19/06/2026
ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে যত গল্প লেখা হয়, তার প্রায় সবই একটা প্যাটার্ন মেনে চলে — নায়ক, গোল, ট্রফি, উদযাপন। কিন্তু বিশ্বকাপের ৯২ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে একটা দ্বিতীয় ধারার গল্প পাওয়া যায়, যেটা স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না। এই গল্পের মূল চরিত্র ট্রফি না, বরং সেই ক্ষমতা যারা এই টুর্নামেন্টটাকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে, এবং সেই মানুষেরা যারা এর মূল্য চুকিয়েছে, প্রায়ই নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে।
এই লেখাটা সেই দ্বিতীয় ধারা নিয়ে। ১৯৩৪ থেকে ২০২২, প্রায় এক শতাব্দী জুড়ে দেখা যাবে কীভাবে একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট বারবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, এবং কীভাবে সাধারণ মানুষ — খেলোয়াড়, দর্শক, শ্রমিক — তার মূল্য দিয়েছে।
১৯৩৪ ও ১৯৩৮: মুসোলিনির দুটো ট্রফি
ইতালি যখন ১৯৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায়, তখন বেনিতো মুসোলিনি ক্ষমতায় বসে গেছেন প্রায় এক দশক। ইতিহাসবিদরা বলেন, ফিফার তখনকার সভাপতি জুল রিমে নিজেই পরে আক্ষেপ করেছিলেন যে টুর্নামেন্টটা ফিফার মনে হয়নি, মনে হয়েছিল ফ্যাসিস্ট পার্টির অনুষ্ঠান।
এই টুর্নামেন্ট নিয়ে যে অভিযোগটা সবচেয়ে বেশি টিকে আছে, সেটা সুইডিশ রেফারি ইভান একলিন্ডকে নিয়ে। সেমিফাইনালে ইতালি বনাম অস্ট্রিয়া ম্যাচের ঠিক আগের রাতে মুসোলিনি একলিন্ডের সাথে দেখা করেছিলেন বলে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। পরদিন ম্যাচে অস্ট্রিয়ান গোলরক্ষককে বল হাতে রাখা অবস্থায় নিজের গোলেই ধাক্কা দিয়ে ফেলার পরও গোলটা বহাল রাখা হয়, আর ইতালি ১-০ গোলে জেতে। ফাইনালেও একলিন্ডকেই রেফারি করা হয় — ফুটবল ইতিহাসে এমন পুনরাবৃত্তি আর কখনো হয়নি। সেই ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়ার দুটো স্পষ্ট পেনাল্টির দাবি বাতিল হয়ে যায়, আর ইতালি অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। ইতালীয় ফুটবল ঐতিহাসিক মার্কো ইম্পিলিয়া পরে বলেছিলেন, মুসোলিনির সরাসরি সংযোগ প্রমাণ করা না গেলেও সুইডিশ ও ইতালীয় ক্রীড়া কর্মকর্তাদের মধ্যে একটা মিলিত স্বার্থের প্রমাণ মেলে।
চার বছর পর, ১৯৩৮ সালে ফ্রান্সে, ইতালির খেলোয়াড়রা মার্সেইয়ের মাঠে কালো জার্সি পরে নামেন — ফ্যাসিস্টদের রং — এবং মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ফ্যাসিস্ট স্যালুট দেন। গ্যালারির তীব্র দুয়োর মধ্যেও কোচ ভিত্তোরিও পোজো খেলোয়াড়দের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাত নামাতে নিষেধ করতে, যতক্ষণ না গ্যালারি নিজে থেমে যায়। ইতালি সেই বিশ্বকাপও জিতে নেয়, মুসোলিনির পরপর দুটো রাজনৈতিক বিজয়।
১৯৫০: মারাকানাজু এবং একজন মানুষের ৫০ বছরের সাজা
