29/05/2021
কোরআন ও হাদিসে ভূমিকম্প প্রসঙ্গ
যখন কোথাও ভূমিকম্প হয় অথবা সূর্যগ্রহণ হয় কিংবা ঝোড়ো বাতাস বা বন্যা হয়, তখন মানুষের উচিত মহান আল্লাহর কাছে অতি দ্রুত তাওবা করা। তাঁর কাছে নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা। মহান আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা
জানা গেছে, ভূ-অভ্যন্তরে শিলায় পীড়নের জন্য যে শক্তির সঞ্চয় ঘটে, সেই শক্তির হঠাৎ মুক্তি ঘটলে ভূপৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূত্বকের কিছু অংশ আন্দোলিত হয়। এমন আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প ((Earthquake) বলে। সাধারণত তিনটি কারণে ভূমিকম্পের উত্পত্তি হয়ে থাকে—ভূপৃষ্ঠজনিত, আগ্নেয়গিরিজনিত ও শিলাচ্যুতিজনিত কারণে ভূমিকম্প হয়।
পবিত্র কোরআনে ‘ভূমিকম্প’ (Earthquake) নামের একটি সুরা আছে। এর নাম হলো ‘জিলজাল’। ‘জিলজাল’-কে ইংরেজিতে convulsion বলা হয়। এর ভয়াবহতা বোঝাতে when the Earth is shaken to (utmost) convulsion বলা হয়।
মানুষের কর্মকুশলতা পরীক্ষার জন্য মহান আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন ‘জীবন ও মৃত্যু’। সুরা মুলকের সূচনায় আছে : ‘খালাকাল মাওতা ওয়াল হায়াতা...’ অর্থাৎ আল্লাহ জীবনের আগেই মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন নানাভাবে। মানুষ অনিবার্য কিয়ামতের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা এক মহাপ্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প। ইরশাদ হয়েছে : ‘পৃথিবী ভীষণভাবে উঠিবে কাঁপিয়া/ভিতরের বোঝা দেবে বের করিয়া।/ মানুষ বলিবে তখন কী হলো ইহার/ব্যক্ত করিবে খবর যাবতীয় তার।’ (কাব্যানুবাদ, সুরা জিলজাল : ১-৪)
বুয়েটের গবেষকদের প্রস্তুতকৃত ভূকম্পন-এলাকাভিত্তিক মানচিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৪৩% এলাকা ভূমিকম্পের উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে (জোন-১), ৪১% এলাকা মধ্যম (জোন-২) এবং ১৬% এলাকা নিম্ন ঝুঁকিতে (জোন-৩) রয়েছে। অথচ ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের ভূকম্পন মানচিত্রে ২৬% উচ্চ, ৩৮% মধ্যম এবং ৩৬% নিম্ন ঝুঁকিতে ছিল।
নতুন মানচিত্র অনুযায়ী মাত্রাভেদে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার অবস্থান নিম্নরূপ : জোন-১ : পঞ্চগড়, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সম্পূর্ণ অংশ, ঠাকুরগাঁও, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের অংশবিশেষ। জোন-২ : রাজশাহী, নাটোর, মাগুরা, মেহেরপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী ও ঢাকা। জোন-৩ : বরিশাল, পটুয়াখালী, এবং সব দ্বীপ ও চর। তবে দেখা যাচ্ছে, ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ভূমিকম্প সংঘটনের হার বেড়েছে, অর্থাৎ ঘন ঘন ভূমিকম্প হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, গবেষকরা জানিয়েছেন, যেকোনো সময় বাংলাদেশে রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে।
ভূকম্পনের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সতর্ক করেন, যাতে তারা অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসে। এরই সঙ্গে আমাদের অবশ্যই চিন্তা করা উচিত, কেন এত ভূমিকম্প হচ্ছে?
মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সতর্ক করার জন্য বিভিন্ন ধরনের নিদর্শন সৃষ্টি করেন। বান্দাদের উচিত তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া, যাতে করে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে, তাদের বোধোদয় হয়।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি ভয় দেখানোর জন্যই (তাদের কাছে আজাবের) নিদর্শনগুলো পাঠাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৫৯)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, “বলে দাও, ‘আল্লাহ তোমাদের ওপর থেকে অথবা তোমাদের পায়ের নিচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম।’ ’’ (সুরা আনআম : ৬৫)
বুখারি শরিফে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘‘ ‘যখন তোমাদের পায়ের নিচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম’ আয়াতটি নাজিল হলো, তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ ” (বুখারি) শায়খ ইস্পাহানি (রহ.) এই আয়াতের তাফসির করেছেন এভাবে : ‘এর ব্যাখ্যা হলো, ভূমিকম্প ও ভূমিধসের মাধ্যমে পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাওয়া (পৃথিবীতে ভূমিকম্প হওয়া)।’
বর্তমানে যেসব ভূমিকম্প ঘটছে, তা মহান আল্লাহর প্রেরিত সতর্ককারী নিদর্শনগুলোর একটি। এগুলো দিয়ে তিনি তাঁর বান্দাদের ভয় দেখিয়ে থাকেন। এগুলো মানুষের পাপের ফল। আল্লাহ বলেন, ‘যে বিপদ-আপদই তোমাদের ওপর আসুক না কেন, তা হচ্ছে তোমাদের নিজেদের হাতের কামাই। আর আল্লাহ তোমাদের অনেক (অপরাধ) ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা শুরা : ৩০) তাই মুসলমানদের খুবই আন্তরিকভাবে মহান আল্লাহর কাছে তাওবা করা উচিত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি জনপদের মানুষগুলো ইমান আনত এবং (আল্লাহকে) ভয় করত, তাহলে আমি তাদের ওপর আসমান-জমিনের যাবতীয় বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম, কিন্তু তারা (আমার নবীকেই) মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্য আমি তাদের পাকড়াও করলাম।’ (সুরা আরাফ : ৯৬)
মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘জনপদের মানুষগুলো কি নির্ভয় হয়ে ধরে নিয়েছে যে আমার আজাব তাদের ওপর মধ্যদিনে এসে পড়বে না—তখন তারা খেল-তামাশায় মত্ত থাকবে। কিংবা তারা কি আল্লাহর কলাকৌশল থেকেও নির্ভয় হয়ে গেছে? অথচ আল্লাহর কলাকৌশল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত জাতি ছাড়া অন্য কেউই নিশ্চিত হতে পারে না।’ (আরাফ : ৯৮-৯৯)
আল্লামা ইবনু কাইউম (রহ.) বলেন, ‘মহান আল্লাহ কখনো কখনো পৃথিবীকে জীবন্ত হয়ে ওঠার অনুমতি দেন, যার ফলে তখন বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়। এটা মানুষকে ভীত করে। ফলে তারা মহান আল্লাহর কাছে তাওবা করে। পাপকাজ ছেড়ে দেয়। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে এবং তাদের কৃত পাপকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়।’
তাই যখন কোথাও ভূমিকম্প হয় অথবা সূর্যগ্রহণ হয় কিংবা ঝোড়ো বাতাস বা বন্যা হয়, তখন মানুষের উচিত মহান আল্লাহর কাছে অতি দ্রুত তাওবা করা। তাঁর কাছে নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা। মহান আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘যদি তুমি এমন কিছু দেখে থাকো, তখন দ্রুততার সঙ্গে মহান আল্লাহকে স্মরণ করো, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো।’ (বুখারি ও মুসলিম) প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে মুক্তির জন্য দরিদ্র ও মিসকিনদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা এবং তাদের দান করা উচিত। কেননা রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দয়া প্রদর্শন করো, তোমার প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হবে।’ (মুসনাদে আহমদ)
