Swami Nigamananda.bd

Swami Nigamananda.bd গুরু ছাড়া নাইরে গতি এই সংসারে তাই সময় থাকতে করো রে মন গুরুর সাধনা 🌷🙏🌷🕉

বিভিন্ন ভাবের আশ্চর্য অভিব্যক্তি ফুটত ঠাকুরের মুখে। আর গলায় সুরের পর্দাও ছিল নানা রকম। সাধারণত নীচু গলাতেই কথা কইতেন। কি...
29/05/2026

বিভিন্ন ভাবের আশ্চর্য অভিব্যক্তি ফুটত ঠাকুরের মুখে। আর গলায় সুরের পর্দাও ছিল নানা রকম। সাধারণত নীচু গলাতেই কথা কইতেন। কিন্তু কোন কারণে রুষ্ট হলে গলায় যে বাজ ডাকত সে আমিও শুনেছি। অতি শৈশবেই একদিন কি কারণে রাগ করতে দেখেছিলাম তাঁকে। ব্রহ্মচারীদের কার নাম ধরে একটা হাঁক যে দিলেন, যেন চড় চড় চড়াৎ করে ফেটে গেল আকাশখানা, সেই সঙ্গে আমার বুকটাও। মনে হয়েছিল ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাব। জীবনে নিজে একদিন তাঁর সে-ধমক খেয়েছিলাম, যথাস্থানে দেব তার বিবরণ। তবে শ্রীহস্তের প্রহার কখনও খাইনি, কানমলাও নয়।

মায়েদের কাছে যা বর্ণনা শুনি, তা এক-ঘা পিঠে পড়লে আর বাঁচতাম না। আমার এ উক্তিতে কারও ভাবভঙ্গ হলে ক্ষমা চাইছি সেজন্য। তাঁর সে ভৈরব পরিচয়ে আমি তো দোষের কিছু দেখি না। ঠাকুর কি কেবল অবিমিশ্র ভাল, কাল কিছু নাই তাঁর মধ্যে? হিন্দুর গুরু-ভগবানের পরিচয় তো তা নয়! তিনি "নিগ্রহানুগ্রহে শক্তঃ”। যিনি শিব-শংকর তিনিই আবার মহারুদ্র চণ্ডভৈরব। ভক্তের চির শুভানুধ্যায়ী নিগমানন্দের করুণা-কোমল বিশ্বতোভদ্র মূর্তির অন্তরালে নির্মম নিষ্ঠুর এক কঠোর সন্ন্যাসী ছিলেন, যাঁর মায়া দয়া ভদ্রতা বলে কোন বালাই ছিল না। আমি তাঁর দক্ষিণ ও বাম দুটি মুখই দেখেছি যে! দেখেছি বলেই আমার একটা কথা মনে হয়। আমাদের মত অজ্ঞানীর ভগবানকে প্রেমময় দয়াময় স্নেহময় না বলাই ভাল। তিনি ইচ্ছাময় এবং মঙ্গলময় বা করুণাময়, আমাদের কাছে এই-ই তাঁর সত্য পরিচয়। তিনি চলেন তাঁর ইচ্ছামত; 'স্ব-তন্ত্র ঈশ্বর' তাঁর পরিচয়। কিন্তু সে ইচ্ছা সর্বদাই জীবের মঙ্গলপ্রদ কল্যাণকর। এ বুদ্ধি পাকা না হলে গুরুকে নরাকার পরব্রহ্ম বলে ধরা যায় না জোর করেই বলব।
নীলাচলে ঠাকুর নিগমানন্দ
✍️ নারায়ণী দেবী লীলা
#জয়গুরু #শ্রীশ্রীঠাকুর

জগৎপিতা জগদীশ্বর সৃষ্টিকালে সৃষ্ট পদার্থসমূহে এমন একটি অভাব রাখিয়াছেন, যাহা সার্বভৌম ও সাতিশয় সুস্পষ্ট। এই অভাবের পূরণার...
28/05/2026

জগৎপিতা জগদীশ্বর সৃষ্টিকালে সৃষ্ট পদার্থসমূহে এমন একটি অভাব রাখিয়াছেন, যাহা সার্বভৌম ও সাতিশয় সুস্পষ্ট। এই অভাবের পূরণার্থ স্থাবর-জঙ্গম যাবতীয় পদার্থ পরস্পরকে আলিঙ্গন করিতেছে এবং যখন আলিঙ্গিত পদার্থে আশা পূর্ণ হইল না স্পষ্ট বুঝিতে পারিতেছে, তখনই আবার তাহা হইতে বিশ্লিষ্ট হইয়া পড়িয়া অন্য পদার্থের জন্য আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করিতেছে। প্রাকৃত সকল বস্তুই সেই অদ্বিতীয় অভাবের দ্বারা সৃষ্ট; সুতরাং জগতের অভাবময় কোনো পদার্থদ্বারা কাহারও কোনো অভাব দূরীভূত হইবার নহে। অন্যের নিকট স্বীয় অভাবপূরণার্থ গমন করিলে যে পরিমাণে অভাবের পূরণ ঘটে, তদপেক্ষা অধিক পরিমাণে অপরের অভাব পূরণ করিতে করিতে আপনাকে অন্তঃসারশূন্য হইতে হয়। প্রেম বা স্নেহজনিত সুখের পূরণার্থ পত্নী বা পুত্রের সহিত সঙ্গত হইলে যে পরিমাণে আনন্দ নিজের সংগৃহীত হয়, তদপেক্ষা সহস্রগুণ যত্ন দ্বারা পুত্র-কলত্রাদির ভরণপোষণে আপনাকে অসাড় ও ভগ্নোদ্যম হইতে হয়। অতএব অভাবময় প্রাকৃত পদার্থ দ্বারা কাহারও স্বাভাবিক অভাব দূর হইবার নহে। তবে, যিনি অভাব দিয়া জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন, তাঁহার নিকটেই ইহার প্রতিকারের ঔষধ আছে। অভাবপূরণার্থ ইন্দ্রিয়বর্গের এই স্বাভাবিক বৃত্তিই আসক্তি বা ভক্তি নামে অভিহিত হইয়া থাকে। অভাববিশিষ্ট প্রাকৃত পদার্থের প্রতি ইন্দ্রিয়াদির গতি হইলে তাহাকে আসক্তি এবং সর্বাভাববর্জিত অখণ্ডানন্দ-স্বরূপ ভগবানের প্রতি উহাদিগের গতি হইলে তাহাকে ভক্তি বলা যায়।
—শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী
(প্রেমিকগুরু)
#জয়গুরু #শ্রীশ্রীঠাকুর

