10/06/2026
পুলিশও মানুষ!
Fahim Al Chowdhury
৫ই আগস্ট, এই তারিখটি বাংলাদেশের ইতিহাসের বুকে র.ক্ত, আগুন, আর অসংখ্য পুলিশ পরিবারের কান্নায় লেখা এক বিভীষিকাময় অধ্যায়।
আজও আমি চোখ বন্ধ করলে সেই বিভীষিকাময় দৃশ্যগুলো আমাকে তাড়া করে বেড়ায়, চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা, বুকফাটা চিৎকার, আতঙ্কে কাঁপতে থাকা মানুষ, আর জীবন বাঁচানোর শেষ আকুতিতে এক কোণা থেকে আরেক কোণায় ছুটে বেড়ানো অসহায় কিছু পুলিশ সদস্য!
কেউ সাহায্য চাইছিল, কেউ শুধু বাঁচতে চাইছিল, কিন্তু সেদিন যেন মানবতা পর্যন্ত ভয়ে লুকিয়ে পড়েছিল। অনেকের চোখে ছিল মৃত্যুভয়, অনেকের মুখে ছিল পরিবারের শেষ স্মৃতি, সেই আতঙ্ক, সেই কান্না, সেই অসহায় দৌড় আজও আমার হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
তারা তখন আর “পুলিশ” ছিল না, তারা ছিল কারো বাবা, কারো সন্তান, কারো স্বামী, কারো একমাত্র ভরসা, কারো বৃদ্ধ মায়ের শেষ আশ্রয়, আমি আজও ভুলতে পারি না কীভাবে তারা আতঙ্কে এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায় দৌড়াচ্ছিল, কীভাবে তারা কাঁপা চোখে মানুষের দিকে তাকিয়ে একটু আশ্রয় চাইছিল, কীভাবে তারা শুধু বাঁচতে চাইছিল, আর কিছু না, শুধু একটু বাঁচতে!
সেদিন তাদের গায়ে ইউনিফর্ম ছিল, কিন্তু বুকের ভেতর ছিল সাধারণ একজন মানুষেরই হৃদয়, যে হৃদয় ভয় পায়, যে হৃদয় পরিবারকে মনে করে কাঁদে, যে হৃদয় বাঁচার জন্য আকুতি করে!
কেউ হয়তো শেষবারের মতো নিজের সন্তানের ছবিটা দেখেছিল,
কেউ হয়তো মায়ের কণ্ঠটা মনে করে চোখের পানি লুকিয়েছিল,
কেউ হয়তো আল্লাহকে ডেকে শুধু বলেছিল, আমাকে বাঁচিয়ে দিন, কিন্তু সেই দিন, মানুষের ভেতরের মানবতাও যেন মারা গিয়েছিল।
হ্যাঁ…
মানুষের রাগ ছিল, ক্ষো.ভ ছিল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের ঘৃণা ছিল, কিন্তু সেই দিন যা হয়েছে, তা শুধু প্রতিশোধ ছিল না, তা ছিল মানবতার মৃত্যু।
কারণ একজন মানুষ যখন আগুনে পুড়ে চিৎকার করে বাঁচতে চায়, আর চারপাশের মানুষ দাঁড়িয়ে সেটা দেখে, তখন শুধু একজন পুলিশ মারা যায় না, মরে যায় মানুষের বিবেকও।
আমি আজও ভুলতে পারি না,
কীভাবে ইউনিফর্ম পরা মানুষগুলো আতঙ্কে এদিক, ওদিক দৌড়াচ্ছিল, কীভাবে তারা মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে শুধু একটু দয়া চাইছিল!
একটু আশ্রয় চাইছিল!
একটু বাঁচতে চাইছিল!
কিন্তু সেই দিন দয়া হারিয়ে গিয়েছিল। মানুষ যেন মানুষ ছিল না।
একজন কনস্টেবল আগুনের ভেতর হাত নাড়ছিল, হয়তো সে বাঁচতে চেয়েছিল, হয়তো তার ছোট্ট মেয়েটা বাসায় বসে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিল!
একজন এএসআই কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, ভাই, আমারে মাইরেন না, তার কণ্ঠে কোনো ক্ষমতা ছিল না, ছিল শুধু মৃত্যুভয়।
একজন এসআই হয়তো শেষ নিঃশ্বাসের আগে নিজের সন্তানের মুখটা মনে করছিল, হয়তো ভাবছিল, আর একবার যদি আমার বাচ্চাটাকে দেখতে পারতাম! কিন্তু কেউ থামেনি। কেউ একবারও বলেনি, যথেষ্ট হয়েছে!
