26/06/2026
#হৃদয়ের_স্পন্দনে_মহররমও_কারবালার_আর্তনাদঃ
মুহাররম কেবল একটি মাস নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর ঐতিহ্যের এক দগদগে ক্ষত ও ইতিহাসের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। যখনই আকাশপটে মুহাররমের নতুন চাঁদ উদিত হয়, মুমিনের হৃদয়ে এক অদ্ভুত হাহাকার ও শ্রদ্ধার শিহরণ খেলে যায়। এটি সেই মাস, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সত্যের পথে আত্মত্যাগের মহিমা, মিথ্যার বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের পরাকাষ্ঠা এবং আল্লাহর ভালোবাসায় সবকিছু বিলিয়ে দেওয়ার অনন্য এক দৃষ্টান্ত। কারবালার মরুপ্রান্তরে যা ঘটেছিল, তা কেবল একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে চিরন্তন সংঘাতের এক চূড়ান্ত রূপরেখা। আজ আমরা সেই ইতিহাসের পাতা উল্টাব, কিন্তু আবেগ ও যুক্তির ভারসাম্য বজায় রেখে, দলিলের স্বচ্ছ আয়নায় সত্যের অবয়ব অনুসন্ধানের প্রচেষ্টায়।
#মুহাররমের পরিচিতি ও মহিমাঃ 'মুহাররম' (المحرم) শব্দের অর্থ হলো 'নিষিদ্ধ' বা 'পবিত্র'। ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগেও এই মাসে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল। এটি হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ইসলামি শরিয়তে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ চারটি মাসের একটি। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ۚ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ "নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাসের সংখ্যা বারোটি—সেদিন থেকেই যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে চারটি মাস হলো সম্মানিত (হারাম)। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং তোমরা এই মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।" (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩৬)।
এই চারটি হারাম মাস হলো—যুলকাদাহ, যুলহিজ্জাহ, মুহাররম এবং রজব। এই মাসগুলোতে ইবাদতের গুরুত্ব যেমন বেশি, তেমনি পাপের ভয়াবহতাও অধিক।
#আশুরার তাৎপর্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ
আশুরা কী? 'আশুরা' শব্দটি 'আশারা' (দশ) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ দশম তারিখ। মুহাররমের দশম দিনকে আশুরা বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত।
সহীহ হাদিসের আলোকে আশুরারঃ রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর ইহুদিদের আশুরার রোজা রাখতে দেখে এর কারণ অনুসন্ধান করেছিলেন। যেমনটি হাদিসে এরকম আসছে, عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَدِمَ الْمَدِينَةَ فَوَجَدَ الْيَهُودَ صِيَامًا يَوْمَ عَاشُورَاءَ فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مَا هَذَا الْيَوْمُ الَّذِي تَصُومُونَهُ قَالُوا هَذَا يَوْمٌ عَظِيمٌ أَنْجَى اللَّهُ فِيهِ مُوسَى وَقَوْمَهُ وَغَرَّقَ فِرْعَوْنَ وَقَوْمَهُ فَصَامَهُ مُوسَى شُكْرًا فَنَحْنُ نَصُومُهُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَنَحْنُ أَحَقُّ وَأَوْلَى بِمُوسَى مِنْكُمْ فَصَامَهُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ অর্থাৎ, ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এই দিন তোমরা কেন রোজা রাখো?" তারা বলল, "এটি একটি মহান দিন। আল্লাহ এ দিনে মুসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। তাই মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এ দিনে রোজা রেখেছিলেন, আমরাও তাই রাখি।" রাসূল (সা.) বললেন, "আমরা মুসা (আ.)-এর অনুসরণে তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।" এরপর তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং উম্মতকে রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২০০৪; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৩০)।
#আশুরার সঙ্গে সম্পর্কিত নবীদের ঘটনাঃ মুহাররমের ১০ তারিখ ঐতিহাসিক ঘটনাবলির কেন্দ্রবিন্দু। তবে মনে রাখতে হবে, অনেক জনশ্রুতি অতিরঞ্জিত। বর্তমান সময়ে আমাদেরকে সহীহ ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি ।
১. মুসা (আ.) ও ফেরাউন: এটি কুরআন ও সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত সত্য। আল্লাহ মুসা (আ.)-কে বিজয় দান করেছিলেন।
২. নূহ (আ.)-এর কিস্তি: ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, নূহ (আ.)-এর কিস্তি জুদি পাহাড়ে এ দিনে ভিড়েছিল। এটি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।
৩. অন্যান্য ঘটনা: আশুরার দিনে আদম (আ.)-এর সৃষ্টি, ইবরাহিম (আ.)-এর অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি ইত্যাদি সম্পর্কে যেসব হাদিস প্রচলিত, তার অধিকাংশেরই সনদ অত্যন্ত দুর্বল। মুহাদ্দিসগণের মতে, এগুলোকে অকাট্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করা প্রশ্নবিদ্ধ।
#কারবালার_বিয়োগান্তকইতিহাস (পর্যালোচনা)ঃ
