11/08/2026
#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_৭
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]
ঘণ্টা পেরিয়ে দিন গড়াচ্ছে, সময় ছুটে চলেছে নিজস্ব অমোঘ গতিতে। অথচ ইদানীং আয়াশের সময়কাল যেন কোনো এক অদৃশ্য স্থবিরতায় থমকে দাঁড়িয়েছে। আয়শা বেগমদেরও ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আইরিনও আজকাল তার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলছে না। চারপাশে এত মানুষ থাকা সত্ত্বেও আয়াশ নিজেকে কেমন এক অসীম নিঃসঙ্গতার মধ্যে আবিষ্কার করছে।বিশাল বাসাটাও যেন তার সঙ্গে সঙ্গে নিস্তব্ধতার অতল গহ্বরে ডুবে গেছে। বাড়ির অবস্থা বেহাল। কাজের লোকেও আসতে নিষেধ করে দিয়েছে সে, ফলে গোটা বাসাজুড়ে অযত্ন আর অব্যবস্থার ছাপ স্পষ্ট। কোথাও কোনো প্রাণের সঞ্চার নেই, নেই পরিচিত ব্যস্ততার সামান্যতম রেশও। আয়াশ অলস, অবসন্ন শরীরটা অবশেষে বিছানা থেকে টেনে তুললো সে। বিকেলেই আয়শা বেগমরা এসে পৌঁছাবেন। অথচ তারা এখনো জানেন না, ইনায়া নেই।
এই কয়েক দিনে কতবার যে মিথ্যের আশ্রয় নিতে হয়েছে তাকে, তার হিসাব নেই। কিন্তু তারা চলে এলে? তখনও কি করে মিথ্যে বলবে? ইনায়াকে তার বাবা-মা নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসেন। এই তিন বছরে মেয়েটা তাদের কাছে কেবল পুত্রবধূ হয়ে থাকেনি, ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে আরেকটি মেয়ে। যদি তারা জানতে পারেন, আয়াশের কারণেই সেই মেয়েটা আজ সবকিছু ছেড়ে চলে গেছে, তবে হয়তো কোনোদিনই তাকে ক্ষমা করতে পারবেন না। ঘরদোরের অবস্থাও করুণ হয়ে উঠেছে।জামাকাপড় এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। গত সপ্তাহ ধরে এই বাড়িতে কোনো প্রকার রান্না হয়নি, আয়াশের চুলের সঙ্গে দাড়িগুলোও অযত্নে, অবিন্যস্তভাবে বেড়ে উঠেছে। নির্ঘুম রাতগুলোর নীরব সাক্ষ্য হয়ে চোখের নিচে জমেছে গাঢ় কালি।
একসময়ের পরিপাটি মানুষটাকে এখন নিজের কাছেই যেন অপরিচিত লাগছে। আয়াশ ধীরে ধীরে একে একে সবকিছু গোছাতে শুরু করলো। এখন ফোন করে কাজের লোকে আসতে বলেও কোনো লাভ নেই। ছুটিটা তো সে নিজেই দিয়েছে। তাই আজ নিজের অবসন্ন হাতেই সবকিছু সামলাতে হবে। সময় নিয়ে, ধীর হাতে, একে একে ঘর গোছাতে লাগলো সে। সবশেষে নিজের ঘরের ছোট্ট ডাস্টবিনটির ময়লা ফেলার জন্য সেটি হাতে তুলতেই চোখে পড়লো ভেতরে জমে থাকা অসংখ্য কাগজ।
নিজের রাগের বশে অফিসের অনেক কাগজই সে ছুঁড়ে ফেলেছিল সেখানে। সেগুলো আলাদা করে নেওয়ার জন্য একে একে কাগজগুলো দেখতে শুরু করলো আয়াশ। দেখতে দেখতে হঠাৎই তার হাতের মুঠোয় এমন কিছু এসে পড়লো, যার জন্য কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিল না সে। একটা ছেঁড়া আল্ট্রাসনোগ্রামের ছবি। আয়াশের আঙুলগুলো মুহূর্তেই কেঁপে উঠলো। কাঁপা হাতে দুই টুকরো হয়ে থাকা ছবিটা তুলে নিলো সে।
