Zihad

Zihad Connecting dots others miss.

খেলায় হারা লজ্জার কিছু না, কিন্তু বেইজ্জতিরও তো একটা লিমিট থাকে!আর্জেন্টিনার পোলাপান ১২০ মিনিট ধইরা স্পেনের পিছে পিছে হ...
20/07/2026

খেলায় হারা লজ্জার কিছু না, কিন্তু বেইজ্জতিরও তো একটা লিমিট থাকে!

আর্জেন্টিনার পোলাপান ১২০ মিনিট ধইরা স্পেনের পিছে পিছে হাঁটলো, ছুটলো, হাঁপাইলো— শেষে বলটার সাথে একটা সেলফিও তুলতে পারলো না! ফাইনাল খেইলা গেলো অথচ বল যে গোল না চারকোনা, নরম না শক্ত— এই বেসিক জিনিসটাই টের পাইলো না।

মুরগির ছানার মতো খালি পিছে পিছে দৌড়াইলো, একটানা দুই ঘণ্টা! এর নাম হার না, এর নাম হইলো পাবলিক প্লেসে বেইজ্জতি হওয়া!

আর মার্তিনেজ, ভাই আমার— বেতন কত পায় জানি না, কিন্তু খাটনি দিলো একদম কামলার মতো, পুরা ১২০ মিনিট এক পাও নড়ে নাই গোলবার থিকা।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হইলো— ফিফার প্রেসিডেন্ট গ্যালারিতে বইসা সব দেখলো, বুঝলোও, তারপরও কোনো ত্রাণ পাঠাইলো না! এখন আর্জেন্টিনার ভক্তরা ভরসা রাখবে কার উপর?😑🤡

20/07/2026

এইটা স্পষ্ট যে বাণিজ্যিক কারণে FIFA আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে ফাইনাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে। কারণ তারা যেসব দলের বিপক্ষে খেলে পরের রাউন্ডগুলোতে গেছে, সেগুলোর সঙ্গে অন্য দিকের দলগুলোর মানের পার্থক্য ছিল আকাশ-পাতাল।

তারপরও সেই সবচেয়ে দুর্বল দলগুলোর বিপক্ষেই ম্যাচ জিততে তাদের জান বের হয়ে গেছে। এমনকি মিশরের কাছেও হেরেছিল... তারপরও কোনোভাবে রেফারি এবং ফিফার অ্যাডভান্টেজ পেয়ে পরের ম্যাচগুলো খেলার সুযোগ পেয়েছে।

তাই আর্জেন্টাইন ফ্যান ভাইদের বলি-- তোমরা ইজিপ্টের সাথেই হেরে গিয়েছিলে। এরপর যতগুলো ম্যাচ খেলেছো... সবই bonus content. ফাউ খেলেছ। DLC ম্যাচ 😭😂

আর আসল কমেডি তো এখন শুরু হয়েছে। 🤡

যে দলের সমর্থকরা ২০১৪ সালে ব্রাজিল জার্মানির কাছে ৭ গোল খাওয়ার পর ২০২৬ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল ফ্যানদের জ্বালিয়ে, নাচানাচি করে, বোলিং করে, হাজার রকমের পচানি দিয়ে এসেছে, একেক দলকে আব্বা ডেকেছে... আজ তারাই আবার আমাদেরকে বলছে- গোল করেছে স্পেন, চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন, হারছে আর্জেন্টিনা.... কিন্তু নাচতেছে অন্য দলের সমর্থনরা। Joke of the Generation.🤡

আর হ্যাঁ আর্জেন্টিনার খেলা দেখলে একটা বিষয় পরিষ্কার যে তাদের টিমের প্লেয়াররা যেমন অসভ্য এবং ম্যাক্সিমাম সাপোর্টাররাও.... থাক আর না বলি🤧।। খেলায় না পারলে আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠে। আর একেক সময় একেক রকমের কমেডি তো আছেই।🤮

But Good luck, Leo. Respect you, legend.⚽

18/07/2026

Comparison kills confidence.
তোমার timeline আলাদা, তোমার যুদ্ধ আলাদা, তোমার ভাগ্য আলাদা—এবং তোমার জয়ও আলাদা হবে।

So… stay in your lane, keep building, and stop comparing your Chapter 2 with someone else’s Chapter 20. 🖤🔥

17/07/2026

AI tool-এর ভিড়ে কোন কাজের জন্য কোনটা ব্যবহার করবেন বুঝতে পারছেন না? 😵‍💫

এই লিস্টটা Save করে রাখুন—কাজ অনুযায়ী সঠিক AI tool বেছে নিন 👇

১. 🧠 নতুন আইডিয়া দরকার? → ChatGPT

২. 🔍 গভীর Research করতে চান? → Perplexity

৩. 📚 কোনো বিষয় বুঝে শিখতে চান? → NotebookLM

৪. ✍️ লেখালেখি আরও Natural করতে চান? → Claude

৫. 🧑‍💻 AI দিয়ে Code লিখতে চান? → Cursor

৬. ⚡ দ্রুত Code Generate করতে চান? → Claude Code

৭. 🌐 Prompt দিয়ে Website বানাতে চান? → Lovable

৮. 🏗️ Full Website/App বানাতে চান? → Bolt

৯. 🎨 দ্রুত Graphic Design করতে চান? → Canva

১০. 🖼️ AI Image তৈরি করতে চান? → Midjourney

১১. 🎥 Text থেকে AI Video বানাতে চান? → Runway

১২. ✂️ Long Video থেকে Short/Reels বানাতে চান? → OpusClip

১৩. 🎙️ নিজের Voice Clone করতে চান? → ElevenLabs

১৪. 🧍‍♂️ AI Avatar দিয়ে Video বানাতে চান? → HeyGen

১৫. 📝 Meeting-এর Notes Automatically লিখতে চান? → Otter.ai

১৬. 🔄 Repetitive কাজ Automate করতে চান? → n8n

১৭. 📊 Data Analysis করতে চান? → ChatGPT

১৮. 📑 Presentation বানাতে চান? → Gamma

১৯. 🧪 কোনো Product বা Business Idea Validate করতে চান? → Perplexity + ChatGPT

২০. 🚀 নিজের AI-powered Workflow বানাতে চান? → Make

AI-এর যুগে আসল Skill হলো—
শুধু AI ব্যবহার করা নয়,
কোন সমস্যার জন্য কোন AI ব্যবহার করতে হবে—এটা জানা। 🧠⚡

এই পোস্টটা Save করে রাখুন।
আপনার পরিচিত কোনো AI enthusiast থাকলে Share করে দিন। 😊

09/07/2026

ক্লাস টুতে পড়া দুইজন মানুষ জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—বিয়ে করার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে পালিয়েছে। সঙ্গে আবার একজন সহপাঠীকে সাক্ষী হিসেবেও নিয়ে গেছে!

ঘটনাটা কভার করতে সাংবাদিক গেলে দুইজনের একটাই দাবি—
"ওর সাথে বিয়ে না দিলে আমরা মরে যাব।"

আর সম্পর্ক?
সেটাও নাকি এক বছরের! মানে ক্লাস ওয়ানের বেঞ্চ থেকেই ভালোবাসার বীজ বপন হয়েছে! ❤️

আহ, ভালোবাসা! কী নির্মল, কী গভীর, কী ঐতিহাসিক! ভালোবাসা সত্যিই অন্ধ। বয়স, ক্লাস, রিপোর্ট কার্ড—কিছুই মানে না। এমন নিখাদ, অবিনাশী প্রেমের গল্প শুনলে মনটা এক অন্যরকম প্রশান্তি পায়!

কমেন্টে ভিডিওর লিংক দিলাম। এমন মহাকাব্যিক, কিংবদন্তি প্রেমের অভিজ্ঞতা জীবনে অর্জন করতে না পারলেও, অন্তত দর্শক হয়ে ইতিহাসের সাক্ষী থাকুন! 🥹

হুস্টনের স্টেডিয়ামে তখন ৯৫ মিনিট চলছে। স্কোর ১-১। ক্যামেরা যখন জাপানের বেঞ্চে যায়, একটা লোককে দেখা যায় — একদম স্থির। ...
01/07/2026

হুস্টনের স্টেডিয়ামে তখন ৯৫ মিনিট চলছে। স্কোর ১-১। ক্যামেরা যখন জাপানের বেঞ্চে যায়, একটা লোককে দেখা যায় — একদম স্থির। না রাগ, না ভয়, না অস্থিরতা। কয়েক সেকেন্ড পর ব্রাজিল গোল করে ফেলে, পুরো স্টেডিয়াম কাঁপিয়ে দেয়, আর সেই লোকটা তখনও একইরকম দাঁড়িয়ে আছে। কোনো পরিবর্তন নেই মুখে।

এই একটা দৃশ্য আসলে অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়, যদি তুমি খেয়াল করে দেখো।

আমরা সবাই ভাবি, রিয়াকশন মানেই কনফিডেন্স। জোরে কথা বলা মানেই কন্ট্রোল। কিন্তু হাজিমে মোরিয়াসু নামের এই কোচ পুরো উল্টো জিনিস দেখাচ্ছেন — সবচেয়ে বড় চাপের মুহূর্তে সবচেয়ে কম রিয়াক্ট করা মানুষটাই আসলে সবচেয়ে বেশি কন্ট্রোলে থাকে। এটা কোনো accident না, এটা একটা ট্রেইনড হ্যাবিট। যে মানুষ ইমোশনে রিয়াক্ট করে না, সে অবজার্ভ করে। আর যে অবজার্ভ করে, সে ভুল সিদ্ধান্ত কম নেয়।

এই একটা জিনিস তোমার লাইফেও কাজ করে। প্রেশারের মুহূর্তে তোমার প্রথম রিয়াকশনটা প্রায় সবসময় ভুল হয়। রাগ, প্যানিক, ইমপালসিভ ডিসিশন — এগুলো সবই তোমাকে দুর্বল জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। কিন্তু যদি তুমি তিন সেকেন্ড থামতে শেখো, শুধু অবজার্ভ করতে শেখো তুমি রিয়াক্ট করার আগে — তাহলে তোমার ডিসিশন কোয়ালিটি পুরো বদলে যায়। এটা মোটিভেশন না, এটা একটা স্কিল। আর স্কিল প্র্যাকটিস করা যায়।

এবার একটু পেছনে যাই।

জাপান কখনো বিশ্বকাপ জেতেনি। কোয়ার্টার ফাইনালেও যায়নি কখনো। কিন্তু ফুটবল বিশ্লেষকরা যখন কথা বলে কোন জাতি সবচেয়ে সিস্টেমেটিক ভাবে এগোচ্ছে, জাপানের নাম সবার আগে আসে। কেন?