#প্রেক্ষাপটঃ ক্ষমতা ও সংকট: হযরত আমীরে মুয়াবিয়া (রাঃ )-এর ওফাতের পর তাঁর পুত্র ইয়াজিদের হাতে খেলাফতের দায়িত্ব অর্পিত হয়। ইয়াজিদের নেতৃত্ব নিয়ে মদিনার বিশিষ্ট সাহাবী ও তাবেয়ীনদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। ইমাম হুসাইন (রা.) ইয়াজিদের বাইআত নিতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ তিনি ইয়াজিদের শাসন পদ্ধতির স্বচ্ছতা ও সততা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
#কুফাবাসীদের আমন্ত্রণ ও বিশ্বাসঘাতকতাঃ কুফাবাসীরা ইমাম হুসাইন (রা.)-কে কুফায় আসার জন্য বারবার চিঠি লিখে আমন্ত্রন জানায়। ইমাম হুসাইন (রা.) পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য মুসলিম বিন আকিল (রা.)-কে প্রেরণ করেন। কিন্তু কুফাবাসীরা ইয়াজিদের বাহিনীর চাপে পড়ে মুসলিম বিন আকিল (রা.)-কে সাহায্য করেনি, বরং তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
#কারবালার পথে ইমাম হুসাইন (রাঃ)ঃ ইমাম হুসাইন (রা.) পরিবারের সদস্য ও অল্প কিছু সঙ্গী নিয়ে মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে কারবালা প্রান্তরে উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ প্রেরিত বিশাল বাহিনী তাঁদের অবরুদ্ধ করে ফেলে। সেখানে পানির উৎস বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইমাম হুসাইন (রা.) কেবল ন্যায়বিচার ও অন্যায়ের প্রতিবাদ চেয়েছিলেন, যুদ্ধ তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু ইয়াজিদ বাহিনী আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
#ইমাম_হুসাইন (রাঃ) এর শাহাদাত ও পরবর্তী ঘটনাঃ
১০ই মুহাররম আসরের সময় ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাতবরণ করেন। কারবালার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে এক গভীর বেদনার নাম। ১০ই মুহাররম, আসরের সময় মহানবী ﷺ-এর প্রিয় দৌহিত্র, জান্নাতের যুবকদের সর্দার ইমাম হুসাইন ইবনে আলী রাঃ শাহাদাতবরণ করেন। কারবালা ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক ঘটনাগুলোর একটি। তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে সত্য, ন্যায় ও দ্বীনের মর্যাদা রক্ষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁর শাহাদাত মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরকাল ত্যাগ, ধৈর্য ও নীতির প্রতীক হয়ে থাকবে।
কিন্তু অনেকে ইয়াযিদকে রাঃ পর্যন্ত বলছেন। কিন্তু ইয়াজিদের শাসনামলেই কারবালার এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। অধিকাংশ ইতিহাসবিদ ইয়াজিদকে এই ঘটনার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় থেকে মুক্ত মনে করেন না। যদিও সে সরাসরি হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন—এমন বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মতে, ইয়াযিদ কিন্তু এর দায় এড়াতে পারে না। এজন্য আহলে হক্ব উলামায়ে কেরামের অধিকাংশ ই তাকে কাফের মনে করেন।
#আহলুল বাইতের মর্যাদা ও শিক্ষাঃ রাসূল (সা.) আহলুল বাইতের ব্যাপারে সাহাবীদের অনেকবার অসীয়ত করেছেন, এমনকি আল্লাহ তায়ালা আহলে বাইতকে যথাযথ পবিত্র ও সম্মানিত করেছেন যা কোরআন শরীফে বর্ণিত আছে । এমনকি, ইমাম হুসাইন (রা.) সম্পর্কে প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন: "হুসাইন আমার থেকে এবং আমি হুসাইন থেকে। যে হুসাইনকে ভালোবাসে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন।" (সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং ৩৭৭৫)।
#কারবালার শিক্ষাঃ ১. একমাত্র আল্লাহর সামনে মস্তক অবনত করা; জালিম ও অন্যায়ের সামনে কখনো মাথা নত না করা।
২. সত্য, ন্যায় ও ইসলামের আদর্শের পথে জীবন চলে গেলেও অটল থাকা।
৩. ধৈর্য, তাকওয়া ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা।
৪. অন্যের হক (অধিকার) আদায়ে সচেতন থাকা এবং কোনো অবস্থাতেই জুলুম বা হক নষ্ট না করা।
৫. জুলুমের প্রতিবাদ করা এবং মজলুমের পাশে দাঁড়ানো।
৬. দুনিয়াবি স্বার্থের চেয়ে দ্বীন, নৈতিকতা ও আদর্শকে প্রাধান্য দেওয়া।
৭. মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা।
#আশুরার করণীয় ও বর্জনীয়ঃ করণীয়: রোজা রাখা (৯ ও ১০ বা ১০ ও ১১ তারিখ)। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা।
বর্জনীয়: শোক পালনের নামে মাতম করা, শরীর রক্তাক্ত করা (জিঞ্জির মাতম), যা ইসলামে নিষিদ্ধ। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ধৈর্য ও ঈমানের পরিপন্থী।
পরিশেষে, কারবালা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—দুনিয়া নশ্বর, কিন্তু নীতি অমর। ইমাম হুসাইন (রা.)-এর ত্যাগ আমাদের শেখায়, ক্ষমতার চেয়ে সত্য বড়, দাপটের চেয়ে ইনসাফ বড়। আসুন, আমরা কোনো প্রকার কুসংস্কার বা বিদাতে লিপ্ত না হয়ে, কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে মুহাররম ও আশুরাকে অতিবাহিত করি। হে আল্লাহ! আমাদের উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ রাখো, ন্যায় ও ইনসাফের পথে চলার তাওফিক দাও এবং আহলুল বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার ভারসাম্য রক্ষা করার শক্তি দান করো।
✍️ Muhi Uddin
শিক্ষার্থী, আল হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।