12/03/2026
প্রিয় ইমাম ও খতিব ছাহেবদের জন্য হাদিয়া।
রমজানের ৪র্থ জুমু'আ
বিষয়: সাদাকাতুল ফিতর
সম্মানিত মুসল্লীগণ।
পবিত্র মাহে রমজান আমাদের জন্য তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাস। এই পবিত্র মাসের শেষে আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নির্ধারণ করেছেন, আর তা হলো যাকাতুল ফিতর বা ফিতরা।
✍️ফিতরা (যাকাতুল ফিতর) সরাসরি কুরআনে “ফিতরা” শব্দে উল্লেখ নেই, তবে গরিব-মিসকিনকে দান করার নির্দেশ এবং রোজার শেষে পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্য কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে। নিচে কুরআনের আয়াত ও সহিহ হাদিসের আলোকে আলোচনা করা হলো।
✍️ফিতরা হলো রমজানের শেষে দরিদ্রদের জন্য নির্ধারিত দান। এটি রোজাদারের আত্মশুদ্ধি ও গরিবদের সাহায্যের জন্য নির্ধারিত। সাদাকাতুল ফিতর প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের উপর ওয়াজিব এবং ঈদের নামাজের আগে আদায় করা উত্তম।
✍️পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আ‘লা, আয়াত ১৪-১৫
قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ
“নিশ্চয়ই সে সফল হয়েছে, যে নিজেকে পবিত্র করেছে এবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করেছে, তারপর সালাত আদায় করেছে।”
তাফসিরে ইঙ্গিত:
অনেক মুফাসসিরগণ বলেছেন, এখানে “تَزَكَّىٰ” দ্বারা ঈদের আগে যাকাতুল ফিতর আদায়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
(ইবনে কাসির)
✍️অন্য আয়াতে এসেছে,
اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَ الۡمَسٰكِیۡنِ وَ الۡعٰمِلِیۡنَ عَلَیۡهَا وَ الۡمُؤَلَّفَۃِ قُلُوۡبُهُمۡ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الۡغٰرِمِیۡنَ وَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ ابۡنِ السَّبِیۡلِ ؕ فَرِیۡضَۃً مِّنَ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیۡمٌ حَكِیۡمٌ ﴿۶۰﴾
নিশ্চয় সদাকা হচ্ছে ফকীর ও মিসকীনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য; (তা বণ্টন করা যায়) দাস আযাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।
✍️যাকাত বা ফিতরা ৮ শ্রেণির মানুষকে দেওয়া যাবে।
১️. ফকির (الفقراء)
যাদের কাছে জীবিকা খুবই কম, মৌলিক প্রয়োজনও ঠিকমতো পূরণ হয় না।
২️. মিসকিন (المساكين)
অত্যন্ত অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি, যাদের অবস্থা ফকিরের চেয়েও কঠিন হতে পারে।
৩️. যাকাত সংগ্রহকারী (العاملين عليها)
যারা যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের কাজে নিয়োজিত থাকে।
৪️. মুয়াল্লাফাতুল কুলুব (المؤلفة قلوبهم)
যাদের হৃদয় ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করা বা ইসলামকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে সাহায্য করা হয়।
৫️. দাসমুক্তি (وفي الرقاب)
দাস বা বন্দীদের মুক্ত করার জন্য।
৬️. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (الغارمين)
যারা বৈধ কারণে ঋণের বোঝায় জর্জরিত।
৭️. আল্লাহর পথে (في سبيل الله)
ইসলামের কল্যাণমূলক কাজ বা আল্লাহর পথে সংগ্রামের জন্য।
৮️. মুসাফির (ابن السبيل)
যে ভ্রমণের পথে বিপদে পড়ে অর্থহীন হয়ে গেছে।
নোট: ফিতরার ক্ষেত্রে সাধারণত সবচেয়ে বেশি দেওয়া হয় ফকির ও মিসকিনদের। কারণ ফিতরার মূল উদ্দেশ্য হলো গরিবদের ঈদের দিনে খাবারের ব্যবস্থা করা।
✍️ প্রিয় মুসল্লিগণ,
