26/07/2015
গ্রামের ভৌতিক কাহিনী ।। একজন জঙ্গল
মোহনপুর গ্রামের পুবদিক জুড়ে জেলেপাড়া। জেলেপাড়ার
ভেতর থেকে বিলাপ করে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে।
ভাসান আলীর পাঁচ বছর বয়সী ছেলে জঙ্গল পানিতে ডুবে
মারা গেছে। কখন কিভাবে নদীর পানিতে পড়ে গিয়েছিল
তা কেউ বলতে পারে না। সে প্রায় একা একা আপনমনে
নদীরপাড় ঘেঁষে সাদা কাশফুলের বনে ছুটাছুটি করে খেলা
করতো। জন্মের পর থেকেই ছেলেটা কেমন যেন একটু চুপচাপ
আর চাপা স্বভাবের। আশপাশের সমবয়সী কারও সাথে
মিশতে পারতো না। কথাও তেমন একটা বলতে শোনা যেত
না। ভাসান আর আম্বিয়ার ঘরে দশ বছর পরে জঙ্গল আসে।
অনেক তাবিজ তুমা, ওঝা কবিরাজের ঝাড় ফুক আরও কতকিছুর
পর তাদের আধার ঘরে চাঁদের বাতি। এক কবিরাজের
কথামতো আম্বিয়াকে অমাবস্যার রাতে তিন রাস্তার
মোড়ে তিন নদীর মেশানো পানিতে গোসল করতে
হয়েছিল। তাবিজ আর কবজে গলা মাজা সব ভরে গিয়েছিল।
এক দরবেশ ছেলেপুলে হলে মানুষের নামে নাম না রাখার
পরামর্শ দিয়েছিল। তাই ওরা দরবেশের কথামতো ছেলের
নাম জঙ্গল রেখেছিল।
সকালে ভাসান আলি জাল আর নাও নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার
পর বাবার পিছু পিছু সেও বেরিয়ে যায়। তার মা আম্বিয়া
দুই বাড়ি পরে মাঠে মাছ শুকাতে যায়। দুপুরে একবার জঙ্গল
ঘরে আসে পান্তা খেতে। তাই আম্বিয়াও দুপুর নাগাদ
বাড়ি ফিরে আসে জঙ্গলকে খাবার দিতে। আম্বিয়া অনেক
করে জঙ্গলকে তার সাথে সাথে রাখতে চায়। কিন্তু
ছেলেটা তার কারও সাথে মিশে খেলতে চায় না। বাপের
সাথে মাঝে মাঝে নৌকায় মাছ ধরতে নিয়ে গেলে চুপচাপ
মনমরা হয়ে বসে থাকে। তাই ভাসানও বেশি একটা তাকে
সাথে নেয় না।
জঙ্গল জন্মানোর পর তার গলা আর কোমরেও তাবিজে আর
কবজে ভরে যায়। কিন্তু সে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে নিজে
নিজেই সুযোগ পেলে তাবিজ কবজগুলো ছিঁড়ে নদীতে
ফেলে দিতো। গ্রামের লোকেরা জঙ্গলকে নিয়ে আদি
ভৌতিক সব গল্প বানাতো। গ্রামের ঊনআশি বছর বয়সের
কুঁজোবুড়ী সময় সুযোগ পেলেই জঙ্গলের গতিবিধি অনুসরণ
করে মুখরোচক গল্প বানিয়ে এ পাড়া ও পাড়া বলে
বেড়াতো। ‘বউয়েরা জঙ্গলের কাহিনী কিছু শুনছো?’ সবাই
সমস্বরে বলে উঠতো, ‘কী কাহিনী গো নানী?’