" জীবের মঙ্গল কিসে হয়, সকলের অন্তরে সেই অলৌকিক ইঙ্গিত আসে না। মহাপুরুষেরাই একমাত্র জগদ্গুরুর সেই মঙ্গলময় ইঙ্গিত বুঝতে সক...
27/05/2026

" জীবের মঙ্গল কিসে হয়, সকলের অন্তরে সেই অলৌকিক ইঙ্গিত আসে না। মহাপুরুষেরাই একমাত্র জগদ্গুরুর সেই মঙ্গলময় ইঙ্গিত বুঝতে সক্ষম। আমি সদ্গুরু-জগদ্গুরুর মঙ্গলময় ইচ্ছা আমার অন্তরে লীলায়িত, তোমরা সেই লীলাপুষ্টিরই সহায়ক। আমার অন্তরে যা প্রতিভাত হয়েছে, তোমরা বাইরে তাকে রূপ দাও। আমি তোমাদের কাছে অন্য কিছু চাই না-তোমরা আমার প্রকাশ-শক্তি হও। "
--- শ্রীশ্রীঠাকুর নিগমানন্দ পরমহংসদেব
#জয়গুরু #শ্রীশ্রীঠাকুর

23/05/2026

শারীরিক পরিশ্রম ইন্দ্রিয়জয়ের পক্ষে উপকারী। প্রত্যহ কোনরূপ ব্যায়াম কিম্বা মুক্ত বাতাসে দ্রুতপদে ভ্রমণ করিবে। নিজেকে সর্ব্বদা পবিত্র রাখিলে পাপের প্রতি ঘৃণা হইবে, "এই শরীর ভগবানের মন্দির" —সর্ব্বদা এই চিন্তা করিলে হৃদয়ে পাপ প্রবেশ করিতে পারিবে না।
—শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী পরমহংসদেব
(ব্রহ্মচর্য্য-সাধন)
#জয়গুরু #শ্রীশ্রীগুরুগীতা #শ্রীশ্রীঠাকুর

22/05/2026

ধন্যা মাতা পিতা ধন্যো ধন্যং সর্বকূলস্তথা।
ধন্যা চ বসুধা দেবি! গুরুভক্তিঃ সুদুর্লভা॥( শ্রীশ্রীগুরুগীতা)

ধন্যা মাতা — সেই মা ধন্য
পিতা ধন্যঃ — সেই পিতাও ধন্য
সর্বকূলঃ ধন্যঃ — সমগ্র বংশ ধন্য
বসুধা ধন্যা — পৃথিবীও ধন্য
গুরুভক্তিঃ সুদুর্লভা — কারণ গুরুভক্তি অত্যন্ত দুর্লভ

ভগবান শিব পার্বতীকে বলছেন—
যে মানুষের অন্তরে সত্যিকারের গুরুভক্তি জন্মায়, তার মা-বাবা, পরিবার, এমনকি যে পৃথিবীতে সে জন্মেছে, সবই ধন্য হয়ে যায়। কারণ প্রকৃত গুরুভক্তি খুবই বিরল।
#জয়গুরু #শ্রীশ্রীঠাকুর
#শ্রীশ্রীগুরুগীতা

প্রত্যহ একচিত্তে শ্বেত, কৃষ্ণ ও লোহিত বর্ণের ধ্যান করিলে বায়ু, পিত্ত, কফ এই ত্রিধাতু সাম্য থাকে।ললাটোপরি পূর্ণচন্দ্রসদৃ...
22/05/2026

প্রত্যহ একচিত্তে শ্বেত, কৃষ্ণ ও লোহিত বর্ণের ধ্যান করিলে বায়ু, পিত্ত, কফ এই ত্রিধাতু সাম্য থাকে।
ললাটোপরি পূর্ণচন্দ্রসদৃশ জ্যোতিঃ ধ্যান ও গব্যঘৃতে নিজ প্রতিবিম্ব দর্শন করিলে আয়ু বৃদ্ধি হয়।
প্রত্যহ দিবাভাগে বামনাসায় ও রাত্রিকালে দক্ষিণনাসায় শ্বাস বহন রাখিতে পারিলে নীরোগ, দীর্ঘজীবী ও চিরযুবা হওয়া যায়।
—শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী পরমহংসদেব
(ব্রহ্মচর্য্য সাধন)
#জয়গুরু #শ্রীশ্রীঠাকুর