১৯৫০ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপ আয়োজন করে এমন আত্মবিশ্বাসের সাথে যে রিও'র সংবাদপত্র ম্যাচের দিন সকালেই ব্রাজিলকে "বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন" ঘোষণা করে ছেপে দেয়। মারাকানা স্টেডিয়ামে দুই লাখেরও বেশি মানুষের সামনে ব্রাজিলের দরকার ছিল শুধু একটা ড্র। ৭৯ মিনিটে উরুগুয়ের আলসিদেস গির্জা একটা শট নেন যেটা ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক মোয়াসির বারবোসাকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। উরুগুয়ে ২-১ গোলে জিতে যায়। এই হারকে ব্রাজিলে ডাকা হয় মারাকানাজু — "মারাকানার আঘাত।"
বারবোসা সেই টুর্নামেন্টে সাংবাদিকদের ভোটে সেরা গোলরক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন, তবু সেই একটা মুহূর্ত তার বাকি জীবনটা গ্রাস করে নেয়। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন তাকে আর জাতীয় দলে নিয়মিত ডাকেনি। ১৯৬৩ সালে তিনি মারাকানার পুরনো গোলপোস্ট কিনে এনে নিজের বাড়িতে পুড়িয়ে ফেলেন। ১৯৯৩ সালে, ৪৩ বছর পরও, তিনি যখন জাতীয় দলের ক্যাম্পে শুভেচ্ছা জানাতে যান, তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি — বলা হয়েছিল তিনি অপয়া। বারবোসা নিজেই একবার বলেছিলেন, ব্রাজিলে সবচেয়ে বড় অপরাধের সাজা ৩০ বছর, কিন্তু তিনি এমন একটা অপরাধের সাজা পেয়েছেন ৫০ বছর ধরে, যেটা তিনি করেননি। সাংবাদিকরা পরে যেটা লক্ষ্য করেছেন, সেটা হলো — সেই দলের যে কালো খেলোয়াড়রা ছিলেন (বারবোসা, বিগোদ, জুভেনাল), দোষটা তাদের ওপরই সবচেয়ে বেশি পড়েছিল। ২০০০ সালে দারিদ্র্যের মধ্যে বারবোসা মারা যান।
১৯৭৮: ট্রফি থেকে ১১০০ মিটার দূরে
আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা, জেনারেল হোর্হে রাফায়েল বিদেলার নেতৃত্বে, ১৯৭৮ বিশ্বকাপকে নিজেদের ভাবমূর্তি পরিষ্কার করার একটা বৈশ্বিক জনসংযোগ অভিযান বানিয়ে ফেলে। সেই সময় দেশজুড়ে চলছিল "ডার্টি ওয়ার" — মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে প্রায় ৩০,০০০ মানুষ "নিখোঁজ" হয়ে যান, যাদের অনেকেই ছিলেন ছাত্র, সাংবাদিক, ইউনিয়ন নেতা, শিল্পী।
বুয়েনস আয়ার্সের রিভার প্লেট স্টেডিয়াম থেকে মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে ছিল এসমা — নৌবাহিনীর মেকানিক স্কুল, যেটা প্রকৃতপক্ষে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় গোপন বন্দিশালা ও নির্যাতন কেন্দ্র। ঐতিহাসিকদের হিসাবে আনুমানিক পাঁচ হাজার মানুষ সেই দরজা দিয়ে ঢুকেছিল, ফিরেছিল মাত্র সামান্য কয়েকজন। ফাইনালের দিন, যখন স্টেডিয়াম আনন্দে ফেটে পড়ছিল, এসমার বন্দিরা তাদের নির্যাতকদের সাথে বসেই খেলা দেখেছিল — কেউ কেউ পরে বলেছেন, রাস্তায় টহল দেওয়া সৈন্যরা তাদের দেখিয়েছিল যে কেউ তাদের কথা ভাবে না।