দুই টুকরোকে পাশাপাশি রাখতেই ধীরে ধীরে ভেসে উঠলো এক বিরল অথচ অতি ক্ষুদ্র অস্তিত্বের চিত্র। একটি ছোট্ট ভ্রূণ। তার ক্ষীণ হৃৎস্পন্দনের চিহ্ন, শরীরের প্রাথমিক গঠনের অস্পষ্ট রেখা, সবকিছু মিলিয়ে যেন তার চোখের সামনে ফুটে উঠলো এমন এক সত্য, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে এতদিন বিন্দুমাত্র অবগত ছিল না সে। এতদিন গুমরে গুমরে থাকলেও আজ যেন সেই নিস্তব্ধতা আর নিজের মধ্যে ধরে রাখতে পারলো না আয়াশ। হয়তো তার মতো হতভাগ্য কোনো পিতা নেই, যে কিনা নিজের সন্তানের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানার সুযোগটুকুও পায়নি।
আয়াশ কেমন অসহায় মানুষের মতো ছেঁড়া ছবিটা বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরলো। নেত্রজোড়া মুহূর্তেই রক্তাভ হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য, অথচ সেই শূন্যতার মাঝেই অসহনীয় এক ভার জমাট বেঁধে আছে। ইনায়াকে সে প্রতিদিন খুঁজেছে। প্রতিটি সম্ভাব্য জায়গায় তার অস্তিত্বের কোনো চিহ্ন খুঁজে বেড়িয়েছে। অথচ মেয়েটা কোথাও নেই। তবুও আশাহত হয়নি আয়াশ। ইনায়াকে সে খুঁজে বের করবেই। কিন্তু আজ যেন হঠাৎ করেই তার সমস্ত দৃঢ়তার ভিত ভেঙে পড়লো। কাঁচ যেমন এক মুহূর্তে ভেঙে অসংখ্য টুকরো হয়ে যায়, ঠিক তেমনই তার ভেতরটাও যেন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো। বুকের মধ্যে সেই ছেঁড়া ছবিখানি জড়িয়ে ধরে আয়াশ অসহায়, কাতর কণ্ঠে বলে উঠলো-
" এতোটা নিষ্টুর হলে কি করে ইনায়া? আমায় একটি বারও ক্ষমা করার সুযোগ অব্দি দিলে না, ওর কি দোষ যে আমার কাছ থেকে এতো বড় একটা সত্যি লুকালে। আমায় একবারও ওর অস্তিত্বকে স্পর্শ করারও সুযোগ দিলে না?"
কথাগুলো উচ্চারণ করতে করতেই তার শ্বাস আটকে এলো। নিজেকেই কেমন এক অসহায় পথিক বলে মনে হলো তার। গন্তব্যহীন, আশ্রয়হীন, অথচ বুকের ভেতর এক পৃথিবী অনুতাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়াশ যেন এতদিনে নিজের অবশিষ্ট শক্তিটুকুও নিঃশেষ করে ফেলেছে। গত দুই দিন ধরে কেবল একটি ইনস্ট্যান্ট নুডলস খেয়েছে। এ ছাড়া পেটে আর কোনো দানা পড়েনি। অনাহার, অনিদ্রা আর মানসিক বিপর্যয়ের সম্মিলিত ভারে শরীরটাও অবশেষে পরাজয় স্বীকার করলো। অবশিষ্ট শক্তিটুকুও যেন সেখানেই নিঃশেষ হয়ে গেলো। নেত্রপল্লব মেলে রাখাটুকুও তার কাছে দুঃসাধ্য মনে হলো। চারপাশের সমস্ত দৃশ্য ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এলো। মনে হলো, কোনো অদৃশ্য কালো মেঘ এসে তার দৃষ্টির সমস্ত আলো ঢেকে দিচ্ছে। ঠোঁট আওড়ে কয়েকটি শব্দ ছিটকে পড়লো-
“ এ..এমনটা না করলে হতো না?”
