08/06/2026
হক্কানী আলেম চেনার উপায়
ইসলামে সঠিক পথপ্রদর্শক বা হক্কানী আলেম চেনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দ্বীনের সঠিক বুঝ, আমল ও হিদায়াত অনেকাংশে নির্ভর করে সঠিক আলেমদের সান্নিধ্য ও অনুসরণের ওপর। তাই কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনের বাণীর আলোকে হক্কানী আলেমের কিছু বৈশিষ্ট্য জানা জরুরি।
১. কুরআন ও সুন্নাহর দৃঢ় অনুসরণ
হক্কানী আলেমের প্রথম পরিচয় হলো, তিনি কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরবেন এবং মানুষকে সেই পথেই আহ্বান করবেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ﴾
"তোমরা কোনো বিষয়ে মতভেদ করলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।"
(সূরা আন-নিসা ৪:৫৯)
তাঁর বক্তব্য, ফতোয়া ও দাওয়াত হবে দলিলনির্ভর; ব্যক্তিগত মত, দল বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক নয়।
২. ইলম অনুযায়ী আমল করেন
তিনি যা শিক্ষা দেন, নিজেও তা পালন করার চেষ্টা করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ﴾
"তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও, আর নিজেদেরকে ভুলে যাও?"
(সূরা আল-বাকারা ২:৪৪)
সালাফগণ বলতেন:
اَلْعِلْمُ يَهْتِفُ بِالْعَمَلِ، فَإِنْ أَجَابَهُ وَإِلَّا ارْتَحَلَ
"ইলম আমলকে আহ্বান করে; আমল সাড়া দিলে ইলম থাকে, অন্যথায় চলে যায়।"
৩. আল্লাহভীতি ও তাকওয়া
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ﴾
"আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমগণই তাঁকে যথাযথ ভয় করে।"
(সূরা ফাতির ৩৫:২৮)
হক্কানী আলেমের সান্নিধ্যে গেলে আল্লাহর স্মরণ বৃদ্ধি পায়, গুনাহ থেকে বাঁচার আগ্রহ জন্মায় এবং আখিরাতের চিন্তা জাগ্রত হয়।
৪. দুনিয়াবিমুখতা ও ইখলাস
তারা দ্বীনকে দুনিয়া অর্জনের মাধ্যম বানান না। পদ, অর্থ, খ্যাতি বা মানুষের প্রশংসার জন্য দ্বীনের কথা বলেন না।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অর্জনীয় ইলম কেবল দুনিয়ার স্বার্থে শিক্ষা করে, সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।"
(সুনান আবু দাউদ, ৩৬৬৪)
৫. নম্রতা ও বিনয়
প্রকৃত আলেম অহংকারী হন না। তিনি নিজের ভুল স্বীকার করতে জানেন এবং ‘আমি সব জানি’ এমন মনোভাব পোষণ করেন না।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
كَفَى بِالْمَرْءِ عِلْمًا أَنْ يَخْشَى اللَّهَ
"মানুষের আলেম হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে আল্লাহকে ভয় করে।"
৬. উম্মতের কল্যাণকামী ও হিকমতপূর্ণ
তিনি মানুষকে গালাগালি, অপমান বা অহেতুক বিতর্কের মাধ্যমে নয়; বরং হিকমত, দয়া ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করেন।
আল্লাহ বলেন:
﴿ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ﴾
"আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।"
(সূরা আন-নাহল ১৬:১২৫)
৭. সালাফে সালেহীনের পথের অনুসারী
তিনি সাহাবা, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন এবং উম্মতের নির্ভরযোগ্য ইমামদের সম্মান করেন এবং তাদের বুঝ অনুযায়ী দ্বীনকে বুঝতে চেষ্টা করেন।
তাঁর কাছে নতুন মতবাদ বা অভিনব চিন্তার চেয়ে কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফের পথ অধিক মূল্যবান।
৮. সত্য কথা বলতে সাহসী
তিনি মানুষের সন্তুষ্টির জন্য হক গোপন করেন না এবং ভয়ভীতির কারণে দ্বীনের বিধান পরিবর্তন করেন না।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ حَقٍّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ
"সর্বোত্তম জিহাদ হলো জালিম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা।"
(সুনান আবু দাউদ, ৪৩৪৪)
মুহাম্মদ ইবনে সিরিন রহিমাহুল্লাহ বলেন:
إِنَّ هَذَا الْعِلْمَ دِينٌ، فَانْظُرُوا عَمَّنْ تَأْخُذُونَ دِينَكُمْ
"নিশ্চয়ই এই ইলম হলো দ্বীন। অতএব তোমরা লক্ষ্য করো, কার কাছ থেকে তোমরা তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করছ।"
(সহীহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা)
হক্কানী আলেম চেনার সংক্ষিপ্ত সোনালী সূত্র
যে আলেমের কাছে গেলে—
কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসা বাড়ে,
আল্লাহভীতি বৃদ্ধি পায়,
গুনাহের প্রতি ঘৃণা জন্মায়,
আখিরাতের চিন্তা জাগ্রত হয়,
ইখলাস ও তাকওয়ার গুরুত্ব অনুভূত হয়,
এবং সালাফে সালেহীনের পথের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়,
তাহলে আশা করা যায় তিনি হক্কানী আলেমদের অন্তর্ভুক্ত।
আর যে ব্যক্তি মানুষকে নিজের দিকে, দল বা ব্যক্তিপূজার দিকে আহ্বান করে; কুরআন-সুন্নাহর চেয়ে ব্যক্তিগত মতকে প্রাধান্য দেয়; দুনিয়ার স্বার্থে দ্বীনের কথা পরিবর্তন করে— তার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত।
আলী ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন:
اِعْرِفِ الْحَقَّ تَعْرِفْ أَهْلَهُ
"হককে চিনে নাও, তাহলে হকের অনুসারীদেরও চিনতে পারবে।"
অতএব, প্রথমে কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফের মানদণ্ড জানুন; তারপর সেই মানদণ্ডে মানুষকে যাচাই করুন। এটাই হক্কানী আলেম চেনার সবচেয়ে নিরাপদ ও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: হক্কানী আলেমদের মধ্যে শরীয়তের ভারসাম্যপূর্ণ আমল থাকবে। ধরুন উনি অন্য একটি আমলের কারণে সালাতের তাকবির উলার আমল ছেড়ে দিবেন না। শরীয়তের একটি বিষয় জোর দিতে গিয়ে অন্য বিষয়কে উপেক্ষা করবেন না।