25/01/2024
যুগশ্রেষ্ট মুহাদ্দীস শাইখ আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রঃ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
◈ নাম ও জন্ম এবং বংশপরিচয়
নাম: মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন, পিতার নাম: আলহাজ্ব নূহ। দাদার নাম: নাজাতী। ডাক নাম: আবু আব্দুর রহমান। ইউরোপের মুসলিম অধ্যুষিত দেশ আলবেনিয়ায় তার জন্ম হওয়ায় তাকে আলবানী বলা হয়। তিনি ১৩৩৩ হিজরী মোতাবেক ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে আলবেনিয়ার রাজধানী স্কোডার এ জন্ম গ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল দরিদ্র। কিন্তু দ্বীনদারী ও জ্ঞানার্জন তাদের দরিদ্রতার উপর ছিল বিজয়ী। তার পিতা ছিলেন আলবেনিয়ার একজন বিজ্ঞ আলেম। ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের জন্য মানুষ তার কাছে ছুটে যেত। তিনি সাধ্যানুযায়ী মানুষকে দ্বীনের জ্ঞান দিতেন এবং তাদেরকে দিক নির্দেশনা প্রদান করতেন। তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে শরীয়াহ বিষয়ে শিক্ষকতা করেন।
মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন সিরীয় ইসলামী চিন্তাবিদ, যিনি হাদীস ও ফিক্ব্হ্ শাস্ত্রের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি পেশাগতভাবে একজন ঘড়ি মেরামতকারী ছিলেন এবং এর পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন প্রামাণ্য লেখক ও বক্তা। তিনিই প্রথম সালাফী শব্দটিকে একটি শ্রেণীগত প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি সিরিয়ায় তার খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তার পরিবার ছোটবেলায় স্থানান্তরিত হয়েছিল এবং যেখানে তিনি শিক্ষিত হয়ে ছিলেন।
◈ শিক্ষা জীবন:
দামেস্ক আসার পর আলবানীর বয়স প্রায় নয় বছর হলে তার পিতা তাকে সেখানকার ‘স্কুল অব এইড চ্যারিটি’ নামক একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। সেখানেই তিনি কৃতিত্বের সাথে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন।
প্রচলিত একাডেমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় দ্বীন সম্পর্কে ভালো জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা ছিল না। বিধায় তার পিতা এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজ ছেলের পড়া-শোনার ক্ষেত্রে ভিন্ন দৃষ্টি পোষণ করতেন। এ কারণে, তিনি নিজে সন্তানের জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষা সিলেবাস তৈরি করে তার মাধ্যমে তাকে আল কুরআনুল কারীম, তাজবীদ, নাহু, সরফ এবং হানাফী ফিকাহ ইত্যাদি বিষয় শিক্ষা দিতে লাগলেন। ফিকাহের মধ্যে হানাফী ফিকাহের অন্যতম কিতাব মুখতাসরুল কুদুরী পড়ান। তিনি তার পিতার কাছেই হাফস বিন আসেম এর রেয়াওয়াত অনুযায়ী কুরআনের হিফয সমাপ্ত করেন।
◈ শায়খ আলবানীর শিক্ষকগণ:
