21/06/2024
🐍বিষয়: রাসেল'স ভাইপাার/চন্দ্রবোড়া সাপ
🐍রাসেল'স ভাইপার/চন্দ্রবোড়া সাপে কাটলে কি করবেন?
🔲 সর্পদংশনের পর প্রাথমিক যে জরুরী করনীয় গুলো করা আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় -
◾প্রথমত রোগীকে আতঙ্কিত না হতে পরামর্শ দেয়া, দংশিত ব্যক্তিকে আশ্বস্থ করতে হবে যে দেশের হাসপাতাল গুলোতে বিনামূল্যে সর্প চিকিৎসা হয়, যথাসময়ে চিকিৎসা নিলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠছে।
◾দংশিত বাহুর (হাত-পা) নিশ্চল অবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং দংশিত ব্যাক্তিকে অবশ্যই স্থির থাকতে হবে দেহ নড়াচড়া করা যাবে না। যদি নিম্নবাহু পায়ে দংশন করে তবে বসে পড়তে হবে হাটাচলা করা যাবে না।যদি উর্ধবাহু হাতে দংশন করে, তবে হাত নড়াচড়া করা যাবে না। অনেকটা হাত-পা ভাংলে যেভাবে স্থির রেখে গামছা-কাপড় দিয়ে হাত ঝুলিয়ে দেয়া হয় যাতে করে নড়াচড়া না করতে পারে।
◾কোন প্রকার বাঁধ দেয়া ও কাটাছেঁড়া করা যাবে না।
◾যতদ্রুত সম্ভব হাত-পায়ে লাগানো চুড়ি, ঘড়ি, আংটি, নূপুর, তাবীজ, তাগা ইত্যাদি খুলে ফেলা
◾রোগীকে এক পাশে(বাম দিকে) কাত হয়ে রাখা।
◾অতিদ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে অ্যাম্বুলেন্স কিংবা মটর বাইকের সাহায্যে।
◾ যদি শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় তবে মুখ দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে প্রয়োজন হলে।
⭕ সর্পদংশনের পর সাপ মারা ও ধরার পিছনে অযথা সময় নষ্ট করা যাবে না কোন প্রয়োজন নেই।
⭕খালি হাতে সাপ ধরা যাবে না মৃত হলেও (সাপ চিনতে না পারলে এবং সাপ না নিয়ে গেলে ও চিকিৎসা চলবে অযথা এই বিষয়ে চিন্তত হওয়ার প্রোয়োজন নেই) যদি দংশন করা সাপটি দূর্ঘটনাবশত মারা হয়ে থাকে পূর্বেই তাহলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলে ভালো কারন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে প্রোয়োজনীয় ব্যবস্থা করে নিতে সর্প চিকিৎসার ক্ষেত্রে সাপটি শনাক্ত করা গেলে।
🟥🟥প্রাথমিকভাবে এই পদক্ষেপ গুলো নেয়ার উদ্দেশ্যে-
🔷যাতে করে দেহ কোষে বিষের উপস্থিতি যথাসম্ভব খুবই মন্থর গতিতে ছড়ায়।
❇️ মৃতু ঝুঁকি ও হাসপাতালে যাওয়ার আগে শারীরিক জটিলতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা।
❇️ বিষ প্রয়োগের পর বিপদজনক লক্ষণ গুলো কমিয়ে আনা ও নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা করা
❇️ সর্প দংশনের ক্ষতি হতে রোগীর জীবন রক্ষা করা।
🚫 ওঝার কাছে গিয়ে সময় নষ্ট করে স্বেচ্ছায় মৃত্যু ডেকে না আনা।