সেই দিন হ.ত্যা যেন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল, মানুষের চিৎকার যেন বিনোদন হয়ে গিয়েছিল, আর আগুনের শিখার সাথে সাথে পুড়ে গিয়েছিল মানবতা, দয়া আর বিবেক।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে যখন ভাবি, যারা মারা গেল, যারা পুড়ে ছাই হয়ে গেল, যারা রাস্তায় পড়ে শেষ নিঃশ্বাস নিল, তাদের বেশিরভাগই ছিল সাধারণ পুলিশ সদস্য।
একজন সাধারণ কনস্টেবল, একজন এএসআই, একজন এসআই, যারা শুধু “অর্ডার” পালন করছিল। তারা কুরআন ছুঁয়ে শপথ নিয়েছিল, উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ মানবে। তাদের কাজ ছিল আদেশ পালন করা।
কিন্তু যারা নির্দেশ দিয়েছিল, যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যারা ক্ষ.মতার খেলায় আগুন লাগিয়েছিল, তাদের অনেকে নিরাপদে চলে গেল। আর মরে গেল সেই সাধারণ পুলিশ সদস্যরা, যাদের হয়তো বাসায় ছোট্ট সন্তান অপেক্ষা করছিল, আব্বু কখন আসবে?
আজও আমি ভাবি!
সেই শ.হীদ পুলিশ সদস্যদের মায়েরা কীভাবে বেঁচে আছেন?
তাদের সন্তানরা কীভাবে “বাবা” শব্দটা সহ্য করে? তাদের স্ত্রীরা কীভাবে প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে? তাদের কান্না কি কেউ শুনছে? তাদের বুকভাঙা গল্প কি কেউ জানতে চায়?
সবাই শুধু বলে,
“পুলিশের উপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।”
কিন্তু কেউ কি একবারও ভেবেছে, এই ভয়াবহ ট্রমার পর পুলিশের নিজের মন কে ফিরিয়ে আনবে? তাদের ভাঙা হৃদয় কে জোড়া লাগাবে? তাদের রাতের দুঃস্বপ্ন কে থামাবে?
আজও অনেক পুলিশ সদস্য আতঙ্কে থাকে। আজও তারা ভয় পায়। আজও তারা ভাবে, কোনো ভুল হলে হয়তো আমাকেই মরতে হবে!
আমার বিশ্বাস…
এই ক্ষত শুকাতে অনেক বছর লাগবে। কারণ শরীরের ক্ষত শুকায়, কিন্তু চোখের সামনে মৃত্যুর আগুন দেখার ক্ষত কখনো শুকায় না।
তাই আজ আমি দুই হাত জোড় করে একটা কথাই বলতে চাই!
দয়া করে আমাদের পুলিশ সদস্যদের ঘৃণা করবেন না! তাদের অভিশাপ দেবেন না! তাদের অপমান করবেন না! কারণ সেই ইউনিফর্মের ভেতরেও একজন মানুষ বেঁচে থাকে।
একজন বাবা,
যে ডিউটিতে যাওয়ার আগে সন্তানের কপালে চুমু খেয়ে বের হয়,
কিন্তু জানে না আবার ফিরে এসে সেই মুখটা দেখতে পারবে কিনা।
একজন সন্তান,
যার বৃদ্ধ মা রাত জেগে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে, শুধু এই আশায়, আমার ছেলেটা আজ নিরাপদে বাসায় ফিরুক!
একজন স্বামী,
যার স্ত্রী মাঝরাতে ফোন না ধরলে আতঙ্কে কেঁপে ওঠে, কারণ সে জানে, এই চাকরিতে মৃত্যুর খবর কখনো দরজায় কড়া নেড়ে আসে না, হঠাৎ করেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়।
তারা শুধু ইউনিফর্ম না, তাদেরও বুক ফেটে কান্না আসে, তাদেরও হৃদয় ভেঙে যায়, তাদেরও ভয় লাগে, তাদেরও ব্যথা হয়, তাদেরও সন্তান আছে, স্বপ্ন আছে, অসমাপ্ত গল্প আছে!
আপনি যখন গভীর ঘুমে নিজের সন্তানকে বুকের কাছে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমান, তখন হয়তো কোনো এক পুলিশ সদস্য, ক্ষুধার্ত পেটে, ক্লান্ত শরীরে, রাতভর রাস্তায় দাঁড়িয়ে আপনার পরিবারকে নিরাপত্তা দিচ্ছে।
ঈদের দিনেও তারা বাসায় থাকতে পারে না, সন্তানের জন্মদিন মিস করে, মায়ের জানাজায় যেতে পারে না, শুধু এই দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য।
কিন্তু বিনিময়ে আমরা কী দিই?
ঘৃণা, অপমান, অভিশাপ, আর কখনো কখনো এমন নিষ্ঠুরতা, যা কোনো সভ্য হৃদয় সহ্য করতে পারে না।
আর মনে রাখবেন,
সেই ইউনিফর্মের ভেতরেও একজন মানুষ থাকে, যে রাতের অন্ধকারে চুপচাপ কাঁদে, যে বুকের ভেতর হাজারো ব্যথা লুকিয়ে রাখে, যে শুধু একটু সম্মান, একটু মানবতা, আর বেঁচে থাকার অধিকার চায়।
© Al Chowdhury