04/01/2025
শীতকাল আসলে আমার মনে পড়ে যায় আজ থেকে আরও ১৪/১৫ বছর পূর্বের কথা। কতটা কঠিন ছিলো সেসময় টা। সকালে ভাত খাইতে পারলে দুপুরে পাইতাম না। অনেক রাত গেছে আলু সিদ্ধ করা খেয়ে। অনেক শীতের সন্ধা অতিবাহিত হয়েছে পান্তা ভাত খেয়ে। কোনো কোনো দিন দুপুর বেলায় তরকারি ছিলো না,! আমার মা," শুট মরিচ আগুনে পুড়ে রসুন দিয়ে ভর্তা করে আমাদের তিন ভাই বোনকে খাওয়াইতো। আহ্ কি যে কঠিন মুহুর্ত চলে গেছে জীবন হইতে।
আমার বাবা একজন দিনমজুর মানুষ ছিলেন। এখনো তাই।
পরিবারে মোট সদস্য সংখ্যা ছিলো পাঁচজন। কিন্তু আয়ের উৎস ছিলো একমাত্র বাবা'ই। বড় ভাই টুকটাক কাজ করে বাবাকে সাহায্য করতো। বড় বোন (আছিয়া) পড়াশোনা করতো। খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলো। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার পূর্বেই পাশের এলাকা থেকে ভালো সমন্ধ আসায় দাদার অনুমতি সাপেক্ষে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়! বাবার পক্ষে বোনের পড়াশোনা চালানোটা কঠিন ছিলো। মোটা অংশের টাকা দিয়ে বই কিনে পড়তে হইতো। সেটাও দাদার মাধ্যমেই কেনা হইতো। দাদা না থাকলে হয়তো আমরা না খেয়ে মরতাম। আমার মরহুম দাদা নাতি-নাতনীদের অনেক স্নেহ করতো। খুবই ভালো মানুষ ছিলেন।
একসেট বই কিনে আমার ফুফুর মেয়ে রেহেনা আপুসহ পরতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পড়া হয়নি কারোই!
হয়তো তাদের ও স্বপ্ন ছিলো আর দশটা মেয়ের মতো। কিন্তু স্বপ্নটাকে তারা বিসর্জন দিয়ে দিছে!
[এখন তারা ভালো আছে।]
বাবা, কাজ করে পাইতো ২০০/২৫০ টাকা। তা দিয়েই সংসারের পক্ষে যুদ্ধ করতো। একজন মানুষ হয়ে অন্য কয়েকজন মানুষের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে রাতে যে কিভাবে ঘুমাইতো,সেটা ভাবলেও এখন ভিতর খন্ড খন্ড হয়ে যায়! উপলব্ধির দিক থেকে নিজের প্রতি এক আকাশ পরিমাণ দুঃখ লেখা হয়ে যায়। বাবাকে নিয়ে লিখতে গেলে,যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই লেখা হয় না।
বাবা সকালে বাড়ি থেকে বাহির হওয়ার পর কখনো খালি হাতে ফিরতো না। ফিরতো বা কেমনে, তেনার অপেক্ষায় পরিবারের বাকি চারজন মানুষ শুকনো পাকস্থলী নিয়ে বাড়িতে ছিলো!
বাবা" কাজ থেকে ফিরে আসার পর আমার হাতে খরচের ব্যাগ আর পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে বলতো, দুই কেজি চাল আর দশ টাকার সয়াবিন তেল নিয়া আইসো। আমি যাইতাম। তা থেকে ২ টাকা বাচতো। সেটা পেলেই কি যে খুশি লাগতো। আহ্।
বাড়িতে মা বোন ও বসে থাকতো না। শাক পাতা কুড়িয়ে তরকারির ব্যবস্হা করতো।
[কোনোদিন আবার,মা" চুলোর পাশে বসে বাবার বাজারের ব্যাগের অপেক্ষায় থাকতো। আর মায়ের পাশে বড় বোন। আমি সারাদিন কি করতাম না করতাম, নিজের ও ঠিক ছিলো না! পড়াশোনা করতাম একসময় হাফিজিয়া মাদ্রাসায়। কিন্তু সেটাও বাদ দিয়ে জেনারেল পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছিলাম! বড় ভাই ইংরেজি বিষয়ে দূর্বল জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় চলে যায়!