🚫 না জেনে অন্যের কথা শুনে প্রচলিত কুসংস্কার সম্পর্কিত চিকিৎসা পন্থা অবলম্বন না করা এবং ওঝার পিছনে সময় নষ্ট করে মৃত্যুর ঝুকি বাড়িয়ে না তোলা। যথাসময়ে ব্যবস্থা না নিতে পারলে অবস্থা সংকটাপন্ন হতে পারে।কাজেই এক সেকেন্ড ও অযথা সময় নষ্ট করা যাবেনা কারন চিকিৎসার জন্য সর্পদংশনের পরবর্তী প্রতিটি সময়ই অতিমূল্যবান।
🔲 চিকিৎসা সম্পর্কিত বিস্তারিত -
সম্প্রতি একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ছে যে চন্দ্রবোড়া সাপের চিকিৎসা নেই তথ্যটি সত্য নয়। চন্দ্রবোড়া সাপের দংশন মানেই মৃত্যু নয়।
ভারতের বিগ ফোর (Russell’s Viper, Common Krait, Spectacled Cobra ,Saw scaled Viper) সাপের বিষদিয়ে তৈরী প্রতিষেধক (পলিভ্যালেন্ট এন্টিভেনম) যেটি আমাদের দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কিছু জেলা সদর হাসপাতাল ও কিছু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরবরাহ থাকে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসার জন্য যা ভারত থেকে আমদানি করা হয়। যেহতু Russell’s Viper চন্দ্রবোড়া সাপের বিষের উপদান দিয়ে তৈরী প্রতিষেধক তাই সেটা কার্যকর আমাদের দেশে চন্দ্রবোড়া সাপের দংশন হলে। ডোজ প্রতি মূল্য ১০ হাজারের অধিক এটি বিনামূল্যে প্রদান করা হয় সাপেকাটা রোগীদের জন্য। তাই ওঝার কাছে গিয়ে সময় নষ্ট না করে যথাসময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলেই ডাক্তারদের আন্তরিক চেষ্টায় অনেক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে। তাই সাপে কাটলেই কাল বিলম্ব না করেই হাসপাতালে যাওয়া যেহতু বাঁচতে হলে অপশন একটা ই।
চন্দ্রবোড়া সাপের বিষক্রিয়ায় মূলত (Hemotoxic Effect) রক্তজনিত জটিলতা দেখা দেয় এছাড়াও রয়েছে কিছুটা (Neurotoxic Effect) তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মারাত্মক আকার ধারন করলে (Nefrotoxic Effect) কিডনি জনিত জটিলতা দেখা দেয়। চন্দ্রবোড়া সাপে কাটলে 24-72 ঘন্টা পর্যন্ত পর্যবেক্ষনে রক্ত পরীক্ষা (WBCT20) পজিটিভ ও উপসর্গ দেখা দিলেই কেবল প্রতিষেধক সহ আনুসাঙ্গিক চিকিৎসা দেয়া হয় প্রয়োজন অনুযায়ী।
🛑 চন্দ্রবোড়া সাপের দংশনে উপসর্গ -
◾দংশিত স্থান ফুলে যাওয়া সহ প্রচণ্ড ব্যথা পাওয়া।
◾চোখের পাতা পড়ে আসা।
◾মাড়ি দিয়ে রক্তপড়া।
◾রক্ত বমি হওয়া।
◾নাক দিয়ে রক্তপড়া।
◾কফ থুতু সাথে রক্ত বের হওয়া।
◾রক্তমল এবং প্রস্রাবের সাথে রক্ত বের হওয়া।
◾দংশিত ক্ষত স্থান দিয়ে ক্রমাগতভাবে রক্ত ঝরা।
◾এছাড়াও তীব্র ব্যাথা অনুভব হওয়া দংশিত স্থান সংলগ্ন বাহুতে। ফোস্কা পড়া।
