29/10/2016
২০১৬ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের সম্পর্কে বিস্তারিত ....................................................................
ঘোষণা করা হয়েছে ২০১৬ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম। আগামী ১০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে এই পুরস্কার। এ বছর পদার্থ, রসায়ন, অর্থনীতি, সাহিত্য, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শান্তিতে মোট ১১ জন নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।.....
১। সাহিত্যে বব ডিলান...................................
সাহিত্যে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন গায়ক ও গীতিকার বব ডিলান। তাঁর আসল নাম রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান। সাহিত্যে ১১৩তম নোবেল বিজয়ী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি। তিনি রক, ফোক, আরবান ফোকসহ ভিন্ন আমেজের সব গান করে এসেছেন। নোবেলের ১১২ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো সংগীতশিল্পী ও গীতিকার এ পুরস্কার পেলেন। আমেরিকার মহান সঙ্গীত-ঐতিহ্যে নতুন কাব্যিক অভিব্যক্তি সৃষ্টির জন্য ডিলানকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নোবেল কমিটি। এর আগেও বহুবার তাঁর নাম মনোনয়ন তালিকায় উঠে এসেছিল।
২০০১ সালে ‘থিংস হ্যাভ চেইঞ্জড’ গানটি দিয়ে বব ডিলান অস্কার জিতে নেন। ওয়ান্ডার্স বয়েজ চলচ্চিত্রে ডিলানের এই গানটি ব্যবহৃত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১২ সালে ডিলানের গলায় পরিয়ে দেন ‘মেডাল অব ফ্রিডম’। বব ডিলানের সংগীতশিল্পী হিসেবে আবির্ভাব ঘটে ১৯৫৯ সালে। দ্রুত খ্যাতির তুঙ্গে পৌঁছান এই শিল্পী। হাতে গিটার আর গলায় ঝোলানো হারমোনিকা তাঁর ট্রেডমার্ক। তাঁর অনেক গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
বব ডিলান ১৯৭১ সালে ১ আগস্ট ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ অংশ নেন। বাংলাদেশের শরণার্থীদের কল্যাণে তহবিল সংগ্রহের জন্য অনুষ্ঠানটি হয় নিউ ইয়র্ক সিটির ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে। এ জন্য বাংলাদেশের মানুষ বব ডিলানের প্রতি বরাবরই কৃতজ্ঞ। ৭৫ বছর বয়সী বব ডিলান এখনো নিয়মিত গান গেয়ে যাচ্ছেন।
২। অর্থনীতিতে দুই মার্কিনির চমক..............................................
অর্থনীতিতে নোবেল দেওয়া শুরু হয় ১৯৬৯ সাল থেকে। এ বছর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য অর্থনীতিতে নোবেল জিতেছেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ। তাঁদের একজন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত অর্থনীতিবিদ অলিভার হার্ট ও আরেকজন ফিনল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ বেঙ্কট হোমস্ট্রর্ম। বাজার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে কন্ট্রাক্ট থিওরিতে অবদানের কারণে এ দুই বিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আধুনিক অর্থনীতি শত সহস্র চুক্তিতে নানা রকম বাধা ও সমস্যা দেখা দেয়। চুক্তির সঙ্গে অর্থনীতির এই সম্পর্কের তত্ত্ব দিয়ে নোবেল জিতে নিয়েছেন এই দুই গবেষক। কন্ট্রাক্ট থিওরি নিয়ে এই দুই গবেষকের কাজ বাস্তব জীবনের বিভিন্ন চুক্তি ও এর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চুক্তি কাঠামোর সম্ভাব্য জটিলতা চিহ্নিত করতেও তাঁদের তত্ত্ব কাজে আসছে। অধ্যাপক বেঙ্কট হোমস্ট্রর্ম ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগে কর্মরত আছেন। আর হার্ট হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক। নোবেল পুরস্কারের ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার এ দুই গবেষকের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে।
৩। শান্তিতে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট............................................
এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়নের তালিকায় রেকর্ড ২২৮ জন ব্যক্তি ও ১৪৮টি সংগঠনের নাম জমা পড়ে। অনেক জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা গৃহযুদ্ধ অবসানে তাঁর ভূমিকার জন্য এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতে নেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস তাঁর নোবেল পুরস্কারের অর্থ দেশটির অর্ধশতকের গৃহযুদ্ধের শিকারদের সহায়তার জন্য দান করার ঘোষণা দিয়েছেন।
বিদ্রোহী গোষ্ঠী দ্য রেভল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়ার (ফার্ক) সঙ্গে দেশটির সরকারের লড়াই শুরু হয়েছে ১৯৬৪ সালে। ২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি এই লড়াই বন্ধে শান্তিচুক্তি এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ২০১৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হন সান্তোস। বহুল প্রত্যাশিত এই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ৫২ বছরের রক্তাক্ত সংঘাতের ইতি টেনেছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট সান্তোস। তবে ফার্ক বিদ্রোহী নেতা লোন্দোনিও তিমোশেঙ্কোও এই চুক্তি বাস্তবায়নে অন্যতম ভূমিকা রেখেছেন। নোবেল কমিটির সম্ভাব্য তালিকায় লোন্দোনিওর নাম থাকলেও শেষ পর্যন্ত পুরস্কার জিতে নিলেন হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস। কলম্বিয়ায় এই গৃহযুদ্ধে দুই লাখ ৬০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়, বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ।
৪।চিকিৎসাশাস্ত্রে ইয়োশিনোরি ওশুমি..................................................