ইমাম আলবানীর শিক্ষকের সংখ্যা ছিল হাতেগণা কয়েকজন। তন্মধ্যে:
১) তার পিতা শায়খ আলহাজ্ব নূহ।
২) তার পিতার বন্ধু বিশিষ্ট আলেম শাইখ সাঈদ আল বুরহানীর নিকট কিশোর আলবানী হানাফী ফিকাহের কিতাব মুরাকিল ফালাহ, নাহুর কিতাব শুযূরুয যাহাব এবং আধুনিক যুগের লিখা আরবী সাহিত্য ও ইলমুল বালাগাহর কিছু কিতাব পড়েন।
৩) এর পাশাপাশি তিনি তখনকার দামেস্কের প্রসিদ্ধ আলেম আল্লামা মুহাম্মদ বাহজা আল বাইতারের বিভিন্ন দারসে অংশ গ্রহণ করতেন।
৪) আলবানী রহ. এর আরেকজন শায়খ হলেন আল্লামা রাবিগ আত ত্বব্বাখ। তিনি সিরিয়ার অত্যন্ত বড়মাপের একজন আলেম ছিলেন। তিনি পরিচিত ছিলেন হালাবের আল্লামা হিসেবে। এই শায়খের নিকট তিনি হাদীস পড়েন। অত:পর তিনি আলবানী রহ. কে হাদীসের ইজাযা প্রদান করেন।
আল-আলবানী সহিংসতার পক্ষে সওয়াল করেননি, প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রতি নীরবতা এবং আনুগত্য পছন্দ করতেন।
◈ তার ছাত্রদের মধ্যে বিশিষ্ট কয়েকজন:
শাইখ আলবানী বিভিন্ন দেশ প্রচুর সফর করতেন। যার কারণে তার ছাত্রের সংখ্যাও প্রচুর যারা তার জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কতিপয় ছাত্র হল,
১) আলামা ইহসান ইলাহী যহীর
২) ডক্টর বাসিম ফায়সাল আল জাওয়াবিরাহ
৩) শায়খ হুসাইন বিন আউদাহ আল উয়াইশাহ
৪) আল্লামা শায়খ রবী বিন হাদী আল মাদখালী
৫) শায়খ আলী হাসান আল হালাবী
৬) শায়খ মুকবিল বিন হাদী আল ওয়াদাঈ
৭) শায়খ মাশহুর হাসান আলে সালমান
৮) শায়খ জামীল যাইনূ
এছাড়াও অসংখ্য বড় বড় আলেম রয়েছেন যারা শাইখ আলবানী রাহ. এর সান্বিধ্যে থেকে ইলম অর্জন করেছেন।
◈ কষ্টে ধৈর্য ধারণ ও হিজরত:
১৯৬০ সালের প্রথম দিকে শাইখ সিরিয়া ক্ষমতাসীনদের নজরদারীতে পড়েন যদিও তিনি রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। যা তার সামনে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। তিনি দুবার গ্রেফতার হয়েছেন। প্রথমবার ৬৮ সালের আগে দামেস্কের কেল্লা কারাগারে বন্দি ছিলেন একমাসের জন্য। এটা সেই কারাগার যেখানে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. কে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। ৬৮ সালের যুদ্ধের সময় সিরিয় সরকার সকল রাজবন্দীকে মুক্ত করে দিলে তিনিও মুক্ত হন।
কিন্তু যুদ্ধ আরও কঠিন রূপ ধারণ করলে শাইখকে পুনরায় কারাবরণ করতে হয়। কিন্তু এবার কেল্লা কারাগারে নয় বরং দামেস্কের পূর্ব-উত্তরাঞ্চলের আল হাসাকা কারাগারে। শাইখ এখানে আট মাস অতিবাহিত করেন। কারাগারে অবস্থানের এই আট মাস সময়ে তিনি হাফেয মুনযেরীর লেখা মুখতাসার সহীহ মুসলিম তাহকীক করেন এবং সেখানে অন্যান্য বড় বড় রাজবন্দী ব্যক্তিত্বের সাথে মিলিত হন।
পরবর্তীতে তিনি সিরিয়া ছেড়ে জর্ডানে পাড়ি জমান এবং রাজধানী আম্মানে স্থায়ী ভাবে বসবাস করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন।
◈বাংলায় অনুদিত বইসমূহ :
আপনার হজ্জ শুদ্ধ হচ্ছে কি?