প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে, প্লাজা দে মায়োতে কয়েকজন মা হাঁটতেন, মাথায় সাদা স্কার্ফ, হাতে নিখোঁজ সন্তানের ছবি — আদালতের আদেশ এড়াতে চক্রাকারে হাঁটতেন, কারণ দুজনের বেশি একসাথে দাঁড়ানো নিষিদ্ধ ছিল। ফাইনালে আর্জেন্টিনা নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতে। বিদেলা ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে হাসেন। বহু বছর পর আর্জেন্টিনার সেই দলের গোলরক্ষক উবালদো ফিয়োল বলেছিলেন, অনেকের কাছে ১৯৭৮ মানে ৩০ হাজার নিখোঁজ মানুষ, কিন্তু খেলোয়াড়রা কাউকে নির্যাতন বা হত্যা করেননি — তারা শুধু দেশকে কিছুটা আনন্দ দিতে চেয়েছিলেন।
১৯৮৬: একটা গোল, একটা যুদ্ধের স্মৃতি
১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেন ফকল্যান্ড দ্বীপ (আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস) নিয়ে যুদ্ধ করে, যেখানে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা মারা যান, তাদের অনেকেই ছিলেন কিশোর বয়সী। চার বছর পর, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ডের।
দিয়েগো মারাদোনা ৫১ মিনিটে হাত দিয়ে বল ঠেলে গোল করেন, যা রেফারি বা লাইন্সম্যান কেউ দেখতে পাননি। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, গোলটা "একটু মারাদোনার মাথা দিয়ে, একটু ঈশ্বরের হাত দিয়ে" — যা থেকে আসে বিখ্যাত নাম "হ্যান্ড অফ গড।" বছরের পর বছর পরে তিনি স্বীকার করেন, এটা ছিল মালভিনাসের জন্য "প্রতীকী প্রতিশোধ।" মারাদোনা নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, খেলার আগে তারা সবাই বলেছিলেন ফুটবলের সাথে যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু আসলে তারা জানতেন বহু আর্জেন্টাইন কিশোর সেখানে মারা গিয়েছিল, আর এটাই ছিল তাদের প্রতিশোধ।
চার মিনিট পরেই মারাদোনা একা বল নিয়ে পাঁচজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে যে গোলটা করেন, সেটা ফুটবল ইতিহাসে "শতাব্দীর সেরা গোল" নামে পরিচিত। একই ম্যাচে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকে ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত প্রতারণা এবং সবচেয়ে প্রশংসিত প্রতিভা — দুটোই একই রাজনৈতিক আবেগ থেকে জন্ম নেওয়া।
১৯৯৪: একটা আত্মঘাতী গোল এবং দশ দিন
১৯৯৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়া দলকে অনেকে ফাইনাল খেলার সম্ভাব্য দল বলে মনে করেছিল — পেলে নিজেও এই কথা বলেছিলেন। কিন্তু দেশের ভেতরে তখন মাদক কার্টেলের যুদ্ধ তীব্র, মেদেইনের হত্যার হার ছিল প্রতি লাখে ৩৮০ জন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ২৭ বছর বয়সী ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার একটা ক্রস ঠেকাতে গিয়ে নিজের জালেই বল ঠেলে দেন। কলম্বিয়া হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। পরিবার তাকে কিছুদিন ইউরোপে থেকে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল, কিন্তু এসকোবার ফিরে আসেন মেদেইনে, বলেছিলেন তিনি কোনো অপরাধ করেননি, কোথাও যাবেন না।
ফিরে আসার দশ দিন পর, এক রাতে নাইটক্লাবের বাইরে গ্যালোন ভাইদের একটা দল — যারা কলম্বিয়ার ম্যাচে বাজি হেরেছিল বলে জানা যায় — তাকে নিয়ে কথা বলার সময় বিতণ্ডা শুরু হয়। তাদের একজন গাড়ি চালক উমবের্তো কাস্ত্রো এসকোবারকে ছয় গুলি করে মারেন, প্রতিটা গুলির সাথে চিৎকার করে বলেন "গোল।" কাস্ত্রো পরে স্বীকার করে ৪৩ বছরের সাজা পান, ১১ বছর পর মুক্তি পান। মেদেইনে একটা স্টেডিয়ামের নাম রাখা হয় এসতাদিও আন্দ্রেস এসকোবার।
