07/05/2026
মহান মে দিবস: শ্রম, ন্যায়, ইতিহাস ও মানবমর্যাদার অনন্ত মহাকাব্য।
প্রভাতের প্রথম রৌদ্ররেখা যখন ধরণীর বুকে নেমে এসে শ্রমিকের ঘামে ভেজা কপালে স্বর্ণাভ দীপ্তি ছড়িয়ে দেয়, তখন সেই আলো কেবল একটি দিনের সূচনা নয় সে আলো ইতিহাসের, সে আলো আত্মত্যাগের, সে আলো মানবমর্যাদার পুনর্জাগরণের। মহান মে দিবস সেই আলোকোজ্জ্বল দিন, যেখানে সময় থমকে দাঁড়িয়ে শোনে শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, প্রতিবাদ, আর অবিনশ্বর বিজয়ের মহাকাব্য।
শ্রম এই ক্ষুদ্র শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সভ্যতার সর্ববৃহৎ মহিমা। মানবজাতির প্রতিটি অর্জন, প্রতিটি উন্নয়ন, প্রতিটি স্থাপত্য, প্রতিটি অগ্রগতি সবই যেন শ্রমের পবিত্র স্পর্শে প্রাণ পায়। অথচ ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়ে এই শ্রমই ছিল অবহেলিত, এই শ্রমিকই ছিল বঞ্চিত, এই ঘামই ছিল অবমূল্যায়িত।
উনবিংশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সময়ে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শিল্পনগরীগুলোতে শ্রমিকজীবন ছিল এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ, কোনো নির্ধারিত বিশ্রাম নেই, কর্মস্থলে নেই নিরাপত্তা, নেই ন্যায্য মজুরি মানুষ যেন তখন যন্ত্রেরই এক সম্প্রসারিত রূপ। এই অমানবিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে মানবিক চেতনা যখন আর নীরব থাকতে পারল না, তখনই ইতিহাসে আবির্ভূত হয় এক মহাসংগ্রাম।
১৮৮৬ সালের ১ মে শিকাগোর রাজপথে শ্রমিকরা উচ্চারণ করেছিল এক অনন্ত মানবাধিকার মন্ত্র “Eight hours for work, eight hours for rest, eight hours for what we will.”
এই স্লোগান শুধু একটি দাবির ভাষা ছিল না, এটি ছিল মানুষের জীবনের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের আহ্বান, ছিল মানবমর্যাদার পুনঃপ্রতিষ্ঠার শপথ।
৪ মে, হে মার্কেট স্কোয়ারে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ যখন রক্তাক্ত সংঘর্ষে রূপ নেয়, তখন ইতিহাস তার এক ভয়াবহ কিন্তু গৌরবময় অধ্যায় রচনা করে। বিস্ফোরণ, গুলিবর্ষণ, আর্তনাদ সবকিছুর মাঝেও শ্রমিকের দাবি স্তব্ধ হয়নি। বরং সেই রক্তস্রোতই বিশ্বমানবতার চেতনাকে জাগিয়ে তোলে। পরবর্তীতে শ্রমিকনেতাদের মৃত্যুদণ্ড ইতিহাসের বুকে এক করুণ কিন্তু অনুপ্রেরণাদায়ী স্মারক হয়ে রয়ে যায়।
১৮৮৯ সালে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে, এই দিনটি হয়ে ওঠে বিশ্বব্যাপী শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক। ইতিহাসের এই অগ্নিপর্ব আমাদের শিখিয়েছে অধিকার কখনো অনুগ্রহে আসে না, তা অর্জন করতে হয় সংগ্রামের আগুনে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শ্রমের ইতিহাস এক গভীর তাৎপর্য বহন করে। এই দেশের কৃষিজীবী মানুষ, গার্মেন্টস খাতের শ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, পরিবহনকর্মী তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই গড়ে উঠেছে আমাদের অর্থনীতির ভিত। পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে নগরীর অট্টালিকা সবই যেন শ্রমিকের নীরব আত্মত্যাগের জীবন্ত দলিল।
তবে বাস্তবতার নির্মম সত্য এই যে, শ্রমিকের অধিকার এখনও সর্বাংশে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ন্যায্য মজুরি, কর্মস্থলের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এসব প্রশ্ন আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত) শ্রমিকের অধিকার রক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো প্রদান করলেও, এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনও একটি চলমান চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) শ্রমিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে চারটি মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করেছে সংগঠনের স্বাধীনতা, জোরপূর্বক শ্রমের বিলোপ, শিশুশ্রমের অবসান, এবং বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ। এই নীতিগুলো কেবল আইনগত কাঠামো নয়,এগুলো মানবতার মৌলিক ভিত্তি।
