08/08/2026
আটঘরিয়ায় পাটকাঠি ঘিরে নতুন সম্ভাবনা
।।ইব্রাহিম খলিল।।
পাবনার আটঘরিয়ায় পাট কাটার পর এখন পাটকাঠি শুকানো ও সংরক্ষণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মাঠ, বাড়ির উঠান, সুতার বিলের পাড় ও রাস্তার ধারে সারি সারি করে শুকানো হচ্ছে পাটকাঠি। পাটের আঁশ সংগ্রহের পর অবশিষ্ট পাটকাঠি এখন আর কৃষকের কাছে ফেলনা নয়। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার, বিভিন্ন কাজে লাগানো এবং বিক্রির মাধ্যমে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এই পাটকাঠিকে ঘিরে।
সরেজমিনে উপজেলার সুতার বিল,চত্রার বিল,ভাদির বিল, ব্যাঙ্গারি,সুজাপুর বিল,মাজপাড়ার মধ্যে কাকমাড়ির বিল,রত্নাই নদী,চন্দ্রাবতী নদী, চিকনাই নদী, এলাকায় দেখা যায়, বিলের পাড়জুড়ে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে সদ্য জাগ দেওয়া পাট থেকে পাওয়া পাটকাঠি। কোথাও লম্বালম্বি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, কোথাও আবার ছোট ছোট আঁটি করে স্তূপ করা হয়েছে। সকালের রোদ উঠতেই কৃষকেরা ভেজা পাটকাঠি রোদে বিছিয়ে দিচ্ছেন। কেউ পাটকাঠি উল্টে-পাল্টে দিচ্ছেন, আবার কেউ শুকিয়ে যাওয়া পাটকাঠি এক জায়গায় জড়ো করে আঁটি বাঁধছেন।
পাট কাটার পর কৃষকের প্রধান লক্ষ্য থাকে ভালো মানের আঁশ সংগ্রহ করা। তবে পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর অবশিষ্ট পাটকাঠিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের মানুষের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসা পাটকাঠির চাহিদা এখনও রয়েছে। অনেক পরিবার নিজেদের প্রয়োজনের জন্য পাটকাঠি সংরক্ষণ করে রাখে। অতিরিক্ত অংশ স্থানীয়ভাবে বিক্রি করে বাড়তি অর্থও পান কৃষকেরা।
সুতার বিল এলাকার এক কৃষক বলেন, “পাট চাষে অনেক খরচ ও পরিশ্রম করতে হয়। পাটের আঁশ বিক্রি করে মূল টাকা পাওয়া যায়। পাশাপাশি পাটকাঠি বাড়িতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি। বেশি হলে বিক্রি করে কিছু বাড়তি টাকা পাওয়া যায়।”
আরেক কৃষক বলেন, “বাড়ির উঠানে সব পাটকাঠি শুকানোর জায়গা হয় না। তাই বিলের পাড়ে এনে শুকিয়ে নিই। কয়েক দিন ভালো রোদ পেলে পাটকাঠি শুকিয়ে যায়। এরপর বাড়িতে নিয়ে সংরক্ষণ করি।”
কৃষকদের কাছে পাটকাঠির গুরুত্ব শুধু জ্বালানি হিসেবে নয়। বর্তমানে পাটকাঠির বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় পাটকাঠি থেকে জ্বালানি ও চারকোলসহ নানা ধরনের পণ্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে পাটকাঠির একটি বড় বাজার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, পাটকাঠির সঠিক বাজারব্যবস্থা গড়ে উঠলে তারা পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটকাঠি থেকেও ভালো আয় করতে পারবেন। এতে পাট চাষ আরও লাভজনক হতে পারে।
বর্তমানে আটঘরিয়ায় পাট কাটার মৌসুম চলছে। একই সঙ্গে চলছে পাট জাগ দেয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ। ফলে প্রতিদিনই নতুন করে পাটকাঠি বের হচ্ছে। এসব পাটকাঠি শুকাতে কৃষকেরা বিলের পাড়, খোলা মাঠ, বাড়ির উঠান এবং রাস্তার পাশের জায়গা ব্যবহার করছেন।
সুতার বিলের পাড়ে দেখা যায়, রোদে শুকাতে দেয়া পাটকাঠির ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। কোথাও কৃষকেরা পাটকাঠির আঁটি উল্টে দিচ্ছেন, আবার কোথাও শুকনো পাটকাঠি দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হচ্ছে। বিলের পাড়জুড়ে এমন দৃশ্য গ্রামীণ জীবনের পরিচিত চিত্র হয়ে উঠেছে।