২০০৬: যে গল্প কেউ মনে রাখে না
জিদানের মাথা দিয়ে গুঁতো মারার ঘটনা ২০০৬ ফাইনালের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত হয়ে আছে, কিন্তু সেই বিশ্বকাপের একটা অংশ অনেকেরই অজানা। জার্মান গোলরক্ষক রবার্ট এনকে, যিনি ছিলেন মূল গোলরক্ষক ইয়েন্স লেমানের ব্যাকআপ, পুরো টুর্নামেন্ট গ্যালারিতে বসেছিলেন। তিনি সদ্য বাবা হয়েছিলেন — মেয়ে লারার জন্ম থেকেই হার্টে সমস্যা ছিল। বিশ্বকাপের পর লারা মাত্র দু'বছর বয়সে মারা যায়। এনকে এই ক্ষতি কোনোদিন কাটিয়ে উঠতে পারেননি, এবং ২০০৯ সালে ৩২ বছর বয়সে একটা ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে যান। ফুটবল মাঠে যা দেখা যায়, সেটাই সবসময় সবচেয়ে বড় গল্প হয় না।
২০২২: যাদের নাম স্কোরবোর্ডে আসে না
কাতার, জনসংখ্যা মাত্র ৩০ লাখের একটা দেশ, ২০১০ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের ভোট পায়। পরের ১২ বছরে যে ২২ জন ফিফা কর্মকর্তা সেই ভোট দিয়েছিলেন, তাদের ১৬ জনের বিরুদ্ধেই ঘুষ বা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
সাতটা স্টেডিয়াম, মেট্রো, হোটেল — সবকিছু নতুন করে বানাতে হয়েছিল, আর এই কাজ করেছিলেন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কেনিয়া, ফিলিপাইনের অভিবাসী শ্রমিকরা, অনেকেই দালালকে কয়েক হাজার ডলার ঋণ দিয়ে বা গ্রামের জমি বন্ধক রেখে এসেছিলেন। কাতারের "কাফালা" নিয়োগ ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তা শ্রমিকের পাসপোর্ট রেখে দিতে পারতেন, যার ফলে নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া দেশ ছাড়া বা চাকরি বদলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত।
২০২১ সালে গার্ডিয়ানের একটা তদন্তে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই পাঁচটা দেশ থেকে আসা অন্তত ৬,৫০০ অভিবাসী শ্রমিক কাতারে মারা গেছেন। এই সংখ্যাটা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে — এটা ছিল সব কারণে হওয়া মোট মৃত্যুর হিসাব, সরাসরি বিশ্বকাপ নির্মাণের সাথে যুক্ত না হলেও। কাতারের কর্মকর্তারা পরে স্বীকার করেন বিশ্বকাপ প্রকল্পে সরাসরি মৃত্যু সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০ এর মধ্যে, যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই সংখ্যাও কম দেখানো বলে মনে করে। সংখ্যা নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, এই সত্যটা অনস্বীকার্য — যারা স্টেডিয়াম বানিয়েছেন, তাদের কেউ কেউ সেই স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার সুযোগটাও পাননি।
২০২৬: যাদের ম্যাচে নামার আগেই থামিয়ে দেওয়া হলো
২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই একটা প্রশ্ন ঘুরছিল — সবাই কি আসলে এই টুর্নামেন্টে পৌঁছাতে পারবে?