কারণ ওরা রেজাল্ট দিয়ে সিস্টেম বানায়নি। ওরা সিস্টেম দিয়ে রেজাল্ট বানানোর চেষ্টা করেছে। ১৯৯৩ সালে যখন জে-লিগ শুরু হয়, তখন জাপানে প্রফেশনাল ফুটবলের কোনো স্ট্রাকচারই ছিল না। কিন্তু ওরা একটা কাজ ঠিকঠাক করেছিল — বাচ্চাদের প্রথমে শৃঙ্খলা শিখিয়েছে, তারপর স্কিল। কারণ ওরা জানত, স্কিল যেকোনো বয়সে শেখানো যায়, কিন্তু ডিসিপ্লিন যদি ছোটবেলায় গেঁথে না দাও, সেটা পরে কখনো তৈরি হয় না।

এইখানে একটা ট্রিগার পয়েন্ট আছে যেটা আজকের জেনারেশনের সবচেয়ে বেশি দরকার। আমরা শর্টকাটের জেনারেশন। আমরা রেজাল্ট দেখতে চাই এক মাসে। কিন্তু জাপান তিন দশক ধরে একটা প্ল্যান ফলো করেছে যেটার রেজাল্ট হয়তো ওরা নিজেরাও দেখতে পাবে না। ২০১৪ সালে গ্রুপ স্টেজ থেকে বিদায়। ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২ গোলে এগিয়ে থেকেও হার। ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে বিদায়। প্রতিটা হার একটা ডেটা পয়েন্ট হয়ে গেছে, একটা ব্যর্থতা না। এটাই আসল পার্থক্য — ফেইলিওরকে ইমোশন হিসেবে না দেখে ইনফরমেশন হিসেবে দেখা।

তুমি যখন কোনো কাজে ফেল করো, প্রশ্নটা এটা না যে "আমি কেন খারাপ"। প্রশ্নটা হওয়া উচিত "এই ফেইলিওর আমাকে কী ডেটা দিচ্ছে যেটা আমি নেক্সট টাইম ব্যবহার করতে পারি"। জাপান ঠিক এইভাবেই চিন্তা করে। প্রতিটা টুর্নামেন্ট হারের পর ওরা প্রশ্ন করে না "কেন হারলাম", প্রশ্ন করে "কী শিখলাম"।

এবার আসি আসল ম্যাচের কথায়, যেখান থেকে সবচেয়ে বড় লেসনটা পাওয়া যায়।

ব্রাজিলের বিপক্ষে জাপান জানত ওরা ট্যালেন্টে পিছিয়ে। তাই ওরা ট্যালেন্ট দিয়ে লড়েনি, স্ট্রাকচার দিয়ে লড়েছে। পুরো মাঠজুড়ে চাপ না দিয়ে, নির্দিষ্ট মুহূর্তে চাপ দিয়েছে — যখন প্রতিপক্ষ একটু দুর্বল পজিশনে থাকে, ঠিক তখনই। এটাকে বলে সিলেক্টিভ এফোর্ট। সব জায়গায় এনার্জি খরচ না করে, সঠিক জায়গায় এনার্জি খরচ করা। জাপান জানত ব্রাজিলের সাথে ওপেন ফুটবল খেললে হারবে। তাই ওরা একটা জিনিস করেছিল — নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা প্রোটেক্ট করা। মাঝমাঠটা এত টাইট করে বন্ধ করে দিয়েছিল যে ব্রাজিল বাধ্য হয়েছিল বল সাইড দিয়ে খেলাতে।

এইটা তোমার ডেইলি লাইফের সবচেয়ে বড় মিসিং স্কিল। আমরা সারাদিন এনার্জি খরচ করি সব জায়গায় — সব নোটিফিকেশনে রিয়াক্ট করি, সব কমেন্টে রিপ্লাই দিই, সব সুযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ি। জাপান দেখিয়ে দিল, যে জেতে সে সবচেয়ে বেশি খাটে না, যে জেতে সে সবচেয়ে সঠিক মুহূর্তে খাটে।

আর সেই ম্যাচের প্রথম গোলটা এসেছিল ঠিক এই স্ট্র্যাটেজি থেকেই। কাইশু সানো একটা আলগা বল কেড়ে নিয়ে প্রায় চল্লিশ গজ একা দৌড়ে গোল করে। এটা কোনো লাক না। এটা এমন একটা মুহূর্ত যেটার জন্য পুরো দল নব্বই মিনিট ধরে অপেক্ষা করছিল। প্রস্তুতি ছাড়া সুযোগ আসলেও তুমি সেটা ধরতে পারবে না। সুযোগ সবসময় প্রস্তুত মানুষকেই বেছে নেয়।

কিন্তু এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা আসে দ্বিতীয়ার্ধ থেকে, যেখানে জাপান শেষ পর্যন্ত হেরে যায়।

ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি বিরতিতে বুঝে যান, একই স্ট্র্যাটেজি দিয়ে জাপানকে ভাঙা যাবে না। তাই তিনি পুরো প্ল্যান বদলে ফেলেন। সে অ্যাডজাস্ট করল। মাঝমাঠ দিয়ে ঢোকার বদলে দুই পাশ দিয়ে আক্রমণ, এনদ্রিককে নামিয়ে সরাসরি স্ট্রাইকার বানাল, কুনিয়াকে পেছনে টেনে আনল। এই একটা বদল পুরো টিমের খেলার ধরন বদলে দিল — ভিতর দিয়ে খেলার বদলে সাইড দিয়ে ক্রস, স্লো বিল্ড-আপের বদলে ফাস্ট অ্যাটাক।

এখানে যে জিনিসটা শেখার আছে সেটা "কে ভালো খেলল" এই প্রশ্নের বাইরে। যে জিনিসটা শেখার আছে সেটা হলো — প্ল্যান এ যখন কাজ করে না, তখন ইমোশনাল না হয়ে দ্রুত প্ল্যান বি-তে যাওয়ার ক্ষমতা। বেশিরভাগ মানুষ যখন প্ল্যান এ ফেল করে, তারা একই জিনিস আরও জোরে চেষ্টা করতে থাকে। আনচেলত্তি সেটা করেননি। তিনি পুরো অ্যাপ্রোচটাই বদলে দেন, ইগো ছাড়াই।

আর জাপান শেষ পর্যন্ত হারে কেন? ট্যালেন্টের অভাবে না। এক্সপেরিয়েন্স আর ডেপথের অভাবে। ব্রাজিলের বেঞ্চে এমন খেলোয়াড় ছিল যাদের নামালেই খেলা বদলে যায়। জাপানের হাতে সেই বিকল্প ছিল না। এটা একদিনে তৈরি হয় না। এটা বছরের পর বছর বড় বড় মঞ্চে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হয়। মোরিয়াসু নিজেও ম্যাচ শেষে এটা স্বীকার করেছিলেন — ব্রাজিল আর জাপানের মধ্যে এখনও একটা লেভেল ডিফারেন্স আছে, যদিও সেই গ্যাপ ধীরে ধীরে কমছে।

এইটাই বাস্তবতা। কখনো কখনো তুমি সবকিছু ঠিকঠাক করেও হারবে, শুধু কারণ প্রতিপক্ষের এক্সপেরিয়েন্স লেভেল বেশি। এটা তোমার দোষ না। এটা টাইমলাইনের ব্যাপার। জাপান তিন দশক ধরে এই গ্যাপ কমাচ্ছে, একদিনে না।

ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি সেলিব্রেট করেননি খুব বেশি। কারণ ফুটবল যতটা জেতার খেলা, ততটাই সম্মানের খেলা — এবং জাপান যেভাবে লড়েছে, সেটা সম্মান পাওয়ার যোগ্য ছিল।

আর মোরিয়াসু বলেছিলেন, তার খেলোয়াড়রা সবটুকু দিয়েছে, আর এই ধরনের অভিজ্ঞতাই জাপানি ফুটবলের ভবিষ্যৎ গড়বে।

তো আসল কথা কী দাঁড়ালো?