জয়গুরু 🙏🙏🙏
22/05/2026

জয়গুরু 🙏🙏🙏

ছোটদের প্রতি ঠাকুর[সরোজরানী নাথ]ঠাকুরকে আমি প্রথম দেখি একেবারে ছোটবেলায়, তখন আমার বয়স ছয় কি সাত বৎসর। কাছাড় জেলার অন্তর্...
21/05/2026

ছোটদের প্রতি ঠাকুর

[সরোজরানী নাথ]

ঠাকুরকে আমি প্রথম দেখি একেবারে ছোটবেলায়, তখন আমার বয়স ছয় কি সাত বৎসর। কাছাড় জেলার অন্তর্গত পাঁচগ্রামে টিলার উপরে একটি বাসায় আমরা থাকতাম। বাবা সেখানে বি. ও. সি.-তে কাজ করতেন। ঠাকুর আমাদের বাসায় এসেছিলেন। ছোট্ট আমি তখন 'ঠাকুর আসবেন' এই কথায় মনে একটি অদ্ভুত কৌতূহল অনুভব করেছিলাম। ঠাকুর যে কি তা তো বুঝতাম না, শুধু এক শ্রদ্ধা-ভক্তি ও বিস্ময়ের ঘনীভূত প্রতীককে দেখবার আশায় আকুল আগ্রহে পথের দিকে চেয়েছিলাম। ঠাকুর আসলেন, মিলিতকণ্ঠের জয়ধ্বনির মধ্যে চেয়ারে বসে, হুকার নলটি মুখে নিয়ে চারিদিকে দৃষ্টিপাত করতে লাগলেন। তাঁর দৃষ্টি এসে থামলো সেখানে, যেখানে কয়েকটি শিশুর সঙ্গে আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে অপারবিস্ময়ে তাঁর দিকে চেয়েছিলাম। তিনি আমার চোখের দিকে কতক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন। আশ্চর্য এই যে, সেই দৃষ্টির আকর্ষণ থেকে আমার দৃষ্টিকে আমি ফেরাতে পারলাম না, যতক্ষণ না তিনি নিজে থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। আজও সেই দৃষ্টি আমার মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এরপর ঠাকুরের প্রতি একটা প্রবল আকর্ষণ অনুভব করতাম, কয়দিন থেকে ঠাকুর চলে গেলেন। তখন থেকে ঠাকুরপূজা ও সন্ধ্যাবাতি দেওয়া আমার প্রিয় কাজ হয়ে দাঁড়ালো।

এরপর আবার ঠাকুর এসেছিলেন। সন তারিখ কিছু মনে থাকবার কথা নয়, শুধু প্রধান ঘটনাগুলোই মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে, বাকীগুলো ভুলে গেছি; ঠাকুর যাওয়ার পর থেকে শুধু তাঁকে দেখবার জন্য মন ছটফট করত। যেদিন তিনি এলেন, সেদিন স্কুলে গেলাম না, জঙ্গলে জঙ্গলে ফুলের সন্ধানে ঘুরে বেড়ালাম। সকলের সঙ্গে বসে স্তোত্রপাঠ করলাম সেবার। ঠাকুর যে আমাকে লক্ষ্য করছিলেন, তা বুঝতে পারলাম তখন; যখন স্তোত্র পাঠান্তে ঠাকুর বললেন, 'মেয়েটি কার? কি সুন্দর স্তোত্রপাঠ শিখেছে। সহদেবের নাকি? তোমরাও এভাবে প্রত্যেকে নিয়মিতভাবে স্তোত্রপাঠে ছোটদের অভ্যস্ত করাবা।' ছোটরা যাতে সন্ধ্যাবাতি দেওয়া ঠাকুরপজা ইত্যাদিতে অভ্যস্ত হয় সে সম্বন্ধেও ইচ্ছা প্রকাশ করলেন ঠাকুর। এর দ্বারা বোঝা যায় ঠাকুর যাতে ছোটবেলা থেকে ছেলেমেয়েরা ধর্মভাবে ভাবিত হয় তার পক্ষপাতী ছিলেন।

