30/10/2022
কমিশন-ঘুস ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ মেলে না
সন্দ্বীপে বৈদ্যুতিক মিটার ও খাম্বা বাণিজ্য
এক বছরে সিন্ডিকেটের পকেটে ৫০ কোটি টাকা!
* একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি পেতে ২০ হাজার টাকা, মিটার ১০-১৫ হাজার টাকা, বিরোধী দলের গ্রাহক হলে দ্বিগুণ
-
মুজিব মাসুদ, সন্দ্বীপ থেকে ফিরে ।। দৈনিক যুগান্তর ।। ৩০ অক্টোবর ২০২২
-
চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপে কমিশন ও ঘুস ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ মেলে না। বৈদ্যুতিক খুঁটি আর মিটার পেতেও গ্রাহককে মোটা অঙ্কের কমিশন গুনতে হচ্ছে। গত এক বছরে ক্ষমতাসীন দলের এক এমপির নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট এই ‘খাম্বা বাণিজ্য’ করে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা পকেটস্থ করেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশব্যাপী শতভাগ বিদ্যুতায়নের সাফল্যকে ম্লান করে দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের এই এমপির খাম্বা বাণিজ্য। শুধু বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন নয়, প্রতিটি মিটার সংযোগ দেওয়ার নামেও হয়েছে ভয়ংকর বাণিজ্য।
সিন্ডিকেটকে টাকা না দিলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের বাড়িতে বৈদ্যুতিক খুঁটি দেওয়া হতো না। মিলত না বৈদ্যুতিক মিটার। ক্ষমতাসীন দলের ওই এমপি ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের ভয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পর্যন্ত তটস্থ থাকতেন। তাদের অভিযোগ-মূলত এই খাম্বা বাণিজ্যের কারণে এখনো শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্ভব হয়নি সাগরবেষ্টিত এই দ্বীপে। অথচ সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে সাগরের নিচ দিয়ে এই দ্বীপে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দিয়েছে সরকার। জাতীয় গ্রিড থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে এখানে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রামের এক এমপির ইশারা ছাড়া তারা একটি সংযোগও দিতে পারেননি। এমনকি বিদ্যুৎ সংযোগের আগে জরিপ পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি তাদের। যুগান্তরের নিজস্ব অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ যুগান্তরকে বলেন, ১৪৪ কোটি টাকা খরচ করে সন্দ্বীপে সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে সাগরের নিচ দিয়ে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই দ্বীপের বিদ্যুৎ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন। কেউ যদি এখানে সংযোগ বাণিজ্য ও খুঁটি বাণিজ্য করে, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এত সুবিধা থাকার পরও সন্দ্বীপে এখনো শতভাগ বিদ্যুতায়ন হচ্ছে না কেন-জানতে চাইলে নসরুল হামিদ বলেন, সন্দ্বীপে বিদ্যুতের অবস্থা জানাতে স্থানীয় এমপি মাহফুজুর রহমান মিতাকে দুই দফা চিঠি পাঠানো হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে। কিন্তু কোনো চিঠির উত্তর পাওয়া যায়নি। স্থানীয়ভাবে সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলে অনেক কিছু জানা সম্ভব হয় না।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা যুগান্তরকে বলেন, সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ সংযোগ বা খুঁটি নিয়ে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি। তার নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আমার নির্বাচনি এলাকা সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো ও আইনশৃঙ্খলাসহ প্রতিটি সেক্টরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। সন্দ্বীপ আজ উন্নয়নের মডেল। সরকারবিরোধী একটি গোষ্ঠীর অপপ্রচারের মাধ্যমে উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রা কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না।
সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন গ্রাহক ও সংযোগপ্রত্যাশীরা।
তারা জানান, সন্দ্বীপে ওই সিন্ডিকেটের কাছ থেকে প্রতিটি বৈদ্যুতিক খুঁটি পেতে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে দিতে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রতিটি মিটার সংযোগের জন্য দিতে হয়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এই হিসাব ছিল ক্ষমতাসীন দলের গ্রাহকদের জন্য। যদি কোনো গ্রাহক অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের দিতে হয়েছে দ্বিগুণ টাকা। এই খাম্বা বাণিজ্যের টাকা উঠানোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন জসিম উদ্দিন নামে স্থানীয় এক ইউপি চেয়ারম্যান।
অভিযোগ আছে, মেসার্স হাই অ্যান্ড কোং নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জোগসাজশে এ বাণিজ্য করে সিন্ডিকেট।
