01/09/2025
দুষ্টু বুড়ো এবং অদৃশ্য স্যুপ
একদা এক ছোট্ট গ্রামে, যেখানে সবাই সবাইকে চিনত, সেখানে বাস করত এক বুড়ো মানুষ, তার নাম ছিল গোবিন্দ। গোবিন্দর ছিল অদ্ভুত এক শখ—তিনি মানুষকে বোকা বানাতে খুব ভালোবাসতেন। তবে তার বোকা বানানোর কায়দাটা ছিল বেশ মজার, কেউ রাগ করত না, বরং হাসত।
একদিন গোবিন্দ তার পুরনো চালের বস্তা থেকে ছেঁড়া কিছু কাপড় বের করে আনলেন। তিনি সেগুলোকে সুন্দর করে সেলাই করে একটি ঝোলা তৈরি করলেন। এরপর সেই ঝোলার মধ্যে কয়েকটি নুড়ি পাথর এবং কিছু শুকনো পাতা ভরে দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, “আমি এমন এক জাদু স্যুপ বানাবো, যা পৃথিবীর সেরা খাবার।”
গ্রামের সবাই তার কথা শুনে হাসাহাসি শুরু করল। কিন্তু গোবিন্দ ছিলেন নাছোড়বান্দা। তিনি সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে বললেন, “আমার এই জাদু স্যুপ শুধু তারাই দেখতে পাবে, যারা সৎ এবং বুদ্ধিমান। যারা অসৎ এবং বোকা, তারা এই স্যুপ দেখতে পাবে না।”
এই কথা শুনে গ্রামের মানুষ বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। কেউ যদি স্যুপ দেখতে না পায়, তাহলে তো সবাই তাকে বোকা বলবে! তাই, সবাই গোবিন্দর কথা মেনে নিলো।
গোবিন্দ বড় একটি হাঁড়ি নিলেন। তাতে নুড়ি পাথর এবং শুকনো পাতাগুলো ঢেলে দিলেন। এরপর সবাইকে হাঁড়ির চারপাশে জড়ো হতে বললেন। তিনি একটা একটা করে উপাদান যোগ করতে লাগলেন, আর সবাইকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, “তোমরা কি দেখছো?”
গ্রামের প্রথম ব্যক্তি, একজন ধনী বণিক, হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “আহ! গোবিন্দ দা, কী অপূর্ব রঙ! এর সুবাস তো মন কেড়ে নিচ্ছে।” আসলে তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না, কিন্তু বোকা সাজার ভয়ে মিথ্যে বললেন।
এরপর এক কৃষক বললেন, “এর মধ্যে তো সবজির টুকরো ভাসছে। কী সুন্দর দেখাচ্ছে!” আসলে তার চোখ তখন হাঁড়ির খালি গর্ত খুঁজছিল।
এমন করে গ্রামের সবাই একে একে এসে স্যুপের গুণগান করতে লাগল। কেউ বলল, “বাহ! এতে তো মাশরুম আছে।” আরেকজন বলল, “আহ, এই স্যুপ খেলে তো শরীরের সব ব্যথা দূর হয়ে যাবে।” আসলে সবাই এক অদৃশ্য স্যুপের প্রশংসা করছিল, যার অস্তিত্ব শুধু গোবিন্দর মনেই ছিল।
হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে থেকে একটি ছোট ছেলে, তার নাম ছিল বাবলু, সে হাত তুলে বলল, “গোবিন্দ দা, আমি তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না।”
বাবলুর এই কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। গোবিন্দ মুচকি হেসে বললেন, “বাবলু, তুমি কিছুই দেখতে পাচ্ছো না?”
বাবলু বলল, “না, এখানে তো শুধু নুড়ি আর পাতা!”
এই কথা শুনে সবাই লজ্জায় লাল হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, গোবিন্দ তাদের সাথে মজা করছিল। সবাই হাসতে শুরু করল। গোবিন্দও হাসতে হাসতে বললেন, “আসলে জাদুটা স্যুপে ছিল না, জাদুটা ছিল তোমাদের মনে! তোমরা বোকা সাজার ভয়ে নিজেরাই নিজেদের বোকা বানাচ্ছিলে।”
সেইদিন থেকে, গ্রামের মানুষ গোবিন্দকে আর কোনোদিন বোকা বানাতে পারেনি। কারণ তারা বুঝে গিয়েছিল, সততা এবং সরলতা হলো জীবনের সেরা জাদু, যা দিয়ে বোকা বানানো যায় না। গোবিন্দও তার এই দুষ্টুমি ছেড়ে আর কখনও এমন অদ্ভুত কান্ড ঘটাননি, তবে তার এই মজার গল্প গ্রামের প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে ফেরে।