তখন থেকে ঠাকুরঘরের আনাচে কানাচে শুধু ঠাকুরকে দেখবার আশায় ঘুরে বেড়াতাম। মাকে বললাম 'আমি ঠাকুরের সঙ্গে চলে যাব।' মা বললেন 'ঠাকুরকে বল না।' কিন্তু যাঁর সঙ্গে এতসব বড় বড় লোকেরা এত সমীহ করে কথা বলেন তাঁকে সাক্ষাতে বলবার সাহস কিছুতেই হল না। বলতেও পারি না, আর না বলেও শান্তি পাই না। তখন এক বুদ্ধি জাগল। চুপি চুপি ঠাকুরঘরে গিয়ে ঠাকুরের ফটোর কাছে বলে এলাম 'আমি তোমার সঙ্গে যাব।' ভাবলাম 'ব্যস, বলা হয়ে গেল। ফটোকে সকলে পূজা করে, নিশ্চয় এর মধ্যে ঠাকুর আছেন বলেই। সন্ধ্যাবেলা, সকলে ঠাকুরকে প্রণামাদি করছে, আমি গিয়ে প্রণাম করে দাঁড়াতে ঠাকুর বললেন, "খুকি, তুই আমার সঙ্গে আশ্রমে যাবি?" এ প্রশ্নে বিস্ময় জাগল না, কারণ ঠাকুরের ফটোতে বলেছি, ঠাকুর তো শুনেছেনই। কিন্তু মন আড়ষ্ট হয়ে গেল, সেখানে দাঁড়িয়ে ঠাকুরের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না। পরে ঠাকুর চলে গেলে কি কান্না। প্রশ্নের উত্তর দিইনি বলে কি অনুতাপ! এরপর তাঁকে দেখি শিলচর যোগেন্দ্রচন্দ্র ধরের বাসায়। পাঁচগ্রাম থেকে আমরা সকলে ঠাকুরকে দেখতে শিলচর গিয়েছিলাম। সেখানে কে একজন ঠাকুরকে বলেন ছোট ছেলেমেয়ে কয়টিকে দীক্ষা দিতে। আমরা গিয়ে দাঁড়াতে ঠাকুর বললেন, "ওদের আর দীক্ষা দিব কি? তোমরা জয়গুরু নাম মনে রাখবা, সকালে ঘুম থেকে উঠে জয়গুরু নাম জপ করে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা জানাবা, ঠাকুর আমাদের শুভবুদ্ধি দাও।" আরও কি কি বলেছিলেন ঠাকুর, আজ আর সব মনে নেই। আবছাভাবে মনে পড়ে, রোজ ঘুমাতে যাবার আগে সমস্তদিন কি ভাবে চলেছি, তার হিসাব মনে মনে নিয়ে, খারাপ যা করেছি, তার জন্য অনুতপ্ত হয়ে 'এরূপ আর করব না' ও ভাল কাজগুলির জন্য তৃপ্তি অনুভব করে, 'পরে এরূপ আরও ভালকাজ করব' এই সংকল্প নিয়ে জয়গুরু নাম জপ করে ঘুমাতে বলেছিলেন।

পরে তাঁর এক সেবক আমাদিগকে কয়েকটি 'আসন' শিখিয়ে দিয়েছিলেন, যেগুলো সকাল সন্ধ্যায় অভ্যাস করলে স্বাস্থ্যেরও উপকার হয়। আমরা এরপর থেকে ভাবতাম "ব্যস দীক্ষা হয়ে গেল, 'জয়গুরু' এই শব্দই মন্ত্র। ঠাকুরের উপদেশের পর ঠাকুরকে সকলে প্রণাম করে চলে গেল, আমি প্রণাম করে যাবার জন্য ফিরে দাঁড়াতে ঠাকুর বললেন “তোমার নাম কি?" আমি বললাম, 'সরোজনলিনী'; তখন ঐ নাম ছিল। তিনি আবার ফিরে তাকিয়ে বললেন, 'সরোজনলিনী?' আমি বললাম 'হ্যাঁ'। বলেই চলে এলাম।

এরপর ১০।১১ বৎসর বয়সে সারস্বত মঠে ভক্ত-সম্মিলনীতে যাই। মঠে ঠাকুরকে নিয়ে সেই শেষ ভক্ত-সম্মিলনী। একদিন রাত্রে বাহিরে সকলে ঠাকুরকে প্রণাম করছে, আমরা ছোটরা তাঁকে প্রণাম করে দাঁড়াতেই ঠাকুর বললেন, "আজ তোমাদের 'জয়গুরু' বলে নাচতে হবে, আমার কাছে লজ্জা কি? আমিও তোমাদেরই মত একটি বালক।" আমরা সকলে তাঁর পেছন পেছন চলে গেলাম ঘরে। ঠাকুর আসনে বসলেন, আমরা খুব নাচ ও 'জয়গুরু' কীর্তন আরম্ভ করলাম। পরে আরম্ভ হলো প্রবল জয়গুরু কীর্তনের সঙ্গে উদ্দণ্ডনর্তন। ঠাকুর আমাদের মাঝে উঠে এলেন। ছোটদের মাঝে তাঁর উন্নত তেজঃপুঞ্জবিশিষ্টদেহ ধীরে দুলতে লাগল, তিনিও আমাদের সঙ্গে 'জয়গুরু' বলতে লাগলেন। শ্বেতপদ্মের মত চরণ দু'খানা নাচের তালে তালে উঠছে পড়ছে। কীর্তনশেষে তিনি আমাদের সঙ্গে মাটিতে বসে পড়লেন। প্রসাদ বিতরণ করতে করতে ছোটদের সঙ্গে গল্প করতে লাগলেন, সকলের নাম জিজ্ঞেস করলেন। কেউ পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে নাচের সময়, বলছেন, "কি দুঃখু পেয়েছ? কে, যূথী না পুঁথি প্রসাদ নিতে এস।" একটি ছোট ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন "তোমার বাবার নাম কি?” সে বলল, "বাবা"। "মা'র নাম?" "মা"। এইভাবে ছোটদের নিয়ে আনন্দ করতে লাগলেন।

এরপর ঠাকুর মায়েদেরও জয়গুরু বলে নাচতে বললেন, "খুব নাম কর, নাম করতে করতে ভাব হবে, ভাব হতে হতে প্রেম হবে।" মায়েরাও নাম কীর্তনের সঙ্গে নেচেছিলেন।

পরদিন ভক্তরা যখন নামকীর্তন করছিলেন, তখন ভাবোন্মত্ত ঠাকুর তাঁদের মাঝে উঠে নর্তন আরম্ভ করতেই ঢলে পড়লেন, তখন ভক্তরা তাঁকে ধরাধরি করে ভিতরে নিয়ে গেলেন। এরপর স্থির হয়ে আবার বাইরে এসে বসলেন। আমরা ছোটরা নাচিনি। আমি ঠাকুরের ডানপার্শ্বে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঠাকুর হাত বাড়িয়ে আমার পিঠে হাত রাখলেন, বললেন, "তোরা নাচতে জানিস?" প্রথমে কথাগুলো আমার কানেই গেল না,—ঠাকুরের সেই স্পর্শে একমুহূর্তের জন্য মনে একটা আনন্দপ্রবাহ খেলে গেল যেন, জিজ্ঞেস করলাম "কি"?