গ্রামাঞ্চলে পাটকাঠির অন্যতম প্রধান ব্যবহার রান্নার জ্বালানি হিসেবে। শুকনো পাটকাঠি সহজেই আগুন ধরে এবং অনেক পরিবার নিজেদের উৎপাদিত পাটকাঠি ব্যবহার করে রান্নার কাজে জ্বালানি খরচ কমিয়ে থাকে।
এছাড়া পাটকাঠি ঘরের বেড়া, অস্থায়ী ঘর, গবাদিপশুর ঘেরসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। ফলে কৃষকের উৎপাদিত পাটকাঠির একটি বড় অংশ পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজনেই কাজে লাগে।
পাটকাঠির চাহিদা থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে এটি বিক্রি করেও কৃষকেরা কিছু বাড়তি আয় করছেন। তবে কৃষকদের অভিযোগ, সব জায়গায় পাটকাঠির নির্দিষ্ট বাজার নেই। ফলে অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। তাদের দাবি, ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে পাটকাঠি সংগ্রহ ও বিক্রির ব্যবস্থা করা হলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পেতে পারেন। পাশাপাশি পাটকাঠি প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন পণ্য তৈরির ছোট শিল্প গড়ে উঠলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতে পারে।
সুতার বিলের পাড়ের পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন রাস্তার ধারে পাটকাঠি শুকাতে দেখা যাচ্ছে। জায়গার সংকটের কারণে অনেক কৃষক রাস্তার পাশের খোলা জায়গা ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে পাটকাঠি দ্রুত শুকানো সম্ভব হলেও ব্যস্ত সড়কের পাশে রাখলে যানবাহন চলাচলে সমস্যা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্থানীয়দের পরামর্শ, রাস্তার মূল অংশ বা বাঁকের কাছে পাটকাঠি না রেখে নিরাপদ দূরত্বে শুকানো উচিত। এতে কৃষকের কাজও হবে, আবার পথচারী ও যানবাহন চলাচলও নিরাপদ থাকবে।
আটঘরিয়ার কৃষকেরা চান, পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটকাঠিরও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক। পাটকাঠি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা আরও লাভবান হতে পারবেন। কৃষকদের মতে, একই জমিতে উৎপাদিত পাটের প্রতিটি অংশের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে পাট চাষের লাভ বাড়ানো সম্ভব। পাটকাঠি নিয়ে নতুন করে বাণিজ্যিক উদ্যোগ গড়ে উঠলে কৃষকের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরাও উপকৃত হবেন।
আটঘরিয়ার সুতার বিলের পাড়ে এখন তাই শুধু পাটের আঁশ নয়, পাটকাঠিও হয়ে উঠেছে আলোচনার বিষয়। রোদে শুকানো সারি সারি পাটকাঠির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের শ্রম, পরিশ্রম ও বাড়তি আয়ের প্রত্যাশা। সঠিক বাজার ও বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে পাটকাঠিই হয়ে উঠতে পারে আটঘরিয়ার কৃষকের নতুন সম্ভাবনার দ্বার।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহমুদা মোতমাইন্না বলেন, পাটকাঠি কৃষকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজাত পণ্য। পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটকাঠি বিক্রি করেও কৃষকরা বাড়তি আয় করতে পারেন। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি পাটকাঠি দিয়ে বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরিরও সুযোগ রয়েছে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করতে পারলে পাটকাঠি কৃষকের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়াতে পারে। তিনি কৃষকদের পাটকাঠি নষ্ট না করে সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের আহ্বান জানান।