Natural Touch

Natural Touch Organic products that made from Pure Aloevera...Try these for gaining a healthy skin....❣️❣️
(7)

11/08/2026

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_৭

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

ঘণ্টা পেরিয়ে দিন গড়াচ্ছে, সময় ছুটে চলেছে নিজস্ব অমোঘ গতিতে। অথচ ইদানীং আয়াশের সময়কাল যেন কোনো এক অদৃশ্য স্থবিরতায় থমকে দাঁড়িয়েছে। আয়শা বেগমদেরও ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আইরিনও আজকাল তার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলছে না। চারপাশে এত মানুষ থাকা সত্ত্বেও আয়াশ নিজেকে কেমন এক অসীম নিঃসঙ্গতার মধ্যে আবিষ্কার করছে।বিশাল বাসাটাও যেন তার সঙ্গে সঙ্গে নিস্তব্ধতার অতল গহ্বরে ডুবে গেছে। বাড়ির অবস্থা বেহাল। কাজের লোকেও আসতে নিষেধ করে দিয়েছে সে, ফলে গোটা বাসাজুড়ে অযত্ন আর অব্যবস্থার ছাপ স্পষ্ট। কোথাও কোনো প্রাণের সঞ্চার নেই, নেই পরিচিত ব্যস্ততার সামান্যতম রেশও। আয়াশ অলস, অবসন্ন শরীরটা অবশেষে বিছানা থেকে টেনে তুললো সে। বিকেলেই আয়শা বেগমরা এসে পৌঁছাবেন। অথচ তারা এখনো জানেন না, ইনায়া নেই।

এই কয়েক দিনে কতবার যে মিথ্যের আশ্রয় নিতে হয়েছে তাকে, তার হিসাব নেই। কিন্তু তারা চলে এলে? তখনও কি করে মিথ্যে বলবে? ইনায়াকে তার বাবা-মা নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসেন। এই তিন বছরে মেয়েটা তাদের কাছে কেবল পুত্রবধূ হয়ে থাকেনি, ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে আরেকটি মেয়ে। যদি তারা জানতে পারেন, আয়াশের কারণেই সেই মেয়েটা আজ সবকিছু ছেড়ে চলে গেছে, তবে হয়তো কোনোদিনই তাকে ক্ষমা করতে পারবেন না। ঘরদোরের অবস্থাও করুণ হয়ে উঠেছে।জামাকাপড় এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। গত সপ্তাহ ধরে এই বাড়িতে কোনো প্রকার রান্না হয়নি, আয়াশের চুলের সঙ্গে দাড়িগুলোও অযত্নে, অবিন্যস্তভাবে বেড়ে উঠেছে। নির্ঘুম রাতগুলোর নীরব সাক্ষ্য হয়ে চোখের নিচে জমেছে গাঢ় কালি।

একসময়ের পরিপাটি মানুষটাকে এখন নিজের কাছেই যেন অপরিচিত লাগছে। আয়াশ ধীরে ধীরে একে একে সবকিছু গোছাতে শুরু করলো। এখন ফোন করে কাজের লোকে আসতে বলেও কোনো লাভ নেই। ছুটিটা তো সে নিজেই দিয়েছে। তাই আজ নিজের অবসন্ন হাতেই সবকিছু সামলাতে হবে। সময় নিয়ে, ধীর হাতে, একে একে ঘর গোছাতে লাগলো সে। সবশেষে নিজের ঘরের ছোট্ট ডাস্টবিনটির ময়লা ফেলার জন্য সেটি হাতে তুলতেই চোখে পড়লো ভেতরে জমে থাকা অসংখ্য কাগজ।

নিজের রাগের বশে অফিসের অনেক কাগজই সে ছুঁড়ে ফেলেছিল সেখানে। সেগুলো আলাদা করে নেওয়ার জন্য একে একে কাগজগুলো দেখতে শুরু করলো আয়াশ। দেখতে দেখতে হঠাৎই তার হাতের মুঠোয় এমন কিছু এসে পড়লো, যার জন্য কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিল না সে। একটা ছেঁড়া আল্ট্রাসনোগ্রামের ছবি। আয়াশের আঙুলগুলো মুহূর্তেই কেঁপে উঠলো। কাঁপা হাতে দুই টুকরো হয়ে থাকা ছবিটা তুলে নিলো সে।

দুই টুকরোকে পাশাপাশি রাখতেই ধীরে ধীরে ভেসে উঠলো এক বিরল অথচ অতি ক্ষুদ্র অস্তিত্বের চিত্র। একটি ছোট্ট ভ্রূণ। তার ক্ষীণ হৃৎস্পন্দনের চিহ্ন, শরীরের প্রাথমিক গঠনের অস্পষ্ট রেখা, সবকিছু মিলিয়ে যেন তার চোখের সামনে ফুটে উঠলো এমন এক সত্য, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে এতদিন বিন্দুমাত্র অবগত ছিল না সে। এতদিন গুমরে গুমরে থাকলেও আজ যেন সেই নিস্তব্ধতা আর নিজের মধ্যে ধরে রাখতে পারলো না আয়াশ। হয়তো তার মতো হতভাগ্য কোনো পিতা নেই, যে কিনা নিজের সন্তানের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানার সুযোগটুকুও পায়নি।

আয়াশ কেমন অসহায় মানুষের মতো ছেঁড়া ছবিটা বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরলো। নেত্রজোড়া মুহূর্তেই রক্তাভ হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য, অথচ সেই শূন্যতার মাঝেই অসহনীয় এক ভার জমাট বেঁধে আছে। ইনায়াকে সে প্রতিদিন খুঁজেছে। প্রতিটি সম্ভাব্য জায়গায় তার অস্তিত্বের কোনো চিহ্ন খুঁজে বেড়িয়েছে। অথচ মেয়েটা কোথাও নেই। তবুও আশাহত হয়নি আয়াশ। ইনায়াকে সে খুঁজে বের করবেই। কিন্তু আজ যেন হঠাৎ করেই তার সমস্ত দৃঢ়তার ভিত ভেঙে পড়লো। কাঁচ যেমন এক মুহূর্তে ভেঙে অসংখ্য টুকরো হয়ে যায়, ঠিক তেমনই তার ভেতরটাও যেন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো। বুকের মধ্যে সেই ছেঁড়া ছবিখানি জড়িয়ে ধরে আয়াশ অসহায়, কাতর কণ্ঠে বলে উঠলো-

" এতোটা নিষ্টুর হলে কি করে ইনায়া? আমায় একটি বারও ক্ষমা করার সুযোগ অব্দি দিলে না, ওর কি দোষ যে আমার কাছ থেকে এতো বড় একটা সত্যি লুকালে। আমায় একবারও ওর অস্তিত্বকে স্পর্শ করারও সুযোগ দিলে না?"

কথাগুলো উচ্চারণ করতে করতেই তার শ্বাস আটকে এলো। নিজেকেই কেমন এক অসহায় পথিক বলে মনে হলো তার। গন্তব্যহীন, আশ্রয়হীন, অথচ বুকের ভেতর এক পৃথিবী অনুতাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়াশ যেন এতদিনে নিজের অবশিষ্ট শক্তিটুকুও নিঃশেষ করে ফেলেছে। গত দুই দিন ধরে কেবল একটি ইনস্ট্যান্ট নুডলস খেয়েছে। এ ছাড়া পেটে আর কোনো দানা পড়েনি। অনাহার, অনিদ্রা আর মানসিক বিপর্যয়ের সম্মিলিত ভারে শরীরটাও অবশেষে পরাজয় স্বীকার করলো। অবশিষ্ট শক্তিটুকুও যেন সেখানেই নিঃশেষ হয়ে গেলো। নেত্রপল্লব মেলে রাখাটুকুও তার কাছে দুঃসাধ্য মনে হলো। চারপাশের সমস্ত দৃশ্য ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এলো। মনে হলো, কোনো অদৃশ্য কালো মেঘ এসে তার দৃষ্টির সমস্ত আলো ঢেকে দিচ্ছে। ঠোঁট আওড়ে কয়েকটি শব্দ ছিটকে পড়লো-

“ এ..এমনটা না করলে হতো না?”

-----

অন্ধকার আর নিস্তব্ধতার দীর্ঘ আবরণ পেরিয়ে ধীরে ধীরে আলোর দিশায় ফিরে এলো কান্ত, অবসন্ন নেত্রপল্লবের জোড়ায়। অতি ধীর, দুর্বল প্রয়াসে চোখ মেললো আয়াশ। চৈতন্য ফিরেছে তার। তবুও চারপাশের পরিবেশকে চিনে উঠতে কিছুখন সময় লেগে গেলো। স্মৃতির পাতায় এখনো সবকিছু কেমন আবছা, অস্পষ্ট। কোথায় ছিল সে, কী ঘটেছিল, কিছুই যেন স্পষ্টভাবে মনে পড়ছে না। কিছুটা সময় যেতেই, সেই অস্পষ্টতার মধ্যেই কেটে গেলো।তারপর হঠাৎই স্মৃতির বন্ধ দরজা একে একে খুলে গেলো। ইনায়া,ছেঁড়া ছবিটা।তার অজানা সন্তানের অস্তিত্ব। সবকিছু আচমকাই মনে পড়তেই চট করে উঠে বসলো আয়াশ।