সোমালি রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান আফ্রিকার সবচেয়ে সম্মানিত ম্যাচ অফিশিয়ালদের একজন। ফিফা তাকে বিশ্বকাপে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য বেছে নিয়েছিল, এবং তিনি হতে যাচ্ছিলেন এই টুর্নামেন্টে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম সোমালি রেফারি। কিন্তু বৈধ ভিসা থাকার পরও তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফিফা এক বিবৃতিতে শুধু বলেছিল, "হোস্ট দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়ার ব্যাপারে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।" আরতান নিজে শুধু লিখেছিলেন, তিনি ফুটবল পরিবারের শুভেচ্ছাবার্তার জন্য কৃতজ্ঞ, এবং সহকর্মীদের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। আফ্রিকার বাকি সব রেফারি ভিসা পেয়ে প্রস্তুতি শিবিরে যোগ দিলেও, তিনি একাই বাইরে থেকে গেলেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় দলের অবস্থাও আলাদা কিছু ছিল না। মেক্সিকোর বিরুদ্ধে উদ্বোধনী ম্যাচের ঠিক আগে দলের ২০ জনেরও বেশি সদস্যের ভিসা প্রক্রিয়াকরণ আটকে থাকায় নির্ধারিত দিনে তারা যাত্রাই করতে পারেনি। দেশের ক্রীড়া মন্ত্রী গেটন ম্যাকেঞ্জি তখন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, এটা "লজ্জাজনক," আর তারা যেন বোকা বনে গেছেন এমন অনুভূতি হচ্ছে। ইরানের ক্ষেত্রে শুধু খেলোয়াড়রা ভিসা পেয়েছিলেন, কিন্তু ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ-সহ দলের প্রায় ডজনখানেক কর্মকর্তা ও সহায়ক স্টাফ ভিসা পাননি। ইরানি ফুটবল ফেডারেশন এটাকে "প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ" বলে অভিযোগ করে, আর কিছুদিনের জন্য বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠান বয়কট করার ঘোষণাও দেয়।
ঘানার থমাস পার্টে কানাডায় প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ার খবরও আসে। সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলোর ভিসা জটিলতার কারণে দলের সাথে প্রশিক্ষণে যোগ দিতে দেরি হয়। আর সেনেগালের অধিনায়ক কালিদু কুলিবালি প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কেন নির্দিষ্টভাবে আফ্রিকান দেশগুলোকে এতটা প্রভাবিত করছে।
কিন্তু এই পুরো নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে কঠিন প্রভাবটা পড়েছিল খেলোয়াড় বা কর্মকর্তাদের ওপর না, পড়েছিল সাধারণ সমর্থকদের ওপর। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সেনেগাল ও আইভরি কোস্টকে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আংশিক তালিকায় যুক্ত করা হয়, ইরান ও হাইতির সাথে যারা আগে থেকেই সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে ছিল। নিয়মে খেলোয়াড়, কোচ ও স্বীকৃত দলীয় কর্মীদের জন্য ছাড় রাখা হয়েছিল, কিন্তু সাধারণ সমর্থকদের জন্য কোনো ছাড় ছিল না। মরক্কোয় আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস দেখতে আসা সেনেগাল সমর্থক জিব্রিল গেয়ে এপি বার্তা সংস্থাকে বলেছিলেন, তিনি বুঝতে পারছেন না কেন একজন প্রেসিডেন্ট চাইবেন নির্দিষ্ট কিছু দেশের দল প্রতিযোগিতায় অংশ নিক, কিন্তু তাদের সমর্থকদের আসতে না দিক — যদি এটাই হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপ আয়োজনে রাজিই হওয়া উচিত ছিল না। সেনেগালের নারী সমর্থকদের একটা দলের প্রধান ফাতু দিয়েদিও বলেছিলেন, তারা সত্যিই অংশ নিতে চান, কিন্তু কীভাবে নেবেন জানেন না — শুধু অপেক্ষা করছেন, যদি কিছু বদলায়।