-----
অন্ধকার আর নিস্তব্ধতার দীর্ঘ আবরণ পেরিয়ে ধীরে ধীরে আলোর দিশায় ফিরে এলো কান্ত, অবসন্ন নেত্রপল্লবের জোড়ায়। অতি ধীর, দুর্বল প্রয়াসে চোখ মেললো আয়াশ। চৈতন্য ফিরেছে তার। তবুও চারপাশের পরিবেশকে চিনে উঠতে কিছুখন সময় লেগে গেলো। স্মৃতির পাতায় এখনো সবকিছু কেমন আবছা, অস্পষ্ট। কোথায় ছিল সে, কী ঘটেছিল, কিছুই যেন স্পষ্টভাবে মনে পড়ছে না। কিছুটা সময় যেতেই, সেই অস্পষ্টতার মধ্যেই কেটে গেলো।তারপর হঠাৎই স্মৃতির বন্ধ দরজা একে একে খুলে গেলো। ইনায়া,ছেঁড়া ছবিটা।তার অজানা সন্তানের অস্তিত্ব। সবকিছু আচমকাই মনে পড়তেই চট করে উঠে বসলো আয়াশ।
কিন্তু দুর্বল শরীরটা যেন তার এই আকস্মিক তৎপরতার সঙ্গে কোনোভাবেই সঙ্গ দিতে রাজি হলো না।মাথাটা কেমন ভার হয়ে আছে, শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন অবসাদের ভারে অবনত। চারপাশে চোখ বুলিয়ে হঠাৎই নিজের অবস্থান বুঝতে পারলো সে। বিছানায় শুয়ে আছে। কিন্তু সে তো মেঝেতে পড়ে ছিলো। তাহলে? কীভাবে এখানে এলো সে? প্রশ্নটা মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগলো। কিন্তু তার থেকেও বড় হয়ে উঠলো অন্য এক উৎকণ্ঠা।কাঙ্ক্ষিত জিনিসটির খোঁজ।বিচলিত চোখে চারপাশে তাকাতে লাগলো আয়াশ। অস্থির দৃষ্টিতে বিছানার চারপাশ, মেঝে, টেবিল, প্রতিটি সম্ভাব্য স্থান খুঁজে চললো। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটির দেখা মিললো।বেডসাইড টেবিলের ওপর পড়ে আছে সেটি।আয়াশ আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করলো না। দুর্বল শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে দ্রুত হাত বাড়িয়ে সেটাকে নিজের মুঠোর মধ্যে আঁকড়ে নিলো।
পরম মমতায় আঙুল বুলিয়ে দিলো ছবিটির ওপর। কতটা কাছে ছিল সে! এতটা কাছে। অথচ এতদিনেও একবারের জন্য টের পায়নি নিজের অস্তিত্বের সেই ক্ষুদ্রতম স্পন্দনটুকু। কতটা নির্বোধ হলে এমনটা সম্ভব? কতটা অন্ধ হলে নিজের এত কাছাকাছি বেড়ে ওঠা একটি জীবনের অস্তিত্বও অনুভব করা যায় না?আয়াশ কোনো উত্তর খুঁজে পেলো না। শুধু বুকের ভেতরটা আরও একবার নিঃশব্দে ভেঙে পড়লো।
চারিদিকে নিস্তব্ধতায় ঘেরা, ঠিক সেই নিস্তব্ধতার বুক চিরেই ধোঁয়া ওঠা গরম সুপের বাটি হাতে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন আয়শা বেগম। অন্যদিনের তুলনায় আজ তাঁর মুখশ্রী অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর। দৃষ্টির গভীরে যেনো কোনো অপ্রকাশিত আশঙ্কার ছায়া। হয়তো মাতৃসুলভ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি ইতোমধ্যেই কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন। ছেলে আর পুত্রবধূর মধ্যবর্তী অদৃশ্য দেয়ালটি যে নিছক নীরবতা নয়, তার আভাস হয়তো তাঁর চোখ এড়িয়ে যায়নি। আয়শা বেগম ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ছেলের দিকে সুপের বাটিটি বাড়িয়ে দিলেন। অতঃপর কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলেন ছেলের নিস্তেজ হয়ে আসা মুখশ্রী। সেই মুখে ক্লান্তি, অবসাদ আর অনুচ্চারিত কোনো অপরাধের ছায়ায় একাকার হয়ে আছে।
“ এটা খাও, আর ইনায়া কোথায়?”
প্রশ্নটার জন্য সে প্রস্তুত ছিলো আয়াশ। তবুও মায়ের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রশ্নটা তার অভিঘাতে শিরদাঁড়া বেয়ে হিমেল এক কম্পন নেমে গেলো। এতদিনের লুকিয়ে রাখা সত্য যেনো হঠাৎ করেই তার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। আয়াশ ধীরেধীরে মায়ের দিকে দৃষ্টি তুললো। এই নারীটাকে শেষ কবে তার দিকে এমন কঠিন, গম্ভীর এবং অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন, তা তার স্মৃতির কোনো কোণেই খুঁজে পেলো না।এতদিন অসংখ্য মিথ্যার আড়ালে সত্যটাকে ঢেকে রাখা গেলেও আজ আর সেই অবকাশটুকুও অবশিষ্ট নেই। কারণ কিছু সত্য যতই গভীর অন্ধকারে সমাহিত করে রাখা হোক, একদিন না একদিন তারা নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতেই ফিরে আসে। আজ সেই ফিরে আসার দিন।
“ আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছে।”
মাথা অবনত রেখে অত্যন্ত ধীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলো আয়াশ। আয়শা বেগমের মুখশ্রী যেনো মুহূর্তেই আরও কঠোর হয়ে উঠলো। চোখের তারায় জমাট বাঁধলো প্রশ্নের সঙ্গে মিশে উঠলো ক্ষোভ।
“ কেনো চলে গিয়েছে?”