তুমি যদি রেজাল্ট চাও, শুধু হার্ড ওয়ার্ক দিয়ে হবে না। তোমার দরকার একটা সিস্টেম, রিয়াকশনের বদলে অবজারভেশনের অভ্যাস, এফোর্টকে সঠিক জায়গায় খরচ করার বুদ্ধি, ফেইলিওরকে ডেটা হিসেবে দেখার মানসিকতা, আর প্ল্যান কাজ না করলে ইগো ছাড়া প্ল্যান বদলে ফেলার সাহস। জাপান একটা রাতে এগুলো শেখায়নি। ওরা তিন দশক ধরে এটা প্র্যাকটিস করেছে, একটা ম্যাচের জন্য না, একটা জেনারেশনের জন্য।

হুস্টনের সেই রাতে স্কোরবোর্ডে জাপান হেরেছিল। কিন্তু যে সিস্টেম, যে ধৈর্য, আর যে মানসিকতা ওরা দেখিয়েছিল, সেটা যেকোনো ট্রফির চেয়ে বেশি মূল্যবান একটা লেসন।

— Nur Zihad

তথ্যসূত্র হিসেবে এই লেখায় ব্যবহার করা হয়েছে Reuters (ANI ও The Tribune-এর মাধ্যমে প্রকাশিত মোরিয়াসু ও আনচেলত্তির বক্তব্য), FIFA-র অফিসিয়াল ম্যাচ রিপোর্ট, ESPN আর Al Jazeera-র কভারেজ, CBS Sports-এর লাইভ বিশ্লেষণ, এবং Sports Mole-এর ট্যাকটিক্যাল ব্রেকডাউন।

বিশ্বকাপের ট্রফির নিচে যে অন্ধকারগুলো থাকেপ্রতি চার বছর পর একটা মাস আসে যখন পুরো পৃথিবী একসাথে শ্বাস নেয়। আমরা টিভির সা...
27/06/2026

বিশ্বকাপের ট্রফির নিচে যে অন্ধকারগুলো থাকে

প্রতি চার বছর পর একটা মাস আসে যখন পুরো পৃথিবী একসাথে শ্বাস নেয়। আমরা টিভির সামনে বসি, গোল হলে চিৎকার করি, পতাকা গায়ে জড়িয়ে রাস্তায় নামি। ট্রফিটা যখন কারো হাতে ওঠে, সোনালি কনফেটি উড়তে থাকে, পুরো স্টেডিয়াম একসাথে গর্জন করে ওঠে। এই দৃশ্যটা আমরা সবাই চিনি। কিন্তু একটা জিনিস কখনোই ক্যামেরার ফ্রেমে আসে না — সেই ট্রফিটার ঠিক নিচে, ছায়ার মধ্যে, কে দাঁড়িয়ে আছে। কাকে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে সেই উজ্জ্বল আলোর নিচে।

আজকে এই তিনটা গল্প বলব। আলাদা সময়, আলাদা দেশ, আলাদা ধরনের কষ্ট। কিন্তু পড়তে পড়তে একটা জিনিস খেয়াল করবেন — প্যাটার্নটা কোথাও না কোথাও একই থেকে যায়।

মোয়াসির বারবোসা: যে গোলটা একটা মানুষের পুরো জীবন খেয়ে নিলো

১৯৫০ সাল। মারাকানা স্টেডিয়াম। ব্রাজিল আর উরুগুয়ের মধ্যে বিশ্বকাপ ফাইনাল। সেই সময়ের ফরম্যাটে ব্রাজিলের একটা ড্র করলেই চলতো, এমনকি একটা ড্র মানেই ট্রফি। প্রায় দুই লাখ মানুষ স্টেডিয়ামে, পুরো দেশ ধরে নিয়েছিল এটা শুধু একটা আনুষ্ঠানিকতা। ব্রাজিল তখন এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে আগের দিনই পত্রিকায় উরুগুয়ের বিরুদ্ধে বিজয়ী ব্রাজিল দলের ছবি ছাপা হয়ে গিয়েছিল, খেলাটা হওয়ার আগেই।

মাঠে বারবোসা ছিলেন গোলরক্ষক। খেলার একটা মুহূর্তে উরুগুয়ের গিজা একটা শট নিলেন। বারবোসা ভেবেছিলেন বলটা ক্রস হয়ে আসবে নিয়ার পোস্টের দিকে, তাই সেদিকে একটু সরে গেলেন। কিন্তু বল গেল ফার পোস্টে। গোল। উরুগুয়ে জিতে গেল, আর পুরো ব্রাজিল একসাথে স্তব্ধ হয়ে গেল।

এখন এখানেই গল্পটা শেষ হলে এটা শুধু একটা দুঃখজনক ফাইনাল হতো। কিন্তু আসল গল্প শুরু হলো তার পরে।

বারবোসার পুরো বাকি জীবনটা সেই একটা মুহূর্তের মধ্যে আটকে গেল। ব্রাজিল জাতীয় দলে তিনি আর কখনো নিয়মিত জায়গা পাননি। মানুষ তাকে রাস্তায় চিনতো, কিন্তু সম্মান করে না, করুণা বা ঘৃণা মিশিয়ে দেখতো। ১৯৯৩ সালে, ঘটনার পুরো ৪৩ বছর পর, একদিন তিনি জাতীয় দলের প্র্যাকটিস ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য সহজ — খেলোয়াড়দের সাথে দেখা করা, শুভেচ্ছা জানানো, পুরনো একজন গোলরক্ষক হিসেবে একটু সম্মান নেওয়া। তাকে ভেতরে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছিল, সে দলের জন্য অপয়া, তার উপস্থিতি দলের জন্য খারাপ ফল আনতে পারে।

একজন মানুষ, যার বয়স তখন সাতের কোঠায়, যাকে একটা প্র্যাকটিস সেশনের গেট থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হলো কারণ সে "অপয়া"।

বারবোসা নিজে একবার একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন একটা লাইন, যেটা পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। তার ভাষায় — ব্রাজিলে সবচেয়ে বড় অপরাধের সাজা হয় তিরিশ বছরের জেল। আর তিনি যে অপরাধ করেননি, তার সাজা তিনি ভোগ করছেন পঞ্চাশ বছরের বেশি ধরে।

এখানে আরো একটা স্তর আছে, যেটা না বললে গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেদিন মাঠে এগারোজন খেলোয়াড় ছিলেন, পুরো দলের ভুল ছিল, কোচের সিদ্ধান্তেও প্রশ্ন ছিল। কিন্তু দোষটা গিয়ে পড়লো মূলত কালো খেলোয়াড়দের ঘাড়ে — বারবোসা, বিগোদ, জুভেনাল। তখনকার ব্রাজিল নিজের ভেতরের বর্ণবাদের ইতিহাস থেকে তখনো বের হতে পারেনি। একটা জাতীয় হার যখন আসলো, পুরনো সেই পক্ষপাতিত্বটা আবার ফিরে এলো, শুধু এবার সেটা ফুটবলের জার্সি পরে এসেছিল, যাতে সবাই সেটাকে "খেলার সমালোচনা" বলে চালিয়ে দিতে পারে।

এটাই আসলে সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গাটা। কষ্টটা যখন স্পোর্টসের ভাষায় কথা বলে, তখন সেটাকে খুব সহজে আড়াল করা যায় আসল সমস্যাটা থেকে।

আন্দ্রেস এসকোবার: যে ফেরাটা মৃত্যুতে শেষ হলো

এবার চলুন ১৯৯৪ সালে, আরেকটা মহাদেশে। কলম্বিয়া তখন বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে যাচ্ছে, পেলে নিজেও তাদের চ্যাম্পিয়নশিপের দাবিদার বলেছিলেন। দলে কার্লোস ভালদেরামার মতো তারকা, পুরো জাতি স্বপ্ন দেখছে।

প্রথম ম্যাচে রোমানিয়ার বিরুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ম্যাচটা হয়ে গেল "মাস্ট উইন"। সেই ম্যাচেই আন্দ্রেস এসকোবার, যাকে তার ভদ্র স্বভাবের জন্য "দ্য জেন্টলম্যান" বলা হতো, একটা ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে বলটা নিজের জালেই ঠেলে দিলেন। আত্মঘাতী গোল। কলম্বিয়া হারলো, পরের ম্যাচ জিতলেও পয়েন্টের হিসাবে বিদায় নিতে হলো গ্রুপ পর্ব থেকেই।

দেশে ফেরার আগে তার পরিবার তাকে বলেছিল, কিছুদিনের জন্য ইউরোপে চলে যাও, পরিস্থিতি একটু শান্ত হোক। এসকোবার রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, আমি তো কোনো অপরাধ করিনি, আমি লুকিয়ে থাকব কেন, আমি কলম্বিয়াতেই ফিরব। তিনি দেশে ফিরে একটা পত্রিকায় লেখাও লিখেছিলেন, যেখানে তিনি দেশের মানুষকে বলেছিলেন একসাথে এগিয়ে যেতে, রাগ আর হতাশাকে নিজেদের গ্রাস করতে না দিতে।

ফেরার দশ দিনের মাথায়, মেদেইন শহরের একটা নাইটক্লাবের পার্কিং লটে, রাত তিনটার দিকে, কয়েকজন লোক তাকে ঘিরে ধরে। তারা সেই আত্মঘাতী গোলটা নিয়ে কথা বলছিল, অপমান করছিল। এসকোবার সম্মান চেয়েছিলেন, পাল্টা কিছু বলেছিলেন। তারপর গুলি। ছয়টা গুলি। প্রতিটা গুলির পর খুনি চিৎকার করে বলছিল "গোল!" — যেন এটা একটা খেলার অংশ। হাসপাতালে নেওয়া হলো, কিন্তু পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে তিনি মারা যান। বয়স ছিল মাত্র সাতাশ।