রাসূলুল্লাহ ﷺ ফিতরাকে মুসলমানদের উপর অপরিহার্য করেছেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ عَلَى الْعَبْدِ وَالْحُرِّ وَالذَّكَرِ وَالْأُنْثَى وَالصَّغِيرِ وَالْكَبِيرِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ
রাসূলুল্লাহ ﷺ মুসলমানদের মধ্যে দাস-মুক্ত, পুরুষ-নারী, ছোট-বড় সবার উপর এক ‘সা’ খেজুর বা এক ‘সা’ যব পরিমাণ যাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন।
[সহিহ বুখারি: ১৫০৩]
[সহিহ মুসলিম: ৯৮৪]
✍️ ফিতরার পরিমাণ
হাদিসে এক সা‘ খাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَفْرِضُ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ
রাসূলুল্লাহ ﷺ এক ‘সা’ খাদ্য পরিমাণ যাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন।
[সহিহ বুখারি ১৫১০]
নোট: এক সা প্রায় ২.৫ থেকে ৩ কেজি খাদ্যের সমান।
বাংলাদেশে সাধারণত খেজুর, কিসমিস, পনির বা তার সমমূল্যের টাকা দেওয়া হয়।
✍️ ফিতরার আরেকটি বড় উদ্দেশ্য হলো রোজার ত্রুটি দূর করা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ
রাসূলুল্লাহ ﷺ ফিতরা নির্ধারণ করেছেন রোজাদারের অপ্রয়োজনীয় ও অশালীন কথাবার্তার ক্ষতি থেকে সাওম/রোজা পবিত্র করার জন্য এবং গরিবদের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য।
[সুনান আবু দাউদ: ১৬০৯]
[ইবনে মাজাহ: ১৮২৭]
✍️ যাকাতুল ফিতর আদায়ের উত্তম সময় সম্পর্কে হাদিসে এসেছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
أَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ بِزَكَاةِ الْفِطْرِ أَنْ تُؤَدَّى قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلَاةِ
রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে ফিতরা আদায় করো।
[সহিহ বুখারি: ১৫০৯]
✍️যাকাত বা ফিতরা যেমন কিছু নির্দিষ্ট মানুষকে দেওয়া যায়, তেমনি কিছু মানুষকে দেওয়া বৈধ নয়। নিচে কুরআন-হাদিস ও ফিকহের আলোকে সহজভাবে তুলে ধরছি।
১. নিজের মূল বংশধর ও ঊর্ধ্বতন আত্মীয়
নিজের পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং সন্তান, নাতি-নাতনিকে যাকাত বা ফিতরা দেওয়া যাবে না।
কারণ তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিজের উপরই।
২. স্বামী-স্ত্রী
স্বামী তার স্ত্রীকে বা স্ত্রী তার স্বামীকে যাকাত বা ফিতরা দিতে পারবে না।
কারণ স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব রয়েছে।
৩. ধনী ব্যক্তি
যে ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, তাকে যাকাত বা ফিতরা দেওয়া যাবে না।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
لَا حَظَّ فِيهَا لِغَنِيٍّ وَلَا لِقَوِيٍّ مُكْتَسِبٍ
অর্থঃ
“ধনী ব্যক্তি এবং উপার্জনে সক্ষম শক্তিশালী ব্যক্তির জন্য যাকাতে কোনো অংশ নেই।”
(সুনান আবু দাউদ)
৪. অমুসলিম ব্যক্তি
যাকাত ও ফিতরা সাধারণত মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ
অর্থঃ
“মুসলমানদের ধনীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে এবং তাদের গরিবদের মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।”
(সহীহ্ বুখারি)
৫. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বংশধর (আহলে বাইত)
অনেক আলেমের মতে বনি হাশিম (রাসূল ﷺ-এর পরিবার) যাকাত গ্রহণ করতে পারেন না।
হাদিসে এসেছে—
إِنَّ الصَّدَقَةَ لَا تَنْبَغِي لِآلِ مُحَمَّدٍ
অর্থঃ
“নিশ্চয়ই সদকা (যাকাত) মুহাম্মদ (সা:)এর পরিবারের জন্য উপযুক্ত নয়।”
(সহীহ্ মুসলিম)
সংক্ষেপে যাদেরকে যাকাত/ফিতরা দেওয়া যাবে না:
পিতা-মাতা ও সন্তান
স্বামী-স্ত্রী
ধনী ব্যক্তি
অমুসলিম
রাসূল ﷺ-এর বংশধর (বনি হাশিম)
(সংক্ষিপ্ত)
✍️রিয়াজ আহমদ তানজীম।