“স্বামী হিসেবে আমি ব্যর্থ তাই।"
উত্তরটা উচ্চারিত হতেই আয়শা বেগমের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তিনি কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ছেলের পানে। ছেলের অতীত সম্পর্কে পরিবারের প্রত্যেকেই অবগত। তারা জানে, একসময় ছেলেটা কীভাবে ধীরে ধীরে বিষণ্নতার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছিলো। সেই অন্ধকার সময়টাকে যদি যথাসময়ে সামলে ওঠার সুযোগ না দেওয়া হতো, তবে হয়তো আজ আয়াশ তাদের পাশে বসে থাকতো না। সেই স্মৃতির ভার তাঁর চোখের কঠোরতাকেও আরও তীব্র করে তুললো।
“ তিনটা বছর আয়াশ, তিনটা বছর! একটা দুইটা দিন নয় যে তুমি তাকে ভুলতে পারোনি। আগের কথা বাদ দিলাম, কিন্তু তুমি এখন বিবাহিত। অন্যনারীর জন্য এতো অনুভূতি, এতো আবেগ সব নিষিদ্ধ তোমার জন্য। হারাম তোমার জন্য।”
আয়শা বেগম যখন আয়াশের প্রতি রাগ, অভিমান কিংবা গভীর হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, তখনই তাঁর সম্বোধনে 'তুমি' শব্দটি নেমে আসে। এই একটা শব্দই যেনো মাতৃস্নেহের আবরণ সরিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় তাকে। আয়াশ আরও নত হয়ে গেলো। চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। মায়ের দৃষ্টির সম্মুখীন হওয়ার সাহসটুকুও যেনো ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আয়শা বেগম আবারও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নত হয়ে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে ধীর দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলেন-
“ আজ যদি তোমার বাবাও তার প্রাক্তনকে মনে করে দিন কাটাতো, তখন কি তুমি সইতে পারতে?”
মায়ের কথাটা যেনো সরাসরি এসে আঘাত করলো আয়াশের অন্তঃস্থলে। আহত দৃষ্টিতে তাকালো সে মায়ের দিকে। বাস্তবতা বড় অদ্ভুত। কোনো পরিস্থিতি যখন নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে না, তখন তার ভার উপলব্ধি করা সহজ। অন্যের কষ্ট দূর থেকে দেখলে তা কেবল কষ্ট বলেই মনে হয়। অথচ সেই একই যন্ত্রণা যখন নিজের একান্ত আপন কারো জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখনই বোঝা যায় তার প্রকৃত গভীরতা কতখানি। আয়শা বেগম থামলেন না।
“ উত্তর দাও, কেন করলে মেয়েটার সঙ্গে এমন? ওর কি দোষ এখানে? ওর কি তোমার অতীতে ছিলো? তাহলে কেনো তুমি ওর ভাগের অধিকার ছিন্ন করেছো? ভেবেছিলাম নতুন জীবন শুরুর মাধ্যমে তুমি তাকে ভুলে যাবে। নতুন করে বাঁচতে শিখবে, অথচ আমরা সবাই ভুল ছিলাম। তোমার জীবন বাঁচাতে গিয়ে,আর একটা জীবন শেষ করে দিলাম।”
শেষ কথাগুলো উচ্চারণ করতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠেও অদৃশ্য ভার জমে উঠলো। একদিকে ছেলের অতীতের অন্ধকার, অন্যদিকে সেই অন্ধকারের মূল্য হিসেবে আরেকটি নিরপরাধ জীবনের ভেঙে যাওয়া। একটা জীবনকে বাঁচানোর প্রয়াসে অন্য একটি জীবন যে নিঃশব্দে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে, সেই উপলব্ধি হয়তো একজন মায়ের হৃদয়কেও ভেতর থেকে বিদীর্ণ করে দিচ্ছে। আয়াশ মাথা নুইয়েই রাখলো। অপরাধবোধের ভারে তার ঘাড় যেনো আরও অবনত হয়ে এলো। মায়ের চোখের দিকে তাকানোর মতো সাহস তার নেই। সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টির প্রতিটি প্রশ্ন যেনো তার বিবেকের দরজায় একের পর এক আঘাত হানছে। আয়শা বেগম এবার কঠিন স্বরে বলে উঠলেন-
“ ইনায়াকে খুঁজে বের করবে, আমি নিজে তোমাদের ডিভোর্স দিবো। তোমার মতো ছেলের সঙ্গে আর আমি ওকে রাখবো না, আমার মেয়েকে ফিরে এনে দিয়ে তোমার যাকে ইচ্ছে তাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচো। আমি বা অন্যকেউ তোমাকে আর আটকাবো না।”
কথাগুলো শুনে আয়াশের ভেতরের শেষ অবলম্বনটুকুও যেনো ভেঙে পড়লো। সে এতক্ষণ নিজেকে কোনোভাবে সামলে রেখেছিলো, পরমুহূর্তেই সে যেনো নিজের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেললো। ছোট্ট শিশুর মতো মায়ের কোমড় আঁকড়ে ধরে পেটে মুখ লুকিয়ে ফেললো। এতদিনের সঞ্চিত ক্লান্তি, অপরাধবোধ আর অনুতাপ যেনো একসঙ্গে বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সহ্য করার ক্ষমতাটুকুও যেনো ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে এসেছে। এই হাহাকারের দহন আর কতক্ষণ সহ্য করা যায়?
