24/08/2026
এক, যায়েদ (রা.) আনুমানিক আট বছর বয়সে ডাকাতির শিকার হয়ে দাসে পরিণত হন। খাদিজা (রা.)-এর সাথে রাসুল (সা.)-এর বিয়ের পর যায়েদ (রা.) রাসুল (সা.)-এর অধীনস্ত ছিলেন। একজন সহায়-সম্বলহীন দাস, জীবনের গভীর ট্র্যাজেডির পরে কঠিন এক জিল্লতির জীবনের অপেক্ষায় ছিলেন হয়ত। কিন্তু তার পরিবর্তে রাসুল (সা.)-এর কাছে তিনি পেয়েছিলেন ভালোবাসা আর ফাদার ফিগারের নির্ভরতা। বেশ কয়েক বছর পরে যায়েদ (রা.)-এর খোঁজ পেয়ে তাঁর বাবা মক্কায় আসেন তাঁকে নিয়ে যেতে। রাসুল (সা.) বিনা মুক্তিপণে যায়েদ (রা.)-কে তাঁর বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যেতে দেন। কিন্তু ততদিনে যায়েদ (রা.) এক মহামানবের অন্তরের গভীরতর ভালোবাসা দেখে ফেলেছেন। ফলে, তিনি তাঁর নিজের বাবা-মায়ের কাছে ফিরে না গিয়ে সেই মানুষটির সাথেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রাসুল (সা.)ও যায়েদ (রা.)-কে এরপর দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে নিজের সন্তানের মর্যাদায় বড় করেন।
দুই, রাসুল (সা.) মদিনায় আসার পরপরই উম্মে সুলাইম (রা.) তাঁর সন্তান আনাস (রা.)-কে রাসুল (সা.)-এর কাছে দিয়ে দেন তাঁর সাথে থাকার জন্য, টুকটাক কাজকর্মে সাহায্য করার জন্য। আনাস (রা.)-এর বয়স ছিল তখন মাত্র ১০ বছর। এরপর প্রায় দশ বছর তিনি তাঁর সঙ্গে ছিলেন। পরবর্তীতে আনাস (রা.) বলেছেন, এই দশ বছরে রাসুল (সা.) তাঁকে কখনো “উফ” পর্যন্ত বলেননি। কোনো কাজ না করলে জিজ্ঞেস করেননি, কেন করনি; কোনো কাজে ভুল করে ফেললে বলেননি, কেন এইটা করলে। এমনই সহনশীল আর রহমদীল ছিলেন রাসুল (সা.)।
তিন, মদিনায় একদিন নামাজে ইমামতির সময় রাসুল (সা.) অনেক দেরি করলেন সিজদা থেকে উঠতে। সাহাবিরা পরে কারণ জিজ্ঞেস করলেন। রাসুল (সা.) বললেন পিঠের উপর তাঁর ছোট নাতি হাসান (রা.) ছিলেন, এইজন্য তিনি সিজদা থেকে উঠতে দেরি করেছিলেন।
চার, মদিনাতে এক মহিলা সাহাবি ছিলেন বারীরাহ (রা.) নামে। এক সময় তিনি তাঁর স্বামীর সাথে আর থাকতে চাইলেন না। কিন্তু তাঁর স্বামী এই সেপারেশানে খুব মন খারাপ করেন। এতটাই যে, মদিনার রাস্তায় প্রকাশ্যে তিনি কাঁদতেছিলেন। তাঁর এই কান্না দেখে রাসুল (সা.) নিজে গিয়ে সেই মহিলা সাহাবিকে তাঁর স্বামীর সাথে সেপারেশানে না যাওয়ার জন্য সুপারিশ করেন। যদিও এই সুপারিশ শরয়ী বাধ্যবাধকতা না হবার কারনে বারীরাহ (রা.) শেষ পর্যন্ত রাখেন নাই। কিন্তু দয়ার্দ্র রাসুল কান্নারত মুগীছ (রা.)-কে দেখে দয়াপরবশ হয়েই সুপারিশ করেছিলেন।
পাঁচ, মদিনায় একজন ইহুদি নারী রাসুল (সা.)-কে একবার খাবারের সাথে বিষ মিশায়ে দিয়েছিলেন হত্যা করার জন্য। রাসুল (সা.) খাবার কিছুটা মুখে দিয়েই বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু বিষের একটা অংশ তাঁর শরীরে গিয়েছিল। এই হত্যাচেষ্টার জন্য তিনি সেই মহিলাকে কোনো শাস্তি দেন নাই। তাঁর নিজের উপর এই হত্যাচেস্টা তিনি মাফ করে দিয়েছিলেন। পরে যখন অন্য আরেকজন সাহাবি সেই বিষের কারণে কিছুদিন পরে মৃত্যুবরণ করেন, তখন ওই নারীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।
ছয়, মক্কা বিজয়ের পরে রাসুল (সা.) মক্কার কাফেরদের মাফ করে দেন। যে শহর থেকে তাঁকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, যে মানুষগুলো বছরের পর বছর তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তাঁর সাহাবিদের নির্যাতন করেছে—সেই মানুষদেরকেই তিনি মাফ করে দেন। "ইউসুফ (আ.) তাঁর ভাইদের সাথে যে আচরণ করে ছিলেন, আজকে আমি তোমাদের সাথে সেই আচরণ করব", এমন গভীরতর ক্ষমা, মহানুভবতা আর ভালোবাসা নিয়ে তিনি দাঁড়ান তাদের সামনে। মক্কা বিজয়ের পরে রাসুল (সা.) নয়জন ব্যক্তির জন্য মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছিলেন। এরা প্রত্যেকেই বড় মাপের অপরাধী ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এই নয়জনের মধ্যেও পাঁচজনকে তিনি ক্ষমা করে দেন।
রাসুল (সা.) ছিলেন রহমাতুল্লিল আলামিন। জগতের সকল সৃষ্টির জন্য রহমা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা রাসুল (সা.)-এর অন্তরকে প্রসারিত করে দিয়েছিলেন। "আলাম নাশরাহ লাকা ছদরাক"। নিঃস্ব যায়েদকে তিনি আপন করে নিয়েছিলেন। ভুল-ত্রুটির কারণে কারও সাথে অসহিষ্ণু হন নাই তিনি কোনোদিন। আনাসের দশ বছরের জীবনে একদিন একবারের জন্যও তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন নাই কোনো কাজে। তিনি সন্তানদের ভালোবাসতেন একজন সাধারণ প্রেমময় মানুষ হিসাবে। কঠোর রাজা-বাদশা বা দিগ্বিজয়ী সেনাপতির রুক্ষতা ছিল না তাঁর আচরণে। নিজের জন্য কখনো কারও কাছ থেকে প্রতিশোধ নেন নাই। মাফ করে দিয়েছেন তাঁকে হত্যা করতে আসা খুনিকেও। মাফ করে দিয়েছেন মক্কার জালেমদেরকেও। চলে যাওয়া স্ত্রীর জন্য ক্রন্দনরত এক মানুষের চোখের অশ্রু তাঁর মনকে বিষাদে ভরে দিয়েছিল কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে, তিনি ছুটে গিয়েছিলেন দাম্পত্য মান-অভিমান আর পছন্দ-অপছন্দদের মাঝে একজনের পক্ষে হয়ে আরেকজনের কাছে সুপারিশ নিয়ে। ভালবাসাবাসির কঠিন সমীকরনে সেই সুপারিশ কাজ না করলে বিনা দ্বিধায় ফিরে এসেছিলেন, দিয়েছিলেন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা।
আমাদের এই দুনিয়ার সব কোলাহল শেষে যখন আমরা ফিরে যাব শেষ বিচারের দিনে, সেই কঠিন সময়েও তিনি সিজদায় পড়ে থাকবেন তাঁর উম্মতের গুনাহ মাফের জন্য। মানুষের জন্য, উম্মাহর জন্য যেই ভালোবাসা নিয়ে তিনি দুনিয়াতে এসেছিলেন, সেই ভালোবাসা দিয়েই তিনি আমাদেরকে নিয়ে যেতে চাইবেন আল্লাহর ক্ষমাশীলতার অসীম চাদরের ছায়াতে।
শুধু আমরা যদি একটুখানি তাঁর অন্তরের বিশালতা ধারণ করতে পারি এই মাটির পৃথিবীর কর্দমাক্ত পঙ্কিলতার মধ্যে।
ইয়া নবী, সালামু আলাইকা। ইয়া রাসুল, সালামু আলাইকা। ইয়া হাবিব, সালামু আলাইকা। সালাওয়াতুল্লাহি আলাইকা।
লিখেছেনঃ মির্জা গালিব