15/03/2026
শহরের এক কোণে ঝাপসা কাঁচের একটা দোকান। সাইনবোর্ডে ধুলো জমা অক্ষরে লেখা— 'বিনিময় কেন্দ্র: হারানো সময় ও বর্তমান'।
ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল মধ্যবয়সী এক লোক। পরনে ইস্ত্রি করা শার্ট, চোখে ক্লান্তির চশমা। সে কাউন্টারের ওপাশে বসা এক বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, "আমার বড় বেলার কিছু দিন বিক্রি করে, শৈশব এর কয়েকটা দিন কিনতে চাই।"
বৃদ্ধ চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে হাসলেন। "বড় বেলার দিনগুলোর দাম কিন্তু খুব সস্তা, হে যুবক! বৃদ্ধের কথায় যুবকটি কিছুটা থমকে গেল। সে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, "সস্তা কেন? এই দিনগুলো তো অনেক পরিশ্রমের, অনেক লড়াইয়ের।"
বৃদ্ধ একটা বড় খাতা খুলে পালক কলম ডুবিয়ে বললেন, "পরিশ্রম থাকলেই তা মূল্যবান হয় না। তোমার এই বড় বেলার দিনগুলো দুশ্চিন্তা, হিসেব-নিকেশ আর মেকি হাসিতে ঠাসা। এগুলোর বাজারে কোনো চাহিদা নেই। অন্যদিকে, শৈশবের একেকটা দুপুর মানে খাঁটি সোনা। একটা বিকেলের বিনিময়ে তোমাকে হয়তো তোমার যৌবনের পুরো একটা বছর দিয়ে দিতে হবে। রাজি?"
যুবকটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখে ভেসে উঠল ট্রাফিক জ্যাম, ফাইলের স্তূপ আর প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে আগামীকালের দুশ্চিন্তা। সে পকেট থেকে মানিব্যাগ নয়, বরং তার বুকের বাম পাশ থেকে কাল্পনিক একটা স্মৃতির ঝাপি বের করল।
"আমি রাজি। আমার আগামী পাঁচ বছরের কর্মব্যস্ত জীবন নিয়ে নিন। বদলে আমাকে শুধু সেই দিনটা ফিরিয়ে দিন, যেদিন প্রথম বৃষ্টির দিনে আমি কদম ফুলের নিচে দাঁড়িয়েছিলাম। কোনো তাড়া ছিল না, শুধু আকাশ দেখার আনন্দ ছিল।"
বৃদ্ধ মুচকি হাসলেন। তিনি কাউন্টারের নিচ থেকে একটা নীল রঙের কাঁচের শিশি বের করলেন। ধুলো মুছে সেটা যুবকের হাতে দিয়ে বললেন, "এই নাও। তবে মনে রেখো, শৈশব কেনা যায়, কিন্তু সেখানে স্থায়ী হওয়া যায় না। এই শিশির ছিপি খুললেই তুমি সেই বৃষ্টিতে পৌঁছে যাবে, কিন্তু সুগন্ধ ফুরিয়ে গেলেই আবার এই ধুলোবালি মাখা শহরে ফিরে আসতে হবে।"
যুবকটি শিশিটা হাতে নিয়ে দোকানের বাইরে পা রাখল। শহরের কোলাহল তখনো তেমনি আছে, কিন্তু তার হাতের মুঠোয় এখন একটা ছোটবেলার বিকেল বন্দি। সে বুঝতে পারল, আমরা আসলে বড় হই কেবল ছোটবেলার সেই সহজ দিনগুলোকে আরও বেশি কদর করতে শেখার জন্য।