🔲 চন্দ্রবোড়া সাপের দংশন থেকে বাঁচতে করনীয় -
🔘ধানকাটার মূহুর্তে প্রতিটি পদক্ষেপ সতর্কতার সহিত লক্ষ্য রাখা প্রয়োজনে লম্বা বাশ ব্যবহারে জায়গাটি দেখে নেয়া সাপের অবস্থান আছে কিনা।চন্দ্রবোড়া সাপের অনেকটা প্রেশার কুকারের ন্যায় শব্দেই অবস্থান বুঝতে পারবেন।
🔘কৃষিজমিতে এদের বিচরণ খুব বেশি, ইঁদুর এদের প্রধান খাদ্য তাই। সম্ভব হলে কৃষিকাজে গামবুট,হ্যান্ড গ্লাভস ইত্যাদি নিরাপত্তা মূলক সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা প্রয়োজনে কৃষি অধিদপ্তরের সহযোগিতা নিন।
🔘ধানক্ষেতে ইঁদুরের স্তুপকৃত মাটির ডিপিতে সাপ আছে কিনা দৃষ্টি রাখা।
🔘কোন গর্ত থাকলে অবশ্যই ভরাট করতে হবে যাতে করে গর্তে কোন ইঁদুর যাতে অবস্থান নিতে না পারে।
🔘খালি পায়ে হাঁটা যাবে না এবং চলার পথে অবশ্যই ঝোপঝাড় সম্পন্ন রাস্তা এড়িয়ে চলতে হবে।
🔘 চন্দ্রবোড়া সাপের দেহ বর্ণের সংমিশ্রণ ধানক্ষেত এবং ঝোপঝাড়ের সাথে মিশে থাকায় খুব সহজে আপনার নজরে আসবে না তাই হাটার সময় পথ চলতে চোখ খোলা রেখে চলতে হবে।
🔘মাছ ধরার সময় চাইয়ের ও জালের মধ্যে সাপ আছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে।
🔘স্তূপকৃত লাকড়ি,ইট-কাঠের টুকরো খুব সাবধানে উল্টানো। প্রয়োজনে লাঠি দিয়ে চেক করে নিন।
🔘বাসা-বাড়িতে খাবারের উচ্ছিষ্ট না ফেলা ,পোকামাকর নিধন ও অন্যান্য প্রানির প্রবেশ বন্ধ রাখা সহ গৃহপালিত প্রাণী (হাস-মুরগী-কবুতর) বাড়ির ভিতরে না রাখা।
🔘বাড়ির চারপাশ ঝোপঝাড় মুক্ত রাখা যাতে করে সাপ লুকিয়ে অবস্থান নিতে না পারে।
🔘 মশারী টানিয়ে বিছানার চতুর্পাশের গুজে দেওয়া ঘুমানো, সম্ভব হলে মেঝেতে না ঘুমানো।
🔘 যেখানে চন্দ্রবোড়া সাপর বিচরণ আছে সেখানে পথচলতে লাঠিদিয়ে নাড়িয়ে সম্ভব হলে শব্দ করে একটু দেখে শুনে চলা।
🔘 প্রয়োজনে বাড়ির চারিপাশে নেট দিয়ে রাখা যাতে করে সাপ প্রবেশ করতে না পারে।
🔲 পূর্ব প্রস্তুতি ও সতর্কতামূলক করনীয় -
চর অঞ্চলে বিশেষ করে নদী বাহিত এলাকায় চন্দ্রবোড়া সাপের বিচরণ বেড়েছে। মৃত্যু ঝুঁকি কমাতে কিছু সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমেই কেবল চন্দ্রবোড়া সাপের দংশন এড়িয়ে চলা সম্ভব।
◾প্রথমত নিকটস্থ হাসপাতালে সর্পচিকিৎসা হয় কিনা এন্টিভেনম সরবরাহ আছে কিনা খোঁজ নিয়ে রাখা। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ব্যবস্থা করা।
◾জরুরী পরিবহনের ব্যবস্থা রাখা।
🟥তথ্যসূত্র: সোসাইটি ফর স্নেক অ্যান্ড স্নেকবাইট অ্যাওয়ারনেস (থ্রিএসএ)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সহকারী গবেষক মো. রফিকুল ইসলাম।
(সংগৃহীত)