হতে।
- শওকত সাহেব! এত টাকা দিয়ে কি করতেন?
- মানে?
- বলছি , এত টাকা দিয়ে কি করবেন?
শওকত সাহেব কথা খুঁজে পেলো না। খানিকটা অসহায় লাগলো নিজেকে।
শওকত সাহেবের ক্রমে ক্রমে দম বন্ধ লাগছে। তিনি লোকটার আওয়াজ ব্যতীত আশেপাশে আর কোনো আওয়াজ পাচ্ছেন না। বিষয়টা তিনি অনেক দেরীতে লক্ষ্য করলেন।
- ভাই , দয়া করে বলবেন? আমাকে কেন তুলে এনেছেন? আমি আপনার কি ক্ষতি করছি?
- ক্ষতি করেন নাই? আপনি তো আমাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।
- মানে? কি বলছেন এসব?
প্রতিবারের মতো লোকটি এবারও চুপ রইলো।
- শওকত সাহেব। আপনার স্ত্রী তো মারা গিয়েছে তাও ৯ বছর হয়ে গেলো। ছেলেটাকে নিজের সাথে রাখেন না কেন?
- আমি রাখতে চাই , ওই থাকতে চায়না।
- মা মরা ছেলে , বাবার সাথে থাকতে চায়না কেন বলুন তো?
- ও চায়না আমি...
- বলুন.. বলুন.. সত্যি স্বীকার করতে লজ্জা হলে বুঝতে হবে কাজটা ভুল।
শওকত সাহেবের বুকে কিঞ্চিৎ ব্যথা শুরু হলো। তিনি আবারও কাশতে শুরু করলেন।
অজ্ঞাত লোকটা Salbutamol নামক ইনহেলার শওকত সাহেবের মুখে ধরলেন। এরপর একটা ঔষধ দিয়ে গিলে নিতে বললেন। লোকটার হাতে ঔষধ গেলার জন্য পানির গ্লাস।
- আপনি কি ঔষধ দিচ্ছেন এটা?
- আপনার অ্যাজমার ঔষধ।
- আপনি আমার সম্পর্কে এত কিছু কিভাবে জানেন?
লোকটি এইবার কঠিন গলায় বললো ,
- সময় হলেই জানতে পারবেন!
- আপনি মনিরুল সাহেবকে ৪ বছর হলো বেআইনি ভাবে ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়ে যাচ্ছেন। উনিও আপনাকে মোটা টাকা দিচ্ছে। ফুলে ফেপে উঠছেন দিনে দিনে। বয়স কত আপনার?
- ৫৩
- ৫৮!!
শওকত সাহেব বুঝলেন , ইনাকে মিথ্যা বলা ঠিক হচ্ছেনা।
- ভাই , দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে কেন এনেছেন?
- গল্প করতে
- গল্প?!
- হুম , গল্প। আচ্ছা , আপনার কি ধারণা আপনি আর কতদিন বাঁচবেন?
শওকত সাহেব চমকে উঠলেন। উত্তর দিলেন না।
লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলো,
- এইযে সপ্তাহে ২ বার হাসপাতালে দৌড়ান। ছেলে আপনাকে ত্যাগ করে আলাদা থাকে আপনার ঘুষের টাকায় কেনা আহার মুখ দিয়ে নামাবেনা বলে , এরপরেও কেন দুর্নীতি করেন? কি লাভ?
শওকত সাহেব এবারও উত্তর দিতে পারলেন না।
- আমি যদি আজ আপনাকে এইখানে মেরে ফেলি , স্রষ্টার কাছে যাবার জন্য প্রস্তুত?
শওকত সাহেবের বুকের ব্যথা ক্রমশই বাড়তে শুরু করলো। উনি সাহস নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ,
- আপনি কি চান স্পষ্ট করে বলুন , আমাকে ছেড়ে দিন।
লোকটা চিৎকার করে বললো ,
- আমার খুনের প্রতিশোধ নিতে চাই!!
শওকত সাহেবের বুকের মাঝে ধুক ধুক করতে শুরু করলো। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো। আশেপাশের সব ভয় যেন ক্রমশ তার দিকে ব্যাপিত হচ্ছে।
তার কন্ঠ এতক্ষণ বেশ শক্ত থাকলেও , এইবার বেশ ক্ষীণ হয়ে গেলো।
- আমি কারো কোনো ক্ষতি করিনি। আমাকে দয়া করে ছেড়ে দিন।
- আপনি আমাকে দিনে দিনে নিঃশেষ করে দিয়েছেন।
- আপনি কে? আমি কেন আপনার ক্ষতি করবো? আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা।
- আপনি আর খুব বেশিদিন নেই জেনেও ক্রমাগত নিজের উপর জুলুম করে যাচ্ছেন। একবারও নিজের ছেলেটার জন্যও ভাবলেন না , মা মরা ছেলেটা শুধু চেয়েছিল তার নিষ্ঠাবান বাবার সাথে থাকতে। আপনি তার সেই জায়গা টুকুও নিঃশেষ করে দিয়েছেন। প্রতিনিয়ত অন্যায়ের পাশে থেকেছেন। প্রবৃত্তি কে অনুসরণ করেছেন।
শওকত সাহেব নিজের অজান্তেই কেঁদে উঠলেন। তার মাথায় ঝিম ধরে যাচ্ছিল , শরীর অবশ হয়ে আসছিল। তার মনে হচ্ছিল ক্রমান্বয়ে তার চোখের আধার যেন আরো গভীর হচ্ছে। মৃত্যু হয়তো তাকে কাছে টেনে নিচ্ছে
- আপনি কে? আমি আপনার কি ক্ষতি করেছি?
লোকটি আচমকা শওকত সাহেবের গলা চেপে ধরে চিৎকার করে বলতে লাগলো,
- আমিই তোমার বিবেক!!! আমিই তোমার বিবেক!!!
শওকত সাহেব মুহূর্তের মাঝেই জ্ঞান হারালেন।
পরেরদিন সকালে শওকত সাহেব নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিষ্কার করলেন। লাঞ্চ ব্রেকে লাঞ্চ দিতে এসে কর্মচারী অফিসের ফ্লোরে অজ্ঞান অবস্থায় উনাকে পান। উনার ব্রিফকেসটা উনার পাশেই ফ্লোরে অবহেলায় পড়ে ছিলো...
©️S. M. Tamim