“ মা..মা আমি সত্যি চাইনি ও কষ্ট পাক! তবুও কষ্ট দিয়েছি৷ তুমি তো জানো আমি ইচ্ছে করে করিনি এমনটা, আমি চাইনি ও কষ্ট পাক। তবুও ও কষ্ট পেলো, আমি চাইনি ওর সান্নিধ্য৷ তোমরাই বেঁধে দিলে। তারপর সময় কাটলো তবুও আমি সেই ভ্রম থেকে বের হতে পারলাম না। পারলাম না বের হতে, আর সেই ভ্রম যে আর একজনকে এইভাবে কষ্ট দিবে ভাবতে পারেনি।"
কণ্ঠের প্রতিটা শব্দ যেনো বুকের গভীর কোনো ক্ষত থেকে উঠে আসছিলো। অনুতাপের ভারে ভেঙে পড়া একজন মানুষের অসহায় স্বীকারোক্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ঘরের নিস্তব্ধতায়।আয়শা বেগম হয়তো নিজের ছেলের এমন অসহায় অবয়ব দেখে এক মুহূর্তের জন্য মায়াবোধ করছে। মাতৃহৃদয়ের কোথাও হয়তো নরম কোনো পর্দা কেঁপে উঠছে। তবুও সেই মায়া তাঁর কঠোরতাকে গলিয়ে দিতে পারলো না। তিনি হাত বাড়িয়ে ছেলের মাথায় সান্ত্বনার স্পর্শও রাখলেন না। কারণ কিছু ভুল এত গভীর হয় যে, সেখানে মমতার চেয়েও অধিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায় সেই ভুলের দায় স্বীকার করা। আর আয়াশকে আজ প্রথমবারের মতো নিজের করা ভুলের সম্পূর্ণ ভারটুকু একা বহন করতেই হবে। এই ভারে সে সঙ্গ দেবে না, অনেক তো দিলো। কিন্তু এখন বিষয়টা অন্যদিকে মোড় নিয়েছে।
আয়াশ বলে গেলো, এতোদিনের একাকিত্ব তাকে যেনো নিঃশব্দে কুঁড়ে কুঁড়ে গ্রাস করছিলো। বুকের গহীন থেকে উঠে আসা অব্যক্ত যন্ত্রণাগুলো আর কোনো বাঁধ মানলো না। বোবাকান্নার ভারে ফেঁপে উঠলো আয়াশের বুক। কাঁপতে থাকা কণ্ঠস্বরটুকুও যেনো দীর্ঘ ছয় বছরের জমে থাকা বেদনার কাছে পরাজিত।
“ মা..মা আজও প্রিয়ার সেই মুখশ্রী ভেসে ওঠে। ওকে ওরা ছিঁ'ড়ে খেয়েছে মা! ওরা ওকে ছিঁ'ড়ে খেয়েছে, আমার পবিত্র ফুলটাকে দুমড়েমুচড়ে নিঃশব্দে শেষ করে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমার হতে গিয়েও হলো না ও!”
