26/08/2026
আমার মনে হয় এই কাজটি করলে দারুণ "মজার" কিছু জিনিস হবে!
এই কাজটি বলতে ভিডিওর ক্যাপশনে যে লেখা আছে,
"ভুল #সিকিৎসায় মারা গেলে ভয়ংকর শাস্তি হবে ডাক্তারের" সেটার কথা বলছিলাম।
কি কি #মজা হবে আসেন একটা তালিকা করিঃ
মজা ১। 🚧
হাসপাতাল থেকে রেফারের পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়বে।
- আমার হাসপাতালে একটি মাসের হিসাব দেই। রেজিস্টারের তথ্য ও DHIS-2 Data অনুযায়ী, আমার হাসপাতালে কোন একটি মাসে মোট ৪৬ হাজার ৮৭ জন রোগীকে সেবা দেওয়া হয়।
- এর মধ্যে মাত্র ২৫৩ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়। নিকটবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ ছিলো।
- শতকরা হিসেব করলে ০.৫% রোগীকে রেফার করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০০ জন রোগী আসলে মাত্র ১ জনকে রেফার করা হয়েছিলো। ১৯৯ জনই সেবা পেয়েছেন এই হাসপাতাল থেকেই।
- ২৫৩ জনের মধ্যে জরুরী বিভাগ থেকে রেফার করা হয়েছিলো মাত্র ৫৪ জনকে। বাকি ১৯৯ জন অন্তঃবিভাগে কিছুটা হলেও চিকিৎসা সেবা পেয়েছে, পরে চিকিৎসকের পরামর্শে বা নিজেদের ইচ্ছায় তারা রেফার্ড হয়েছেন।
- তাহলে জরুরী বিভাগ থেকে রেফার হয়েছেন ০.১১ % রোগী।
- এবার আসুন মজায়, চিকিৎসক যখন বুঝবেন চিকিৎসা প্রদান করলেই সেটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, অথবা মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে না পারলে "ভয়ংকর শাস্তি" হবে, অথবা ফেসবুকের মানুষের বিচারে কোন চিকিৎসা যদি "ভুল" বলে মনে হয়, তখন চিকিৎসক আর চিকিৎসা সেবা দিবেন না। রোগীকে ভর্তিও দিবেন না। জ্বর, ঠান্ডা-কাশি, পাতলা পায়খানার রোগীও রেফার করে দিবেন তিনি।
মজা ২। 🚧
- জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের কাজের চাপ কমে আসবে। কারণ বিপুল রোগীকে সেবা দেওয়ার পরও যখন মানুষ অভিযোগ করে যে "রোগী আসলেই আপনারা রেফার করে দেন", তখন চিকিৎসকরা মনোবল হারিয়ে ফেলে এবং সেবার মানসিকতা হারিয়ে ফেলে, এই ভিত্তিহীন অভিযোগ কেই সত্য প্রমাণে অনুপ্রাণিত হবেন।
- যে হাসপাতাল মাসে ৪৬,০০০ রোগীকে সেবা দিয়েছে, সেই হাসপাতালকে ফেসবুক বুদ্ধিজীবীরা আদর করে "রেফার হাসপাতাল" নামেও ডাকে। এই ৪৬,০০০ মানুষকে কোন ভূত এসে সেবা দিলো কে জানে! (তদন্ত কমিটি হওয়া প্রয়োজন না?)
মজা ৩। 🚧
- ঢাকা শহরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গুলোতে চিকিৎসকরা আর থাকতে চাইবেন না। কারণ সেখানে কাজের চাপ বেড়ে যাবে। তখন চিকিৎসকরা খুঁজে খুঁজে "রেফার হাসপাতালে" পোস্টিং নিবেন। কারণ এতোদিন কাজ করে যা বেতন পেতেন, এখন অল্প পরিশ্রমে রেফার করে একই বেতন পাবেন।
মজা ৪। 🚧
- সবচেয়ে বেশী বিপদে পরবেন কিছু সেলিব্রিটি মানুষ, কতিপয় রাজনৈতিক পাতি নেতা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর অথবা যারাই হাসপাতালে এলে মোবাইল হাতে নিয়ে ভিডিও করা শুরু করেন, তারা। কারণ এই শ্রেনীর মানুষেরা চিকিৎসা কাজে কিভাবে বাঁধা প্রদান করেন, সেটি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ভালো করে জানেন।
- আপনি হাসপাতালে এসে ভিডিও করা শুরু করলেই দেখবেন চিকিৎসক নিজেও কেঁদে কেটে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছেন।
- চিকিৎসক নিজেই কেঁদে কেঁদে বলে উঠবেন "গায়েজ, আপনারা এই ভিডিওটা বেশি বেশি শিয়ার দিবেন। আপনারা শিয়ার দিলেই কততি-পক্কের নজরে আসবে"।
- নার্সের ভিডিও করলে নার্সও দেখবেন চোখ জলে ছল ছল করে বলছেন, "এই অসহায় মানুষটির জন্য আমরা কিচ্ছু করতে পারলাম না। তাই রোগীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন এই ভাই। ওনার বিকাশ নাম্বারে ... ..."
- মানে কনটেন্ট ক্রিয়েশনের এই পুরো নাটকের কুশীলব হয়ে যাবেন হাসপাতালের সবাই। তারা তখন আর জবাবদিহিতা না করে উলটো অভিযোগকারীর দলের লোক হয়ে নাটকটা চালিয়ে যাবেন। এই সব নাটক আবার এমনিতেও ভালো চলে।
সবচেয়ে বড় মজাটা এখন বলিঃ
মজা ৫। 🚧
দেশের ভূমিহীন, দুস্থ আর আসলেই গরীব শ্রমজীবী মানুষের জন্যই সরকারী হাসপাতাল। এই ৪৬,০০০ রোগীদের মধ্যে কোন কোটিপতি ছিলো না, কোন ঋণখেলাপী ছিলো না। ছিলো আমার দেশের খেটে খাওয়া গ্রামের বা মফস্বলের মানুষ যারা আজো জ্বর হলে ৫ কিলোমিটার হেঁটে আসে ডাক্তার দেখাতে আর ১০০-২০০ টাকার ঔষধ নিতে।
নতুন নতুন আইন আর নতুন নতুন ভিডিও করে আপনি আমাদের দেশের সেই সব গরীব মানুষগুলোর সুলভ মূল্যে বা প্রায় বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা নেওয়ার রাস্তাটা বন্ধ করলেন।
করেন, কোন সমস্যা নাই। ফেসবুকে সবাই গরীবের পাশে থাকলেও বাস্তবে এই দেশে আসলে গরীবের পাশে কেউ নাই। আমরা ডাক্তাররা ছিলাম অল্প স্বল্প। আপনারা চাইলে তাও থাকবো না।
কঠিন কঠিন আইন করেন। প্রতি বছর করেন। মজা না পাইলে সংশোধনী অর্ডিন্যান্স করেন। তাও ডাক্তারদেরকে ছাইড়েন না। কারণ আইন দিয়েই আমাদেরকে সেবা দিতে বাধ্য করবেন এটাই আমরা চাই! আমাদের শাস্তি হওয়া দরকার আছে!
একটা শেষ কথা বলতে ইচ্ছে হলো। জানি না কে কিভাবে নিবেন।
"একজন চিকিৎসক তার রোগীর প্রতি অবহেলা করেছেন কী না, তা শুধু জানেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা। তিনি ছাড়া আর কারো এটা জানার সুযোগ নাই, জ্ঞান নাই আর ক্ষমতাও নাই।" কথাটাও আমার না। আপনারা যে দেশে চিকিৎসা নিয়ে সুখ পান, সেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একজন জেষ্ঠ্য বিচারপতি এই কথাটা বলেছিলেন।
দেখেন যেইটা ভালো মনে করেন! 😞
©️~রাজীব দে সরকার