পরে জানা গেল, যারা এই খুনের পেছনে ছিল তারা ছিল মাদক কার্টেলের সাথে যুক্ত, যারা কলম্বিয়ার ম্যাচগুলোতে বড় অঙ্কের বাজি ধরেছিল এবং হেরে গিয়েছিল। তখনকার কলম্বিয়া মাদক কার্টেলের প্রভাবে এমনভাবে ডুবে ছিল যে ফুটবলও তার বাইরে যেতে পারেনি। এসকোবারের শবযাত্রায় প্রায় এক লাখ বিশ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিল। আজও কলম্বিয়ায় তাকে শুধু একজন ফুটবলার হিসেবে নয়, একজন প্রতীক হিসেবে দেখা হয় — একজন মানুষ, যাকে একটা ভুলের জন্য জীবন দিয়ে দাম দিতে হয়েছিল।

এই দুটো গল্পের মধ্যে চুয়াল্লিশ বছরের দূরত্ব, দুটো ভিন্ন মহাদেশ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি। কিন্তু প্যাটার্নটা অবিশ্বাস্যরকম একই। খেলাটা যখন একটা জাতির আত্মসম্মানের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, তখন একটা হারের মূল্য একজন সাধারণ মানুষকে নিজের পুরো জীবন দিয়ে চুকাতে হয়। মাঠে এগারোজন খেলে, কিন্তু দোষটা চাপে একজনের ওপর। উদযাপনের সময় পুরো জাতি, আর ব্যর্থতার সময় একজন বলির পাঁঠা।

কাতার: যাদের হাতে স্টেডিয়াম গড়ে উঠলো, তারা সেই স্টেডিয়ামে কখনো বসতে পারলো না

এবার গল্পটা একটু আলাদা ধরনের। এখানে কোনো একজন তারকা খেলোয়াড়ের গল্প নেই। এখানে আছে হাজার হাজার নাম, যেগুলো আমরা কখনো জানিও না।

২০২২ বিশ্বকাপের আগে কাতারে বিশাল আয়োজন হলো — নতুন নতুন স্টেডিয়াম, বিশাল অবকাঠামো, পুরো দেশ একরকম নতুন করে গড়ে তোলা হলো এই একটা টুর্নামেন্টের জন্য। আর এই কাজটা করেছিল মূলত দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা অভিবাসী শ্রমিকরা — ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা থেকে।

২০২১ সালে গার্ডিয়ানের একটা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই পাঁচটা দেশ থেকে আসা প্রায় ছয় হাজার পাঁচশো অভিবাসী শ্রমিক কাতারে মারা গেছেন। এখানে একটা জিনিস স্পষ্ট করে বলা দরকার, যাতে কেউ ভুল বুঝে আতিরিক্ত প্রচার না করে — এই সংখ্যাটা সব ধরনের মৃত্যুর সম্মিলিত হিসাব, সরাসরি সবগুলো বিশ্বকাপ নির্মাণের সাথে যুক্ত নয়। কাতার সরকার এই সংখ্যা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে, তাদের নিজেদের হিসাবে স্টেডিয়াম নির্মাণে সরাসরি মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক কম।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটা আসে — সংখ্যাটা যত নিচেই নামাই, এমনকি সবচেয়ে কনজারভেটিভ হিসাবেও কয়েকশো মানুষ একটা বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম বানাতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন। এটা কোনো অস্বীকার করার মতো বিষয় না। গরমে কাজ করতে করতে হিট স্ট্রোক, নিরাপত্তার অভাবে দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত কাজের চাপ — এই কারণগুলো বারবার সামনে এসেছে।

আর সবচেয়ে নির্মম সত্যটা হলো এটা — যারা এই স্টেডিয়ামগুলো নিজের হাতে গড়লেন, যাদের শ্রমে এই সৌন্দর্য তৈরি হলো, তারা কখনো সেই স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে একটা ম্যাচ দেখার স্বপ্নও দেখতে পারেননি। তাদের টিকিট কেনার সামর্থ্য ছিল না, তাদের দেশে ফেরার ফ্লাইটের পয়সা জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হতো। তারা শুধু শ্রম দিয়ে গেছেন, আর বিনিময়ে যা পেয়েছেন তা প্রায়শই ছিল অপ্রতুল বেতন, কঠিন পরিবেশ, আর কখনো কখনো জীবন হারানো।

আমরা যখন টিভিতে স্টেডিয়ামের সৌন্দর্য দেখি, ড্রোন শট দেখি, লাইটিং দেখি, আমরা কখনো ভাবি না এই কংক্রিটের প্রতিটা ব্লকের পেছনে কতজন মানুষের ঘাম, কতজনের কষ্ট, আর কতজনের না-ফেরার গল্প জড়িয়ে আছে।

তিনটা গল্প, একটাই প্রশ্ন

এই তিনটা গল্প সম্পূর্ণ আলাদা সময়ের, আলাদা মহাদেশের, আলাদা ধরনের ট্র্যাজেডির। একটা গল্পে একজন গোলরক্ষক, যাকে একটা ভুলের জন্য সারা জীবন একঘরে করে রাখা হয়েছে। একটা গল্পে একজন ডিফেন্ডার, যাকে একটা আত্মঘাতী গোলের জন্য গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। আর একটা গল্পে হাজার হাজার নামহীন মানুষ, যাদের ঘাম আর জীবনের বিনিময়ে একটা টুর্নামেন্টের গ্ল্যামার তৈরি হয়েছে।

কিন্তু এই তিনটা গল্প একসাথে রাখলে একটা প্রশ্ন বারবার মাথায় ঘুরতে থাকে — বিশ্বকাপ যে চমক, যে গর্ব, যে উন্মাদনা আমাদের দেখায়, তার নিচে কতটা মানুষের কষ্ট চাপা পড়ে থাকে, যেটা আমরা কখনো হাইলাইটস রিলে দেখি না, যেটা নিয়ে কখনো কোনো ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হয় না?

আমরা ফাইনালের গোলটা মনে রাখি। আমরা সেই উদযাপনের মুহূর্তটা বছরের পর বছর শেয়ার করি, রিল বানাই, স্ট্যাটাস দিই। কিন্তু সেই গোলরক্ষকের বাকি জীবনটা কে মনে রাখে? সেই হারিয়ে যাওয়া ডিফেন্ডারের পরিবার কীভাবে বেঁচে আছে, কেউ কি জানতে চায়? সেই শ্রমিক, যে নিজের দেশে স্ত্রী-সন্তানের জন্য একটু ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখে কাতারে গিয়েছিল, তার নাম কি কোনো স্টেডিয়ামের গায়ে লেখা আছে?

পরের বিশ্বকাপ যখন আসবে, আমরা সবাই আবার পতাকা গায়ে জড়াবো, পছন্দের দলের জন্য গলা ফাটাবো, রাত জেগে খেলা দেখবো। এটাই হওয়া উচিত, ফুটবলের আনন্দটা সত্যি, সেই উন্মাদনাটাও সত্যি। কিন্তু মাঝে মাঝে, একটা গোলের আনন্দে ভেসে যাওয়ার আগে, একটা মুহূর্ত থামার দরকার আছে। ভাবার দরকার আছে — এই আলোর নিচে আসলে কত মানুষের অন্ধকার লুকিয়ে আছে।

খেলাটা শুধু খেলা না। কখনো কখনো এটা একজন মানুষের পুরো জীবনের দাম।

— Nur Zihad

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান (কাতার অভিবাসী শ্রমিক প্রতিবেদন, ২০২১), উইকিপিডিয়া ও ব্রিটানিকা (আন্দ্রেস এসকোবার), বিভিন্ন ফুটবল ইতিহাস আর্কাইভ (মোয়াসির বারবোসা)

19/06/2026

Attention, Emotion আর Control-এর দুই হাজার বছরের এক পুরনো খেলা

একটা প্রশ্ন মাথায় এসেছিল অনেকদিন আগে, কিন্তু উত্তরটা পুরোপুরি স্পষ্ট হলো একটা পুরনো ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে। প্রশ্নটা সিম্পল— একটা দেশ কেন একটা খেলার পেছনে এত টাকা ঢালে? কেন একজন ফুটবলারের পারফরম্যান্স কোটি মানুষের মুড ঠিক করে দিতে পারে? উত্তরটা ফুটবল মাঠে নেই। উত্তরটা আছে রোমের একটা ধ্বংসস্তূপে, যার বয়স প্রায় দুই হাজার বছর।

কলোসিয়াম যুগ — যখন একটা স্টেডিয়াম ছিল রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

রোমে তখন একটা সংকট তৈরি হচ্ছিল, যেটা আজকের অনেক দেশের গল্পের সাথেই মিলে যায়। শহরের পুরুষ জনসংখ্যার বিশাল একটা অংশের— প্রায় ২৫ থেকে ৪০ শতাংশের— কোনো স্থায়ী কাজ ছিল না। তারা বেঁচে থাকতো রাষ্ট্রের খাদ্যভাতার উপর নির্ভর করে। কাজ নেই, ভবিষ্যৎ নেই, কিন্তু রাগ আর হতাশা প্রতিদিন বাড়ছে। প্রায় দশ লাখ মানুষ— ক্ষুধার্ত, বেকার, আর ক্রমশ বিক্ষুব্ধ।

রোমের শাসকদের সামনে এটা ছিল একটা রাজনৈতিক বোমা। আর এই বোমা নিষ্ক্রিয় করার জন্য তারা যা বেছে নিলো, সেটা কোনো আইন না, কোনো জেল না, কোনো সেনাবাহিনীও না। তারা বানালো একটা স্টেডিয়াম। দৈর্ঘ্যে প্রায় দুটো ফুটবল মাঠের সমান, উচ্চতায় পনেরো তলা ভবনের সমান। কলোসিয়াম।

এটা স্রেফ একটা আর্কিটেকচারাল achievement ছিল না। এটা ছিল একটা সিস্টেম— যা একসাথে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের emotion, attention আর excitement নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো। রোমান একজন কবি প্রায় দুই হাজার বছর আগে এই নীতিটাই লিখে গিয়েছিলেন এক বাক্যে—