কিন্তু দুর্বল শরীরটা যেন তার এই আকস্মিক তৎপরতার সঙ্গে কোনোভাবেই সঙ্গ দিতে রাজি হলো না।মাথাটা কেমন ভার হয়ে আছে, শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন অবসাদের ভারে অবনত। চারপাশে চোখ বুলিয়ে হঠাৎই নিজের অবস্থান বুঝতে পারলো সে। বিছানায় শুয়ে আছে। কিন্তু সে তো মেঝেতে পড়ে ছিলো। তাহলে? কীভাবে এখানে এলো সে? প্রশ্নটা মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগলো। কিন্তু তার থেকেও বড় হয়ে উঠলো অন্য এক উৎকণ্ঠা।কাঙ্ক্ষিত জিনিসটির খোঁজ।বিচলিত চোখে চারপাশে তাকাতে লাগলো আয়াশ। অস্থির দৃষ্টিতে বিছানার চারপাশ, মেঝে, টেবিল, প্রতিটি সম্ভাব্য স্থান খুঁজে চললো। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটির দেখা মিললো।বেডসাইড টেবিলের ওপর পড়ে আছে সেটি।আয়াশ আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করলো না। দুর্বল শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে দ্রুত হাত বাড়িয়ে সেটাকে নিজের মুঠোর মধ্যে আঁকড়ে নিলো।

পরম মমতায় আঙুল বুলিয়ে দিলো ছবিটির ওপর। কতটা কাছে ছিল সে! এতটা কাছে। অথচ এতদিনেও একবারের জন্য টের পায়নি নিজের অস্তিত্বের সেই ক্ষুদ্রতম স্পন্দনটুকু। কতটা নির্বোধ হলে এমনটা সম্ভব? কতটা অন্ধ হলে নিজের এত কাছাকাছি বেড়ে ওঠা একটি জীবনের অস্তিত্বও অনুভব করা যায় না?আয়াশ কোনো উত্তর খুঁজে পেলো না। শুধু বুকের ভেতরটা আরও একবার নিঃশব্দে ভেঙে পড়লো।

চারিদিকে নিস্তব্ধতায় ঘেরা, ঠিক সেই নিস্তব্ধতার বুক চিরেই ধোঁয়া ওঠা গরম সুপের বাটি হাতে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন আয়শা বেগম। অন্যদিনের তুলনায় আজ তাঁর মুখশ্রী অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর। দৃষ্টির গভীরে যেনো কোনো অপ্রকাশিত আশঙ্কার ছায়া। হয়তো মাতৃসুলভ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি ইতোমধ্যেই কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন। ছেলে আর পুত্রবধূর মধ্যবর্তী অদৃশ্য দেয়ালটি যে নিছক নীরবতা নয়, তার আভাস হয়তো তাঁর চোখ এড়িয়ে যায়নি। আয়শা বেগম ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ছেলের দিকে সুপের বাটিটি বাড়িয়ে দিলেন। অতঃপর কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলেন ছেলের নিস্তেজ হয়ে আসা মুখশ্রী। সেই মুখে ক্লান্তি, অবসাদ আর অনুচ্চারিত কোনো অপরাধের ছায়ায় একাকার হয়ে আছে।

“ এটা খাও, আর ইনায়া কোথায়?”

প্রশ্নটার জন্য সে প্রস্তুত ছিলো আয়াশ। তবুও মায়ের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রশ্নটা তার অভিঘাতে শিরদাঁড়া বেয়ে হিমেল এক কম্পন নেমে গেলো। এতদিনের লুকিয়ে রাখা সত্য যেনো হঠাৎ করেই তার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। আয়াশ ধীরেধীরে মায়ের দিকে দৃষ্টি তুললো। এই নারীটাকে শেষ কবে তার দিকে এমন কঠিন, গম্ভীর এবং অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন, তা তার স্মৃতির কোনো কোণেই খুঁজে পেলো না।এতদিন অসংখ্য মিথ্যার আড়ালে সত্যটাকে ঢেকে রাখা গেলেও আজ আর সেই অবকাশটুকুও অবশিষ্ট নেই। কারণ কিছু সত্য যতই গভীর অন্ধকারে সমাহিত করে রাখা হোক, একদিন না একদিন তারা নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতেই ফিরে আসে। আজ সেই ফিরে আসার দিন।

“ আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছে।”

মাথা অবনত রেখে অত্যন্ত ধীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলো আয়াশ। আয়শা বেগমের মুখশ্রী যেনো মুহূর্তেই আরও কঠোর হয়ে উঠলো। চোখের তারায় জমাট বাঁধলো প্রশ্নের সঙ্গে মিশে উঠলো ক্ষোভ।

“ কেনো চলে গিয়েছে?”

“স্বামী হিসেবে আমি ব্যর্থ তাই।"

উত্তরটা উচ্চারিত হতেই আয়শা বেগমের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তিনি কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ছেলের পানে। ছেলের অতীত সম্পর্কে পরিবারের প্রত্যেকেই অবগত। তারা জানে, একসময় ছেলেটা কীভাবে ধীরে ধীরে বিষণ্নতার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছিলো। সেই অন্ধকার সময়টাকে যদি যথাসময়ে সামলে ওঠার সুযোগ না দেওয়া হতো, তবে হয়তো আজ আয়াশ তাদের পাশে বসে থাকতো না। সেই স্মৃতির ভার তাঁর চোখের কঠোরতাকেও আরও তীব্র করে তুললো।

“ তিনটা বছর আয়াশ, তিনটা বছর! একটা দুইটা দিন নয় যে তুমি তাকে ভুলতে পারোনি। আগের কথা বাদ দিলাম, কিন্তু তুমি এখন বিবাহিত। অন্যনারীর জন্য এতো অনুভূতি, এতো আবেগ সব নিষিদ্ধ তোমার জন্য। হারাম তোমার জন্য।”

আয়শা বেগম যখন আয়াশের প্রতি রাগ, অভিমান কিংবা গভীর হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, তখনই তাঁর সম্বোধনে 'তুমি' শব্দটি নেমে আসে। এই একটা শব্দই যেনো মাতৃস্নেহের আবরণ সরিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় তাকে। আয়াশ আরও নত হয়ে গেলো। চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। মায়ের দৃষ্টির সম্মুখীন হওয়ার সাহসটুকুও যেনো ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আয়শা বেগম আবারও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নত হয়ে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে ধীর দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলেন-

“ আজ যদি তোমার বাবাও তার প্রাক্তনকে মনে করে দিন কাটাতো, তখন কি তুমি সইতে পারতে?”

মায়ের কথাটা যেনো সরাসরি এসে আঘাত করলো আয়াশের অন্তঃস্থলে। আহত দৃষ্টিতে তাকালো সে মায়ের দিকে। বাস্তবতা বড় অদ্ভুত। কোনো পরিস্থিতি যখন নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে না, তখন তার ভার উপলব্ধি করা সহজ। অন্যের কষ্ট দূর থেকে দেখলে তা কেবল কষ্ট বলেই মনে হয়। অথচ সেই একই যন্ত্রণা যখন নিজের একান্ত আপন কারো জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখনই বোঝা যায় তার প্রকৃত গভীরতা কতখানি। আয়শা বেগম থামলেন না।

“ উত্তর দাও, কেন করলে মেয়েটার সঙ্গে এমন? ওর কি দোষ এখানে? ওর কি তোমার অতীতে ছিলো? তাহলে কেনো তুমি ওর ভাগের অধিকার ছিন্ন করেছো? ভেবেছিলাম নতুন জীবন শুরুর মাধ্যমে তুমি তাকে ভুলে যাবে। নতুন করে বাঁচতে শিখবে, অথচ আমরা সবাই ভুল ছিলাম। তোমার জীবন বাঁচাতে গিয়ে,আর একটা জীবন শেষ করে দিলাম।”

শেষ কথাগুলো উচ্চারণ করতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠেও অদৃশ্য ভার জমে উঠলো। একদিকে ছেলের অতীতের অন্ধকার, অন্যদিকে সেই অন্ধকারের মূল্য হিসেবে আরেকটি নিরপরাধ জীবনের ভেঙে যাওয়া। একটা জীবনকে বাঁচানোর প্রয়াসে অন্য একটি জীবন যে নিঃশব্দে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে, সেই উপলব্ধি হয়তো একজন মায়ের হৃদয়কেও ভেতর থেকে বিদীর্ণ করে দিচ্ছে। আয়াশ মাথা নুইয়েই রাখলো। অপরাধবোধের ভারে তার ঘাড় যেনো আরও অবনত হয়ে এলো। মায়ের চোখের দিকে তাকানোর মতো সাহস তার নেই। সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টির প্রতিটি প্রশ্ন যেনো তার বিবেকের দরজায় একের পর এক আঘাত হানছে। আয়শা বেগম এবার কঠিন স্বরে বলে উঠলেন-

“ ইনায়াকে খুঁজে বের করবে, আমি নিজে তোমাদের ডিভোর্স দিবো। তোমার মতো ছেলের সঙ্গে আর আমি ওকে রাখবো না, আমার মেয়েকে ফিরে এনে দিয়ে তোমার যাকে ইচ্ছে তাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচো। আমি বা অন্যকেউ তোমাকে আর আটকাবো না।”

কথাগুলো শুনে আয়াশের ভেতরের শেষ অবলম্বনটুকুও যেনো ভেঙে পড়লো। সে এতক্ষণ নিজেকে কোনোভাবে সামলে রেখেছিলো, পরমুহূর্তেই সে যেনো নিজের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেললো। ছোট্ট শিশুর মতো মায়ের কোমড় আঁকড়ে ধরে পেটে মুখ লুকিয়ে ফেললো। এতদিনের সঞ্চিত ক্লান্তি, অপরাধবোধ আর অনুতাপ যেনো একসঙ্গে বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সহ্য করার ক্ষমতাটুকুও যেনো ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে এসেছে। এই হাহাকারের দহন আর কতক্ষণ সহ্য করা যায়?