আয়শা বেগম চোখ দুটো ধীরে ধীরে বুজে নিলেন। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারী নিঃশ্বাসটাকে দীর্ঘ একখানা দমের সঙ্গে বাইরে বের করে দিলেন তিনি। সামনে বসে থাকা ছেলেটাকে দেখে মায়ের অন্তঃস্থলে হাহাকার করে উঠলো। আয়াশ ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে বুকের গহীনে পাথরচাপা দিয়ে রাখা যন্ত্রণাগুলো আজ যেনো একে একে বাঁধন ছিন্ন করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে আবারও। প্রিয়ার মৃ'ত্যুর পর আয়াশ ঠিক কতখানি এই মানবজগতের মায়া, মোহ আর স্বাভাবিক জীবনের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে অন্ধকারের অতল গহ্বরে ডুবে গিয়েছিলো, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী আয়শা বেগম নিজেও। ছয়টি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, অথচ সময় যেনো সেই একটি বিভীষিকাময় দিনেই আটকে আছে আয়াশের কাছে। প্রিয়া নামক কোমল, নিষ্পাপ মেয়েটির জীবনে নেমে এসেছিলো এক নির্মম দুঃস্বপ্ন। একদল ন'রপশু শিকারে মেয়টা কি বাজে ভাবেই না ধ'র্ষ'ণের শিকার হতে হয়েছে। চিকিৎসকদের সমস্ত প্রচেষ্টাও শেষ পর্যন্ত তাকে এই পৃথিবীর মায়ায় ধরে রাখতে পারেনি। প্রিয়ার সেই অসহায় পরিণতি আয়াশের চোখের সামনে তার সমগ্র পৃথিবীটাকেই যেনো মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিলো।
সেদিন ছেলেটা শিশুর মতো কেঁদেছিলো। অতি প্রিয় একজন মানুষকে নিজের চোখের সামনে ধীরে ধীরে নিভে যেতে দেখার যন্ত্রণা যে কতটা অসহনীয়, তার কোনো ভাষা হয় না। আয়াশেরও হয়নি। অনুভূতিগুলোকে শব্দে রূপ দেওয়ার আগেই যেনো নিয়তি তার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছিলো। তবুও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একটুকরো আশাকে আঁকড়ে ছিলো আয়াশ। মনে হয়েছিলো, হয়তো প্রিয়া ফিরে আসবে। হয়তো আবার আগের মতো চোখ মেলে তাকাবে। হয়তো এই দীর্ঘ অন্ধকারের পর কোনো এক ভোরে তার জীবনে ফিরে আসবে সেই চিরচেনা মুখশ্রী।
কিন্তু কিছু অপেক্ষার কোনো পরিণতি হয় না। কিছু প্রার্থনা আকাশ অবধি পৌঁছেও উত্তরহীন থেকে যায়। আয়াশের সেই ক্ষীণ আশাটুকুও শেষ পর্যন্ত নিভে গিয়েছিলো। শেষ নিশ্বাস অব্দি আয়াশ তার প্রেয়সীর হাত ছাড়েনি। সমাজের চোখ, মানুষের কথাবার্তা, কলঙ্কের অভিধান, কোনোকিছুরই পরোয়া করেনি সে। যে মানুষটাকে পৃথিবী নানা পরিচয়ে চিহ্নিত করেছিলো, আয়াশ তার সমস্ত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে শুধু একজন প্রিয় মানুষ হিসেবেই আগলে রেখেছিলো তাকে। তার শেষ সময়টুকু যেনো একটুও একা না কাটে, সেজন্য নিজের সর্বস্ব দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলো ছেলেটা।
হাসপাতালের সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও আয়াশের মস্তিষ্কে অমোচনীয় দাগের মতো খোদাই হয়ে আছে। সাদা দেয়াল, নিস্তব্ধ করিডোর, যন্ত্রের ক্ষীণ শব্দ আর তার দুই চোখের সামনে ক্রমশ ফিকে হয়ে আসা প্রেয়সীর মুখশ্রী, সবকিছু আজও তাকে অকারণে থমকে দেয়। পবিত্র এক বন্ধনের আবদ্ধ হতে চেয়েছিলো তারা। নিয়তির নির্মম পরিহাসের মাঝেও আয়াশ শেষ অবধি সেই স্বপ্নটুকু আঁকড়ে ধরেছিলো। সে কবুল অব্দি বলেছিলো। কিন্তু ওপাশ থেকে প্রেয়সীর কণ্ঠে সেই কাঙ্ক্ষিত কবুল উচ্চারিত হওয়ার আগেই নিষ্ঠুর এই পৃথিবীর সমস্ত মায়া ত্যাগ করে দূর আকাশের ওপারে চলে গিয়েছিলো প্রিয়া। অপূর্ণ থেকে গিয়েছিলো একটি সম্পর্ক, থেমে গিয়েছিলো একটি স্বপ্ন, আর আয়াশের বুকে জন্ম নিয়েছিলো এমন এক শূন্যতা, যার কোনো ঋতু নেই, কোনো অবসান নেই। ছয় বছর পেরিয়েও সেই শূন্যতার ভেতর প্রিয়ার মুখশ্রী ঠিক আগের মতোই জ্বলজ্বল করে। যেনো সময় তাকে মুছে ফেলতে পারেনি, বরং আরও গভীর করে এঁকে দিয়েছে আয়াশের হৃদয়ের অন্তঃস্থলে।