ঠাকুর পিঠে হাত বুলিয়ে মৃদু চাপড় দিতে দিতে বললেন, “তোরা নাচতে জানিস?” আমি বললাম "জানি।” ঠাকুর বললেন, "তবে যে নাচলি না?” ঠাকুরের সেই স্নেহের স্পর্শ ও স্নেহময় কথা আজও মনেরমণিকোঠায় উজ্জ্বল হয়ে আছে, কোনদিন তা মুছে যাবে না। ঠাকুরের স্নেহ পাওয়ার লোভ কার না হয়। ঠাকুর অহেতুকভাবে আমাদেরকে ভালবেসে আসছেন, তেমনি আমাদেরও উচিত তাঁর উপদেশগুলিকে জীবনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে যাওয়া। এতেই তাঁর প্রতি আমাদের ভালবাসার পরিচয় দেওয়া হবে।

ছোটদের প্রতি ঠাকুর
✍️সরোজরানী নাথ

শতরূপে অপরূপ নিগমানন্দ
(চতুর্থ খণ্ড)

#জয়গুরু #শ্রীশ্রীঠাকুর

20/05/2026

আহারের পর চিরুণী দ্বারা (রবারের না হয়) ৪।৫ মিনিট মাথা আঁচড়াইলে বাত, শিরঃপীড়া প্রভৃতি রোগ জন্মিতে পারে না। চিরুণী এরূপভাবে চালনা করিবে, যেন মস্তকের চর্ম্মে কাঁটাগুলি একটু জোরে ঘর্ষিত হয়। ইহাতে চুল পাকে না।
আহারের পর পায়ের পাতা পশ্চাতে মুড়িয়া তাহার উপর ১০।১৫ মিনিট বসিয়া থাকিলে বাতব্যাধি জন্মিতে পারে না।
—শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী পরমহংসদেব
(ব্রহ্মচর্য্য-সাধন)
#জয়গুরু #শ্রীশ্রীঠাকুর

আরেকটা ঘটনা বোধহয় ঠাকুর ২০৪ নম্বরে থাকার সময় ঘটেছিল। সে-বার ঠাকুর হাওড়ায় থাকার সময় রাজাসাহেবও কলকাতায় ছিলেন।বিকালে রাজাস...
20/05/2026