“Bread and circuses” — রুটি আর বিনোদন।

মানুষকে খাবার আর বিনোদন দিয়ে রাখো, তারা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সময় পাবে না। গ্ল্যাডিয়েটর ফাইট, বিস্ট হান্ট, রক্তাক্ত স্পেক্টাকল— এসব আয়োজনের পেছনে যে আসল উদ্দেশ্য ছিল, সেটা entertainment না, সেটা ছিল mass attention management। কারণ রোমের শাসকরা একটা জিনিস ভালোভাবেই বুঝে গিয়েছিল— মানুষ যখন emotionally চার্জড থাকে, তখন সে critically think করে কম। আর যখন একজন মানুষ একটা স্পেক্টাকলে ডুবে থাকে, তখন তার চোখে বেকারত্ব, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অসমতা— এসব আর সমস্যা মনে হয় না। কয়েক ঘণ্টার জন্য, সবকিছু ভুলে যাওয়া যায়। আর ক্ষমতার জন্য, কখনো কখনো এই ভুলিয়ে দেওয়া সময়টুকুই যথেষ্ট।

এখানেই একটা গভীর সত্য লুকিয়ে আছে, যেটা রোম বুঝেছিল হাজার বছর আগে— attention is power। যে মানুষের attention দখল করতে পারে, সে তার emotion প্রভাবিত করতে পারে। যে emotion প্রভাবিত করতে পারে, সে decision প্রভাবিত করতে পারে। আর যে মানুষের decision প্রভাবিত করতে পারে, সে শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজের দিকনির্দেশনাও প্রভাবিত করতে পারে। কলোসিয়াম তাই আসলে স্রেফ একটা স্টেডিয়াম ছিল না। এটা ছিল একটা মেশিন।

যা সবচেয়ে বেশি ভাবায়, তা হলো এই সিস্টেমের নিখুঁততা। রোমের শাসকরা কাউকে জোর করে কলোসিয়ামে নিয়ে যায়নি। কেউ বাধ্য হয়ে গ্ল্যাডিয়েটর ফাইট দেখতে যায়নি। মানুষ নিজের ইচ্ছায়, নিজের আনন্দে, লাইন ধরে গিয়েছিল। এটাই সবচেয়ে কার্যকর ধরনের নিয়ন্ত্রণ— যেখানে নিয়ন্ত্রিত মানুষটা নিজেই অনুভব করে যে সে স্বাধীন। কেউ তাকে বলেনি, তুমি ভাবা বন্ধ করো। বরং তাকে এমন কিছু দেওয়া হয়েছিল, যা ভাবার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। আর একটা মানুষ যখন স্বেচ্ছায় একটা স্পেক্টাকলের দিকে ছুটে যায়, তখন তাকে আর কেউ থামানোর প্রয়োজনও বোধ করে না।

আরও একটা জিনিস লক্ষণীয়— কলোসিয়ামে যা ঘটতো, তা সবসময় চরম আবেগের একটা চক্রের ভেতর দিয়ে যেত। কেউ হিরো হয়ে উঠতো এক মুহূর্তে, কেউ সেখানেই প্রাণ হারাতো পরের মুহূর্তে। জয়, পরাজয়, বীরত্ব, মৃত্যু— সবকিছু একসাথে ঘটতো একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, একটা নির্দিষ্ট জায়গায়। মানুষের মনোযোগ একবার যদি এই ধরনের উচ্চ-তীব্রতার আবেগের চক্রে ঢুকে যায়, তাহলে তার পক্ষে সেখান থেকে বের হয়ে এসে দৈনন্দিন বাস্তবতার দিকে ফিরে তাকানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই কারণেই কলোসিয়ামের প্রভাব শুধু সেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো না, বরং তা পরের দিন, এমনকি পরের সপ্তাহের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকতো। কে জিতলো, কে মারা গেলো, কোন গ্ল্যাডিয়েটর কতটা সাহসী ছিল— এসব নিয়ে আলোচনাই হয়ে উঠতো মানুষের সামাজিক জীবনের মূল বিষয়, রাজনীতি বা শাসনব্যবস্থার বদলে।

আধুনিক যুগ — কলোসিয়াম ভাঙেনি, শুধু পোশাক বদলেছে

কলোসিয়ামের ইট-পাথর আজ ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু যে কনসেপ্টটা সেই স্থাপনার পেছনে কাজ করছিল, সেটা আসলে কখনোই শেষ হয়নি। এটা ফিরে এসেছে নতুন রূপে, নতুন নামে। আজকের কলোসিয়াম হলো বিশ্বকাপ, আইপিএল, লা লিগা, সেলিব্রিটি কালচার, আর একটা ননস্টপ entertainment ecosystem— যেটা স্ক্রিনের ভেতরে বাস করে।

রোমান সম্রাটদের কাছে যেমন ছিল গ্ল্যাডিয়েটর, আজকের সিস্টেমের কাছে আছে অ্যাথলিট আর ইনফ্লুয়েন্সার। তখন এরিনা ছিল ফিজিক্যাল, ইট আর কংক্রিটের তৈরি। আজ এরিনা ডিজিটাল— একটা স্ক্রিনের মধ্যে বন্দি, যেটা সবসময় হাতের কাছে থাকে। দুই হাজার বছরের দূরত্ব, কিন্তু operating principle প্রায় একই। মানুষকে জোর করে না, বরং বিনোদনের মাধ্যমে স্বেচ্ছায় তার attention দখল করে রাখা।

আধুনিক যুগের আরেকটা বড় পরিবর্তন হলো হিরো বদলে যাওয়া। একসময় একটা সমাজের হিরো ছিলেন বিজ্ঞানী, দার্শনিক, লেখক, উদ্ভাবক। আজ সেই জায়গাটা নিয়েছে সেলিব্রিটি কালচার। কোটি মানুষ ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই দেখে কোন সেলিব্রিটি কী পরলো, কোন তারকা কী বললো, কে কাকে নিয়ে ডেটিং করছে। এটাই আজকের মিডিয়ার কেন্দ্রবিন্দু।

আর মডার্ন world-এর সবচেয়ে মূল্যবান resource এখন আর অয়েল বা গোল্ড না। সবচেয়ে মূল্যবান resource হলো মানুষের attention। যে attention নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে perception নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যে perception নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে narrative নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আর যে narrative নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে গুরুত্বপূর্ণ একটা বাস্তবতা ঠিক করে দিতে পারে— কোন ইস্যুটা headline হবে, আর কোনটা নিঃশব্দে হারিয়ে যাবে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি বা গভর্নেন্স প্রবলেমের পেছনে।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবর্তনটা ঘটেছে স্কেলে। রোমের কলোসিয়াম একসাথে কয়েক হাজার মানুষকে ধরতে পারতো। আজকের বিশ্বকাপ ফাইনাল একসাথে কয়েকশো কোটি মানুষকে একই মুহূর্তে একই emotion-এর ভেতর বেঁধে ফেলতে পারে। প্রযুক্তি এখানে শুধু একটা মাধ্যম বদলায়নি, এটা স্কেলটাকেই বদলে দিয়েছে। আগে যা ছিল একটা শহরের ঘটনা, আজ তা হয়ে গেছে একটা গ্রহের ঘটনা। একই সময়ে, একই উত্তেজনায়, পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন কোণে বসে থাকা মানুষ একসাথে নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখে, একসাথে চিৎকার করে, একসাথে কাঁদে। এই ধরনের synchronized emotion তৈরি করার ক্ষমতা ইতিহাসে আগে কখনো কোনো সিস্টেমের হাতে ছিল না।

এই synchronization-এর একটা সরাসরি প্রভাব আছে সংবাদ আর তথ্যের জগতে। একটা বড় টুর্নামেন্ট চলাকালীন সময়ে সংবাদমাধ্যমের বেশিরভাগ স্পেস দখল করে নেয় খেলার খবর। অর্থনীতির রিপোর্ট, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সামাজিক আন্দোলন— এসব তখন পেছনের পাতায় চলে যায়, কারণ মানুষের মনোযোগ তখন অন্য কোথাও নিবদ্ধ। এটা কোনো এক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সচেতন চক্রান্ত হতে হবে না, এমনিতেই এমন হয়— কারণ মনোযোগ একটা সীমিত resource, এবং যখন তা একদিকে চলে যায়, তখন অন্যদিকগুলো স্বাভাবিকভাবেই ফাঁকা হয়ে পড়ে।

ফুটবল যুগ — যখন একটা খেলোয়াড় হয়ে যায় একটা জাতির আবেগ
ফুটবল এই গল্পে সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। মেসি, রোনালদো, সাকিব, বিরাট— এরা যখন আর শুধু একজন খেলোয়াড় থাকেন না, তখন তারা হয়ে যান একটা national emotion, একটা identity, আর collective obsession-এর কেন্দ্রবিন্দু। তার সাফল্য তখন নিজের সাফল্যের মতো মনে হয়। তার সমালোচনা তখন ব্যক্তিগত আক্রমণের মতো লাগে। তার পরিচয় তখন নিজের পরিচয়ের একটা অংশ হয়ে যায়।
এই মুহূর্তে একজন মানুষ আর কেবল একজন public figure থাকেন না, তিনি পরিণত হন একটা symbol-এ। আর এখানেই ইতিহাস বারবার একই প্যাটার্ন দেখিয়েছে— যখন একটা সমাজ কোনো celebrity worship-এ এতটা ডুবে যায় যে নিজের real-life সমস্যা, নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের প্রশ্নগুলোকে ভুলে যেতে শুরু করে, ঠিক সেই সময়টাতেই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা কমে যায়।