কোষের আত্মভক্ষণবিষয়ক ধারণা দেওয়ায় চিকিৎসাশাস্ত্রে এবার নোবেল পেয়েছেন ইয়োশিনোরি ওশুমি। তিনি জাপানের টোকিও ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক। স্কুলের কম মেধাবী ছেলেটাই গোটা পৃথিবীকে আরো একবার প্রমাণ করে দিলেন, পরিশ্রমই আসল কথা। তাঁর বাবা ও পিতামহ উভয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। ছোটবেলায় মাকে দেখেছেন যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন বিছানায় পড়ে থাকতে। তখনই প্রথম মায়ের পথ্য অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধবিষয়ক ধারণা পান। পরে তিনি ইয়োকোহামা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখান যে দেহ নিজেই তার কোষ ধ্বংস করছে। তবে এই আত্মভক্ষণ কোষের একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কোনো কারণে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটলে নিজের সুরক্ষার জন্য কোষ ধ্বংস করতে দেহ ওই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে।
পাশাপাশি নতুন কোষের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে পুরনো কোষ এভাবেই তার আবর্জনা প্রক্রিয়াজাত করে। ১৯৮৮ সালে ইয়োশিনোরি ওশুমি প্রথম এই ধারণা দেন। তাঁর গবেষণার প্রায় ৩০ বছর পর তিনি এ বিষয়ে গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ এই নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন।
৫। পদার্থে ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত তিন বিজ্ঞানী..............................................
ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত তিন মার্কিন বিজ্ঞানী এবার পদার্থে নোবেল জিতেছেন। তাঁরা হলেন ডেভিড জে থুলেস, এফ ডানকান এম হালডেন ও জে মাইকেল কোস্টারলিটজ। তাঁদের গবেষণা ইলেকট্রনিকসে বিপুল অগ্রগতি আনবে বলে আশা প্রকাশ করেছে সুইডিশ একাডেমি। এ গবেষণায় এক অজানা দশার সন্ধান ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেখানে পদার্থ বিচিত্র বাস্তবতায় বদলে যেতে পারে। পদার্থের তিন অবস্থার একটি থেকে অন্যটিতে পরিবর্তিত হওয়ার সময় পদার্থ ওই বিচিত্র দশায় অবস্থান করে। এই দশাকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন এই তিন পদার্থবিদ। আর দশা শনাক্তকরণে তাঁরা চমত্কার গাণিতিক ব্যাখ্যা ব্যবহার করেছেন। এই গাণিতিক ব্যাখ্যা ব্যবহার করার জন্যই তাঁদের নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। গবেষণায় তাঁরা সুপার কন্ডাক্টর, সুপার ফ্লুইড ও পাতলা ম্যাগনেটিক ফিল্মের আচরণ বুঝতে উচ্চতর গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। থুলেস ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ডানকান এম হালডেন ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় যোগ দেওয়ার আগে ফ্রান্সে ফিজিওসিস্ট ছিলেন। কোস্টারলিটজ রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করছেন অল্টো ইউনিভার্সিটিতে। এই নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে দুই ভাগে। প্রথম ভাগের পুরস্কার পাবেন বিজ্ঞানী ডেভিড থুলেস। অন্য ভাগের পুরস্কার পাবেন বাকি দুই বিজ্ঞানী।
৬। রসায়নে তিন দেশের তিন বিজ্ঞানী............................................................
এ বছর রসায়নশাস্ত্রে নোবেল পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী—ফ্রান্সের জ্যঁ পিয়েরে সাভেজ, যুক্তরাজ্যের স্যার জে ফ্রেজার স্টোডার্ট ও নেদারল্যান্ডসের বার্নার্ড এল ফেরিঙ্গা। এই তিন বিজ্ঞানীর মধ্যে পুরস্কারের আট মিলিয়ন ডলার ভাগ হবে। সুইডিশ নোবেল কমিটির বক্তব্যে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম যন্ত্র তৈরির জন্য তিনজন যৌথভাবে এ পুরস্কার জিতেছেন। তাঁরা তাঁদের গবেষণায় অণু সমতুল্য ক্ষুদ্রতম যন্ত্রের নকশা ও সংশ্লেষণ করেছেন। ন্যানো প্রযুক্তির ইতিহাসে এই গবেষণা নতুন একটি মাত্রা যুক্ত করেছে। তাঁদের অবদান রসায়নশাস্ত্রকে ভিন্নতর উচ্চতায় পৌঁছে দেবে। সুইডেনে একটি সংবাদ সম্মেলনে এ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। বিজয়ী এই তিন বিজ্ঞানী ১৯০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২০০ জনের তালিকায় যুক্ত হলেন।
===============
সূত্র > কালের কণ্ঠ
zakirs BCS