আরেকটা ঘটনা বোধহয় ঠাকুর ২০৪ নম্বরে থাকার সময় ঘটেছিল। সে-বার ঠাকুর হাওড়ায় থাকার সময় রাজাসাহেবও কলকাতায় ছিলেন।
বিকালে রাজাসাহেব ঠাকুরকে বেড়াতে নিয়ে যাবার জন্য রোজই মোটর পাঠাতেন। কোন দিন আমরা, কখনও দাদামশাই বা আর কেউ সঙ্গী হতেন ঠাকুরের। রাজাসাহেব নিজে আসতেন ঠাকুরকে নিতে—এমনও হত। তখন কেবল তিনিই হয়তো যেতেন তাঁর সঙ্গে। দাদামশাইয়ের কাছে শুনেছি, ঠাকুর যেরকম কলকাতার প্রত্যেকটি রাস্তা চিনতেন, আজীবন কলকাতার কাছে থেকেও তিনি নিজে নাকি কলকাতার গলি-ঘুঁজি সেরকম চিনতেন না।
এই সময় রাজাসাহেবের গুরুচরণ নামে এক হিন্দুস্তানি ড্রাইভার ছিল। তার মত সরল গোবেচারা মানুষ খুব কমই দেখা যায়। রাজাসাহেব ওকে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন যে, গুরুচরণের হাতে গাড়ি থাকলে অ্যাক্সিডেন্টের ভয় নেই। তা ঠিকই। কারণ রাস্তায় মহিষের গাড়ি (সে সময় কলকাতায় গরুর চেয়ে মহিষটানা গাড়িই বেশি ছিল) সামনে পড়লেও গুরুচরণ কখনও তার পাশ কাটাতে চাইত না। কেবলই হর্ন টিপত আর বলত, “আরে, বাড়হাও! আগে বাড়হাও!” কী জানি, পাশ কাটাতে গিয়ে যদি দুর্ঘটনা হয়! গুরুচরণ সবসময়ই সবার পিছনে ধীরে ধীরে গাড়ি চালাতে ভালবাসত। কাজ কী মেলা ঝামেলায়—এই তার ভাব। তার অসীম ধৈর্যে আমাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটত অনেক সময়, গুরুচরণ নির্বিকার।
আর এক মজা—কলকাতার কোন রাস্তাই সে চিনত না এবং চেনার জন্য ব্যগ্রও ছিল না। ঠাকুর তাকে যে রাস্তা দিয়েই যেতে বলুন না কেন, সব সময়ই “মুঝে তো মালুম নেহি, গুরুজী”—এই ছিল তার বিনীত উত্তর। গঙ্গার ধারে রেড রোড বা স্ট্র্যান্ড রোডে পড়লে তখন সে সানন্দে বলত, “এইবার আমি ঠিক যেতে পারব”—অর্থাৎ ওইখান থেকে হাওড়া ব্রিজ হয়ে পঞ্চাননতলা রোড পর্যন্ত সে ভালই চেনে। আর চেনে রেড রোড হয়ে ল্যান্সডাউন রোডে রাজাসাহেবের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা। তার বাইরে যাই-ই বল না কেন—“মালুম নেহি”।
মজা দেখার জন্য একেকদিন ঠাকুর তাকে এমন ঘুরিয়ে রেড রোড বা স্ট্র্যান্ড রোডে এনে ফেলতেন যে, অত চেনা রাস্তাও গুরুচরণ প্রথমটা চিনে উঠতে পারত না। অচেনা রাস্তায় ঘুরে এমনই হকচকিয়ে যেত সে যে ধাঁধা লেগে যেত বেচারীর। এই নিয়ে হাসাহাসি করতাম আমরা। যেতে যেতে শেষে হাওড়া ব্রিজ চোখে পড়লে তবে তার মালুম হত কোন জায়গায় এসে পড়েছে। তখন সবিস্ময়ে আকর্ণবিস্তৃত অপ্রস্তুত হাস্যে গুরুচরণ বলত, “আরে, এ তো রেড রোড ধরেই চলেছি!” অথবা, “স্ট্র্যান্ড রোডই তো বটে, আমি চিনতে পারিনি!” স্মিতমুখে ঠাকুর বলতেন, “তাই তো, চিনে ফেলেছ এবার?”
কোন কোন দিন বিশেষ কারও বাড়িতে যাবার কথা থাকলে আমরা যেতাম না। হয়তো দাদামশাই একাই সঙ্গী হতেন তাঁর—এমনও ঘটেছে। তিনি যে ঘটনাটা বলেছিলেন তা এই রকম একদিন মোটরে বেড়াতে যাবার সময়ই ঘটেছিল। সে এই সময় না অন্য কোনও বার, তা আজ আর কেউই বলতে পারব না। সেদিন ঠাকুরের সঙ্গে শুধু ফণীবাবুই ছিলেন।
মোটরে বেশ খানিকটা ঘুরে এসে প্রিন্সেপ ঘাটে বসেছেন ঠাকুর—একেবারে গঙ্গার কোলে এক সিঁড়িতে। সূর্য অস্ত যায়-যায়। কয়েক ধাপ উপরে এক সিঁড়িতে ফণীবাবুও বসে আছেন। হঠাৎ কানে এল মাতাল দুটো গোরার চিৎকার। চেয়ে দেখেন, রেড রোডের ওপারে ময়দানের উপর দিয়ে দুটো মাতাল সেলর অকথ্য গালিগালাজ করে সামনে যাকে পাচ্ছে তাকেই তেড়ে গিয়ে ঘুষি মারছে আর পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে গঙ্গার দিকে।
উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে দাঁড়ান দাদামশাই। খুব বেশি দূরে নয় গোরা দুটো। এই ঘাটে এসে পড়া বিচিত্র নয় কিছু। “ঠাকুর!” সভয়ে ডাক দেন তিনি, “উঠে আসুন গাড়িতে। দুটো গোরা মাতাল হয়ে মারপিট আরম্ভ করেছে রাস্তার উপর।”
