21/05/2025
বংশীবাদক রাজকুমারের অন্ধকার
সাকিল মাসুদ
এই শহরের কোণে কোণে, দিনের আলো ধুলো হয়ে মিশে যায় রাস্তায়। এর মাঝেই নানা জীবনের বর্ণাঢ্য মিছিল চলে। ধুলো, বালি, কোলাহল আর আলো-ছায়ার খেলা খেলতে খেলতেই মানুষ প্রতিদিন নিজেকে হারায়, আরেকটা মুখোশ পরে।
মানুষেরা যখন মোহে ডুবে, স্বার্থে বিভোর, তখনই শহরের এক প্রান্তে বাঁশি হাতে ঘুরে বেড়ায় এক রাজকুমার।
তিনি কোনো মোহগ্রস্ত মানুষ নন।
বরং নির্মোহ, নির্লিপ্ত—শহরের প্রাসাদের অলিগলি আর চোরাপথই যেন তাঁর রাজ্যের বিলাসী উদ্যান।
রাজকুমারের চোখে কখনো আলোর ঝলকানি ছিল না।
তিনি কোনোদিন দেখেননি এই পৃথিবীর প্রতারক মুখগুলো।
দেখেননি তাদের, যারা কথা দিয়ে কথা রাখে না, যারা প্রতিদিন নতুন মুখোশ পরে।
সমাজ, রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি—এসব তার কাছে যেন শব্দমাত্র। ভোরের খবর কিংবা টিভি পর্দার কৃত্রিম দুনিয়া তার কাছে এক অপরিচিত ভ্রম।
রাষ্ট্র তার দায়িত্ব নেয়নি। সমাজ তাকে স্বীকার করেনি। কিন্তু তবুও দিন চলে যায়।
রাজকুমার কারও কাছে কিছু চাননি।
চাইলেই পারতেন—এই শহরে কত সম্মানিত, সুস্থ, সবল মানুষও তো জীবনের চাপে হাত পাতে।
কিন্তু রাজকুমার বেছে নিয়েছেন অন্য এক পথ।
তিনি তাঁর বাঁশিতে খুঁজে পেয়েছেন জীবন।
আলোকিত করেছেন নিজের আত্মবিশ্বাস।
একটি বাঁশি আর একটি অজানা গন্তব্যই তাঁর সম্বল।
হয়তো প্রতিদিন তাঁর ঘুম ভাঙে কোনো কাকের ডাক, কুকুরের ঘেউ ঘেউ, কিংবা শহরের কোন ট্রাকের শব্দে।
তারপর, তিনি বাঁশি বাজান। সেই সুর বাতাস ছুঁয়ে যায়, রাস্তা ছুঁয়ে যায়, মানুষকে ছুঁয়ে যায়—যদি কেউ শোনে।
নগরীর ব্যস্ত ভিড়ে কেউ শোনে, কেউ থামে, কেউ পাশ কাটিয়ে যায়—তবুও তিনি থেমে যান না।
অকারণে আমি সেদিন দাঁড়িয়ে গেলাম।
হর্নের কোলাহলে, ট্রাফিকের ধাক্কায় ঝাঁঝালো শব্দের ভেতর হঠাৎ সেই বাঁশির সুরে আমার ভিতরটা কেঁপে উঠলো—
"কপালের ফ্যার,
নইলে কি আর পাখিটির এমন ব্যবহার?"
রাজকুমার এক অন্ধকারের রাজা। যেখানে কোন চেহারা নেই আছে শুধু অনুভব।
রাষ্ট্র তার দায়িত্ব নেয়নি, সমাজ তাকে অস্বীকার করেছে, তবুও সে নিজেই নিজের রাজত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচুর অশিল্পীর পেছনে অর্থ ও সময় ব্যয় করে।
তার বাঁশি দিয়ে হয়তো কোনো সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে না, কিন্তু গড়ে ওঠে এক অনুচ্চারিত বেদনার করাঘাত—যা কেবল অনুভবের।
আমরাও চলছি, জানি না এই পথ কোথায় নিয়ে যাবে। রাজকুমারও জানেন না, তবুও তিনি থামেন না।
আজ সন্ধ্যার পরে, জিএল রায় রোডের ফুটপাতে, অভিজাত শপিং মলগুলোর পাশে
তার বাঁশির সুর বেজে উঠেছিল।
রিকশাওয়ালারা ছুটে যাচ্ছে, মোটরসাইকেল হর্ন বাজিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে, কেউ মোবাইলে ব্যস্ত, কেউ বেরিয়ে আসছে ব্যাগ হাতে শপিং মল থেকে। তার মাঝেই বাতাসে ভাসছে এক বাঁশির সুর।
আপনি শুনেছেন কি?