“ মা..মা আমি সত্যি চাইনি ও কষ্ট পাক! তবুও কষ্ট দিয়েছি৷ তুমি তো জানো আমি ইচ্ছে করে করিনি এমনটা, আমি চাইনি ও কষ্ট পাক। তবুও ও কষ্ট পেলো, আমি চাইনি ওর সান্নিধ্য৷ তোমরাই বেঁধে দিলে। তারপর সময় কাটলো তবুও আমি সেই ভ্রম থেকে বের হতে পারলাম না। পারলাম না বের হতে, আর সেই ভ্রম যে আর একজনকে এইভাবে কষ্ট দিবে ভাবতে পারেনি।"

কণ্ঠের প্রতিটা শব্দ যেনো বুকের গভীর কোনো ক্ষত থেকে উঠে আসছিলো। অনুতাপের ভারে ভেঙে পড়া একজন মানুষের অসহায় স্বীকারোক্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ঘরের নিস্তব্ধতায়।আয়শা বেগম হয়তো নিজের ছেলের এমন অসহায় অবয়ব দেখে এক মুহূর্তের জন্য মায়াবোধ করছে। মাতৃহৃদয়ের কোথাও হয়তো নরম কোনো পর্দা কেঁপে উঠছে। তবুও সেই মায়া তাঁর কঠোরতাকে গলিয়ে দিতে পারলো না। তিনি হাত বাড়িয়ে ছেলের মাথায় সান্ত্বনার স্পর্শও রাখলেন না। কারণ কিছু ভুল এত গভীর হয় যে, সেখানে মমতার চেয়েও অধিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায় সেই ভুলের দায় স্বীকার করা। আর আয়াশকে আজ প্রথমবারের মতো নিজের করা ভুলের সম্পূর্ণ ভারটুকু একা বহন করতেই হবে। এই ভারে সে সঙ্গ দেবে না, অনেক তো দিলো। কিন্তু এখন বিষয়টা অন্যদিকে মোড় নিয়েছে।

আয়াশ বলে গেলো, এতোদিনের একাকিত্ব তাকে যেনো নিঃশব্দে কুঁড়ে কুঁড়ে গ্রাস করছিলো। বুকের গহীন থেকে উঠে আসা অব্যক্ত যন্ত্রণাগুলো আর কোনো বাঁধ মানলো না। বোবাকান্নার ভারে ফেঁপে উঠলো আয়াশের বুক। কাঁপতে থাকা কণ্ঠস্বরটুকুও যেনো দীর্ঘ ছয় বছরের জমে থাকা বেদনার কাছে পরাজিত।

“ মা..মা আজও প্রিয়ার সেই মুখশ্রী ভেসে ওঠে। ওকে ওরা ছিঁ'ড়ে খেয়েছে মা! ওরা ওকে ছিঁ'ড়ে খেয়েছে, আমার পবিত্র ফুলটাকে দুমড়েমুচড়ে নিঃশব্দে শেষ করে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমার হতে গিয়েও হলো না ও!”

আয়শা বেগম চোখ দুটো ধীরে ধীরে বুজে নিলেন। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারী নিঃশ্বাসটাকে দীর্ঘ একখানা দমের সঙ্গে বাইরে বের করে দিলেন তিনি। সামনে বসে থাকা ছেলেটাকে দেখে মায়ের অন্তঃস্থলে হাহাকার করে উঠলো। আয়াশ ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে বুকের গহীনে পাথরচাপা দিয়ে রাখা যন্ত্রণাগুলো আজ যেনো একে একে বাঁধন ছিন্ন করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে আবারও। প্রিয়ার মৃ'ত্যুর পর আয়াশ ঠিক কতখানি এই মানবজগতের মায়া, মোহ আর স্বাভাবিক জীবনের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে অন্ধকারের অতল গহ্বরে ডুবে গিয়েছিলো, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী আয়শা বেগম নিজেও। ছয়টি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, অথচ সময় যেনো সেই একটি বিভীষিকাময় দিনেই আটকে আছে আয়াশের কাছে। প্রিয়া নামক কোমল, নিষ্পাপ মেয়েটির জীবনে নেমে এসেছিলো এক নির্মম দুঃস্বপ্ন। একদল ন'রপশু শিকারে মেয়টা কি বাজে ভাবেই না ধ'র্ষ'ণের শিকার হতে হয়েছে। চিকিৎসকদের সমস্ত প্রচেষ্টাও শেষ পর্যন্ত তাকে এই পৃথিবীর মায়ায় ধরে রাখতে পারেনি। প্রিয়ার সেই অসহায় পরিণতি আয়াশের চোখের সামনে তার সমগ্র পৃথিবীটাকেই যেনো মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিলো।

সেদিন ছেলেটা শিশুর মতো কেঁদেছিলো। অতি প্রিয় একজন মানুষকে নিজের চোখের সামনে ধীরে ধীরে নিভে যেতে দেখার যন্ত্রণা যে কতটা অসহনীয়, তার কোনো ভাষা হয় না। আয়াশেরও হয়নি। অনুভূতিগুলোকে শব্দে রূপ দেওয়ার আগেই যেনো নিয়তি তার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছিলো। তবুও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একটুকরো আশাকে আঁকড়ে ছিলো আয়াশ। মনে হয়েছিলো, হয়তো প্রিয়া ফিরে আসবে। হয়তো আবার আগের মতো চোখ মেলে তাকাবে। হয়তো এই দীর্ঘ অন্ধকারের পর কোনো এক ভোরে তার জীবনে ফিরে আসবে সেই চিরচেনা মুখশ্রী।

কিন্তু কিছু অপেক্ষার কোনো পরিণতি হয় না। কিছু প্রার্থনা আকাশ অবধি পৌঁছেও উত্তরহীন থেকে যায়। আয়াশের সেই ক্ষীণ আশাটুকুও শেষ পর্যন্ত নিভে গিয়েছিলো। শেষ নিশ্বাস অব্দি আয়াশ তার প্রেয়সীর হাত ছাড়েনি। সমাজের চোখ, মানুষের কথাবার্তা, কলঙ্কের অভিধান, কোনোকিছুরই পরোয়া করেনি সে। যে মানুষটাকে পৃথিবী নানা পরিচয়ে চিহ্নিত করেছিলো, আয়াশ তার সমস্ত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে শুধু একজন প্রিয় মানুষ হিসেবেই আগলে রেখেছিলো তাকে। তার শেষ সময়টুকু যেনো একটুও একা না কাটে, সেজন্য নিজের সর্বস্ব দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলো ছেলেটা।

হাসপাতালের সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও আয়াশের মস্তিষ্কে অমোচনীয় দাগের মতো খোদাই হয়ে আছে। সাদা দেয়াল, নিস্তব্ধ করিডোর, যন্ত্রের ক্ষীণ শব্দ আর তার দুই চোখের সামনে ক্রমশ ফিকে হয়ে আসা প্রেয়সীর মুখশ্রী, সবকিছু আজও তাকে অকারণে থমকে দেয়। পবিত্র এক বন্ধনের আবদ্ধ হতে চেয়েছিলো তারা। নিয়তির নির্মম পরিহাসের মাঝেও আয়াশ শেষ অবধি সেই স্বপ্নটুকু আঁকড়ে ধরেছিলো। সে কবুল অব্দি বলেছিলো। কিন্তু ওপাশ থেকে প্রেয়সীর কণ্ঠে সেই কাঙ্ক্ষিত কবুল উচ্চারিত হওয়ার আগেই নিষ্ঠুর এই পৃথিবীর সমস্ত মায়া ত্যাগ করে দূর আকাশের ওপারে চলে গিয়েছিলো প্রিয়া। অপূর্ণ থেকে গিয়েছিলো একটি সম্পর্ক, থেমে গিয়েছিলো একটি স্বপ্ন, আর আয়াশের বুকে জন্ম নিয়েছিলো এমন এক শূন্যতা, যার কোনো ঋতু নেই, কোনো অবসান নেই। ছয় বছর পেরিয়েও সেই শূন্যতার ভেতর প্রিয়ার মুখশ্রী ঠিক আগের মতোই জ্বলজ্বল করে। যেনো সময় তাকে মুছে ফেলতে পারেনি, বরং আরও গভীর করে এঁকে দিয়েছে আয়াশের হৃদয়ের অন্তঃস্থলে।

------

সময় নিজের আপন গতিতে বহমান। কখনো নদীর স্রোতের মতো, কখনো বা ঘূর্ণির বেগে। দেখতে দেখতে একটি মাস পেরিয়ে গেলো ইনায়ার স্বামীর সংসার ছেড়ে আসার। ছেড়ে এসেছে পরিচিত সেই মায়ার সংসার, অথচ সংসার যে বড়ো মায়াময় এক বন্ধন। একটি মেয়ের সমগ্র পৃথিবীজুড়ে অনেক সময় সেই সংসারটুকুই বিস্তৃত হয়ে থাকে। সেই পরিচিত ছায়া থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে অচেনা এক শহরের বুকে নতুন করে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইনায়া।

এখানে থাকা তিনটি মেয়ের সঙ্গে এরই মধ্যে বেশ সখ্য গড়ে উঠেছে তার। বিশেষত যেদিন থেকে তারা জানতে পেরেছে ইনায়া অন্তঃসত্ত্বা, সেদিন থেকেই যেনো মেয়েগুলো তাকে নিজেদের আপনজনের মতো আগলে রেখেছে। কোনো কাজই তাকে করতে দিতে চায় না তারা। যদিও রান্নাবান্না ছাড়া এখানে এমনিতেও বিশেষ কোনো কাজ নেই। তবুও ইনায়ার শরীর যেনো প্রতিদিন নিজের ভেতরে নতুন কোনো পরিবর্তনের সংবাদ বহন করছে। পেটটা আগের তুলনায় বেশ খানিকটা স্ফীত হয়ে উঠেছে। দূর থেকে দেখলেও বোঝা যায়, তার অন্তরে আরেকটি ক্ষুদ্র প্রাণ বেড়ে উঠছে।
আর এই পরিবর্তনই আশপাশের কক্ষগুলোর মানুষের কৌতূহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেনো সে এখানে? তার স্বামী কোথায়? কী এমন ঘটেছে যে অন্তঃসত্ত্বা হয়েও একা একটি মেয়ে এভাবে অন্য শহরে এসে উঠেছে?

