24/08/2026
মদিনার চারপাশ তখন শান্ত,গভীর রাত।,পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধার জ্বালা নিয়ে ঘর থেকে বের হলেন আবু বকর (রা.)।
রাস্তায় দেখা হলো উমর (রা.)-এর সাথে। জানা গেল, তিনিও একই কারণে ঘর থেকে বের হয়েছেন। ঠিক তখনই সেখানে এলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)! প্রিয় দুই সাহাবীকে রাতের এই অসময়ে রাস্তায় দেখে তিনি কারণ জানতে চাইলেন।
তাঁরা যখন ক্ষুধার কথা জানালেন, তখন নবীজি (সা.) বললেন, "যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! যে জিনিসের তাড়নায় তোমরা বের হয়েছ, সেই একই জিনিস আমাকেও আজ ঘর থেকে বের করে এনেছে।"
হাদীসটি বলার সময় সাহাবী আবু হুরাইরা (রাদি.) বলছেন, "নবীজি (সা.) সচরাচর এই সময়ে ঘর থেকে বের হন না।" অর্থাৎ তিনি ক্ষুধার যন্ত্রণায় টিকতে না পেরেই সেদিন রাতে বের হয়েছিলেন।
দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন পাঠক! যিনি দুই জাহানের সর্দার, যিনি চাইলে ওহুদ পাহাড় সোনা হয়ে যেতে পারত, তিনি এবং তাঁর শ্রেষ্ঠ দুই সাহাবী ক্ষুদার্ত পেট নিয়ে রাতের অন্ধকারে মদিনার রাস্তায় হাঁটছেন!
মাঝে মাঝে সীরাতের এমন কিছু ঘটনা স্মরণ হলে চোখে পানি চলে আসে। হায় আল্লাহ! আমি যদি আল্লাহর রাসূলকে সেদিন খাওয়াতে পারতাম! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!
নবীজি (সা.) তাঁর প্রিয় দুই সাহাবীকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটি বাড়ির সামনে পৌঁছালেন। বাড়িটা আবুল হাইসাম ইবনুত তাইহান (রা.) নামক এক আনসারি সাহাবীর।
সাহাবী তখন বাড়িতে ছিলেন না, পানি আনতে গিয়েছিলেন বাহিরে। তাঁর স্ত্রী ঘরের ভিতর থেকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ তিন মেহমানের শব্দ পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন।
একটু পর সেই আনসারি সাহাবী ফিরে এলে তিনিও নিজের আবেগ আটকে রাখতে পারলেন না। আনন্দে বলে উঠলেন, "আলহামদুলিল্লাহ! আজ পৃথিবীতে আমার চেয়ে বেশি সম্মানিত মেহমান আর কারো ঘরে নেই!"
সাহাবী দৌড়ে গিয়ে তাঁর বাগানের একটি ডাল ভেঙে আনলেন, যেখানে কাঁচা, পাকা ও শুকনো, সব ধরনের চমৎকার খেজুর ছিল। এরপর তিনি মেহমানদারির জন্য একটি পশু জবাই করতে ছুরি হাতে নিলেন।
নবীজি (সা.) তাকে মনে করিয়ে দিলেন, "দুধ দেয় এমন কোনো প্রাণী জবাই কোরো না।" সাহাবী একটি নর ছাগল জবাই করলেন। এরপর তাঁরা তৃপ্তি মিটিয়ে গোশত ও খেজুর খেলেন এবং সুপেয় ঠান্ডা পানি পান করলেন।
ক্ষুধার্ত পেটে এই খাবার পড়ার পর যখন তাঁদের শরীরে কিছুটা শান্তি এল, তখন নবীজি (সা.) আবু বকর ও উমর (রা.)-এর দিকে তাকালেন।
দীর্ঘ অনাহারের পর এমন খাবার পেয়ে আমরা হয়তো তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতাম, কিন্তু নবীজি (সা.) উম্মতকে এক বিশাল আধ্যাত্মিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করালেন।
তিনি সূরা তাকাসুরের আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, "যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! কিয়ামতের দিন এই নেয়ামত সম্পর্কে তোমাদের অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে। তীব্র ক্ষুধা তোমাদের ঘর থেকে বের করেছিল, আর ঘরে ফেরার আগেই তোমরা এই অসাধারণ নেয়ামত লাভ করলে।"
দিনের পর দিন অনাহারে থাকার পর সামান্য খাবার পেয়ে শ্রেষ্ঠ নবী যদি আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়ার কথা স্মরণ করেন, তবে প্রতিদিন টেবিলভর্তি খাবার খেয়ে আমরা কতটুকু শুকরিয়া আদায় করছি?
আল্লাহ আমাদের মাফ করুক।