একটা ম্যাচের রেজাল্ট কখনো কখনো একটা মানুষের মানসিক অবস্থা পুরোপুরি ঠিক করে দেয়। আর্জেন্টিনা হারলে কারো কারো জন্য সেটা একটা ব্যক্তিগত শোকের মতো অনুভূত হয়। নব্বই মিনিট মাঠে দৌড়ানো একজন অ্যাথলিটের পেছনে উড়ে যায় কোটি কোটি ডলার, এমন এক সময়ে যখন পৃথিবীর অনেক বড় বড় সংকট নিঃশব্দে চাপা পড়ে থাকে এই একই headline-এর নিচে। এটা ফুটবলকে দোষ দেওয়ার গল্প না। এটা বোঝার গল্প— কীভাবে একটা সুন্দর খেলা, এক হিসেবে, সেই হাজার বছরের পুরনো pattern-টাকেই আজকের ভাষায় পুনরাবৃত্তি করছে।
ফুটবল villain না। ফুটবল মানুষের ভালোবাসার, আনন্দের, একতার একটা জায়গা। কিন্তু একই সাথে এটা আজকের যুগের সবচেয়ে efficient version— সেই পুরনো human pattern-এর, যেখানে মানুষকে এমন কিছুতে engaged রাখা হয় যা তার নিজের জীবনের চেয়েও বড় মনে হতে শুরু করে।

একটা জিনিস এখানে আলাদা করে বোঝার চেষ্টা করা যায়— কেন ফুটবল এতটা শক্তিশালী একটা মাধ্যম হয়ে উঠলো এই পুরনো প্যাটার্নের জন্য? উত্তরটা হয়তো এর সরলতার মধ্যে। ফুটবলের নিয়ম বোঝার জন্য কোনো বিশেষ শিক্ষার দরকার নেই। একটা বল, দুটো গোলপোস্ট, নব্বই মিনিট। এই সরলতা একে পরিণত করেছে এমন একটা ভাষায়, যা গ্রামের একজন কৃষক আর শহরের একজন ব্যবসায়ী— দুজনেই সমানভাবে বোঝেন, সমানভাবে অনুভব করেন। যে কোনো জিনিস যত বেশি মানুষ একসাথে বুঝতে আর অনুভব করতে পারে, সেটা তত বেশি শক্তিশালী একটা attention-tool হয়ে ওঠে।

এর সাথে যুক্ত হয় পরিচয়ের প্রশ্ন। একটা জাতীয় দল যখন মাঠে নামে, তখন সেটা আর শুধু এগারোজন মানুষের খেলা থাকে না। সেটা হয়ে যায় একটা দেশের, একটা সংস্কৃতির, একটা ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব। এই কারণেই একটা গোল মিস হয়ে যাওয়া, একটা পেনাল্টি miss করা— এসব মুহূর্ত শুধু খেলার মুহূর্ত থাকে না, এগুলো হয়ে যায় সামষ্টিক আবেগের বিস্ফোরণ-বিন্দু। মানুষ তখন কাঁদে, কারণ সে নিজেকে সেই মুহূর্তের ভেতর দেখতে পায়। এই ধরনের গভীর emotional investment তৈরি করার ক্ষমতা আর কোনো কিছুর নেই, যতটা আছে একটা জাতীয় দলের।
শেষ কথা — সিটটা বদলেছে, কলোসিয়াম বদলায়নি

যতই এই ইতিহাস ঘাঁটছিলাম, একটা জিনিস বারবার মাথায় আসছিল— মানুষ বলে ইতিহাস repeat হয় না, কিন্তু structure-টা এক্কেবারে একইরকম থেকে গেছে। শুধু পরিবর্তিত হয়েছে মাধ্যম। তখন এরিনা ছিল পাথরের, আজ এরিনা স্ক্রিনের। তখন হাজার হাজার মানুষ একসাথে বসে চিৎকার করতো একটা amphitheatre-এ, আজ কোটি মানুষ একসাথে দেখে একটা ফাইনাল, যার যার ঘরে বসে, একই sync-এ, একই emotion-এ।

এটাকে conspiracy ভাবার দরকার নেই। এটা একটা পুরনো মানব প্রবৃত্তির গল্প— বিনোদন দিয়ে নিজেকে ভুলিয়ে রাখার, কিছু একটাকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় বানিয়ে ফেলার। আর ক্ষমতার জন্য, এই প্রবৃত্তিটা সবসময়ই একটা সুযোগ।

একটা ছোট disclaimer এখানে জরুরি— কলোসিয়াম আর আজকের sports/celebrity culture-এর এই তুলনাটা একটা interpretive perspective, কোনো প্রমাণিত ঐতিহাসিক consensus না। ইতিহাসবিদদের মধ্যে রোমান রাজনীতির আসল motivation নিয়ে ভিন্নমত আছে, আর আধুনিক sports economy অনেক বেশি জটিল— এতে আছে জাতীয় গর্ব, কমিউনিটি, অর্থনীতি, আর সত্যিকারের ক্রীড়া-প্রতিভার উদযাপনও। তবু, একটা প্যাটার্ন হিসেবে এই তুলনাটা ভাবার একটা নতুন জানালা খুলে দেয়।

প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়— আমরা যখন একটা ফাইনাল ম্যাচের জন্য রাত জাগি, তখন কি আমরা শুধু একটা খেলা দেখি, নাকি দুই হাজার বছর পুরনো একটা কলোসিয়ামের ভেতরেই বসে থাকি, শুধু সিটটা এখন বদলে গেছে সোফায়?

— Nur Zihad

19/06/2026

ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে যত গল্প লেখা হয়, তার প্রায় সবই একটা প্যাটার্ন মেনে চলে — নায়ক, গোল, ট্রফি, উদযাপন। কিন্তু বিশ্বকাপের ৯২ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে একটা দ্বিতীয় ধারার গল্প পাওয়া যায়, যেটা স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না। এই গল্পের মূল চরিত্র ট্রফি না, বরং সেই ক্ষমতা যারা এই টুর্নামেন্টটাকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে, এবং সেই মানুষেরা যারা এর মূল্য চুকিয়েছে, প্রায়ই নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে।
এই লেখাটা সেই দ্বিতীয় ধারা নিয়ে। ১৯৩৪ থেকে ২০২২, প্রায় এক শতাব্দী জুড়ে দেখা যাবে কীভাবে একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট বারবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, এবং কীভাবে সাধারণ মানুষ — খেলোয়াড়, দর্শক, শ্রমিক — তার মূল্য দিয়েছে।

১৯৩৪ ও ১৯৩৮: মুসোলিনির দুটো ট্রফি

ইতালি যখন ১৯৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায়, তখন বেনিতো মুসোলিনি ক্ষমতায় বসে গেছেন প্রায় এক দশক। ইতিহাসবিদরা বলেন, ফিফার তখনকার সভাপতি জুল রিমে নিজেই পরে আক্ষেপ করেছিলেন যে টুর্নামেন্টটা ফিফার মনে হয়নি, মনে হয়েছিল ফ্যাসিস্ট পার্টির অনুষ্ঠান।

এই টুর্নামেন্ট নিয়ে যে অভিযোগটা সবচেয়ে বেশি টিকে আছে, সেটা সুইডিশ রেফারি ইভান একলিন্ডকে নিয়ে। সেমিফাইনালে ইতালি বনাম অস্ট্রিয়া ম্যাচের ঠিক আগের রাতে মুসোলিনি একলিন্ডের সাথে দেখা করেছিলেন বলে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। পরদিন ম্যাচে অস্ট্রিয়ান গোলরক্ষককে বল হাতে রাখা অবস্থায় নিজের গোলেই ধাক্কা দিয়ে ফেলার পরও গোলটা বহাল রাখা হয়, আর ইতালি ১-০ গোলে জেতে। ফাইনালেও একলিন্ডকেই রেফারি করা হয় — ফুটবল ইতিহাসে এমন পুনরাবৃত্তি আর কখনো হয়নি। সেই ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়ার দুটো স্পষ্ট পেনাল্টির দাবি বাতিল হয়ে যায়, আর ইতালি অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। ইতালীয় ফুটবল ঐতিহাসিক মার্কো ইম্পিলিয়া পরে বলেছিলেন, মুসোলিনির সরাসরি সংযোগ প্রমাণ করা না গেলেও সুইডিশ ও ইতালীয় ক্রীড়া কর্মকর্তাদের মধ্যে একটা মিলিত স্বার্থের প্রমাণ মেলে।
চার বছর পর, ১৯৩৮ সালে ফ্রান্সে, ইতালির খেলোয়াড়রা মার্সেইয়ের মাঠে কালো জার্সি পরে নামেন — ফ্যাসিস্টদের রং — এবং মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ফ্যাসিস্ট স্যালুট দেন। গ্যালারির তীব্র দুয়োর মধ্যেও কোচ ভিত্তোরিও পোজো খেলোয়াড়দের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাত নামাতে নিষেধ করতে, যতক্ষণ না গ্যালারি নিজে থেমে যায়। ইতালি সেই বিশ্বকাপও জিতে নেয়, মুসোলিনির পরপর দুটো রাজনৈতিক বিজয়।