------
সময় নিজের আপন গতিতে বহমান। কখনো নদীর স্রোতের মতো, কখনো বা ঘূর্ণির বেগে। দেখতে দেখতে একটি মাস পেরিয়ে গেলো ইনায়ার স্বামীর সংসার ছেড়ে আসার। ছেড়ে এসেছে পরিচিত সেই মায়ার সংসার, অথচ সংসার যে বড়ো মায়াময় এক বন্ধন। একটি মেয়ের সমগ্র পৃথিবীজুড়ে অনেক সময় সেই সংসারটুকুই বিস্তৃত হয়ে থাকে। সেই পরিচিত ছায়া থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে অচেনা এক শহরের বুকে নতুন করে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইনায়া।
এখানে থাকা তিনটি মেয়ের সঙ্গে এরই মধ্যে বেশ সখ্য গড়ে উঠেছে তার। বিশেষত যেদিন থেকে তারা জানতে পেরেছে ইনায়া অন্তঃসত্ত্বা, সেদিন থেকেই যেনো মেয়েগুলো তাকে নিজেদের আপনজনের মতো আগলে রেখেছে। কোনো কাজই তাকে করতে দিতে চায় না তারা। যদিও রান্নাবান্না ছাড়া এখানে এমনিতেও বিশেষ কোনো কাজ নেই। তবুও ইনায়ার শরীর যেনো প্রতিদিন নিজের ভেতরে নতুন কোনো পরিবর্তনের সংবাদ বহন করছে। পেটটা আগের তুলনায় বেশ খানিকটা স্ফীত হয়ে উঠেছে। দূর থেকে দেখলেও বোঝা যায়, তার অন্তরে আরেকটি ক্ষুদ্র প্রাণ বেড়ে উঠছে।
আর এই পরিবর্তনই আশপাশের কক্ষগুলোর মানুষের কৌতূহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেনো সে এখানে? তার স্বামী কোথায়? কী এমন ঘটেছে যে অন্তঃসত্ত্বা হয়েও একা একটি মেয়ে এভাবে অন্য শহরে এসে উঠেছে?
গত এক মাসে এমন অজস্র প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। কারো কৌতূহলী দৃষ্টি, কারো চাপা ফিসফাস, কারো বা সরাসরি প্রশ্ন, সবকিছুকেই নির্বিকার মুখে পাশ কাটিয়ে গেছে ইনায়া। নিজের জীবনের ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো মানসিক শক্তি কিংবা আগ্রহ কোনোটাই অবশিষ্ট নেই তার।
ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ অবশ্য বেশ ভালোই চলছে। হাতে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি কাজ এসেছে। নিজের পরিশ্রমের বিনিময়ে উপার্জনের এই পথটুকু অন্তত ধীরে ধীরে স্থির হয়ে উঠছে। তবে সমস্যা একটাই, আগের মতো দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে কাজ করতে পারে না সে। শরীরটা কেমন যেনো সারাক্ষণ বিশ্রামের আকুতি জানায়। অলসতা নয়, বরং ক্লান্তি যেনো তার সমগ্র দেহটাকে নিজের অধিকারে নিয়ে নিয়েছে। অল্পতেই ঘুম এসে চোখের পাতাকে ভারী করে তোলে। অথচ এখানে বসে আরাম করার মতো অবকাশ তার নেই। আগের মতো নিশ্চিন্তে শুয়ে, বসে খেয়ে দিন কাটানোর সুযোগটুকুও আর নেই ইনায়ার। পেট চালাতে হলে অর্থের প্রয়োজন।আর অর্থের জন্য প্রয়োজন কাজের।