গত এক মাসে এমন অজস্র প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। কারো কৌতূহলী দৃষ্টি, কারো চাপা ফিসফাস, কারো বা সরাসরি প্রশ্ন, সবকিছুকেই নির্বিকার মুখে পাশ কাটিয়ে গেছে ইনায়া। নিজের জীবনের ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো মানসিক শক্তি কিংবা আগ্রহ কোনোটাই অবশিষ্ট নেই তার।
ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ অবশ্য বেশ ভালোই চলছে। হাতে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি কাজ এসেছে। নিজের পরিশ্রমের বিনিময়ে উপার্জনের এই পথটুকু অন্তত ধীরে ধীরে স্থির হয়ে উঠছে। তবে সমস্যা একটাই, আগের মতো দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে কাজ করতে পারে না সে। শরীরটা কেমন যেনো সারাক্ষণ বিশ্রামের আকুতি জানায়। অলসতা নয়, বরং ক্লান্তি যেনো তার সমগ্র দেহটাকে নিজের অধিকারে নিয়ে নিয়েছে। অল্পতেই ঘুম এসে চোখের পাতাকে ভারী করে তোলে। অথচ এখানে বসে আরাম করার মতো অবকাশ তার নেই। আগের মতো নিশ্চিন্তে শুয়ে, বসে খেয়ে দিন কাটানোর সুযোগটুকুও আর নেই ইনায়ার। পেট চালাতে হলে অর্থের প্রয়োজন।আর অর্থের জন্য প্রয়োজন কাজের।

তাই নিজের সমস্ত ক্লান্তিকে উপেক্ষা করেই কাজ করে যাচ্ছে সে। যতটুকু সম্ভব হাতে টাকা জমাচ্ছে। নিজের প্রয়োজনের তালিকাটাও ছোট করে এনেছে অনেকখানি। অপ্রয়োজনীয় কোনো জিনিস কেনা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রতিটি পয়সা হিসেব করে ব্যয় করে সে। কারণ সামনে যে পথটা, সেটি কেবল তার একার নয়। তার সঙ্গে আরও একটি ক্ষুদ্র প্রাণের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে। এর মধ্যেই একটি ভালো কোডিংয়ের কাজ হাতে এসেছে। কাজটা সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারলে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতে আসবে। কাজটা পাওয়ার পেছনেও যার অবদান সবচেয়ে বেশি, সে হলো আয়াশ। এই একটি বিষয়ে আয়াশের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ ইনায়া। আয়াশই প্রথম তাকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শেখার কথা বলেছিল। নিজের ঘরে বসেই যাতে কাজ করতে পারে, সেই পথটুকু দেখিয়েছিল সে। শুধু পরামর্শ দিয়েই থেমে থাকেনি, নিজ উদ্যোগে তাকে একটি কোর্সে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল। ধীরে ধীরে সেই কোর্স সম্পূর্ণ করেছে ইনায়া। তারপর শুরু হয়েছিল টুকটাক কাজের পথচলা। প্রথমদিকে তেমন কোনো সাড়া পায়নি। অনেকবার কাজের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে, অনেকবার আশাহতও হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে সেই হতাশার মেঘ সরতে শুরু করলো।

কাজ আসতে লাগলো। প্রথমদিকে বড়ো অঙ্কের কোনো কাজ তার হাতে আসেনি। ছোট ছোট কাজই ছিল তার সম্বল। কিন্তু প্রতিটি কাজকেই নিজের সর্বোচ্চ যত্ন আর নিষ্ঠা দিয়ে সম্পন্ন করেছে সে। আর সেই কাজের মানই ধীরে ধীরে তাকে পরিচিত করে তুলেছে ক্লায়েন্টদের কাছে।
একটি কাজের পর আরেকটি কাজ। ছোট কাজের পর তুলনামূলক বড়ো কাজ। এভাবেই ধীরে ধীরে নিজের জন্য একটি পথ তৈরি করে নিয়েছে ইনায়া। আজ অবশ্য শরীরটা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ দুর্বল লাগছে। শরীরের প্রতিটা অস্থিসন্ধিতে যেনো ক্লান্তির ভার জমে আছে। তবুও আজ সাইবার ক্যাফেতে যেতেই হবে। আগামীকাল কাজটা জমা দেওয়ার কথা। সময় হাতে খুব বেশি নেই। তাই দুর্বল শরীরটাকে কোনো রকমে বিছানা থেকে তুলে নিলো ইনায়া। ধীর হাতে বোরখাটা পরে নিলো। এই মুহূর্তে ঘরে আর কেউ নেই। নিঃসঙ্গ কক্ষটিতে নিজের অস্তিত্বটুকুই যেনো একমাত্র সঙ্গী।

কোনো রকমে নিজেকে প্রস্তুত করে দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সে। হাঁটতে গিয়েই বুঝলো, আজ শরীরটা সত্যিই সায় দিচ্ছে না। প্রতিটি পদক্ষেপেই ক্লান্তি যেনো পায়ের সঙ্গে পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। অবশেষে আর হাঁটার সাহস হলো না। একটা রিকশায় উঠে বসলো ইনায়া।
চাকা ঘুরতে শুরু করলো অচেনা শহরের ব্যস্ত রাস্তায়। চারপাশে ছুটে চলা মানুষ, যানবাহনের কোলাহল, অপরিচিত মুখের ভিড়, সবকিছুর মাঝেও ইনায়া যেনো নিজের ভেতরেই আবদ্ধ হয়ে রইলো। নতুন শহরে তার জীবনটা এখন মোটামুটি নিজের গতিতে এগিয়ে চলছে।
হ্যাঁ, ফেলে আসা মানুষগুলোর কথা বড্ড মনে পড়ে।
কখনো কোনো পরিচিত স্মৃতি হঠাৎ বুকের ভেতর এসে আঘাত করে। কখনো অকারণে মনে হয়, যদি সবকিছু অন্যরকম হতো! কিন্তু সেই ভাবনাগুলোর কোনো উত্তর নেই। কিছু করারও নেই। ফেলে আসা জীবনের দুয়ার তো আর ইচ্ছেমতো খুলে ফিরে যাওয়া যায় না। তাই স্মৃতিগুলোকে বুকের গভীরে চাপা দিয়েই নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে ইনায়াকে। এইভাবেই সময় পার করতে হবে।
এইভাবেই, নিজের জন্য নয়, নিজের ভেতরে বেড়ে ওঠা ক্ষুদ্র প্রাণটির জন্যও।

[ বড় পর্ব দিয়েছি সো সবাই বড়ো বড়ো গঠনমূলক কমেন্ট করবেন, আর সবাই রিয়েক্ট করবেন। পড়ে খালি চলে যাবেন না।]

#চলবে

08/08/2026

#মির্জা_সায়ান_মুগ্ধ — পর্বঃ৫৬(খ)


“ গলায় যত জোর আছে আজ দেখাস ওকে? আ'ই ওন্ট মাইন্ড টুডে!"

যুবকের এহেন বেফাঁস বাক্যবাণে মুহুর্তেই জমে গেল বোকা মানবী। বিস্ফারিত চোখদুটো তার একমুহূর্তের অভিঘাতে আতঙ্কে স্থির হয়ে রইল সম্মুখে। রূঢ় মানবের ঘোরলাগা দু'টো চোখ! ক্ষনে ক্ষনে তৃষ্ণার্ত পথিকের ন্যায় সিক্ত জিভ ঠেলে ভেজাচ্ছে অধর। গভীর দৃষ্টে একমনে পরোখ করে যাচ্ছে সপ্তদশীকে। ধীরলয়ে ঝোঁকাচ্ছে পাহাড়সম দেহটা! সহসা লজ্জার উত্তাপে গালদুটো টকটকে রক্তিম হয়ে উঠল মাহি'র। শঙ্কিত আতঙ্কে বুকের খাঁচায় লুকায়িত হৃদপিণ্ডটা বোধহয় হারিয়েছে নিজের বেগ! ছুটতে লাগল দূর্বার গতিতে। যেন এক্ষুণি বুক পাঁজরের বেড়া ভেঙে বেরিয়ে আসবে বেয়াদব অঙ্গটা! বোকা রমণী তৎক্ষনাৎ নজর নামালো। সর্বাঙ্গের তীব্র কম্পনে হুট করেই খামচে ধরল বিছানার চাদরের দুপাশ। রূঢ় মানব এগিয়েছে বেশ। ধীরলয়ে ভয়াতুর রমণীর ওপর বেশ ঝুঁকে এসে, তার তুলতুলে মসৃণ কপোলের ত্বকে ছোঁয়ালো নিজ রুক্ষ আঙুল! সেথায় এক আজগুবি অদৃশ্য আকিঁবুকিঁ চালাতেই বদ্ধ হলো মাহি'র চোখদুটো। কেঁপে কেঁপে উঠল তার ক্ষুদ্র বদন! বাদামী চোখদুটোর মালিক অস্থির! প্রমত্ত উষ্ণ নিশ্বাসের ঝাপ্টায় রাঙিয়ে দিচ্ছে রমণীর পেলব মুখখানা। দৃষ্টিযুগল আঁটকে আছে ভয়াতুর মানবীর সুশ্রী মুখমণ্ডলে। গালদুটোতে সে-কি লালিমা মেয়ের! যেন একমুঠো রং লেপে আছে সেথায়। তিরতির করে কাঁপছে রমণীর নরম তুলতুলে অধরযুগল। এক বিধ্বংসী মোহাচ্ছন্নতায় ফের বুদ হলো মুগ্ধ! প্রমত্তডায় হুট করেই মুখ ডোবালো রমণীর রাজহংসীর ন্যায় সুকোমল কন্ঠত্বকে। ঘষতে লাগল টিকালো নাকের ডগা! এহেন কান্ডে মুহুর্তেই প্রস্তরখন্ডের ন্যায় জমে গেল মাহি। ধড়াস ধড়াস শব্দ হলো বুক পিঞ্জরে। সর্বাঙ্গে ঝংকার বইতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের ঘোরলাগা কন্ঠ!