১৯৫০: মারাকানাজু এবং একজন মানুষের ৫০ বছরের সাজা

১৯৫০ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপ আয়োজন করে এমন আত্মবিশ্বাসের সাথে যে রিও'র সংবাদপত্র ম্যাচের দিন সকালেই ব্রাজিলকে "বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন" ঘোষণা করে ছেপে দেয়। মারাকানা স্টেডিয়ামে দুই লাখেরও বেশি মানুষের সামনে ব্রাজিলের দরকার ছিল শুধু একটা ড্র। ৭৯ মিনিটে উরুগুয়ের আলসিদেস গির্জা একটা শট নেন যেটা ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক মোয়াসির বারবোসাকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। উরুগুয়ে ২-১ গোলে জিতে যায়। এই হারকে ব্রাজিলে ডাকা হয় মারাকানাজু — "মারাকানার আঘাত।"

বারবোসা সেই টুর্নামেন্টে সাংবাদিকদের ভোটে সেরা গোলরক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন, তবু সেই একটা মুহূর্ত তার বাকি জীবনটা গ্রাস করে নেয়। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন তাকে আর জাতীয় দলে নিয়মিত ডাকেনি। ১৯৬৩ সালে তিনি মারাকানার পুরনো গোলপোস্ট কিনে এনে নিজের বাড়িতে পুড়িয়ে ফেলেন। ১৯৯৩ সালে, ৪৩ বছর পরও, তিনি যখন জাতীয় দলের ক্যাম্পে শুভেচ্ছা জানাতে যান, তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি — বলা হয়েছিল তিনি অপয়া। বারবোসা নিজেই একবার বলেছিলেন, ব্রাজিলে সবচেয়ে বড় অপরাধের সাজা ৩০ বছর, কিন্তু তিনি এমন একটা অপরাধের সাজা পেয়েছেন ৫০ বছর ধরে, যেটা তিনি করেননি। সাংবাদিকরা পরে যেটা লক্ষ্য করেছেন, সেটা হলো — সেই দলের যে কালো খেলোয়াড়রা ছিলেন (বারবোসা, বিগোদ, জুভেনাল), দোষটা তাদের ওপরই সবচেয়ে বেশি পড়েছিল। ২০০০ সালে দারিদ্র্যের মধ্যে বারবোসা মারা যান।

১৯৭৮: ট্রফি থেকে ১১০০ মিটার দূরে

আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা, জেনারেল হোর্হে রাফায়েল বিদেলার নেতৃত্বে, ১৯৭৮ বিশ্বকাপকে নিজেদের ভাবমূর্তি পরিষ্কার করার একটা বৈশ্বিক জনসংযোগ অভিযান বানিয়ে ফেলে। সেই সময় দেশজুড়ে চলছিল "ডার্টি ওয়ার" — মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে প্রায় ৩০,০০০ মানুষ "নিখোঁজ" হয়ে যান, যাদের অনেকেই ছিলেন ছাত্র, সাংবাদিক, ইউনিয়ন নেতা, শিল্পী।

বুয়েনস আয়ার্সের রিভার প্লেট স্টেডিয়াম থেকে মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে ছিল এসমা — নৌবাহিনীর মেকানিক স্কুল, যেটা প্রকৃতপক্ষে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় গোপন বন্দিশালা ও নির্যাতন কেন্দ্র। ঐতিহাসিকদের হিসাবে আনুমানিক পাঁচ হাজার মানুষ সেই দরজা দিয়ে ঢুকেছিল, ফিরেছিল মাত্র সামান্য কয়েকজন। ফাইনালের দিন, যখন স্টেডিয়াম আনন্দে ফেটে পড়ছিল, এসমার বন্দিরা তাদের নির্যাতকদের সাথে বসেই খেলা দেখেছিল — কেউ কেউ পরে বলেছেন, রাস্তায় টহল দেওয়া সৈন্যরা তাদের দেখিয়েছিল যে কেউ তাদের কথা ভাবে না।
প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে, প্লাজা দে মায়োতে কয়েকজন মা হাঁটতেন, মাথায় সাদা স্কার্ফ, হাতে নিখোঁজ সন্তানের ছবি — আদালতের আদেশ এড়াতে চক্রাকারে হাঁটতেন, কারণ দুজনের বেশি একসাথে দাঁড়ানো নিষিদ্ধ ছিল। ফাইনালে আর্জেন্টিনা নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতে। বিদেলা ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে হাসেন। বহু বছর পর আর্জেন্টিনার সেই দলের গোলরক্ষক উবালদো ফিয়োল বলেছিলেন, অনেকের কাছে ১৯৭৮ মানে ৩০ হাজার নিখোঁজ মানুষ, কিন্তু খেলোয়াড়রা কাউকে নির্যাতন বা হত্যা করেননি — তারা শুধু দেশকে কিছুটা আনন্দ দিতে চেয়েছিলেন।

১৯৮৬: একটা গোল, একটা যুদ্ধের স্মৃতি

১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেন ফকল্যান্ড দ্বীপ (আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস) নিয়ে যুদ্ধ করে, যেখানে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা মারা যান, তাদের অনেকেই ছিলেন কিশোর বয়সী। চার বছর পর, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ডের।
দিয়েগো মারাদোনা ৫১ মিনিটে হাত দিয়ে বল ঠেলে গোল করেন, যা রেফারি বা লাইন্সম্যান কেউ দেখতে পাননি। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, গোলটা "একটু মারাদোনার মাথা দিয়ে, একটু ঈশ্বরের হাত দিয়ে" — যা থেকে আসে বিখ্যাত নাম "হ্যান্ড অফ গড।" বছরের পর বছর পরে তিনি স্বীকার করেন, এটা ছিল মালভিনাসের জন্য "প্রতীকী প্রতিশোধ।" মারাদোনা নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, খেলার আগে তারা সবাই বলেছিলেন ফুটবলের সাথে যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু আসলে তারা জানতেন বহু আর্জেন্টাইন কিশোর সেখানে মারা গিয়েছিল, আর এটাই ছিল তাদের প্রতিশোধ।

চার মিনিট পরেই মারাদোনা একা বল নিয়ে পাঁচজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে যে গোলটা করেন, সেটা ফুটবল ইতিহাসে "শতাব্দীর সেরা গোল" নামে পরিচিত। একই ম্যাচে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকে ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত প্রতারণা এবং সবচেয়ে প্রশংসিত প্রতিভা — দুটোই একই রাজনৈতিক আবেগ থেকে জন্ম নেওয়া।

১৯৯৪: একটা আত্মঘাতী গোল এবং দশ দিন

১৯৯৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়া দলকে অনেকে ফাইনাল খেলার সম্ভাব্য দল বলে মনে করেছিল — পেলে নিজেও এই কথা বলেছিলেন। কিন্তু দেশের ভেতরে তখন মাদক কার্টেলের যুদ্ধ তীব্র, মেদেইনের হত্যার হার ছিল প্রতি লাখে ৩৮০ জন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ২৭ বছর বয়সী ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার একটা ক্রস ঠেকাতে গিয়ে নিজের জালেই বল ঠেলে দেন। কলম্বিয়া হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। পরিবার তাকে কিছুদিন ইউরোপে থেকে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল, কিন্তু এসকোবার ফিরে আসেন মেদেইনে, বলেছিলেন তিনি কোনো অপরাধ করেননি, কোথাও যাবেন না।

ফিরে আসার দশ দিন পর, এক রাতে নাইটক্লাবের বাইরে গ্যালোন ভাইদের একটা দল — যারা কলম্বিয়ার ম্যাচে বাজি হেরেছিল বলে জানা যায় — তাকে নিয়ে কথা বলার সময় বিতণ্ডা শুরু হয়। তাদের একজন গাড়ি চালক উমবের্তো কাস্ত্রো এসকোবারকে ছয় গুলি করে মারেন, প্রতিটা গুলির সাথে চিৎকার করে বলেন "গোল।" কাস্ত্রো পরে স্বীকার করে ৪৩ বছরের সাজা পান, ১১ বছর পর মুক্তি পান। মেদেইনে একটা স্টেডিয়ামের নাম রাখা হয় এসতাদিও আন্দ্রেস এসকোবার।

২০০৬: যে গল্প কেউ মনে রাখে না

জিদানের মাথা দিয়ে গুঁতো মারার ঘটনা ২০০৬ ফাইনালের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত হয়ে আছে, কিন্তু সেই বিশ্বকাপের একটা অংশ অনেকেরই অজানা। জার্মান গোলরক্ষক রবার্ট এনকে, যিনি ছিলেন মূল গোলরক্ষক ইয়েন্স লেমানের ব্যাকআপ, পুরো টুর্নামেন্ট গ্যালারিতে বসেছিলেন। তিনি সদ্য বাবা হয়েছিলেন — মেয়ে লারার জন্ম থেকেই হার্টে সমস্যা ছিল। বিশ্বকাপের পর লারা মাত্র দু'বছর বয়সে মারা যায়। এনকে এই ক্ষতি কোনোদিন কাটিয়ে উঠতে পারেননি, এবং ২০০৯ সালে ৩২ বছর বয়সে একটা ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে যান। ফুটবল মাঠে যা দেখা যায়, সেটাই সবসময় সবচেয়ে বড় গল্প হয় না।

২০২২: যাদের নাম স্কোরবোর্ডে আসে না

কাতার, জনসংখ্যা মাত্র ৩০ লাখের একটা দেশ, ২০১০ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের ভোট পায়। পরের ১২ বছরে যে ২২ জন ফিফা কর্মকর্তা সেই ভোট দিয়েছিলেন, তাদের ১৬ জনের বিরুদ্ধেই ঘুষ বা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

সাতটা স্টেডিয়াম, মেট্রো, হোটেল — সবকিছু নতুন করে বানাতে হয়েছিল, আর এই কাজ করেছিলেন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কেনিয়া, ফিলিপাইনের অভিবাসী শ্রমিকরা, অনেকেই দালালকে কয়েক হাজার ডলার ঋণ দিয়ে বা গ্রামের জমি বন্ধক রেখে এসেছিলেন। কাতারের "কাফালা" নিয়োগ ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তা শ্রমিকের পাসপোর্ট রেখে দিতে পারতেন, যার ফলে নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া দেশ ছাড়া বা চাকরি বদলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত।
২০২১ সালে গার্ডিয়ানের একটা তদন্তে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই পাঁচটা দেশ থেকে আসা অন্তত ৬,৫০০ অভিবাসী শ্রমিক কাতারে মারা গেছেন। এই সংখ্যাটা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে — এটা ছিল সব কারণে হওয়া মোট মৃত্যুর হিসাব, সরাসরি বিশ্বকাপ নির্মাণের সাথে যুক্ত না হলেও। কাতারের কর্মকর্তারা পরে স্বীকার করেন বিশ্বকাপ প্রকল্পে সরাসরি মৃত্যু সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০ এর মধ্যে, যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই সংখ্যাও কম দেখানো বলে মনে করে। সংখ্যা নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, এই সত্যটা অনস্বীকার্য — যারা স্টেডিয়াম বানিয়েছেন, তাদের কেউ কেউ সেই স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার সুযোগটাও পাননি।

২০২৬: যাদের ম্যাচে নামার আগেই থামিয়ে দেওয়া হলো

২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই একটা প্রশ্ন ঘুরছিল — সবাই কি আসলে এই টুর্নামেন্টে পৌঁছাতে পারবে?