কোন সাড়া নেই। মান-অভিমান, রাগ-রঙ্গ যতই করুন, গুরুকে আন্তরিক শ্রদ্ধা করতেন ফণীবাবু। সাড়া না পেয়ে কাজেই একটু কুণ্ঠিত হলেন। অন্তরে বুঝলেন, আপন ভাবে বিভোর হয়ে রয়েছেন তাঁর ঠাকুর। ব্যাঘাত করব তাঁর ধ্যানানন্দে? কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করেন। কিন্তু উপায় নেই। চেঁচামেচি, গালিগালাজ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, এই ঘাটের দিকেই ওদের লক্ষ্য যেন।
“ঠাকুর, শুনছেন?” জোরে এবার ডাক দিলেন একটা।
“কী?” গম্ভীর প্রত্যুত্তর এল।
আবার সঙ্কোচ বোধ করেন ফণীবাবু। উত্তরের ধরনেই বুঝেছেন, মানুষটির মন এখানে নেই। সম্মুখবর্তী কলপ্রবাহিণী ভাগীরথীর ধারা ধরে কোন সাগরসঙ্গমে উধাও হয়ে গেছেন বুঝি! কাছে এগিয়ে এসে বিনীত অনুনয়ে বললেন, “ঠাকুর, দুটো মাতাল গোরা মারপিট করতে করতে এদিকে আসছে।”
কথায় বাধা পড়ল—তাঁর বক্তব্য শেষ না হতেই ঠাকুর বলে উঠলেন, “আসুক, আমার কী?” স্বর ঈষৎ রুক্ষ যেন।
দাদামশাই আমাদের কাছে বলতেন, “শুনে হাড় জ্বলে গেল। নাও ঠেলা! তোমার কী? তা তো বটেই। বেশ জান, আগে ফণীকে মেরে লাশ বানিয়ে তবে তোমায় ছুঁতে পারবে। তাই বলে বসলে ‘আমার কী?’ ওদিকে আমার যে প্রাণসংশয়! আমি একা ওই দুটো যণ্ডামার্কাকে ঠেকাতে পারব? রাগ করে বলি, ‘উঠে আসুন গাড়িতে। কী হচ্ছে! একি ছেলেখেলা নাকি? মাতাল আপনাকে সাধু ভেবে ছেড়ে দেবে ভেবেছেন? আমিই বা একা ওদের দু’জনকে আটকাব কী করে?’”
কোন উত্তর নেই। যেন কে কাকে বলছে! যেমন বসেছিলেন তেমনি বসে রইলেন।
তারপর দাদামশাই বলতেন, “চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না, দিদিমণি! গোরা দুটো ততক্ষণে রাস্তা পার হয়ে এদিকে এসে পড়েছে। সামনেই পড়ল একটা বিহারি—হয়তো কুলি-কামিনের কাজ ধরার জন্য জেটিতে এসেছিল—দিল তার পেটে ধাঁই করে এক ঘুষি বসিয়ে। ‘আরে রাম!’ বলে ঠিকরে একদিকে গিয়ে পড়ল লোকটা।
কী চেহারা মাতাল দুটোর! কাছে এসে পড়েছে, আমি কাঠ হয়ে চেয়ে দেখছি—দশটা বাঘে খেয়ে কুলাতে পারবে না যেন, এমনি তাগড়াই জোয়ান। ঘাড় তো নয়, ঠিক বৃষস্কন্ধ যাকে বলে। ইয়া হাতের কবজি! দেখছ তো আমাকে, দশজন বাঙালির মধ্যে দাঁড়ালে লোকে ফিরে তাকিয়ে বলে—‘মশাইয়ের স্বাস্থ্যখানা দেখার মত।’ কিন্তু আমি তাদের কাছে একটা পোকাছানা। তার উপর স্কচ হুইস্কি খেয়েছে নির্জলা—রক্ত ফেটে বেরোচ্ছে চোখে-মুখে, একটা মানুষ যেন পাঁচটা হয়েছে ফুলে। গাঁ-গাঁ করে তেড়ে আসছে আমাদের ঘাটের দিকেই।
সেলর তো, বড় কঠোর, বড় শুষ্ক জীবন ওদের। ডাঙায় নামলেই তাই পণ্ড হয়ে যায় ওরা। দাপাদাপি না করে পারে না। তোমায় বলব কী ভাই, বুকের রক্ত আমার জল হয়ে গেল। ঠাকুরকে ডেকে তোলার আর সময় নেই। বেটারা দেখেছে দুটো নেটিভ আছে গঙ্গার ধারে, মেরে হাতের সুখ করে নেবে। বুনো মোষের মত গোঁ-ভরে সোজা এই দিকেই আসছে আর সে কী যাচ্ছেতাই খিস্তি করছে।”
নিরুপায়ে চারদিক অন্ধকার দেখেন ফণীবাবু। ঠাকুরের জন্য মার খেতে তাঁর আপত্তি ছিল না। কিন্তু তবুও বাঁচাতে পারবেন না তাঁকে—এই আফসোস। গুরুচরণ বোধহয় গাড়ি নিয়ে পালাবে, কখনই নেমে আসবে না সাহায্য করতে—যা লোক ও!
এল! এল!
আস্তিন গুটিয়ে, ছাতি ফুলিয়ে ফণীবাবুও রুখে দাঁড়িয়েছেন। তারই মধ্যে দেখছেন, ঘাটের শেষ সিঁড়িতে নিশ্চল হয়ে বসে আছেন একজন—যেন পাথরেরই ঠাকুর। রাগ, বিরক্তি যত হচ্ছে, সেই সঙ্গে একটা সশ্রদ্ধ বিস্ময়। লোকটা কি? দাদামশাই বলতেন, “ভাবলাম humbug না সত্যিই যোগী—বুঝতে পারলাম না বাবা! বেশি ভাবার সময়ও ছিল না। ওরা দুটো তখন ঘাটের সিঁড়িতে পা দিয়েছে। ত্বরিতে ভেবে নিচ্ছি, একবার কি মিষ্টি কথায় নিরস্ত করতে যাব, না প্রথমেই হাতাহাতি করব? হাতাহাতিতে যে পারব না সেটা দিনের আলোর মত দেখতে পাচ্ছি।”
এমন সময় ওদের সেই বুটের শব্দ আর মত্ত কণ্ঠের প্রলাপেই বোধহয় সম্বিৎ ফিরল অন্যজনের।
যৌবনে অভিনয়ের সখ ছিল দাদামশাইয়ের। গঙ্গার ঘাটের সেই একাঙ্ক নাটকটা তিনি একাই চমৎকার অভিনয় করে দেখাতেন আমাদের। মাতাল দুটো ঠিক ফণীবাবুর এক সিঁড়ি উপরে তখন। চকিতে ঘাড় ফিরিয়ে একবার তাকালেন ঠাকুর।
দাদামশাই বলতেন, “সেই ঝুঁটিবাঁধা চুল আর দাড়ি-গোঁফে ঢাকা মুখ, তার উপর নির্বিকার অতি প্রশান্ত গম্ভীর একটা ভাব। ঘাড় ফিরিয়ে যে তাকালেন, যেন খোঁচা খেয়ে মাথা তুলে চাইল বনের ঘুমন্ত সিংহ। দুনিয়ার কাউকে পরোয়া করে না—এমনই ভঙ্গি।