‘পোলাডারে দেখলাম ভরদুপুরে নদীরপাড়ে কাশবনে বইয়া
কাঁচামাছ চিবাইয়া খাইতেছে। আমারে দেইহা কইলো, “ও
বড় মা খাইয়া দেখবানি একটা মাছ?” বইলা একটা জেতা
চাপিলা আমার দিকে ছুঁইড়া দিলো। ওই পোলার ঘাড়ে
মেছো ভূত আছে। তোমগো পোলাপানগোরে আলগাইয়া
রাইখো।’
গ্রামের নশু পাগলাও ফাঁক ফোকর-মতো গল্প বানাতে
ওস্তাদ। ‘জঙ্গলের খবর কিছু জানো মিয়ারা? পোলাডারে
দেইখা আইলাম নদীরপাড়ে কার লগে জানি বিড়বিড় কইরা
কথা কয়। আশপাশ চাইয়া দেহি কেউ নাই। আর কথার
ভাষাও কিছু বুঝবার পারলাম না। মনে লয় জ্বিন-পরীর আছর
হইছে।’ গ্রামের মেয়ে-পুরুষরাও ভাসান আর আম্বিয়াকে
এসব গুজব নিয়া খুব ত্যক্ত করে। জঙ্গলকে এসব নিয়ে কিছু
জিজ্ঞাস করলে সব সময় না সূচক মাথা নাড়ে। ভাসান
অন্যদের পরামর্শ মতে ওঝা কবিরাজ করেছে।
একবার এক ওঝা জঙ্গলকে উঠোনের পিঁড়িতে বসিয়ে গ্রাম
সুদ্ধ মানুষের সামনে খালি গায়ে সারা গায়ে ঝাঁটার
বাড়ি মেরে ভূত নামিয়েছে। জঙ্গলের সাড়া গা কেটে
ফুলে রক্তারক্তি হয়ে জ্বর উঠে গেছে। গ্রামের মসজিদের
ইমাম সাহেব ভাসান আম্বিয়া আর গ্রামের সবাইকে
আপ্রাণ বুঝিয়েছে ভূত-প্রেত বলে কিছু নাই। এগুলো সব
বানানো আর আজগুবি কথা। ছেলেটা একটু চুপচাপ আর চাপা
স্বভাবের এই যা। কিন্তু কে শোনে কার কথা! গত রাতেও
পড়শীদের বানানো গুজবে কান দিয়ে বাবা মা দুজনে
মিলে জঙ্গলকে খুব মারধর করেছে। আর যেন নদীরপাড়ে
যেতে না পারে সেজন্য সারাদিন ঘরে শিকল তুলে আটকে
রেখেছে। বিকালে আম্বিয়া মাছ শুকানোর কাজ শেষে
বাড়ি ফিরে এসে শিকল নামিয়ে দরজা খুলে দেয়। তারপর
হেঁসেলে গিয়ে জঙ্গল আর তার বাবার জন্য ভাত চড়িয়ে
দেয়। আশেপাশে পোলাডারে দেখতে না পেয়ে ভাবে
হয়তো কাছে পিঠে কোথাও আছে। তার রান্না সেরে
গোসল করতে করতে বেলা গড়িয়ে যায়। সন্ধ্যার আগে আগে
ভাসান ফিরে এলে আম্বিয়া সব খুলে বলে।
তাড়াতাড়ি দুজনে নদীর ঘাটের দিকে রওনা হয়। খবর পেয়ে
গ্রামের সব মানুষ নদীর পাড়ে জড়ো হয়। কেউ কেউ নৌকা
আর জাল নিয়ে নেমে পড়ে। রাতে চাঁদের আলোয় মাঝ
নদীতে জেলেরা জঙ্গলের লাশ খুঁজে পায়। লাশ দেখে
গ্রামবাসিরা থমকে যায়। ইমাম সাহেব এগিয়ে এসে
দাওয়া থেকে জঙ্গলের লাশ কোলে তুলে নেয়। তারপর
গোসল করিয়ে জানাজার জন্য মসজিদে নিয়ে যায়।
কুঁজোবুড়ী আর নশু পাগলা দাওয়ার এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে
বসে থাকে।
জানাজা শেষে ভাসান তার সন্তানের লাশ তুলে নেয়।
কবরে নেমে সন্তানের ভারী লাশ পরম যত্নে শুইয়ে দেয়।
জগত সংসারে বেঁচে থাকার আগ্রহ হারিয়ে সবকিছু তার
কাছে অর্থহীন মনে হয়। সন্তান হারানোর বেদনা তাকে
বাকিটা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে।