12/06/2026
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাংলাদেশ জাতীয় বাজেট: সামষ্টিক অর্থনৈতিক রূপান্তর ও বহুবিধ প্রভাবের বিশদ বিশ্লেষণ -
বাজেটের প্রধান লক্ষ্য, কৌশল ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ :
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আর্থিক খাতের নীতিগত দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় দূর করে একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করা হয়েছে । নতুন নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কর্তৃক উত্থাপিত এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো সামষ্টিক অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বাজারে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং সব শ্রেণির মানুষের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা । সরকার এই রূপান্তর প্রক্রিয়া চালু করতে মূলত এক বছর মেয়াদী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং মধ্যমেয়াদী টেকসই সমৃদ্ধি অর্জনের কৌশল গ্রহণ করেছে, যা দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম বাজেট পরিকল্পনা হিসেবে ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট কাঠামোর মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে ।
এই বাজেটের অন্যতম প্রধান সামষ্টিক লক্ষ্য হলো চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির হারকে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উন্নীত করে ৬.৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া । সরকার তার মধ্যমেয়াদী কাঠামোর অধীনে আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামাতে এবং প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে । বিগত আমলের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের কারণে দেশের ঋণ স্থায়িত্ব যে ঝুঁকির মুখে পড়েছে, তা মোকাবিলায় বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লক্ষ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় ৬ হাজার কোটি টাকা কম । এর মাধ্যমে বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান সচল রাখা এবং সুদের হারের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে ।
সরকার অতীতের ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে সরে এসে বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে চায়, যার ফলশ্রুতিতে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারবে । এই দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি । প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংগ্রহ করবে6 লক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা । এই রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর ফাঁকি রোধ এবং কর ব্যবস্থার সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়করণ বা অটোমেশনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে । একই সাথে ব্যবসা পরিচালনায় সরকারি কাজের অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও বিলম্ব পরিহারের জন্য দেশজুড়ে বিনিয়ন্ত্রণকরণ বা লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে সহজতর করার আইনি সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে ।
খাতভিত্তিক বরাদ্দ পরিবর্তন ও এর সামষ্টিক প্রভাব :
প্রস্তাবিত বাজেটে অনুৎপাদনশীল ব্যয় কমিয়ে টেকসই সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামো বিনির্মাণে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে । এর অংশ হিসেবে সরকারের পরিচালন ব্যয় পূর্ববর্তী বছরের ৭২.৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে এবং বিপরীতে মোট উন্নয়ন ব্যয়ের অনুপাত পূর্ববর্তী সংশোধিত বরাদ্দের ২৭.২৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে । এই বরাদ্দ পরিবর্তনের ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ যোগাযোগের মতো মৌলিক খাতসমূহ নজিরবিহীন নীতিগত অগ্রাধিকার লাভ করেছে ।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ পূর্ববর্তী অর্থবছরের ৮৭,২০৬ কোটি টাকা থেকে একলাফে বাড়িয়ে ১ লক্ষ ৩৬ thousand ৬০৬ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ । এই বিপুল বরাদ্দ বৃদ্ধির ফলে দেশের শিক্ষা কারিকুলামে বড় ধরনের রূপান্তর আসবে, যার আওতায় ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষা প্রবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর শিক্ষা পদ্ধতির বিকাশ এবং শিক্ষার্থীদের ভাষা ও তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞান বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে । এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবে দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী বৈশ্বিক কর্মবাজারের উপযোগী আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হবে ।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ পূর্ববর্তী সংশোধিত বাজেটের ৩৫,৪৭৭ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জিডিপির ১.০১ শতাংশ । এই বাড়তি বরাদ্দের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা সম্ভব হবে । এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছাবে এবং জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য মানুষের ঢাকা বা বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে ।
সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে ১ লক্ষ ৪৪,৩৩৮ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বিগত সংশোধিত বাজেটে ছিল ১ লক্ষ ২৬,৭৩১ কোটি টাকা । এই বরাদ্দ বৃদ্ধির ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে কর্মহীন নারী, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বলয় জোরদার হবে, যা সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসে এবং দেশের মানুষের পুষ্টির সুরক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখবে ।
পল্লী উন্নয়ন ও গ্রামীণ যোগাযোগ উন্নয়নে স্থানীয় সরকার ও সমবায় খাতে ৪১,৩৫২ কোটি টাকা এবং সামগ্রিক যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে ৬০,৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে । সড়ক ও রেলপথ আধুনিকায়নের পাশাপাশি নদী ও খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ১০,৫৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে । বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ খাতে ১৭,৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুতের জোগান বৃদ্ধি করবে এবং উৎপাদনশীল খাতের চাকা সচল রাখবে ।
কর, শুল্ক ও ভ্যাট সংক্রান্ত পরিবর্তনসমূহ :
প্রস্তাবিত বাজেটের একটি প্রধান বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হলো ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সাধারণ সীমা বিদ্যমান ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা । করদাতারা যাতে দীর্ঘমেয়াদী কর পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে পারেন, সেজন্য আগামী ৫ বছরের জন্য একটি প্রগতিশীল কর কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে করমুক্ত সীমা পর্যায়ক্রমে ৫ বছরে ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত হবে । নারী ও প্রবীণ করদাতাদের জন্য এই করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫ লক্ষ টাকা এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের জন্য এই সীমা ৫ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে ।
ব্যবসা পরিচালনায় নীতিগত নিশ্চয়তা প্রদান এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কর্পোরেট করের হার আগামী ৫ বছরের জন্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে । পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর করহার ২২.৫ শতাংশ এবং অতালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য ২৭.৫ শতাংশ বহাল থাকবে, যা সম্পূর্ণ লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হলে যথাক্রমে ২০ শতাংশ এবং ২৫ শতাংশে নেমে আসবে । এছাড়া, ছোট ব্যবসায়ীদের পদ্ধতিগত হয়রানি দূর করতে এবং এনবিআরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা বিলোপ করতে সারা দেশের এলাকাভিত্তিক ব্যবসা ও আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক টার্নওভার কর বা ফ্ল্যাট ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে ।
কর আদায়ের পরিধি বাড়াতে স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট ও বিশেষ ক্ষুদ্র সঞ্চয়ী হিসাব ব্যতীত অন্য যেকোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে মূসক বা ভ্যাট নিবন্ধন সনদ ও টিআইএন (TIN) দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে । তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে গতি আনতে স্টার্টআপ কোম্পানিগুলোর স্থানীয় ভ্যাট ১৫ শতাংশ সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে এবং এই সুবিধা আগামী ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বহুলাংশেই বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে । একই সাথে ফ্রিল্যান্সার ও অনলাইন কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ের ওপর থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা হয়েছে ।
সাধারণ জনগণের চিকিৎসার ব্যয় কমানোর অনন্য উদ্যোগ হিসেবে হার্টের রিং ও চোখের লেন্স সরবরাহের ক্ষেত্রে যোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট এবং কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় ডায়ালাইসিস ফিল্টার ও ব্লাড টিউবিং সেটের ওপর আরোপিত অগ্রিম আয়কর ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে । এছাড়া, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে তাদের স্বাধীন চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ২১ ধরনের বিশেষ সহায়ক উপকরণের ওপর আরোপিত সকল প্রকার শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে মওকুফ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ।
বাজেটের প্রভাবে দাম বাড়তে পারে এমন পণ্য ও সেবা :
নতুন বাজেটে ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় শিল্পের অতিরিক্ত সুরক্ষার উদ্দেশ্যে শুল্ক ও ভ্যাট বাড়ানোর ফলে বেশ কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে:
তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার কমাতে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সিগারেটের সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য স্তর প্রতি ১০ শলাকায় ৬২ টাকা থেকে শুরু করে অতি উচ্চ স্তরে ২১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার ফলে বাজারে সব ধরনের সিগারেটের দাম বাড়বে । একই সাথে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তামাকের ব্যবহার কমাতে নিকোটিন পাউচের ওপর ৪০ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকো বা আধুনিক ইলেকট্রনিক ধূমপানের বিকল্পগুলোর ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার কারণে এ জাতীয় পণ্যের দাম একলাফে অনেক বেড়ে যাবে ।
মদ ও অ্যালকোহল জাতীয় পণ্যের ওপর কড়াকড়ি আরোপ ও রাজস্ব বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেশে উৎপাদিত অ্যালকোহল ও মদের ওপর লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব আসায় দেশীয় মদের দাম বাজারে বেশ খানিকটা বৃদ্ধি পাবে ।
আবাসন খাতের অন্যতম প্রধান উপাদান এমএস রড ও এ জাতীয় ধাতব পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ভ্যাট ও কর প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব আসার কারণে রডের উৎপাদন খরচ বাড়বে । এর ফলে বাজারে রডের দাম টনপ্রতি বৃদ্ধি পাবে, যা মানুষের বাড়ি তৈরির খরচকে বাড়িয়ে তুলবে ।
পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পেট্রোল বা ডিজেল চালিত ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনের গাড়ির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার আমদানিকৃত গাড়ির ওপর সামগ্রিক করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫.৮৮ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার কারণে এ শ্রেণীর গাড়ির দাম বাজারে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে । পাশাপাশি উচ্চবিত্তদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় ব্যবহৃত helicopter বা হেলিকপ্টারের ওপর বার্ষিক অগ্রিম আয়করের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে ।
দেশীয় কৃষি ও মৎস্য চাষীদের বাজার সুরক্ষার উদ্দেশ্যে অপ্রক্রিয়াজাত ও প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানির শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার কারণে আমদানিকৃত বাদামের দাম বাড়বে । একইভাবে আমদানিকৃত উচ্চ মূল্যের হিমায়িত মাছের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং পাঙ্গাস মাছের ফিলেটের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব আসায় বিদেশী ও হিমায়িত প্রক্রিয়াজাত মাছের দাম বৃদ্ধি পাবে ।
স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষায় জিপসাম বোর্ড ও শিট আমদানির ওপর ২০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক এবং ওয়াশিং মেশিন আমদানিতে নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে । প্লাস্টিক ও কসমেটিকস খাতের কাঁচামাল পিভিসি রেজিন ও পেট রেজিন আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার কারণে আমদানিকৃত গৃহস্থালী প্লাস্টিক পণ্য ও কসমেটিকসের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে ।
বাজেটের প্রভাবে দাম কমতে পারে এমন পণ্য ও সেবা :
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় সংকোচন এবং চিকিৎসা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বড় ধরনের শুল্ক ও ভ্যাট ছাড় দেওয়ায় নিম্নলিখিত পণ্য ও সেবার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে:
সাধারণ মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাল, ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ অতিপ্রয়োজনীয় ৬০টি ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ও আমদানিতে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অনেকখানি কমিয়ে স্বস্তি আনবে । এছাড়া জনসাধারণের প্রাত্যহিক রান্নায় ব্যবহৃত সকল প্রকার মসলা ও খেজুর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করায় মসলা ও খেজুরের দাম বাজারে কমবে ।
টেলিযোগাযোগ সেবা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে প্রতিটি মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকা সুনির্দিষ্ট কর সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করায় সিমের দাম সরাসরি কমে যাবে । এর পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবায় উৎসে করের হার ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা এবং বিটিআরসির লাইসেন্স ফির ২০ শতাংশ উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করায় ইন্টারনেট ও মোবাইল কথা বলার সামগ্রিক ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হবে । দেশীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনের ২২টি কাঁচামালে অগ্রিম কর কমিয়ে ১% করায় দেশীয় স্মার্টফোনের দামও হ্রাস পাবে ।
চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে আনতে হৃদরোগীদের হার্টের রিং বা স্টেন্ট এবং চোখের ছানি অপারেশনে ব্যবহৃত ইন্ট্রাওকুলার লেন্স সরবরাহের ক্ষেত্রে যোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে, যার ফলে প্রতিটি হার্টের রিংয়ের মূল্য প্রায় ২০,০০০ টাকা এবং চোখের লেন্সের মূল্য প্রায় ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত কমে আসবে । কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করায় এবং ব্লাড টিউবিং সেটের ওপর ৭.৫ শতাংশ আগাম কর মওকুফ করায় রোগীদের প্রতিটি ডায়ালাইসিস সেশনের খরচ প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে । ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির নতুন ৯টি কাঁচামাল এবং দেশীয় জেনেরিক ওষুধ তৈরির জন্য এপিআই (API) উৎপাদনে ব্যবহৃত নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করায় ক্যান্সারের ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম বাজারে হ্রাস পাবে ।
প্রযুক্তি খাতে বিপ্লব ও তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সমুদয় আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা কম্পিউটার ও ডিজিটাল সরঞ্জামের বাজারমূল্য ব্যাপকভাবে হ্রাস করবে ।
জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) জনপ্রিয় করার জন্য ২৫,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির সামগ্রিক করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে । একই সাথে বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জার ও চার্জিং স্টেশন আমদানির সামগ্রিক শুল্ককর ৩৯.৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সম্পূর্ণ শূন্য করা হয়েছে এবং ১৮০০ সিসি পর্যন্ত নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার কারণে পরিবেশবান্ধব গাড়ির আমদানিমূল্য ও ব্যবহারিক খরচ কমে আসবে ।
বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর ওপর বাজেটের সম্ভাব্য প্রভাব :
সাধারণ নাগরিকের ওপর প্রভাব :
প্রস্তাবিত বাজেট সাধারণ নাগরিকদের জন্য মিশ্র প্রভাব বয়ে আনবে । একদিকে চাল, গম, ডাল, আলু এবং ভোজ্যতেলের মতো ৬০টি প্রধান নিত্যপণ্যে শুল্ক ও কর হ্রাস পাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের মাসিক বাজার খরচ অনেকখানি সহনশীল থাকবে । ব্যাংক আমানতের আবগারি শুল্কমুক্ত সীমা ৩ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লক্ষ টাকা করায় ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা উৎসাহিত হবেন এবং মোবাইল সিম কর বাতিলের কারণে সাধারণ যোগাযোগের ব্যয় হ্রাস পাবে । তবে আবাসন খাতের অন্যতম মূল উপাদান রডের উৎপাদন কর বৃদ্ধি পাওয়ায় নিজস্ব ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার স্বপ্ন পূরণের খরচ বেড়ে যাবে । এছাড়া মধ্যম সারির জ্বালানি চালিত ব্যক্তিগত গাড়ির শুল্ক বৃদ্ধি পাওয়ায় যাতায়াত খাতের বিলাসিতা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে ।
শিক্ষার্থীর ওপর প্রভাব :
শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক মেধা বিকাশ এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ক্যারিয়ার গঠনে এই বাজেট অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে । ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর ও প্রিন্টারের শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করায় শিক্ষার্থীরা স্বল্প মূল্যে আধুনিক শিক্ষার প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম কিনতে পারবে । "লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস" বা আনন্দময় শিক্ষার অংশ হিসেবে প্রযুক্তি ও এআই নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই ও "ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব” কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া সহজ করবে । এছাড়া ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষা প্রবর্তন ও মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা সম্প্রসারণ শিক্ষার্থীদের স্বনির্ভর হতে সাহায্য করবে । বিশেষ করে, তৃতীয় ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিশেষ ঋণ সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক সুযোগের দুয়ার খুলে দেবে ।
চাকরিজীবীর ওপর প্রভাব :
চাকরিজীবী শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিতে বাজেটে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে । সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘ ১১ বছর পর মূল্যস্ফীতিজনিত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা তাদের পরিবারের আর্থিক চাপ লাঘব করবে । করমুক্ত আয়ের সাধারণ সীমা বাড়িয়ে ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা করায় করদায়ী চাকরিজীবীদের করের পরিমাণ কিছুটা কমবে এবং তাদের হাতে ব্যবহারযোগ্য অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে । অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সর্বজনীন পেনশন ফান্ডের আওতায় অবসর গ্রহণকালে মোট জমার ৩০ শতাংশ অর্থ গ্র্যাচুইটি হিসেবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বেসরকারি চাকরিজীবীদের বার্ধক্যকালীন সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে ।
ব্যবসায়ীর ওপর প্রভাব :