“ ড্যাম! ইউ স্মেল লাইক ফা'কিং রেড ওয়াইন। ওহ ফা'ক! আ'ম গেটিং সো ড্রাঙ্ক!”

নিজ অসহায়ত্বে ভঙ্গুর মাহি। গায়ের জোরে দু'হাতে ঠেলে সরাবে লোকটাকে — তার বালাই নেই! মুগ্ধ কেমন আষ্টেপৃষ্টে আঁটকে নিয়েছে তাকে। কোমল মানবী এবার অধর নাড়ালো। ভয়ার্ত কন্ঠে আমতা আমতা করে শুধালো,

“ আমার... খ-খারাপ লাগছে বিস্ট!”

কথাটা বেশ শুনলো মুগ্ধ। অথচ গা-ছাড়া ভাবটা যা ধরেছে না! নিজ মোহাচ্ছন্নতায় মত্ত থেকে আচানক দাঁত বসালো রমণীর কোমল কন্ঠত্বকে। ওমনি বেচারির ওষ্ঠপুটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো এক টুকরো ব্যথাতুর ধ্বনি! মুখাবয়বে আহত ভাবভঙ্গিমা লেপ্টে, মানবী তক্ষুনি দু'হাতে ঠেলতে লাগল রূঢ় মানবকে। অথচ মুগ্ধ নিরুত্তাপ! রমণীর কোমল কন্ঠার একপাশ হতে দাঁত সরিয়ে এনে, ফের বসালো আরেক পাশে। মেয়েটা এবার বড্ড অতিষ্ঠ হলো। চোখদুটো আপনাআপনি ভিজে উঠতেই ভগ্ন কন্ঠে শুধালো,

“ থামুন বিস্ট! আমি সহ্য করতে পারছিনা এসব।”

থামেনি মুগ্ধ! নিজ রুক্ষ হাতদুটোর বেপরোয়া স্পর্শ রমণীর কোমল উদরজুড়ে বিচরণ করিয়ে, মত্ত রইলো রমণীতে। আবেশিত কন্ঠে কেবল প্রতুত্তর ছুঁড়ল -

“ মুখ বুঁজে সহ্য করে নে চাশমিস! ইউ নো না? আ'ই কান্ট স্টপ টুডে।”

“ আমি ব্যথা পাচ্ছি বিস্ট! গলার কাছটা ছিঁড়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে।”

মাহি'র সুকোমল কন্ঠ ত্বকে রূঢ় মানবের তীক্ষ্ণ দাঁতের রুষ্ট স্পর্শ চলমান। সেথায় ইতোমধ্যেই বসেছে ছোপ ছোপ দাগ। তবুও মুগ্ধের থেমে যাবার নাম-গন্ধও নেই। সে কেমন বেপরোয়া ভঙ্গিতে তক্ষুনি নিজ পাহাড়সম বদনের ভর ছাড়লো মেয়েটার ওপর। ওমনি নিঃশ্বাস আঁটকে যাবার যোগাড় হলো মাহি'র। নাক-মুখ কুঁচকে যেই-না কিছু আওড়াবে তার পূর্বেই কর্নধার হলো মুগ্ধের ব্যাকুল কন্ঠ!

“ এটুকু ব্যথা কিছুই না পিচ্চি! আমার রুষ্ট ছোঁয়ায় তোর এখনো বেশ জখম হওয়া বাকি। এখনো বড্ড কান্না করা বাকি। এন্ড ইউ হেভ টু টলারেট অল দোজ ফা'কিং থিংগস। বাট ডোন্ট ওয়ারি মা'ই গার্ল! আমি আছি তো। তোর দেহের সকল ক্ষত মিটিয়ে দিবো খুব তাড়াতাড়ি।”

নিঃশ্বাস নিতে না পারার কষ্টের চাইতেও যুবকের এহেন বাক্যে রমণীর অন্তঃকোণে ক্ষত হলো বেশ। ঠোঁটের কোণে আচমকা উত্থাপিত হলো এক চিলতে ব্যথাতুর হাসির টান! সিক্ত চোখদুটো আপনা-আপনি বুঁজে আসতেই অভ্যন্তরে আওড়ালো সে,

“ যার প্রয়াস ছিলো — দেহের দৃশ্যমান ক্ষতগুলো মেটানো। আফসোস! সে এখন অদৃশ্য আত্মাটাকে ক্ষত-বিক্ষত করতে ব্যস্ত!”

ক্ষুদ্র বদনে অসারতা নেমেছে মাহি'র। নিঃশ্বাস আঁটকে এসেছে গলার কাছে। তবুও মুগ্ধকে থামালো না মাহি। যার কাজ কেবল দৈহিক সুখ খোঁজা, তাকে বাঁধা দিয়ে আত্মার গান শোনানোর থোড়াই মানে হয়! রমণী পাথরের ন্যায় পড়ে রইলো বিছানার কোলে। চোখদুটো বুঁজে রেখে অধর কামড়ে কাঁদছে সে। কাঁদছে নিজ অসহায়ত্বে! রূঢ় মানবের বেপরোয়া হাতের প্রতিটি অনিচ্ছের পরশ গায়ে কাঁটার ন্যায় বিঁধছে তার। লাগামহীন ঘোরার ন্যায় ছুটছে রমণীর ধনুকের ন্যায় বাঁকানো নারী কায়ায়। ধীরলয়ে মসৃণ উদরত্বক হতে উঁচুতে গড়িয়ে উঠতে গেলেই নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলোনা মায়াবিনী। তৎক্ষনাৎ দু'হাতে খামচে ধরল মুগ্ধের ব্যস্ত হাত। তীব্র আত্মমর্যাদার ডোরে আষ্টেপৃষ্টে লেপ্টে থেকে ডুকরে উঠে আওড়াল,

“ আমার কষ্ট হচ্ছে। বিশ্বাস করুন বিস্ট! আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আমি পারছিনা এসব মানতে। দয়া করে আপনি আমার ওপর থেকে সরুন। আমার নিঃশ্বাস টানতে কষ্ট হচ্ছে! এই দেখুন, আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমার...ভীষণ.!”

বলতে বলতেই রমণীর হাঁপিয়ে ওঠার যোগাড়। তা টের পেয়ে সহসা থমকে গেলো মুগ্ধ। চোখদুটো টেনেহিঁচড়ে সরালো নিজেদের পর্দা। বিচক্ষণে মস্তিষ্ক তার হুটহাট সাইরেন বাজলো যেন। কানের কাছে কেমন হুট করেই শোনা গেলো —

“ মেয়েটার সাইকোজেনিক সিউডোসিনকোপ রয়েছে! অধিক ভয়ে যদি আবারও জ্ঞান হারায় তখন?”

উপলব্ধির একমুহুর্তের অভিঘাতে তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে ওঠে মুগ্ধ। সহসা পাহাড়সম দেহটার ভর সরালো রমণীর ওপর থেকে। একটুখানি ছাড়া পাবার স্বস্তিতে তক্ষুনি জোরালো নিঃশ্বাস টানে মাহি। চোখদুটো বুঁজে রেখে কেমন উম্মাদের ন্যায় হাঁপাতে থাকে সে। এদিকে বেপরোয়া মুগ্ধ! অনিয়ন্ত্রিত কামনার ভাবাবেগে কাঁপছে তার সর্বাঙ্গ। মেয়েটাতে জোরপূর্বক ডুব দিতে গিয়েও বাঁধছে বিবেকে। যুবক তক্ষুনি মাহি'কে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। শুকনো ঢোক গিলে দাঁতে দাঁত চেপে খানিক পায়চারী চালায় পুরো ঘরময়। একহাতে কোমর চেপেছে মুগ্ধ, অন্যহাতে ঘাড় ডলছে অনবরত! চিড়বিড়িয়ে বিড়বিড় করে আওড়াচ্ছে —

“ ওহ ফা'ক! নো...নো..! জোর করিস না। জোর করিস না। নাহলে আবারও জ্ঞান হারাবে বান্দীর মেয়ে! জোর করিস না, জোর করিস না। কন্ট্রোল!”

রূঢ় মানবের উত্তেজনার তীব্র ঢেউয়ে ভাটি পড়ছেনা এখনো। বরং হাল হচ্ছে বেগতিক। সে তক্ষুনি পা বাড়ালো কক্ষের একপাশের দেয়ালঘেঁষা কাউচের পানে। কাউচের সম্মুখে একখানা ছোট্ট টেবিল, সেথায় সাজিয়ে রাখা বিদেশি কিছু এলকোহল। মুগ্ধ ত্বরিত এগিয়ে এসে গা এলিয়ে বসলো কাউচের কোলে। ব্যস্ত হাতে সম্মুখ থেকে একখানা রা-মের বোতল হাতে তুলে নিয়ে, বেপরোয়া আঙ্গিকে খুললো বোতলের ক্যাপ। অতঃপর কোনোদিক না তাকিয়ে ঢকঢক করে গিলতে লাগলো বোতল ভর্তি এলকোহলটুকু। সপ্তদশীর সিক্ত চোখ, ভয়ার্ত চাহনিতে বারংবার আড়দৃষ্টে অবলোকন করে যাচ্ছে রূঢ় মানবের অস্থির কর্মকাণ্ড। মুগ্ধ থামছেনা। মিনিট তিনেকের ব্যবধানে সম্পূর্ণ রা-মের বোতল শূন্য করেও মন ভরেনি তার। পাশ থেকে তৎক্ষনাৎ হাতে নিলো আরেকটি বোতল। তন্মধ্যে পকেট হাতড়ে বার করল ক্রুটস নিকারাগুয়ান সিগার! ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে নিয়ে তাতে লাইটার ধরাতেই যাবে ওমনি রূঢ় মানবের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে ফের ঠেকল অদূরে মাথানত করে বসে থাকা রমণীর পানে। মেয়েটা আবার সিগারের কলুষিত ধোঁয়া সইতে পারে না। কথাটুকু ভাবনায় উদয় হতেই চোয়াল শক্ত হলো মুগ্ধের। মুখাবয়বে একরাশ বিরক্তি নিয়ে যুবক তৎক্ষনাৎ রা-মের বোতল নিয়ে উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। ব্যস্ত পায়ে ঘর লাগোয়া বারান্দার অভিমুখে হেঁটে এসে দাঁড়ায় সে। ধীরলয়ে মনের সুখে আগুন ধরায় সিগারের শেষভাগে। মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া টেনে নিয়ে, পরক্ষণেই রা-মের বোতলে চুমুক বসায় বেপরোয়া ছেলে! একদিকে গিলে ঢোক, আরেকদিকে নাক দিয়ে ছাড়ে ধোঁয়া। নিজেকে শান্ত করার প্রয়াসে চেয়ে রয় দূর আকাশে!

