31/08/2026
দেলাওয়ার হোসেন: কারাগার থেকে ঠাকুরগাঁও-১-এর সম্ভাব্য এমপিঃ
একজন ছাত্রনেতার গল্প—যার রাজনৈতিক পথচলায় আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব, কেন্দ্রীয় ছাত্ররাজনীতি, গ্রেপ্তার, দীর্ঘ রিমান্ড ও কারাজীবন। আর সেই মানুষটিই আজ আবার দাঁড়িয়েছেন ঠাকুরগাঁও-১-এর নির্বাচনী মাঠে।
৩০ আগস্ট ২০২৬। ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের সমাবেশে ঘোষণা হলো—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন। গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনেও এই আসনে তিনিই ছিলেন ঐক্যের প্রার্থী।
কিন্তু এবারের গল্পটি শুধু একজন প্রার্থীর নয়। এটি একই সঙ্গে একজন সাবেক ছাত্রনেতার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকা এবং একটি আসনে নতুন করে ভোটের সমীকরণ তৈরির গল্প।
শুরুটা ছাত্ররাজনীতি দিয়ে.....
দেলাওয়ার হোসেনের শিক্ষাজীবন শুরু শালেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৯৮ সালে বালাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০০ সালে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ইসলামী ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন।
ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই সাংগঠনিক রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। স্থানীয় শাখা থেকে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ, এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়—ধাপে ধাপে দায়িত্ব বাড়তে থাকে।
২০০৭-০৮ এবং ২০০৯ সালের জুন পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করার পর ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক, ২০১০ সালে কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক এবং ২০১১ সালে সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে ২০১২-১৩ সেশনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি হন।
দেলাওয়ার হোসেনের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় আসে ২০১৩ সালে। ছাত্রশিবিরের সভাপতি থাকা অবস্থায় তিনি গ্রেপ্তার হন। তাকে একটানা ৫৭ দিন রিমান্ড ও প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর কারাগারে কাটাতে হয়। তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ১০৭টি মামলা দেওয়া হয়েছিল।
কারাগারের অধ্যায় শেষ করে তিনি ধীরে ধীরে জামায়াতের সাংগঠনিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তির আরেকটি দিক হলো—প্রতিপক্ষের প্রতি প্রকাশ্য সৌজন্য। ২০২৬ সালের নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের কাছে পরাজিত হওয়ার পরও তাঁকে অভিনন্দন জানানোর বিষয়টি তাঁর রাজনৈতিক আচরণের একটি আলোচিত দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও তিনি ফখরুলকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, “প্রতিযোগী” হিসেবে দেখার কথা বলেছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট নিবন্ধিত ভোটার ছিল ৫,১১,৬২৯ জন।
ফলাফল—
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর — ২,৩৮,৮৩৬ ভোট
দেলাওয়ার হোসেন — ১,৪১,০১৭ ভোট
ফারাক ৯৭,৮১৯ ভোট।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য হয়েছে এবং সেই শূন্য আসনের উপনির্বাচনেই আবার দেলাওয়ারকে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী করা হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনে দেলাওয়ারের সামনে ছিলেন বিএনপির মহাসচিবের মতো একজন হেভিওয়েট নেতা। এবার তাঁকে লড়তে হবে বিএনপির নতুন প্রার্থীর বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে দেলাওয়ারের সবচেয়ে বড় সুবিধা—তাঁকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হচ্ছে না।
একবার তিনি ১,৪১,০১৭ ভোট পেয়েছেন। এবার তাঁর সামনে লক্ষ্য শুধু আগের ভোট ধরে রাখা নয়; বরং সেই ভোটের সঙ্গে নতুন ভোট যোগ করা।
কারাগারের অন্ধকার থেকে রাজনীতির নির্বাচনী মঞ্চে ফিরে আসা এই মানুষটির সামনে তাই এবার এক নতুন অধ্যায়।
পরাজিত প্রার্থী হিসেবে নয়—নিজের আগের ভোটকে ভিত্তি করে বিজয়ের জন্য লড়াই করা এক পরীক্ষিত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে।
৩০ আগস্টের প্রার্থী ঘোষণার পর ঠাকুরগাঁও-১-এর রাজনীতিতে প্রশ্নটি এখন একটাই—
১,৪১,০১৭ থেকে কি দেলাওয়ার হোসেন এবার বিজয়ের সংখ্যায় পৌঁছাতে পারবেন?
উত্তর দেবে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ—আর সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে,
কারাগার পেরিয়ে আসা এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা শেষ পর্যন্ত সংসদের দরজায় পৌঁছায় কি না।
#ঠাকুরগাঁও #উপনির্বাচন #দাঁড়িপাল্লা #জামায়াত #বিএনপি #মির্জা_ফখরুল #দেলাওয়ার_হোসেন #শিবির #সংসদ