16/04/2026
পৃথিবীর সবচেয়ে অভাগী মা মনে হয় বর্তমানে উনিই। শিশু সন্তান কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১০০% মারা যাবে। অথচ কান্না করা ছাড়া কিছুই করার নেই! কিন্তু এর দায় কে নিবে?
রমজান মাসে শিশুটিকে বাসার বাইরে কুকুর কামড় দেয়। একজন সচেতন মা হিসেবে উনি দ্রুত, মাত্র দেড় ঘন্টার মধ্যে নারায়নগঞ্জ থেকে ঢাকা মেডিক্যালে শিশুটিকে নিয়ে আসেন জলাতঙ্কর ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য। ভ্যাকসিন নিয়েছিলেনও তারপরেও জলাতঙ্ক হয়েছে।
ইন্টারভিউতে এক ডাক্তার ম্যাম আফসোস করে বলছিলেন, নিয়ম অনুযায়ী নাকি ক্ষতের চারপাশে ইনজেকশন পুশ না করে, পুশ করেছিলো শিশুটির পিঠের মাংসে।
আর ক্ষমার অযোগ্য এই ভুলের জন্য খুব দ্রুত শিশুটির মস্তিষ্ক এবং সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে র্যাবিস ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। যার একমাত্র করুণ পরিণতি মৃত্যু।
গতকাল MYTV নিউজে শিশুর মায়ের সাক্ষাৎকার দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
আমি কুকুরকে ভালোবাসি, খাবারও কিনে দেই। তবে দূর থেকে। আমি ভয় পাই। অনেকে মনে করে কুকুর বিনা কারনে মানুষকে কামড়ায় না। কথাটা পুরোপুরিভাবে সত্য নয়। অন্তত সিসিটিভি ফুটেজের ক্লিপ্স যদি দেখা যায়, এটা দিনের আলোর মতো সত্য। অনেক কুকুর বিনা কারণেও পথচারীকে কামড় দেয়।
যদিও বিভিন্ন সময়ে পথ এক্সিডেন্টে নিরীহ প্রাণীগুলো ছোট থাকতেই মারা যায়। তারপরেও কুকুরের সংখ্যা অত্যাধিক হারে বাড়ে। কুকুরের অত্যাচার হতে বাঁচতে মেরে ফেলা মোটেও মানবিক কাজ নয়। এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রনে নিউটার পদ্ধতির বিকল্প নেই।
ধ্রুব রাঠে ভারতের বিপদজনক হারে কুকুরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে অনেক সুন্দর একটি ভিডিও বানিয়েছিলেন।কুকুরের কারণে ভারতে ২০-৩০ হাজার মানুষ প্রতি বছর মারা যায়।
ধ্রুব এর প্রধান কারণ হিসেবে বলেছিলো, কুকুরকে রাস্তায় একা ছেড়ে দেওয়া। অর্থাৎ মালিকহীন কুকুর। কুকুরের মালিকানা যদি থাকতো। সবাই কুকুর পুষতো। তাহলে এদের সংখ্যা বাড়তো না। আপনি উন্নত দেশে মালিকবিহীন কুকুর পাবেন না।
যেহেতু বাংলাদেশে কুকুর পোষা নিয়ে ধর্মীয় বা সামাজিক বিধিনিষেধ রয়েছে। যার জন্য এই দেশে কুকুরের মালিকানা গ্রহণের সমাধান সম্ভব নয়। যতদিন না এই ট্যাবু ভাঙে। Yes! বাড়ি পাহারা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কুকুর পালা জায়েজ। এটা অনেকেই জানেন না। সরাসরি নাজায়েজ বলে দেয়।
সেক্ষেত্রে নিউটার ভ্যাকসিনই বর্তমানে একমাত্র সমাধান। অর্থাৎ কুকুরের প্রজনন ক্ষমতা নিরোধ। এর চেয়ে ভালো মানবিক সমাধান আর নেই।
অতীতে জলাতঙ্ক বা র্যাবিস সম্পর্কে সচেতন করতে অনেক লিখেছি। তবে আমি এই মায়ের মতো এমন কেস জীবনেও দেখিনি। তাই পোস্ট করতে বাধ্য হলাম।
আমি এমনও কেস দেখেছি শ্বশুর বাড়িতে জামাই বেড়াতে এসেছে। কুকুরের কামড় খেয়েছে। জামাই চেয়েছিলো ভ্যাকসিন নিতে, শ্বশুর বলেছে এলাকার বড় কবিরাজের কাছ থেকে বাটি পড়া নিতে। শ্বশুরকে মুখের উপর না বলতে পেরে বেচারা জলাতঙ্ক হয়েছে। ইন্টারভিউতে যখন এই বর্ণনা দিচ্ছিলো, তার মুখটার দিকে তাকাতে পারছিলাম না।
মা ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করে। শিশুকে কামড় দিয়েছে গ্রামে। নানি কবিরাজের কাছ থেকে বাটি পড়া খাইয়েছে। জলাতঙ্ক নিয়ে মহাখালী সংক্রামন হাসপাতালের সামনে মায়ের কান্নার আহাজারি। মৃত্যুর কোলে থাকা শিশুটির আতঙ্কিত, পানি দেখে ভয়ে ছটফট!