তাই নিজের সমস্ত ক্লান্তিকে উপেক্ষা করেই কাজ করে যাচ্ছে সে। যতটুকু সম্ভব হাতে টাকা জমাচ্ছে। নিজের প্রয়োজনের তালিকাটাও ছোট করে এনেছে অনেকখানি। অপ্রয়োজনীয় কোনো জিনিস কেনা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রতিটি পয়সা হিসেব করে ব্যয় করে সে। কারণ সামনে যে পথটা, সেটি কেবল তার একার নয়। তার সঙ্গে আরও একটি ক্ষুদ্র প্রাণের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে। এর মধ্যেই একটি ভালো কোডিংয়ের কাজ হাতে এসেছে। কাজটা সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারলে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতে আসবে। কাজটা পাওয়ার পেছনেও যার অবদান সবচেয়ে বেশি, সে হলো আয়াশ। এই একটি বিষয়ে আয়াশের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ ইনায়া। আয়াশই প্রথম তাকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শেখার কথা বলেছিল। নিজের ঘরে বসেই যাতে কাজ করতে পারে, সেই পথটুকু দেখিয়েছিল সে। শুধু পরামর্শ দিয়েই থেমে থাকেনি, নিজ উদ্যোগে তাকে একটি কোর্সে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল। ধীরে ধীরে সেই কোর্স সম্পূর্ণ করেছে ইনায়া। তারপর শুরু হয়েছিল টুকটাক কাজের পথচলা। প্রথমদিকে তেমন কোনো সাড়া পায়নি। অনেকবার কাজের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে, অনেকবার আশাহতও হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে সেই হতাশার মেঘ সরতে শুরু করলো।
কাজ আসতে লাগলো। প্রথমদিকে বড়ো অঙ্কের কোনো কাজ তার হাতে আসেনি। ছোট ছোট কাজই ছিল তার সম্বল। কিন্তু প্রতিটি কাজকেই নিজের সর্বোচ্চ যত্ন আর নিষ্ঠা দিয়ে সম্পন্ন করেছে সে। আর সেই কাজের মানই ধীরে ধীরে তাকে পরিচিত করে তুলেছে ক্লায়েন্টদের কাছে।
একটি কাজের পর আরেকটি কাজ। ছোট কাজের পর তুলনামূলক বড়ো কাজ। এভাবেই ধীরে ধীরে নিজের জন্য একটি পথ তৈরি করে নিয়েছে ইনায়া। আজ অবশ্য শরীরটা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ দুর্বল লাগছে। শরীরের প্রতিটা অস্থিসন্ধিতে যেনো ক্লান্তির ভার জমে আছে। তবুও আজ সাইবার ক্যাফেতে যেতেই হবে। আগামীকাল কাজটা জমা দেওয়ার কথা। সময় হাতে খুব বেশি নেই। তাই দুর্বল শরীরটাকে কোনো রকমে বিছানা থেকে তুলে নিলো ইনায়া। ধীর হাতে বোরখাটা পরে নিলো। এই মুহূর্তে ঘরে আর কেউ নেই। নিঃসঙ্গ কক্ষটিতে নিজের অস্তিত্বটুকুই যেনো একমাত্র সঙ্গী।
কোনো রকমে নিজেকে প্রস্তুত করে দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সে। হাঁটতে গিয়েই বুঝলো, আজ শরীরটা সত্যিই সায় দিচ্ছে না। প্রতিটি পদক্ষেপেই ক্লান্তি যেনো পায়ের সঙ্গে পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। অবশেষে আর হাঁটার সাহস হলো না। একটা রিকশায় উঠে বসলো ইনায়া।
চাকা ঘুরতে শুরু করলো অচেনা শহরের ব্যস্ত রাস্তায়। চারপাশে ছুটে চলা মানুষ, যানবাহনের কোলাহল, অপরিচিত মুখের ভিড়, সবকিছুর মাঝেও ইনায়া যেনো নিজের ভেতরেই আবদ্ধ হয়ে রইলো। নতুন শহরে তার জীবনটা এখন মোটামুটি নিজের গতিতে এগিয়ে চলছে।
হ্যাঁ, ফেলে আসা মানুষগুলোর কথা বড্ড মনে পড়ে।
কখনো কোনো পরিচিত স্মৃতি হঠাৎ বুকের ভেতর এসে আঘাত করে। কখনো অকারণে মনে হয়, যদি সবকিছু অন্যরকম হতো! কিন্তু সেই ভাবনাগুলোর কোনো উত্তর নেই। কিছু করারও নেই। ফেলে আসা জীবনের দুয়ার তো আর ইচ্ছেমতো খুলে ফিরে যাওয়া যায় না। তাই স্মৃতিগুলোকে বুকের গভীরে চাপা দিয়েই নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে ইনায়াকে। এইভাবেই সময় পার করতে হবে।
এইভাবেই, নিজের জন্য নয়, নিজের ভেতরে বেড়ে ওঠা ক্ষুদ্র প্রাণটির জন্যও।
[ বড় পর্ব দিয়েছি সো সবাই বড়ো বড়ো গঠনমূলক কমেন্ট করবেন, আর সবাই রিয়েক্ট করবেন। পড়ে খালি চলে যাবেন না।]
#চলবে