বলব কী দিদিমণি—একটার হাতে একটা খালি বোতল, অন্যটার হাতে আধাভর্তি বোতল একটা; ওই বোতল মাথায় ভাঙবে আমাদের—সেই মতলবে ঝড়ের মত আসছে। ঠাকুর ফিরে চাওয়ামাত্র প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে সচল ইঞ্জিন থেমে যাবার মত ঠিক যেন ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল দুজনে—একেবারে dead stop!”
এখনও চোখে ভাসে দাদামশাইয়ের বর্ণনা। মাতাল দুই গোরা বিস্ফারিত চোখে একটু ঘাড় ঝুঁকিয়ে দেখছে ঠাকুরকে। তিনি কিন্তু একবার চেয়েই আবার যেমন ছিলেন তেমনি বসে আছেন গঙ্গার দিকে মুখ করে।
ঠাকুর ফিরে চাওয়া মাত্র একজন বলে উঠেছিল, “Oh!” তারপর বিড়বিড় করে কী বলাবলি করল দুটোতে ফণীবাবু বুঝতে পারলেন না। খুব আশ্চর্য কিছু দেখে ভয় পেলে মানুষ যেমন উৎকণ্ঠ হয়ে তাকিয়ে থাকে, কয়েক সেকেন্ড তেমনি হতচকিত ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে পরক্ষণে পিছন ফিরে সিঁড়ি ভাঙতে লাগল মাতাল দুটো। ঘাটের উপরে উঠেই আবার আগের মত গালিগালাজ করতে করতে আর একদিকে ধাওয়া করল তারা। ফণীবাবু স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
এ প্রসঙ্গে যোগেশ্বরদার (গাঙ্গুলী) লেখা একটা ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। সেও কলকাতাতেই ঘটেছিল। গড়ের মাঠে সেদিন প্রসিদ্ধ দুটি দলের খেলা। ঠাকুরকে নিয়ে কোনও এক গুরুভাই (রাজাসাহেব, ফণীবাবু না আর কেউ—যোগেশ্বরদা নাম দেননি) গঙ্গার ধারে বেড়াতে এসেছিলেন। কী খেয়াল হল, মোটর থামিয়ে ঠাকুরও মাঠের এক পাশে নেমে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে লাগলেন।
এমন সময় অত্যধিক ভিড়ের চাপ হওয়ায় ঘোড়সওয়ার দুই সার্জেন্ট মাঠের এদিকে বিশৃঙ্খলা ঘটবার ভয়ে ঘোড়া থেকে নেমে ব্যাটন হাতে এলোপাথাড়ি পিটাতে আরম্ভ করল। সেই সঙ্গে কিল, চড়, ঘুষিও যে না চালাচ্ছে তা নয়। যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে।
ভিড়ের জন্য ঠাকুরের সঙ্গী যিনি, তিনি প্রথমটা সার্জেন্টের উপস্থিতি দেখতে পাননি। সামনের মানুষগুলি হঠাৎ ছিটকে সরে যেতে ব্যাটন হাতে দুই লালমুখোকে তিনি দেখতে পেলেন। তখন আর সরে যাওয়ার সময় নেই—এত কাছে এসে পড়েছে দু’জন!
এদিকে দু’হাতে কিল-চড়-চাবুক চালাতে চালাতে ঠাকুরের সামনাসামনি এসে পড়েই সার্জেন্ট দুটি থমকে দাঁড়িয়ে গেল। একে অপরকে বলল, “He is a gentleman!” অন্যজন সায় দিল, “Oh, yes!”
তারপর দু’জনেই ঘুরে অন্যদিকে চলে গেল। ভদ্রলোক (“gentleman!”) যেমন খেলা দেখছিলেন, তেমনি দেখতেই লাগলেন!
দাদামশাই বলেছিলেন, “একদিন হাওড়া কোর্টের বার-লাইব্রেরিতে উকিলদের মধ্যে তর্ক উঠেছিল—প্রকৃত সাধু চেনা যায় কী করে? নানা জনে নানা কথা বলছে, আমি চুপ করে আছি। শেষে হেম ঘোষ (হেমচন্দ্র ঘোষ, গুরুভ্রাতা) বলে, ‘কিহে, তুমি চুপচাপ কেন? বল কিছু।’
তখন আমি বলেছিলাম, ‘দেখ, সাধু পরখ করতে চাও যদি, তো একটা খোলা জায়গায়—এই ধর কোনও মাঠে কি সমুদ্রের ধারে—সার সার সাধুদের বসিয়ে একটা বাঘ ছেড়ে দাও। ওর মধ্যে যে উঠে পালাবে না, জানবে সে-ই ঠিক সাধু। সময় না হলে বাঘেও ছোঁয় না—এই জ্ঞান বা ভগবদ্বিশ্বাস তার পাকা হয়ে গেছে জানবে। মৃত্যুভয় জয় করেছে যে, তাকে বলি সাধু।’
হইহই করে উঠল সবাই, বললে, ‘এ কি হয়?’
আমি দম্ভ করে বলেছিলাম, ‘হয়—আমি চোখে দেখেছি।’ তারপর বললাম বস্তার স্টেটে যাওয়ার পথে ইন্দ্রাবতী নদীর ধারে সেই অভিজ্ঞতা আর এই প্রিন্সেপ ঘাটের ব্যাপারটা। সবাই হাঁ হয়ে গেল শুনে, বললে, ‘তোর গুরুকে একদিন দেখা ফণী!’
আমি বললাম, ‘সখ থাকে নিজে দেখ গিয়ে। আমার বয়ে গেছে।’”
— নীলাচলে ঠাকুর নিগমানন্দ
✍️ নারায়ণী দেবী (লীলা)
#জয়গুরু #শ্রীশ্রীঠাকুর

Address

Rangpur, Dhaka
Rangpur

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Swami Nigamananda.bd posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share