আমার বাবাকেই গত বছর কুকুর কামড় দেয়। মুমুর্ষ কুকুর রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে তাকে সাহায্য করতে গিয়েছিলো। কুকুরটি কামড় বসিয়ে বাবার হাতে। এই বয়সে বাবার এই কষ্ট সহ্য করতে পারিনি। দ্রুত তাকে মহাখালী সংক্রামক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। বাবার কাছে শুনেছি উনার আঙ্গুলের কাছেই নাকি ইঞ্জেকশন পুশ করেছিলো।
জলাতঙ্ক হলে নিশ্চিত মৃত্যু। মাফ নাই। তবে পৃথিবীতে মীরাক্কেল ঘটেছে এমন সংখ্যা হাতে গোনা ৩০-৪০ জনের মতো। যারা জলাতঙ্ক হওয়ার পরেও বেঁচে গিয়েছে।
প্রতি বছর প্রায় ৫৯০০০ জন মানুষ জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। যার মধ্যে ৯৯% কুকুরের কামড়ের কারণে। বিড়ালও ঝুঁকিপূর্ণ। বাদুড়ের কারণে রেয়ার। তবে আমেরিকায় সর্বোচ্চ।
কুকুর, বিড়াল, বানর, বেজি, শিয়াল ইত্যাদি কামড় দিলে প্রথম কাজ ক্ষারযুক্ত সাবান দিয়ে ১৫ মিনিট ধুয়ে ফেলা ভ্যাক্সিন নেওয়া।
ভ্যাকসিন অবশ্যই নিতেই হবে। এই জ্ঞানটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। কোনভাবেই মিস করা যাবে না। এতদিন পরিচিত অপরচিত অনেককেই এই জ্ঞান দিয়েছি।
তবে মনে নতুন ভয় প্রবেশ করলো - সেটি হলো ভ্যাকসিন কী আদৌ সঠিকভাবে, সঠিক স্থানে দেওয়া হলো কীনা! অর্থাৎ ক্ষতস্থানের চারপাশে!
আমি এখনও কনফিউজড! আমি এতদিন জানতাম মাংশ পেশী অথবা চামড়ায় পুশ করলেই হবে। ক্ষতস্থানে পুশ করা কখন আবশ্যক! এই ব্যাপারে কোন চিকিৎসক ভাইয়ের পরামর্শ থাকলে কমেন্ট করতে পারেন।
আপনি নিজেকে এবং আপনার সন্তানকে পথ কুকুর থেকে নিরাপদে রাখুন। তাদেরকে উত্যক্ত করা থেকে বিরত থাকুন। তাদের প্রতি দয়াবান না হতে পারেন। অন্তত Cruel হবেন না।
যারা কুকুর নিয়ে কাজ করেন, কুকুরকে ভালোবাসেন। প্রাণী লাভারদেরও উচিত প্রাণীদেরকে আদর করার সময় সচেতন থাকা। বাইরে থেকে যেহেতু দেখে বুঝা সম্ভব নয় কোনটির মধ্যে র্যাবিসের জীবাণু রয়েছে।
সাধারণ জনগনের যদি মনে হয় এলাকার কোন কুকুর পাগল, মানুষকে কামড়াচ্ছে। তাহলে বিভিন্ন প্রাণী সংগঠন কিংবা সিটি কর্পোরেশনে অভিযোগ জানান। উনারা অবশ্যই সেই কুকুরের ব্যবস্থা করবে। তারপরেও নিজ থেকে প্রাণীর প্রতি অমানবিক আচরণ করবেন না।
কুকুরের সংখ্যা ও পাগলা কুকুর নিয়ন্ত্রনে সরকারের উচিত মানবিক পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া। সারাদেশে র্যাবিসের পর্যাপ্ত মজুদ রাখা। সঠিক পদ্ধতিতে ভ্যাকসিন প্রদানের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া।
এই মায়ের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো! শুধুমাত্র সঠিকস্থানে ভ্যাকসিন না দেওয়ার জন্য! তাও ঢাকা মেডিক্যালের মতো স্থানে! এটার দায় কার! কে নিবে! এই প্রশ্নই মাথায় ঘুরছে!
এমন পরিস্থিতিতে কোন বাবা মা যেন কখনও না পড়ে।