সোমালি রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান আফ্রিকার সবচেয়ে সম্মানিত ম্যাচ অফিশিয়ালদের একজন। ফিফা তাকে বিশ্বকাপে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য বেছে নিয়েছিল, এবং তিনি হতে যাচ্ছিলেন এই টুর্নামেন্টে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম সোমালি রেফারি। কিন্তু বৈধ ভিসা থাকার পরও তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফিফা এক বিবৃতিতে শুধু বলেছিল, "হোস্ট দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়ার ব্যাপারে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।" আরতান নিজে শুধু লিখেছিলেন, তিনি ফুটবল পরিবারের শুভেচ্ছাবার্তার জন্য কৃতজ্ঞ, এবং সহকর্মীদের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। আফ্রিকার বাকি সব রেফারি ভিসা পেয়ে প্রস্তুতি শিবিরে যোগ দিলেও, তিনি একাই বাইরে থেকে গেলেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় দলের অবস্থাও আলাদা কিছু ছিল না। মেক্সিকোর বিরুদ্ধে উদ্বোধনী ম্যাচের ঠিক আগে দলের ২০ জনেরও বেশি সদস্যের ভিসা প্রক্রিয়াকরণ আটকে থাকায় নির্ধারিত দিনে তারা যাত্রাই করতে পারেনি। দেশের ক্রীড়া মন্ত্রী গেটন ম্যাকেঞ্জি তখন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, এটা "লজ্জাজনক," আর তারা যেন বোকা বনে গেছেন এমন অনুভূতি হচ্ছে। ইরানের ক্ষেত্রে শুধু খেলোয়াড়রা ভিসা পেয়েছিলেন, কিন্তু ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ-সহ দলের প্রায় ডজনখানেক কর্মকর্তা ও সহায়ক স্টাফ ভিসা পাননি। ইরানি ফুটবল ফেডারেশন এটাকে "প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ" বলে অভিযোগ করে, আর কিছুদিনের জন্য বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠান বয়কট করার ঘোষণাও দেয়।

ঘানার থমাস পার্টে কানাডায় প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ার খবরও আসে। সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলোর ভিসা জটিলতার কারণে দলের সাথে প্রশিক্ষণে যোগ দিতে দেরি হয়। আর সেনেগালের অধিনায়ক কালিদু কুলিবালি প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কেন নির্দিষ্টভাবে আফ্রিকান দেশগুলোকে এতটা প্রভাবিত করছে।
কিন্তু এই পুরো নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে কঠিন প্রভাবটা পড়েছিল খেলোয়াড় বা কর্মকর্তাদের ওপর না, পড়েছিল সাধারণ সমর্থকদের ওপর। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সেনেগাল ও আইভরি কোস্টকে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আংশিক তালিকায় যুক্ত করা হয়, ইরান ও হাইতির সাথে যারা আগে থেকেই সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে ছিল। নিয়মে খেলোয়াড়, কোচ ও স্বীকৃত দলীয় কর্মীদের জন্য ছাড় রাখা হয়েছিল, কিন্তু সাধারণ সমর্থকদের জন্য কোনো ছাড় ছিল না। মরক্কোয় আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস দেখতে আসা সেনেগাল সমর্থক জিব্রিল গেয়ে এপি বার্তা সংস্থাকে বলেছিলেন, তিনি বুঝতে পারছেন না কেন একজন প্রেসিডেন্ট চাইবেন নির্দিষ্ট কিছু দেশের দল প্রতিযোগিতায় অংশ নিক, কিন্তু তাদের সমর্থকদের আসতে না দিক — যদি এটাই হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপ আয়োজনে রাজিই হওয়া উচিত ছিল না। সেনেগালের নারী সমর্থকদের একটা দলের প্রধান ফাতু দিয়েদিও বলেছিলেন, তারা সত্যিই অংশ নিতে চান, কিন্তু কীভাবে নেবেন জানেন না — শুধু অপেক্ষা করছেন, যদি কিছু বদলায়।

এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক ভুল না। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ২০২৫ সালে ঘোষিত একটা বিস্তৃত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় বিশ থেকে পঁচিশটার বেশি দেশকে আংশিক বা সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে — যার মধ্যে ছিল আফ্রিকার অনেকগুলো দেশ, যেমন অ্যাঙ্গোলা, বেনিন, গাবন, গাম্বিয়া, মালাউই, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া, জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়ে। সরকারের ভাষ্যে এর কারণ ছিল "স্ক্রিনিং ও ভেটিং দুর্বলতা" এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশের ভিসা-ওভারস্টে হারের পরিসংখ্যান। এই যুক্তি যতটাই প্রশাসনিক শোনাক, ফলাফলটা ছিল একতরফা — যে মহাদেশ থেকে বিশ্বকাপের কিছু সবচেয়ে আবেগময় ফুটবল গল্প তৈরি হয়, সেই মহাদেশের সমর্থকরাই নিজেদের দলকে মাঠের ধারে বসে দেখার সুযোগ থেকে সবচেয়ে বেশি বাদ পড়লেন।

নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি একলাইনে এই অস্বস্তিটা ধরেছিলেন — নির্দিষ্ট দেশের সাংবাদিকদের ভিসা বাতিল করা, কোনো দলের কোচের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা, কোনো জাতীয় দলকে একদিনের জন্য একক-দিবস ভিসা দেওয়া — এসবই এই টুর্নামেন্টের আসল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। ৯২ বছর আগে মুসোলিনি বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেছিলেন কাদের ভেতরে রাখা হবে আর কাদের বাইরে, সেটা ঠিক করতে। ২০২৬ সালে প্রশ্নটা একই রকম রয়ে গেছে, কেবল সীমান্তরেখাটা ভিন্ন জায়গায় টানা।

একটা প্যাটার্ন, নব্বই বছর জুড়ে

এই সাতটা গল্প আলাদা মহাদেশের, আলাদা দশকের, আলাদা ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহারের। কিন্তু একসাথে রাখলে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুসোলিনির ইতালি বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেছিল ফ্যাসিজমের জাতীয় গর্বের প্রতীক বানাতে। বিদেলার আর্জেন্টিনা সেটা ব্যবহার করেছিল গণহত্যার ওপর একটা পর্দা টানতে। কাতারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিশ্বকাপ আয়োজনের ব্যয় বহন করতে হয় এমন মানুষদের, যারা কখনো সেই গৌরবের ভাগীদার হতে পারেন না। আর ২০২৬ সালে দেখা যায়, যে টুর্নামেন্টটা সবচেয়ে বেশি গর্ব করে "পৃথিবীকে একসাথে আনার" কথা বলে, সেটাই ঠিক করে দিতে পারে কে আসলে সেই পৃথিবীর অংশ হতে পারবে, আর কে পারবে না।

আর মাঝখানে আছে ব্যক্তিগত মানুষেরা — বারবোসা, এসকোবার, এনকে, আরতান — যাদের একক মুহূর্ত বা একটা সিদ্ধান্ত, যা তাদের নিজের হাতে ছিল না, তাদের জীবনের একটা স্থায়ী চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ফুটবল যখন একটা জাতির আত্মপরিচয়ের সাথে এতটা জড়িয়ে যায়, তখন হারের মূল্য, বা বাদ পড়ার মূল্য, একজন মানুষকে একা বহন করতে হয়, যেটা আসলে এগারো জনের, কখনো কখনো একটা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের।
ট্রফি উঁচু করে ধরার ছবিটা সবাই মনে রাখে। প্রশ্নটা হলো — যারা সেই ছবির ফ্রেমের বাইরে ছিলেন, যাদের মাঠে নামার আগেই থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাদের গল্পগুলো আমরা কতটা মনে রাখি?

সূত্র: এই লেখাটি একাধিক স্বাধীন সংবাদ প্রতিবেদন ও ঐতিহাসিক নথি যাচাই করে লেখা — যার মধ্যে আছে দ্য গার্ডিয়ান, ESPN, History.com, Jacobin, The Ringer, Al Jazeera, NBC News, Vanguard, Front Office Sports, এবং উইকিপিডিয়ার তথ্যসূত্র।

Address

Rajshahi

Telephone

+8801627119790

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Zihad posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Zihad:

Shortcuts

Share