বর্ণিত আছে, যখন কোনো ভূমিকম্প হতো, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) তাঁর গভর্নরদের দান করার কথা লিখে চিঠি লিখতেন। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যা মানুষকে বিপর্যয় (আজাব) থেকে নিরাপদে রাখে। আর তা হলো, যথাসাধ্য সমাজে প্রচলিত জিনা-ব্যভিচার, অন্যায়-অবিচার রোধ করা। হাদিস শরিফে এসেছে, সমাজে ব্যভিচার বেড়ে গেলে ভূমিকম্প হয়।
প্রায়ই ভূমিকম্পে কেঁপে উঠছে বাংলাদেশ। আমাদের দুর্যোগ মোকাবিলার যে সামর্থ্য, তাতে উচ্চমাত্রার ভূকম্পনে এ দেশের কী হবে, তা মহান আল্লাহই ভালো জানেন। ২০০২ সালে চট্টগ্রামে ৪০ বার ভূমিকম্প হওয়া সেই ভয়াবহতার ইঙ্গিত বহন করে। অন্যদিকে ইতিহাসে পাওয়া যায়, ২০০৫ সালের ২৪ মার্চ ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় ভূমিকম্পে ১৩ লাখ, ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার আচেহ্ প্রদেশের ভূমিকম্প ও সুনামিতে দুই লাখ ২৬ হাজার, ১৯৬০ সালের ২২ মে চিলির ভূমিকম্পে প্রাণ হারায় পাঁচ হাজার মানুষ।
ভূমিকম্পের অন্য নাম কিয়ামত। এর ক্ষতি ও ভয়াবহ পরিণতির জন্য দায়ী মানুষের অপকর্ম ও অনাচার। ধর্মদ্রোহীদের শাস্তি দান প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মিনহুম্ মান্ খাসাফনা বিহিল আরদা’—অর্থাৎ তাদের কাউকে আমি মাটির নিচে গেড়ে দিয়েছি। (আনকাবুত : ৪০) তাই সবার উচিত মহান আল্লাহকে ভয় করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। কিয়ামতের ভূমিকম্প এক ভয়ংকর ব্যাপার।’ (সুরা হজ : ১)
সুনামি ও এর প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসে যেভাবে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়, কিয়ামতের ভয়াবহতা তার চেয়ে মারাত্মক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘(যেদিন কিয়ামত হবে) প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে পৃথিবী এবং পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে তা উিক্ষপ্ত ধূলিকণায় পর্যবসিত হবে।’ (সুরা ওয়াকিয়া : ৪-৬)
প্রাকৃতিক নানা বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ মানুষের অপকর্ম। এগুলোর পথ ধরেই মানুষ কিয়ামতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সতর্ক করে প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘যখন জাতির নিকৃষ্ট ব্যক্তি তাদের নেতা হবে, ক্ষতির ভয়ে মানুষকে সম্মান করা হবে, সে সময় তোমরা অপেক্ষা করো রক্তিম বর্ণের ঝড়ের (এসিড বৃষ্টি), ভূকম্পনের, ভূমিধসের, রূপ বিকৃতির (লিঙ্গ পরিবর্তন) পাথর বৃষ্টির এবং সুতো ছেঁড়া (তাসবিহ্) দানার ন্যায় একটির পর একটি নিদর্শনগুলোর জন্য।’ (তিরমিজি)
সুতরাং বলাই যায়, ধেয়ে আসছে আরো ভয়াবহ ভূমিকম্প, যদি না আমরা নিজেদের শুধরে নিই। মহান আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন, নিরাপদ রাখুন। আমরা আশা করি এবং দোয়া করি, ওলি-আউলিয়ার এই দেশে, অগণিত হাফেজ-আলেমের এই দেশে, অসংখ্য মসজিদ-মাদ্রাসার এই দেশে আল্লাহ ভূমিকম্প দিয়ে আমাদের ধ্বংস করে দেবেন না।