এদিকে, রূঢ় মানব দৃশ্যপটের আড়াল হতেই সুযোগ পায় বোকা মানবী। জল্লাদের হাত থেকে বাঁচার ক্ষুদ্র প্রয়াসে পা টিপে টিপে এগোয় বিছানা ছেড়ে। এক-দুবার সর্তক দৃষ্টে পেছনে তাকিয়ে, পরমুহুর্তেই একনাগাড়ে ছুট লাগায় দুয়ার পানে। দুটো সিগার শেষ! সঙ্গে শেষ হলো আরেক বোতল রা-ম। ক্রমশ স্তিমিত হয়ে এলো রূঢ় মানবের উত্তেজনার ঢেউ। কম্পন কমলো বদনের! নিজ উপচে পড়া কামনার আগুনটুকু কোনমতে অভ্যন্তরে লুকিয়ে রেখে শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ায় মুগ্ধ। লম্বা লম্বা কদমে বারান্দা ছেড়ে ঘরে ফিরতেই তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিযুগল আঁচানক গ্রাস করল বোকা মানবীকে। মুহুর্তেই বিরক্তির ভাঁজ পড়ল রূঢ় মানবের রুক্ষ ললাটতটে। দাঁত খিঁচে কদম বাড়িয়ে গমগমে গলায় শুধায়,

“ কোথায় যাচ্ছিস রে বান্দীর মেয়ে?”

সহসা থমকে দাঁড়ায় মাহি। আঁতকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে তাকায় পেছনে। কয়েক হাত দুরত্বে শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। দু'হাত গুঁজেছে পকেটে। এতক্ষণ স্থির থাকলেও কদম বাড়াচ্ছে এবার। ওমনি ভয়ে ভয়ে কদম পেছায় মাহি। মুগ্ধ তখন দাঁত খিঁচে ফের আওড়াল,

“ গায়ের ওপর সামান্য ভর ছাড়তে গেলে — উহঃ আহঃ, ছাড়ুন, কষ্ট হচ্ছে, মরে যাচ্ছি, হ্যান-ত্যান বেরিয়ে আসে তোর মুখ দিয়ে! অথচ পালানোর মতো বা*লপাকনামি করতে গেলে একেবারে সুস্থ! তাই না?”

ফাঁপা ঢোক গিলে মাহি। ত্রস্ত ঘাড় নুইয়ে দাঁড়িয়ে রয় চুপচাপ। রূঢ় মানব ততক্ষণে সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে তার। রুক্ষ হাতের অনমনীয় তালুর চাপায় আচানক টেনে ধরে রমণীর নরম কব্জিসন্ধি। অতঃপর জোরপূর্বক বেচারিকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে বসায় বিছানার কোলে। ভয়ার্ত বোকা মানবী উঠে যেতে চাইলেই বাঁধ সাধল মুগ্ধ। আগ বাড়িয়ে পাশে বসে আচমকা জোরালো হাতে চেপে ধরল সপ্তদশীর মেদহীন বাঁকানো কোমর। তৎক্ষনাৎ ভয়ে সিটিয়ে গেল মাহি। সাপের ন্যায় মোচড়াতে লাগলেই ধৈর্য্যহীন মানব দিলো এক ধমক!

“ মোচড়ানো বন্ধ কর বেয়াদবের বাচ্চা! দেখছিস না? তোর এই মোচড়ামুচড়ির জন্য আগাতে পারছিনা আমি! কিছু করতেও তো দিচ্ছিস না বেয়াদব মেয়েছেলে কোথাকার!”

হতবিহ্বল মাহি! সহসা বোকার ন্যায় চোখ তুলে তাকায় মুগ্ধের পানে। নিষ্পাপ সন্দিগ্ধ কন্ঠে বলেই বসে —

“ আর কি করার মতো বাকি রেখেছেন? এতকিছু করেও মন ভরলো না আপনার? গলাটা বোধহয় আর নেই আমার। ছিড়েখুঁড়ে খেয়েছেন রাক্ষসের মতো! জ্বলে যাচ্ছে জায়গাটা। তারপরও বলছেন কিচ্ছু করতে পারেননি?”

বিরক্তির চরম শিখরে পোঁছে গিয়েছে দ্য মাফিয়া বিস্ট! চোয়াল শক্ত করে ফুটিয়ে, দাঁতে দাঁত চাপলো বেশ। কটমট কন্ঠে বলে উঠল,

“ হ্যাংকি-প্যাংকির কাছে এগুলো কিছুই না বান্দীর মেয়ে!”

হতভম্বতার সাগরে কেউ বুঝি টেনেহিঁচড়ে নামালো বোকা মানবীকে। অবোধ্য ভাবস্রোতে লেপ্টে গিয়েছে মুখ! সে কেমন বোকার ন্যায় প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ কি করতে চাচ্ছেন আপনি?”

কঠোর মুখ অভিব্যক্তিতে অটল মুগ্ধ! রমণী এসবে বড্ড অজ্ঞ তা আর বুঝতে বাকি নেই তার। সে সহসা মুখ নামালো মাহি'র অভিমুখে। দৃষ্টিযুগল স্থির রেখে বেশ বিজ্ঞ কন্ঠে শুধালো —

“ লুক চাশমিস! আ'ই ওয়ান্না গেট ইন্টি**মেট উইথ ইউ্য ওকে? সো...”

একপল থামল মুগ্ধ। কৌতুহলী মানবীর মুখপানে এক-আধবার দৃষ্টি বুলিয়ে ফের শুধালো,

“ সো ডু ইউ নো হাউ টু গেট স্টার্টেড?”

হতবুদ্ধির ন্যায় দু'ধারে মাথা নাড়ায় মাহি। বোকা কন্ঠে বলেই বসে,

“ কি করে জানবো? এর আগে কারো সঙ্গে ইনভলব হইনি তো।”

মুহুর্তেই চোয়ালের পেশি টানটান হলো মুগ্ধের। চোখদুটোয় দেখা গেলো আগুনের ছাপ! রাগের তোড়ে আচানক হিং স্র থাবায় আঁকড়ে ধরল মাহি'র নরম গ্রীবাদেশ। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় গর্জন তুলে আওড়াল,

“ কি বলছিস তুই কু***বাচ্চা? কি করে মুখে আনিস এসব কথা? আমায় ছেড়ে কার সাথে ইনভলব হবি তুই? এতোবড় স্পর্ধা আসে কোত্থেকে তোর? একদম জানে মে'রে ফেলব, চিনিস আমায়?”

আঁতকে উঠে মাহি। ভয়ার্ত কন্ঠে আমতা আমতা করে শুধায়,

“ আমিতো... কেবল বললাম।”

“ কেন বলবি তুই জানোয়ারের বাচ্চা? কেন বলবি বল? কেন অন্যের প্রসঙ্গ উঠাবি তুই? মা'র খাস না কতদিন হয়েছে বল? তাড়াতাড়ি বল বেয়াদব!”

ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়টা ক্ষেপেছে ভীষণ। তাকে সামলাতে এবার বড্ড বেগ পোহাতে হচ্ছে রমণীর। কন্ঠার ব্যথা তরতর করে বাড়ছে তার। ছাড়াবার প্রয়াসে মত্ত তার হাতদুটো!

_________________________________________

“ সই? এই সই? কোথায় তুই?”

অস্থির পদযুগলে ছুটছে নিরু। জমিদার বাড়ির ঠিক পেছনে অবস্থিত পদ্ম বিলের অভিমুখে সে-কি মস্তবড় জঙ্গল। অষ্টাদশীর ছুটন্ত পাদু’টো বড্ড অশান্ত যেন। সইয়ের চিন্তায় ব্যাকুল হয়েছে অন্তরাত্মা! ঘন-জঙ্গল ভেঙে কয়েক গজ এগোতেই আচানক থমকে দাঁড়ায় নিরু। কানখাড়া করতেই শুনতে পায় — কারো অগ্রসর পদধ্বনি। খুব কাছ থেকে ভেসে আসছে শব্দযুগল। শুকনো পাতার গায়ে জোরালো পায়ের চাপ পড়তেই কেমন মর্মর শব্দ হচ্ছে! নিরু বিরক্ত হলো এবার। তৎক্ষনাৎ পিছু না ফিরে, বুকের কাছে বাঁধলো দু'হাত। তেঁতো কন্ঠে বলল,

“ আর ঢং করতে হবে না সই। আমি বুঝে গিয়েছি এটা তুই ছাড়া অন্য কেউ নয়। তাই বলছি এক্ষুনি ওমন লুকোচুরি বন্ধ করে আমার সামনে আয়।”

প্রতুত্তরে কেবল নিস্তব্ধতা পেলো নিরু! এতে যেন বিরক্তির রেশ তরতর করে বেড়ে গেল অষ্টাদশীর। ঝাঁঝ লেপ্টে গেল সুশ্রী মুখমণ্ডলে। দাঁত খিঁচে পিছু ফিরতে ফিরতে শুধালো —

“ তুই কি কোনোদিন মানুষ হবি না সই? কতবার করে বলেছি পেছন থেকে এভাবে.....!”