দেশীয় শিল্প ও উদীয়মান উদ্যোক্তাদের জন্য এই বাজেট ব্যবসা সহজীকরণের একটি মাইলফলক । করপোরেট কর আগামী ৫ বছরের জন্য অপরিবর্তিত রাখার মাধ্যমে বিনিয়োগে এক ধরণের দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত স্থিতিশীলতা ও নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে । নতুন কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা, অনলাইনে কর্পোরেট কর দাখিলের সুযোগ, কর রিফান্ড সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করা এবং কর কর্মকর্তার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা হ্রাস করার মতো বিনিয়ন্ত্রণ পদক্ষেপগুলো ব্যবসা পরিচালনার সার্বিক খরচ ও হয়রানি কমিয়ে দেবে । এছাড়া, রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার বন্ড লাইসেন্স প্রতি বছর অডিট করার বাধ্যবাকতা রহিত করা এবং অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাতের জন্য বন্ডের মেয়াদ ৩ বছর করায় ব্যবসায়ীরা বৈশ্বিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন ।
নিম্নআয়ের মানুষের ওপর প্রভাব :
বাজেটটি সমাজে অতিদরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের পুষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষাকবচ তৈরিতে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে । সরকারের সিগনেচার প্রোগ্রাম 'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচির আওতায় ৪১ লক্ষ পরিবারের প্রধান নারীদের প্রতি মাসে সরাসরি ২,৫০০ টাকা নগদ সামাজিক ভাতা প্রদান করা হবে, যা নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়াবে । কৃষক কার্ডের অধীনে ৪২.৫ লক্ষ ক্ষুদ্র ও ভূমিহীন চাষীদের বার্ষিক ২,৫০০ টাকা করে নগদ উৎপাদন সহায়তা প্রদান কৃষিকাজ সচল রাখবে । এছাড়া সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৫৫ লক্ষ পরিবারকে প্রতি মাসে মাত্র ১৫ টাকা দরে ৩০ কেজি চাল সরবরাহ এবং ওএমএস (OMS) কার্যক্রমের মাধ্যমে সারা দেশের ৪১৯টি উপজেলায় ৩০ টাকা কেজিতে চালের সরবরাহ নিম্নআয়ের মানুষের মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে ।
সমাপনী মূল্যায়ন
বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা :
বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান সুবিধা হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি থেকে সাধারণ মানুষকে তাৎক্ষণিক রক্ষা করতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, মসলা ও খেজুরের আমদানিতে বড় আকারের শুল্ক ও কর হ্রাস করা । এর পাশাপাশি দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হৃদরোগীদের হার্টের রিং ও চোখের ছানি অপারেশনের লেন্সের সরবরাহ পর্যায়ের ভ্যাট এবং কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের শুল্ককর সম্পূর্ণ মওকুফ করার ফলে প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসা ব্যয় অভাবনীয় হারে হ্রাস পাবে । ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের শুল্ক প্রত্যাহার এবং স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সারদের ভ্যাট মওকুফ দেশের বিপুল সংখ্যক বেকার তরুণের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত করবে । সর্বোপরি, ব্যবসা সহজীকরণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং ৫ বছরের কর নিশ্চয়তা দেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে ।
বাজেটের প্রধান ঝুঁকি :
বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতি, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত গ্যাস (LNG) ও সারের মূল্য দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতির মারাত্মক চাপ দেশের ওপর চলে আসতে পারে । এছাড়া, ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য চলতি বছরেই সরকারকে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বড় অংকের পুনঃমূলধনীকরণ ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বড় চাপ তৈরি করছে । দেশের রাজস্ব আহরণের বর্তমান সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশের বিপরীতে করভিত্তি সম্প্রসারণের রূপরেখা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং রাজস্ব বোর্ড যদি প্রাক্কলিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে, যা দেশের বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার বড় ঝুঁকি তৈরি করবে ।
সাধারণ মানুষের জন্য মূল বার্তা :
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ভিত্তি ও বিশৃঙ্খলা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার প্রথম বাস্তবমুখী পদক্ষেপ । সাধারণ মানুষের প্রতি সরকারের মূল বার্তা হলো, দেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মিথ্যা পরিসংখ্যান ও বড় মেগা প্রকল্পের ফাঁদ পরিহার করে সব মানুষের মৌলিক অধিকার যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাকে বাজেটের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে । খাদ্যপণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার ও সরাসরি নগদ ভাতা প্রদানের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের দৈনিক কষ্ট লাঘব করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি প্রকাশ পেয়েছে। মানুষের মেধা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বনির্ভর ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এই বাজেটের মূল অভীষ্ট। ©