এদিকে আমরা চারজন।
শীতের সময়টাতে গ্রামে নামের তালিকা করতো কম্বল আর চাদর দেয়ার জন্য [দানকৃত]। সেখানে আমাদের ও নাম ছিলো। বাবার আর্থিক অবস্থা এমন ছিলো যে মানুষের দান পেলে আলহামদুলিল্লাহ বলতাম আমরা।
এক শীতে বাবা আমারে নিয়া জায়গীরহাটে যায় জ্যাকেট কিনে দেয়ার জন্য। পকেটে খুবই সামান্য কিছু টাকা। বাবা জানতো আমি হয়তো জেদ করে বসতে পারি। এজন্য পুরো মার্কেট ঘুরেও বাবার চোখে একটা কাপড় ও পছন্দ হইছিলো না। পছন্দ থাকলেও সামর্থ্য ছিলো না! এরপর মার্কেটের সামনে কিছু কাপড় নিয়ে বসা এক লোকের কাছ থেকে ১৫০ টাকা দিয়ে কালো-লাল মিশ্র রঙের একটা জ্যাকেট কিনে দেয় সেদিন। আমি সেটাতেই খুশি ছিলাম। পরবর্তীতে প্রায় হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষের দিক অব্দি ঐ একটা জ্যাকেটই ছিলো।
বাবার শরীরে একটা শার্ট আর শার্টের উপরে পাতলা চাঁদর ছাড়া আর কিছু ছিলো না! আহ্ কি কষ্ট!
বাবার জন্য সেসময় কিছুই করা হয়নি! শুধু সাক্ষী হওয়া ছাড়া সেসময় আর কিছুই করার ছিলো না।
বাবার চোখের দিকে তাকালে মনে হইতো, কি যেন লুকাচ্ছিলো আমাদের কাছ থেকে। যা একান্তই একজন পুরুষ মানুষের ব্যক্তিগত শোক।
এখনো বাবার হাতের তালুতে শক্ত মাংস। পায়ের গোড়ালিতে যুদ্ধের ময়দানের ধূলো। মুখে সাধা পাকা দাড়ি আর মাথায় আধাপাকা চুল। বাবার দিকে তাকালে মনে হয়, বাবা হয়তো বেঁচে নেই! এখন অবসর পেলেই বাঁচে। এতোটাই সাধাসিধা আমার বাবা, তা ভাবলেই বাবাকে নিয়ে গর্ববোধ উদযাপন করতে ইচ্ছে করে।
বাবা - মা যেভাবে জীবন সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন, সেটা কখনোই আমাদেরকে অমানুষ হতে দিবে না। তারা যেভাবে তৈরি করেছেন, সেভাবে বর্তমান জেনারেশনের বাবা মা তৈরি করতে পারবেন না সন্তানদের।
দুঃখ কষ্ট কাকে বলে সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছি বাবার সংসারে। বাবার দায়িত্ব পালন করা দেখে।
দারিদ্র্যতার সঙ্গে এতোটাই ভালোবাসার জন্ম হয়েছে যে, ধনী হতে হবে এমনটা কখনো ভাবা হয়নি। কখনো বিলাসিতা, শখ, জেদ,স্বপ্ন সম্পর্কে বাবা মায়ের কাছে আবদার করা হয়নি! কিভাবে করতাম!? আমার বাবা একজন সৎ গীরব মানুষ। আর আমি গরীবের সন্তান। তাই ছোট বেলা থেকেই বিলাসিতায় অলসতা। সাধাসিধে ভাবে চলাফেরাটাকে বেশি গুরুত্ব দেই। কারণ আমার বাবা ও তেমনই। বছরের প্রতি মাসে নতুন পোশাক কেনা হয় না। এক পোশাকে বছর পার হয়ে যায়। যেমন পূর্বেও হয়েছিলো। ভাতের প্রতি তেমন রূচি নাই, কারণ কম খাওয়ার অভ্যাসটা আমাদের ছিলো।
আজকেও শীতকালের শীত শরীরে লাগে। ঠান্ডার করূন অনুভূতিটা জীবিত হয়। কেমন ছিলো আমাদের জীবন ব্যবস্হা! মনে পড়ে যায়। বাবার কথা ও দায়িত্ব মনে পড়ে যায়। মায়ের চোখের জল স্মৃতি হয়ে করূনা ঝড়ায় আমার চোখে। সেই সময়টা ভাবলেই ঠোঁট কেপে উঠে।
[দারিদ্র্যতা আসলেই ভয়ংকর। যা আমাদের মতো পরিবারের মানুষরা ছাড়া অন্য কেউ অনুভব ও করতে পারবে না। ]
আমাদের উপলব্ধি কখনো মরে না। কিন্তু পরিবর্তন হয়, ব্যক্তি বিশেষে।
আল্লাহ দারিদ্র্যতা রাখুক জীবনে। দারিদ্র্যহীন থাকলে হয়তো বাবার দায়িত্ব আর মায়ের চোখের জল হৃদয় থেকে মুছে যাবে। শুধু সামর্থ্য থাকুক। বাবাকে অবসরে রাখার আর মায়েরে রানি বানানোর। স্মৃতি থাকুক। তাহলে মানুষ হতে পারবো।
স্বরনের অসুখ [বাবার দারিদ্র্যতা]
চিত্র: ২০২১ সালের।
খোকন ইসলাম।