বাক্যটুকু সম্পূর্ণ করতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হলো নিরু। বিস্ফোরিত রূপ ধরল তার চোখদুটো। ভয়ে থেমে গেলো হৃৎস্পন্দন! দু'হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক অশরীরী। বিশাল সুঠাম দেহ তার! মাথার ওপর ফেলে রাখা বড় একখানা কালো রঙা কাপড়। অশরীরির মুখটা অস্পষ্ট। ঢেকে আছে কালো রঙা কাপড়ের আড়ালে। আকাশে মেঘ জমেছে বিধায় চারপাশের অন্ধকারে অশরীরীর পাদু’টো অদৃশ্য মনে হচ্ছে! তার বলিষ্ঠ হাতে কি যেন একটা উচুঁ করে রাখা। ধীরলয়ে ঘাড় বাঁকাতেই অশরীরির চোখে চোখ পড়ল নিরুর। ওমনি বেচারির নিঃশ্বাস আঁটকে গেল গলার কাছে। একদম ধবধবে শেতাঙ্গের ন্যায় গায়ের রঙ অশরীরির, চোখদুটো ভিন্ন রঙের। একটা চোখ হুবহু মানুষের মতো দেখতে হলেও অন্যটা একদম ভুতের চোখ! সম্পূর্ণ সাদা আইরিশের মাঝে ছোট্ট একখানা কালো রঙা পিউপিল। বাদিকের কপাল হতে ডানপাশের গালের ত্বক বরাবর বিশাল এক ক্ষতের দাগ! অশরীরীর চোখদুটো কেমন মুহুর্তেই রঙ পাল্টালো মনে হচ্ছে। আগুন দৃষ্টে অষ্টাদশীর পানে তাকিয়ে থেকে এগোতে চাইলেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে নিরু!

“ হে ভগবান!!!!! ছোটবেলায় যে-ই আহট দেখেছিলাম তার শাস্তি আমায় এভাবে দিলে তুমি? আহটের সবচেয়ে ভয়ানক মমি'র এসিস্ট্যান্টকে এভাবে আমার সামনে এনে দাঁড় করালে ভগবান? আমি...আমি...”

বলতে বলতেই ভয়ার্ত রমণী জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লো জঙ্গলের স্যাতস্যাতে জমিনে। এদিকে তার এহেন অতর্কিত কান্ডে যারপরনাই বিরক্ত হলেন অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাশিয়ান মানব এডউইন। কপালের চামড়ায় গোটাকতক ভাঁজ টেনে ধীরলয়ে এগিয়ে এলেন তিনি। দু'হাতে আলগোছে মাথার ওপর থেকে নামালেন কালো রঙা ওভারকোটটা। খানিক মাথা তুলে তাকালেন আকাশের পানে। মেঘ জমেছে ফের। কিছুক্ষণ আগে যেভাবে বৃষ্টি হলো! এখন সেভাবে নাহলেই চলে। অগত্যা যুবক ফের ঘাড় নামিয়ে তাকালেন নিজ হাতের পানে। ফোনটা উঁচিয়ে রেখেছে সে-ই কখন থেকে। তাও আবার একটুখানি সিগনালের আশায়! অথচ কান্ড দেখো। আশেপাশে সিগনালের “ স ” ও নেই! এ নিয়ে বড্ড বিরক্ত রাশিয়ান মানব। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আনমনে একবার তাকালো অচেতন নিরুর পানে। তৎক্ষনাৎ মুখাবয়বে এক আকাশসম বিরক্তির ছাপ ফুটলো তার। বিড়বিড়িয়ে শুধালো,

“ হোয়াট দা ফা'ক ইজ দিস? একটা সাধারণ মানুষকে দেখে ওভাবে ভয় পেয়ে জ্ঞান হারানোর কি আছে? যত্তসব ঢং!”

বলতে বলতেই উল্টোপথে পা ঘোরায় এডউইন। হাতের ফোনটার পানে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর কন্ঠে আওড়ায়,

“ কোথায় আপনি মনস্তার? অবশেষে এ কোন জঙ্গলে এনে ফেললেন আমায়?”

____________________________________________

ওড়নার কোণে নাক ডুবিয়ে ফোঁপাচ্ছে মাহি! ফোপাঁতে ফোঁপাতে বারকয়েক আড়চোখে দেখছে সম্মুখে শক্ত মুখে বসে থাকা রূঢ় মানবকে। মুগ্ধ হিসহিসিয়ে যাচ্ছে সে-ই কখন থেকে। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে খেয়ে ফেলার দৃষ্টিতে। মাহি দেখেও না দেখার ভান ধরে বসে আছে। অধৈর্য্য মানব এবার কেমন ধৈর্যহারা হয়ে বাজখাঁই কন্ঠে বলে ওঠে,

“ কাছে আয়!”

কেঁপে ওঠে মাহি! নতমুখে ফোপাঁতে ফোঁপাতে খানিকটা এগিয়ে এসে বসলো মানবী। মধ্যকার দু-আঙুলের ফাঁকা জায়গাটুকু পরক্ষণেই গ্রাস করে বসল মুগ্ধ। রমণীকে একহাতে জড়িয়ে ধরে ধৈর্যহীন কন্ঠে গমগমে গলায় আওড়াল,

“ লিসেন বি'চ! এখন যা যা করব তুই জাস্ট কো-অপারেট করবি আমার সাথে। কোনোরকম ন্যাকাগিরী করলে একদম গলা টিপে মে'রে ফেলব! গট ইট?”

ভয় বাড়ল মাহি'র। নরম চিত্তে ওড়নায় নাক মুছে প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ আগেভাগে বলে দিন কি কি করবেন। তাহলে সেভাবেই কো-অপারেট করব।”

বোকা মানবীর এহেন বাক্যালাপে হতবাক মুগ্ধ! মেয়েটা কি এমুহূর্তে ইচ্ছে করে ন্যাকা সাজছে? না-কি ও এমনিতেই এমন? মুগ্ধ কেমন গম্ভীর ভাবস্রোতে ধীরলয়ে মুখ নামিয়ে আনলো মাহি'র কানের কাছে। আগাম সর্তকতা হিসেবে রমণীকে জড়িয়ে ধরল ভালো করে। যেন চড়ুই ছুটতে না পারে বাঁধন ছেড়ে। খানিকক্ষণ সময় নিয়ে বলতে লাগলো কিছু উদ্ভট কথাবার্তা! যার সঙ্গে পূর্ব পরিচিতি নেই মাহি'র। উটকো বেয়াদবি কথাবার্তা কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই সটান হয়ে গেল বেচারি। রূঢ় মানবের অশ্লীল বাক্যালাপ যত গভীরে যাচ্ছে ততই গা গুলিয়ে উঠছে তার। নাকমুখ কুঁচকে বমি বমি ভাব ধরেছে চঞ্চলা চড়ুই। একপর্যায়ে নিজের সংবরণ আর ধরে রাখতে না পেরে রমণী তক্ষুনি ভকভক করে উগড়ে দিলো পেটে যা ছিলো! তার এহেন অতর্কিত কান্ডে হতভম্ব মুগ্ধ। ত্বরিত মেয়েটার মাথা টেনে এনে জড়িয়ে ধরল নিজ বুকের সঙ্গে। উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,

“ কি হলো তোর? বমি করলি কেনো? ওয়েট, পানি খাবি?”

মাহি'র গা গুলাচ্ছে এখনো। দূর্বল মাথাটা কোনমতে টেনেহিঁচড়ে সরালো রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষভাঁজ হতে। মুগ্ধ অস্থির! তক্ষুনি ছুটে গেল রমণীকে ছেড়ে দিয়ে। মুহুর্তব্যয়ে পানিভর্তি গ্লাস নিয়ে ফিরে আসতে গেলেই হতবিহ্বলতার জড়তা গ্রাস করল তাকে। যে-ই দেখল চঞ্চলা চড়ুই বিছানা ছেড়ে ছুটে গিয়েছে দেয়ালে টানানো পর্দার আড়ালে! মুগ্ধ কপাল গোছালো। মন্থর পায়ে এগিয়ে এসে সন্দিগ্ধ গলায় শুধালো,

“ পর্দার পেছনে কি করছিস? এদিকে আয়।”

সপ্তদশী মুখ কুঁচকায়। দূর্বল কন্ঠে ঝাঁঝ ঢেলে শুধালো,

“ জানোয়ার লোক! মুখে ছাই পড়ুক আপনার বেলাজা, অসভ্য, বেয়াদব! লজ্জা করে না হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ের সঙ্গে এসব বাজে বাজে কথা বলতে?”

মুহুর্তেই সুদর্শনের সুশ্রী মুখাবয়বে রাগের ছাপ স্পষ্ট হলো। হাতে থাকা গ্লাসটা তক্ষুনি রাগের মাথায় ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। কাঁচের ঝনঝন শব্দে মুখরিত হলো চারপাশ। যে শব্দের অভিঘাতে কেঁপে ওঠে মাহি! অথচ মুগ্ধ অধর কোণে দাঁত বসিয়ে হিসহিসিয়ে যাচ্ছে কেমন। চঞ্চলা রমণীর ঝাঁঝাল বাক্যবাণে রাগের পারদ আকাশ ছুঁই ছুঁই তার। দাঁতে দাঁত চেপে হাতদুটো করেছে মুষ্টিবদ্ধ! হিসহিসিয়ে সম্মুখে এগোতে চাইলেই বিচক্ষণ মস্তিষ্ক তার, সপ্তদশীর অসুস্থতার কথা স্মরণ করিয়ে দিলো ফের। মুহুর্তেই অভ্যন্তরে উপচে পড়া রাগগুলো কোনমতে আঁটকে রেখে, জায়গায় স্থির হলো মুগ্ধ! মনে মনে নিজেকে স্বান্তনা দিয়ে শুধালো,

“ কন্ট্রোল! কন্ট্রোল! মুরগিটা অসুস্থ। যা করার বাগে এনে কর। বুঝিয়ে শুনিয়ে আগে শান্ত কর! নয়তো আবার জ্ঞান হারাবে।”

অভ্যন্তরের স্বান্তনার বাণী আওড়ে খানিক শান্ত হলো মুগ্ধ। পাহাড়সম বলিষ্ঠ দেহখানা মৃদুমন্দ নাড়িয়ে হেঁটে এলো কয়েক কদম। তক্ষুনি ভয়ে কদম পেছালো মাহি। ঝুলন্ত পর্দার আড়ালে গা লুকিয়ে বলে উঠল,

“ থেমে যান বলছি!”