ইলমে হাদীসের গুরুত্ব ও মর্যাদা
ইসলাম প্রচারক ভাই প্রথমে তাওহীদের দাওয়াত দিন
ইসলাম বিরোধী আইন জারীর বিধান ও ফিতনাতুত তাকফীর
ইসলামে হাদীসের গুরুত্ব ও মর্যাদা
ঈদের ছালাত ঈদগাহে পড়তে হবে কেন
কবর ও মাজার সংলগ্ন মাসজিদে ছালাত আদায়ে সতর্ক হোন
তারাবীহ ও ইতিকাফ
দাজ্জাল ! মাসীহ্ দাজ্জালের কিসসা
নবী ছল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম যেভাবে হজ্জ করেছেন
নয়টি প্রশ্নের উত্তর
প্রত্যেক মায্হাবে সুন্নাহ্ বিরোধী ফাতওয়া আজ কেন বিদ্যামান
বাসর রাতের আদর্শ
মৃত্যু রোগ থেকে শুরু করে মৃত ব্যক্তি কেন্দ্রিক মৃত্যের যাবতীয় করনীয় ও বর্জন
রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নামায/সালাত সম্পাদনের পদ্ধতি
সলাতুত তারাবীহ
নারীর পোশাকের রীতি নীতি (জিলবাব আল-মার’আহ আল-মুসলিমাহ)
সিলসালাত আল-হাদীস আস-সহীহাহ্
সিলসালাত আল-হাদীস আয-যঈফাহ্
◈ তাঁর ব্যাপারে আলেমগণের ভূয়সী প্রশংসা:
১) শাইখ মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম রহ.বলেন:
“তিনি ছিলেন সুন্নতের অনুসারী, হকের সাহায্যকারী এবং বাতিল পন্থীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী।”
২) শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রহ. বলেন:
“বর্তমান বিশ্বে আসমানের নিচে আল্লামা মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানীর মত এত বড় হাদীসের আলেম আমি দেখি নি।”
শাইখ বিন বায রহ. এর নিকট এই হাদীসটি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। যে হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ তায়ালা প্রতি একশ বছরের মাথায় এই উম্মতের জন্য এমন একজনকে পাঠাবেন যিনি দ্বীন-ইসলামকে সংস্কার করবেন।” তিনি বলেন: আমার ধারণা, শাইখ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী হলেন এ যুগের মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক। আল্লাহ সব চেয়ে ভাল জানেন।
৩) আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন রহ. বলেন:
“শাইখের সাথে বৈঠকাদীতে বসার পর (যদিও তা কম) যা বুঝতে পেরেছি তা হল: তিনি সন্নাহর প্রতি আমল এবং আমল-আকীদা উভয় ক্ষেত্রেই বিদয়াত উৎখাতে খুবই আগ্রহী। আর তার লিখিত বই-পুস্তক পড়ে তার ব্যাপারে জানতে পারলাম যে, তিনি হাদীসের সনদ ও মতন উভয় ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অধিকারী। এ সকল বই-পুস্তক দ্বারা আল্লাহ তায়ালা অনেক মানুষকে উপকৃত করেছেন-যেভাবে জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে তারা লাভবান হয়েছে তদ্রূপ নীতি নির্ধারণ এবং ইলমে হাদীসের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির ক্ষেত্রেও তারা লাভবান হয়েছেন। এটি মুসলমানদের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। আল হামদুলিল্লাহ। আর ইলমে হাদীসের ক্ষেত্রে তার জ্ঞানগর্ভ গবেষণা সত্যি চমৎকৃত হওয়ার মত।”
◈ আখিরাতের পথে যাত্রা:
আল্লামা আলবানী রহ. এই নশ্বর জগত ছেড়ে আখিরাতের পথে যাত্রা করেন শনিবার, ২২ জুমাদাল আখেরা, ১৪২০ হিজরী, মোতাবেক ২ অক্টোবর, ১৯৯৯ খৃষ্টাব্দ।
মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৮৮ বছর।
যে দিন মারা যান সে দিনই ইশার সালাতের পরে তাকে দাফন দেয়া হয়।
তার নামাযে জানাযার ইমামতি করেন তার ছাত্র শাইখ ইবরাহীম শাকরাহ। জানাযায় তার ছেলেরা, আত্মীয়-স্বজন, ছাত্র, বন্ধু-বান্ধব ও সাধারণ মানুষ সহ প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ অংশ গ্রহণ করেন।
লাশ দাফন করা হয় উমানের রাজধানী আল হামলান নামীয় পাহাড়ে নিজ বাড়ি সংলগ্ন পারিবারিক গোরস্থানে।
(আল্লাহ তাআলা শাইখ আলবানীকে অবরিত রহমত বর্ষণে সিক্ত করুন। আমীন)