ইসলাম শ্রমকে কেবল জীবিকার উপায় হিসেবে নয়, বরং ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন “আর মানুষ তাই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে।” (সূরা আন-নাজম: ৩৯)
অন্যত্র বলা হয়েছে হয়েছে “তোমরা মানুষের হক নষ্ট করো না এবং পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করো না।” (সূরা আশ-শু’আরা: ১৮৩)
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণীতে শ্রমিকের অধিকার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে “শ্রমিকের মজুরি তার ঘাম শুকানোর আগেই পরিশোধ করো।” (ইবনে মাজাহ)
এবং “তোমাদের কর্মচারীরা তোমাদের ভাই, তোমরা যা খাও, তাদেরও তা খাওয়াও, যা পরিধান কর, তাদেরও তা পরিধান করাও।” (সহিহ বুখারি)
এই বাণীগুলো আমাদের শেখায় শ্রমিকের প্রতি ন্যায় করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়,এটি ঈমানের অংশ, এটি নৈতিকতার পরম প্রকাশ।
বিশ্বমানবতার মনীষীরাও শ্রমের মাহাত্ম্যকে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন Abraham Lincon এর মতে "Labor is the superior of capital, and deserves much the higher consideration.”
Martin Luther King Jr. এর মতে “All labor that uplifts humanity has dignity and importance.”
Sophocles এর মতে “Without labor, nothing prospers.”
এই উক্তিগুলো যেন এক সুরে বলে শ্রমই সভ্যতার প্রাণ, শ্রমিকই উন্নয়নের স্থপতি।
আইনের দৃষ্টিতে, শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা একটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। সংবিধানের মৌলিক নীতিতে সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সমতা ও মানবমর্যাদার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আইন তখনই জীবন্ত হয়, যখন তা মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়,যখন শ্রমিক তার প্রাপ্য মজুরি পায়, যখন সে নিরাপদ কর্মপরিবেশে কাজ করতে পারে, যখন তার কণ্ঠস্বর শোনা হয়।
মে দিবস তাই কেবল স্মৃতিচারণ নয়,এটি এক জীবন্ত আহ্বান। এটি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে আমরা কি সত্যিই শ্রমের মর্যাদা দিতে পেরেছি?আমরা কি ন্যায়বিচারকে বাস্তবতায় রূপ দিতে পেরেছি?
এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক...
শ্রমিকের অধিকার হবে অবিচ্ছেদ্য,ন্যায়বিচার হবে সর্বজনীন,মানবমর্যাদা হবে অখণ্ড।
আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে শ্রমিকের ঘাম হবে সম্মানের অলংকার, যেখানে তার কণ্ঠস্বর হবে ন্যায়ের প্রতিধ্বনি, যেখানে উন্নয়ন হবে মানবিকতার সঙ্গে সমান্তরাল।
তখনই একদিন, ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে লেখা হবে..
এই দেশ কেবল উন্নয়নের নয়,এই দেশ ন্যায়ের,এই দেশ কেবল অগ্রগতির নয়,এই দেশ মানবতার,এই দেশ শ্রমিকের, এই দেশ মানুষের।
মহান মে দিবস তাই এক অনন্ত শপথ..
শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার,
মানবতার বন্ধন সুদৃঢ় করার,
এবং ন্যায়ভিত্তিক এক বিশ্ব গড়ার।
এই প্রত্যয়ে, মহান মে দিবস হয়ে উঠুক আমাদের চেতনার দীপশিখা,আমাদের মানবিকতার শ্রেষ্ঠ অভিব্যক্তি, এবং আমাদের ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা।
লেখকঃ
মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
আইনজীবী
জেলা ও দায়রা জজ আদালত চট্টগ্রাম।