রূঢ় মানব থামল এবার। অস্থিরতায় মেদহীন কোমরের দুপাশে হাত ঠেকিয়ে গমগমে গলায় আওড়াল,

“ এ্যাই বান্দীর মেয়ে এ্যাই! অতিরিক্ত নাটক করবি না বলে দিলাম। ভদ্র বলে এখনো জোর করছিনা কু***বাচ্চা! নয়তো এতক্ষণে তিনবার জ্ঞান হারাতি। অসভ্য মেয়েছেলের মতো কানে কানে কথাগুলো শুনতে গিয়েছিলি কেনো বেয়াদব? যখন প্র্যাক্টিক্যালি করতাম, তখন নাহয় নিজ চোখে দেখতি। ভালো বলে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিচ্ছিলাম তা গায়ে সয়নি তাই না? লিসেন বি'চ, টুডে আই ডোন্ট ওয়ান্না টেক এনি রিস্ক। সো কাম ফরওয়ার্ড!”

বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকায় মাহি। ঘৃণ্য কন্ঠে তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর করে —

“ কিসের বুঝিয়ে শুনিয়ে নেওয়া হ্যাঁ? হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ের সঙ্গে নষ্ট নষ্ট কথাবার্তা বলতে লজ্জা করছে না আপনার? আপনি জানেন? আপনার কথাগুলো মনে পড়তেই এখনো আমার গা গুলাচ্ছে?”

চোয়ালের পেশি টানটান হলো মুগ্ধের। বেয়াদব জিভটা বোধহয় আর ধরে রাখতে পারলোনা নিজের কপটতা! সঙ্গে সঙ্গে দাঁত খিঁচে কটুবাক্য ছুড়ঁল!

“ ওরে আমার বা*লছিঁড়ু সতী রে! এখনো কিছু করলামই না, তার আগেই বমি বমি পাচ্ছে? আয়, আয়, কাছে আয় বান্দীর মেয়ে, সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা এক্ষুণি করব আমি। মরলে ম*রবি। জ্ঞান হারালে, হারাবি! বেঁচে থাকলে কালকেই বমি পাওয়ার আসল কারণ পেয়ে যাবি! কাছে আয়। কাছে আয় বান্দীর মেয়ে!”

অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গেল মাহি। কাঁপলো তার তুলতুলে অধরজোড়া। কিছু বলতে গিয়েও গলা থেকে কোনো শব্দ বের হলো না যেন। ভীত-লজ্জাতুর দৃষ্টিতে একবার তাকাল রূঢ় মানবের চোখের দিকে, অতঃপর তৎক্ষণাৎ চোখ নামিয়ে নিয়ে ছুটলো বা-দিকে। ওতোবড় কামরায় প্রাণভয়ে ছুটতে ছুটতে চিৎকার দিয়ে শুধালো,

“ শেষ! আমি শেষ। আমি আর এসবে নেই। আল্লাহর ওয়াস্তে আমায় ছেড়ে দিন বিস্ট!”

রমণীর পেছন পেছন ছোটার বদলে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ! কোমরের দুপাশে হাত বেঁধে কটমট কন্ঠে আওড়াল,

“ দেখ সিগনোরা! আই হেভ নো মোর পেশেন্স টুডে। জাস্ট স্টপ রানিং আই সে।”

শুনলো না বোকা মানবী! উল্টো দ্রুত পায়ে আচানক উঠে গেলো বিছানায়। বলল,

“ না না না! দূরে যান। দূরে যান বলছি। আপনার মতো দৈত্যের কাছে আমি একটা পিচ্চি মানুষ। ম'রে যাব আমি।”

এপর্যায়ে ব্যাকুল মুগ্ধ! পায়ের তাল বিছানার পানে এগিয়ে এনে কপট মোলায়েম ভঙ্গিতে বলতে লাগল,

“ না না! দেখ সিগনোরা। দেখ, আমি আছি তো। আমি থাকতে এতো ভয় কিসের তোর?”

বোকা সপ্তদশীর ভয়ের চোটে মাথার তার হয়েছে এলোমেলো। আচমকা রূঢ় মানবের মুখের ওপর বলে বসল,

“ ওরে মাথামোটা দৈত্য! আপনাকেই তো ভয় লাগছে আমার।”

কথায় কথায় বাক্যটা জিভ খসতেই টনক নড়ল মাহি'র। ত্বরিত দু'হাতে ঢেকে নিলো নিজ মুখ। ভয়াতুর দৃষ্টে সম্মুখে তাকাতেই দেখে — ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় হিসহিসিয়ে যাচ্ছে মুগ্ধ। দাঁত খিঁচে হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,

“ মুখ সামলে কথা বল বেয়াদবের বাচ্চা! ভুলে যাস না কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস!”

কাঁপছে মাহি। রূঢ় মানবের ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে কদম পেছাতে চাইলেই আচানক ছুটে এসে বিছানায় লাফ দিলো মুগ্ধ! ওমনি রাশিয়ান দৈত্যের ভারে বেচারা খাটের তক্তাগুলো কেমন মর্মর শব্দে ভেঙে পড়লো নিচে। এহেন অতর্কিত কান্ডে কপোত-কপোতী যুগল আচানক ধপাস করে পড়ে গেল ভাঙা খাটের ঠিক মাঝখানে। ওপর থেকে বাদবাকি কাঠের তক্তাগুলোও পড়ল পরক্ষণে। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এরূপ ঘটনায় হতভম্ব মাহি। ধীরলয়ে স্বাভাবিক হতেই নিজেকে আবিষ্কার করে রূঢ় মানবের উষ্ণ আবেশে। কাঠের তক্তাগুলোয় পিঠ ঠেকিয়ে রাখা মুগ্ধের। নিজ দৃঢ় বাহুবন্ধনে আড়াল করে রেখেছে বোকা মানবীকে। পেতে দেয়নি একচুল ব্যথা! রয়েসয়ে যুবকের উষ্ণ আবেশ হতে মাথা তোলে মাহি। ক্ষুদ্র চোখে মানবের পানে তাকাতেই ভড়কায় সে। রূঢ় মানবের ফর্সা ললাটতটের পাশ কাটিয়ে অবলীলায় গড়াচ্ছে লহু। তবুও তার চোখদুটোতে বিন্দুমাত্র ব্যাথাতুর ছাপ নেই। সেথায় লেপ্টে আছে এক আকাশসম অপেক্ষা! রমণী উদ্বিগ্ন হলো। নিজের সকল ভয়ডর কাটিয়ে পরমুহূর্তেই হাত রাখলো রূঢ় মানবের রুক্ষ গালে। ব্যাকুল কন্ঠে শুধালো,

“ এ কি! আপনার কপাল ফেটে র* ক্ত পড়ছে বিস্ট। আপনি...!”

বাকিটা বলার ফুরসত দিলো না মুগ্ধ। তার পূর্বেই মাথাটা খানিক এগিয়ে এনে আলগোছে টেনে ধরল মাহি'র নরম ওষ্ঠপুট! দীর্ঘ সময়ের স্থায়িত্বে, গভীর আশ্লেষে রমণীর ফিনফিনে অধরজোড়ায় কর্তৃত্ব চালিয়ে ধীরলয়ে বিচ্ছিন্ন করল ওষ্ঠপুটের মেলবন্ধন। স্থবির রমণীর গালে হাত ঠেকিয়ে, চোখে রাখলো চোখ। অত্যন্ত শান্ত অথচ গভীর কন্ঠে আওড়াল,

“ আগেই বলেছি — আমি কোনোকিছু হাসিল করা বলতে জোরজবরদস্তি বুঝি! তোকে আমার চাই সিগনোরা! ট্রাস্ট মি, তোকে আমি একান্তভাবে, গভীরভাবে চাই। এতটুকু কাছে চাই, যতটুকু কাছে এলে তোর প্রতিটি নিশ্বাসের শব্দ আমার কর্ণকুহরে পৌঁছাবে। তোর দেহ ক্ষত-বিক্ষত — তা আমি জানি মেয়ে! তবে আমার কনক্রিটের আস্তরণে বন্দী থাকা হৃদয়টা ঠিক কতটা ক্ষত-বিক্ষত, তা তুই আমাতে ডুব না দিলে কি করে বুঝবি বল তো? শুধু শুধু কেনো অপেক্ষার প্রহর বাড়াচ্ছিস সিগনোরা? পরে আবার প্রহর গুনতে চাইলে আমাকেই না হারাতে হয় তোর! জীবন ক্ষনস্থায়ী হলেও, আমার বেঁচে থাকা তার চেয়েও ক্ষনস্থায়ী। অন্তত তোর মাঝে এই আমাকে — চাইলেই একটুখানি জায়গা দিতে পারিস। কথা দিচ্ছি মেয়ে — তোর দুঃখের ফুলবাগানের প্রতিটি কাটা আমি হাসিমুখে নিজ গায়ে মেখে নিবো।”

চলবে....

[ দুঃখীত! আমি একটা মেয়ের কনসেন্ট ছাড়া তার সঙ্গে জোরজবরদস্তির পক্ষে আমি নেই! এন্ড ইট'স লাউড এন্ড ক্লিয়ার।]

Address

Rahattar Pool
Patenga

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Natural Touch posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share