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক ভুল না। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ২০২৫ সালে ঘোষিত একটা বিস্তৃত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় বিশ থেকে পঁচিশটার বেশি দেশকে আংশিক বা সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে — যার মধ্যে ছিল আফ্রিকার অনেকগুলো দেশ, যেমন অ্যাঙ্গোলা, বেনিন, গাবন, গাম্বিয়া, মালাউই, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া, জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়ে। সরকারের ভাষ্যে এর কারণ ছিল "স্ক্রিনিং ও ভেটিং দুর্বলতা" এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশের ভিসা-ওভারস্টে হারের পরিসংখ্যান। এই যুক্তি যতটাই প্রশাসনিক শোনাক, ফলাফলটা ছিল একতরফা — যে মহাদেশ থেকে বিশ্বকাপের কিছু সবচেয়ে আবেগময় ফুটবল গল্প তৈরি হয়, সেই মহাদেশের সমর্থকরাই নিজেদের দলকে মাঠের ধারে বসে দেখার সুযোগ থেকে সবচেয়ে বেশি বাদ পড়লেন।
নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি একলাইনে এই অস্বস্তিটা ধরেছিলেন — নির্দিষ্ট দেশের সাংবাদিকদের ভিসা বাতিল করা, কোনো দলের কোচের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা, কোনো জাতীয় দলকে একদিনের জন্য একক-দিবস ভিসা দেওয়া — এসবই এই টুর্নামেন্টের আসল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। ৯২ বছর আগে মুসোলিনি বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেছিলেন কাদের ভেতরে রাখা হবে আর কাদের বাইরে, সেটা ঠিক করতে। ২০২৬ সালে প্রশ্নটা একই রকম রয়ে গেছে, কেবল সীমান্তরেখাটা ভিন্ন জায়গায় টানা।
একটা প্যাটার্ন, নব্বই বছর জুড়ে
এই সাতটা গল্প আলাদা মহাদেশের, আলাদা দশকের, আলাদা ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহারের। কিন্তু একসাথে রাখলে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুসোলিনির ইতালি বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেছিল ফ্যাসিজমের জাতীয় গর্বের প্রতীক বানাতে। বিদেলার আর্জেন্টিনা সেটা ব্যবহার করেছিল গণহত্যার ওপর একটা পর্দা টানতে। কাতারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিশ্বকাপ আয়োজনের ব্যয় বহন করতে হয় এমন মানুষদের, যারা কখনো সেই গৌরবের ভাগীদার হতে পারেন না। আর ২০২৬ সালে দেখা যায়, যে টুর্নামেন্টটা সবচেয়ে বেশি গর্ব করে "পৃথিবীকে একসাথে আনার" কথা বলে, সেটাই ঠিক করে দিতে পারে কে আসলে সেই পৃথিবীর অংশ হতে পারবে, আর কে পারবে না।
আর মাঝখানে আছে ব্যক্তিগত মানুষেরা — বারবোসা, এসকোবার, এনকে, আরতান — যাদের একক মুহূর্ত বা একটা সিদ্ধান্ত, যা তাদের নিজের হাতে ছিল না, তাদের জীবনের একটা স্থায়ী চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ফুটবল যখন একটা জাতির আত্মপরিচয়ের সাথে এতটা জড়িয়ে যায়, তখন হারের মূল্য, বা বাদ পড়ার মূল্য, একজন মানুষকে একা বহন করতে হয়, যেটা আসলে এগারো জনের, কখনো কখনো একটা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের।
ট্রফি উঁচু করে ধরার ছবিটা সবাই মনে রাখে। প্রশ্নটা হলো — যারা সেই ছবির ফ্রেমের বাইরে ছিলেন, যাদের মাঠে নামার আগেই থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাদের গল্পগুলো আমরা কতটা মনে রাখি?
সূত্র: এই লেখাটি একাধিক স্বাধীন সংবাদ প্রতিবেদন ও ঐতিহাসিক নথি যাচাই করে লেখা — যার মধ্যে আছে দ্য গার্ডিয়ান, ESPN, History.com, Jacobin, The Ringer, Al Jazeera, NBC News, Vanguard, Front Office Sports, এবং উইকিপিডিয়ার তথ্যসূত্র।