জানা গেছে, এ ঠিকাদারের মাধ্যমে কমপক্ষে ৯ হাজার বৈদ্যুতিক মিটার সংযোগ দেয়া হয়। প্রতিটি মিটার সংযোগ থেকে সিন্ডিকেট গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা কমিশন বাণিজ্য করে।
চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের ২০ হাজার পরিবারকে বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আনতে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের কাজ শেষ হয় ২০১৮ সালের নভেম্বরে। এরপর দেড় বছরের বেশি সময় পেরোলেও এখন পর্যন্ত সংযোগ দেওয়া হয়েছে ২০ হাজার গ্রাহককে।
জানা যায়, বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় পাঁচ লাখ নতুন সংযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এক মেগা প্রকল্পের অধীনে সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রথমবারের মতো সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা হয় দ্বীপ উপজেলাটিকে।
গ্রাহকদের অভিযোগ-সন্দ্বীপ জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের সংযোগ পেতে নির্ধারিত অর্থের চেয়েও বেশি অঙ্কের টাকা দিতে হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিটি মিটার স্থাপনে আড়াই হাজার টাকা খরচ হওয়ার কথা থাকলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
এসব ঘটনায় সন্দ্বীপ বিদ্যুৎ অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সরিয়ে দেওয়া হলেও বাস্তবে অনিয়ম থামেনি। কারণ হিসাবে জানা যায়, অনিয়মের মূল হোতাদের কেউই বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মী ছিলেন না। অভিযুক্ত সবাই ছিলেন স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী সদস্য।
সন্দ্বীপের ভুক্তভোগী একাধিক বাসিন্দা বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যোগসাজশে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন, সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে দফায় দফায় অর্থ আদায় করছে। মূল সড়ক থেকে গ্রামাঞ্চলের সড়কগুলোয় বৈদ্যুতিক খুঁটি বসানোর ক্ষেত্রে দুদফায় অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে খুঁটিপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা।
বিদ্যুৎ সংযোগের এসব অনিয়ম নিয়ে একাধিকবার স্থানীয়রা আন্দোলনে নামলেও বিদ্যুৎ সংযোগ ও খুঁটি বসানোর কাজ বন্ধ রাখার মাধ্যমে আগ্রহী গ্রাহকদের অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আবদুর রহিম যুগান্তরকে অভিযোগ করে বলেন, বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার জন্য প্রথম পর্যায়ে ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের এক ইউপি চেয়ারম্যান। বর্তমানে প্রতিটি খুঁটি বসাতে আরও ১৫ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে। আমরা স্থানীয়ভাবে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে খুঁটি স্থাপনের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সম্প্রতি সন্দ্বীপের বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের পক্ষে উপজেলায় নিযুক্ত পিডিবির আবাসিক প্রকৌশলীর কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, সংশ্লিষ্টরা সঞ্চালন লাইন স্থাপনের জন্য খুঁটিপ্রতি নগদ অর্থের দাবি তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে। বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব নেতাকর্মী ইউনিয়নের ১৫টি পরিবারের কাছ থেকে এ বাবদ ৪০ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছেন। দ্বীপের অন্যান্য এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি বসানোর জন্য খুঁটিপ্রতি ১৫-২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করে পিডিবির একজন আবাসিক প্রকৌশলী যুগান্তরকে বলেন, নতুন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপনের কাজটি হচ্ছে চলমান প্রকল্পের আওতায়। ওই প্রকল্পের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের সম্পর্ক নেই।
তবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবার আগে বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে। এ কারণে কেউ কেউ না চাইলেও ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পে কর্মরতদের নিয়মবহির্ভূত অর্থ দেওয়ার বিষয়টি শুনেছি।
পিডিবি সূত্র জানায়, সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ সুবিধা প্রদান প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৪৪ কোটি টাকা। সাবমেরিন কেবল স্থাপনের প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছিল ২০১৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর।
শুধু বৈদ্যুতিক সংযোগ কিংবা খুঁটি বাণিজ্য নয়, এই সিন্ডিকেট সরকারি সোলার প্যানেল বসানোর নামেও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অভিযোগ আছে, গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত পরিবারকে প্রতি সোলার প্যানেলের জন্য ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ঘুস দিতে হয়েছে এই সিন্ডিকেটকে।