16/09/2026
"মানুষ না বাঁচলে জরায়ু দিয়ে কি করুম স্যার?"—কাঁদতে কাঁদতে এমনটাই বলছিলেন রোগীর স্বামী।
মহিলা ২৭ সপ্তাহের গর্ভবতী। কিন্তু হঠাৎ মাসিকের রাস্তা দিয়ে রক্তপাত হচ্ছিলো।
প্রথমে একটা প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলো। কিন্তু অবস্থা খারাপ দেখে রোগীকে মুগদা মেডিকেল কলেজে রেফার করা হয়।
তখন বাজে প্রায় দুপুর ২:৩০। সিনিয়র ম্যাডামরা বের হয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রোগী আসার সাথে সাথেই আমাদের গাইনীর ট্রেইনী আপুরা দেখে রোগীর অবস্থা খারাপ। Central placenta previa. অর্থাৎ গর্ভফুল একেবারে জরায়ুর মুখে অবস্থিত। বাচ্চা নরমাল ডেলিভারি হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে গর্ভফুল দিয়ে।
সাথে সাথেই সিনিয়র ম্যাডামদের জানানো হয়। সিজারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। ইমিডিয়েটলি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়। সিনিয়র ৪ জন ম্যাডাম বাড়ি যাওয়া বাদ দিয়ে অপারেশন রুমে চলে গেলেন।
এই ধরনের অপারেশনের জটিলতা অনেক। একদিকে বাচ্চা মাত্র ২৭+ সপ্তাহ। এতো ছোট বাচ্চাকে বাঁচানো টাফ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাঁচানো যায় ই না। তার উপর গর্ভফুল এসে জরায়ুর মুখে ঢেকে ফেলেছে। সুতরাং গর্ভফুল ছাড়ানোর সময় অনেক বেশি পরিমাণ রক্তপাত হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রোগী মারাও যেতে পারে।
সবকিছু রোগীর স্বামীকে বুঝিয়ে বলা হলো, পারমিশন নেওয়া হলো। আমরা আগে থেকেই ICU কল লিখে রাখলাম, ৬-৭ ব্যাগ রক্ত রেডি করে রাখতে বললাম।
অবস্থা খারাপ দেখে আমি ২ বার ICU তে গেছি খোঁজ নিতে যে বেড খালি আছে কিনা। ৬ তলার ICU তে খালি নাই, ৩ তালার ICU তে খালি নাই, ইমারজেন্সির OESC ICU তেও খালি নাই। সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছি নিজে সরাসরি গিয়ে।
রোগীর লোকজন ব্লাড ব্যাংকে গিয়ে কিভাবে কি করবে বুঝতেছে না। পরে ম্যাডাম আমাকে বললো তুমি ৩ তালায় ব্লাড ব্যাংকে গিয়ে কথা বলে আসো দ্রুত যেন রক্তের ব্যবস্থা করে দেয়, গেলাম ব্লাড ব্যাংকে। ব্লাড ব্যাংকের স্টাফ দের সবকিছু বলে আসলাম যে ইমারজেন্সি ব্লাড যেনো টেনে দেওয়া হয়। তারাও সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেছে দ্রুত রক্ত টেনে দেয়ার জন্য।
এরপর আমি উপরে আসলাম। ম্যাডামরা প্লাজমাসল দিয়ে অপারেশন শুরু করলেন আল্লাহ্'র নাম নিয়ে। ৪ জন সিনিয়র ম্যাডাম, ২ জন রেজিস্ট্রার ম্যাডাম—টোটাল ৬ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে একজন অভিজ্ঞ এ্যানেসথেসিয়া বা অজ্ঞানের ডাক্তার।
আর বাইরে রোগীর লোকের সাথে যোগাযোগ, রক্ত ম্যানেজ, ICU এসব ম্যানেজের জন্য অপারেশন রুমের বাইরে আমরা ২ জন ডাক্তার।
দৌড়াদৌড়ি করতে করতে শেষ। তার উপর দুপুরে খাওয়ার সময়ও হয়নি, তখন বাজে বিকাল ৪ টা, সকালে ১ টা সিঙ্গারা খেয়েছিলাম কেবলমাত্র।
রোগীর স্বামীকে কল দিয়ে বারবার খোজ নিচ্ছি রক্ত জোগাড় হইছে কিনা।
এরপর হঠাৎ নার্স কোলে করে কাপড় প্যাঁচানো বাচ্চা কে নিয়ে বের হলো। দেখতে সুন্দর, তাকাচ্ছে কতো সুন্দর। কান্না ও করছে, শ্বাস নিচ্ছে। কিন্তু বাচ্চার ওজন অনেক কম। সাধারণত ২৮ সপ্তাহের আগে বাচ্চা শ্বাস নিতে না পারার কারণে মারা যায়। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে এই বাচ্চার বয়স প্রায়ই ২৮ সপ্তাহ এবং শ্বাস ও নিচ্ছে।
নানীকে বাচ্চা দিয়ে শিশু বিভাগে পাঠায়ে দেওয়া হলো। জানি না আল্লাহ্ বাচ্চাটার কপালে কি লিখছে। আমরা যে পরিমাণ কষ্ট করেছি, দোয়া করেছি, সেই কষ্টের ওসিলায় আল্লাহ্ বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে দিও।
এরপর আবার অপারেশন রুমের কাছে ফিরে এলাম, মায়ের রক্তক্ষরণ বেশি হচ্ছে। ম্যাডামরা রোগীর জীবন বাচাতে শেষ পর্যন্ত জরায়ু কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন।
এতোক্ষণ স্বামী ব্লাড ম্যানেজ করতে ব্যস্ত ছিলো। কল করলাম। স্বামী ব্লাড ব্যাংক থেকে অপারেশন রুমের সামনে আসলো। বললাম "ভাই, আপনার বাচ্চা কে শিশু বিভাগে পাঠিয়েছি। কিন্তু আপনার স্ত্রীর রক্তপাত হচ্ছে। স্ত্রীর জীবন বাচাতে জরায়ু কেটে ফেলতে হচ্ছে।"
"স্যার, মানুষ না বাঁচলে জরায়ু দিয়ে কি করবো স্যার?"
কাঁদতে কাঁদতে স্বামী এটাই উত্তর দিলো আমাকে। কথাটা শুনে নিজেও শান্ত থাকতে পারলাম না। উনাকে স্বান্তনা দিয়ে চলে আসলাম আবার অপারেশন রুমে।
বিকাল ৫ ট বেজে গেছে। ৩ ব্যাগ রক্ত অলরেডি রোগীকে দেওয়া হয়ে গেছে অপারেশন টেবিলে।
অনেক কষ্টের পর ম্যামরা জরায়ু কেটে ফেলতে এবং রক্তপাত বন্ধ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু প্রেশার বারবার কমে যাচ্ছিল এ্যানেসথেশিয়ার স্যারও আপ্রাণ চেষ্টা করেন। সবশেষে অপারেশন শেষ হয়।
রোগীকে পোস্ট-অপারেটিভ রুমে শিফট করা হয়। রোগীকে ফলোআপ দিয়ে আসলাম রাত ৮ টায়। আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছে রোগী এখন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে আল্লাহ্ উনাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ্ হয়তো চাননি বাচ্চা টা মা হারা হয়ে যাক, স্বামী টা স্ত্রী হারা হয়ে যাক।
পরে বাচ্চার খোজ নিলাম। বাচ্চা ও ভালো আছে। এটা আসলে আমাদের কাছেও অবিশ্বাস্য লাগছে। ২৭+ সপ্তাহের বাচ্চা বাঁচে কম। তবে আল্লাহর ইচ্ছায় মিরাকেল ঘটেছে হয়তো। সবই আল্লাহর ইচ্ছা।
আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি এবং করে থাকি। অপারেশন শেষ করে সেই ম্যাডামরা ৬ টার দিকে বাড়িতে গেছেন। অথচ তাদের ডিউটি টাইম ছিলো ২:৩০ পর্যন্ত। সকালে ১০ মিনিট লেটে আসলে মিডিয়ায় চলে যায়, অথচ ডিউটি টাইমের বাইরে ৪/৫ ঘন্টা ডিউটি করে, এটা মিডিয়ায় যাবে না।
অনেকে বলে সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা ভালো হয় না। অথচ আমি দেখেছি আমাদের মেডিকেলে আমরা কতো ভালো ভাবে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি।
ICU এর জন্য আমরা নিজেরা ডাক্তাররা দৌড়াচ্ছি,ব্লাড ম্যানেজ করতে ব্লাড ব্যাংকে দৌড়াচ্ছি। আর্জেন্ট রোগী হলে নিজে সাথে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আল্ট্রা করায়ে আনতেছি। এরপরও ফেসবুকে লোকজন বলে আমরা কসাই।😀
~ডাঃ মেহেদী হাসান সাগর
C