25/05/2026
স্মৃতির মণিকোঠায় মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী: এক অনন্য ও নিরহংকার ব্যক্তিত্ব
সালটা সম্ভবত ২০১৬। আমার মামাতো ভাই তখন তুরস্কের (তুর্কি) একটি স্কলারশিপ পেয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে যাবে, কিন্তু সেখানে গিয়ে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে করবে—তা নিয়ে পরিবারের সবার মধ্যেই একটা দুশ্চিন্তা কাজ করছিল।
একদিন শাহগলী বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাওলানা আব্দুস সামাদ তাপাদার ভাই বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি আমাকে পরামর্শ দিয়ে বললেন, "সাবেক এমপি মহোদয়ের ছেলে তুর্কিতে লেখাপড়া করেন। তুমি বারহাল ডিগ্রী কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ফয়জুল ইসলাম চৌধুরী ভাইর সাথে যোগাযোগ করো। তিনি হয়তো এমপি সাহেবের ছেলের সাথে একটি সাক্ষাৎ বা আলোচনার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন।"
সামাদ ভাইয়ের পরামর্শ অনুযায়ী আমি ফয়জুল ইসলাম চৌধুরী ভাইর সাথে আলোচনা করলাম। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আশ্বাস দিলেন যে, এমপি মহোদয়ের ছেলের সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিবেন।
হঠাৎ একদিন ফয়জুল ভাই ফোন দিয়ে বললেন, "আজই এমপি সাহেবের ছেলের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে। তুমি সিলেট হাউজিং স্টেট বাসায় চলে যাও।"
সমস্যা হলো, আমি সেই বাসা চিনতাম না। ফয়জুল ভাইর দেওয়া লোকেশন অনুযায়ী একটি রিকশা নিয়ে হাউজিং স্টেট মসজিদ গলি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। কিন্তু গলির ভেতর গিয়ে আমি বা রিকশাচালক—কেউই নির্দিষ্ট বাসাটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। একপর্যায়ে চালক বলল, "মামা, সামনে একজন মুরুব্বি আসতেছেন, উনাকে জিজ্ঞেস করি এমপি সাহেবের বাসাটা কোথায়?"
রিকশাটি যখন সেই মুরুব্বির সামনে গিয়ে থামল, আমি তো দেখে স্তব্ধ! গায়ে সাধারণ একটা গামছা জড়ানো—যিনি আর কেউ নন, স্বয়ং আমাদের শ্রদ্ধেয় এমপি মহোদয়!
আমি দ্রুত রিকশা থেকে নেমে উনাকে সালাম দিতেই তিনি হাসিমুখে বললেন, "তোমাকে ফয়জুল ইসলাম চৌধুরী পাঠাইছেন?"
তিনি আমাকে বললেন, "রিকশা ছেড়ে দাও, সামনেই বাসা। আমরা হেঁটেই যাব।"
হেঁটে হেঁটে যাওয়ার সময় জানতে পারলাম, শ্রদ্ধেয় ফয়জুল ইসলাম চৌধুরী ভাই আগেই ফোন করে এমপি সাহেবকে জানিয়েছিলেন যে আমি বাসা চিনি না। আর তাই, আমাকে রিসিভ করার জন্য একজন সাবেক এমপি নিজে রাস্তার মোড়ে চলে এসেছেন! এই সাধারণত্ব দেখে আমি মনে মনে চরম বিস্মিত হচ্ছিলাম।
বাসায় যাওয়ার পর এমপি সাহেব কিছু সময়ের জন্য অন্য রুমে গেলেন। আমি ড্রইংরুমে বসে উনার কর্মময় জীবনের কিছু স্মৃতিচিহ্ন ও বাঁধাই করা ছবি দেখছিলাম। এমন সময় দেখি, এমপি সাহেব নিজ হাতে চা ও বিস্কুটের ট্রে নিয়ে আমার সামনে হাজির! তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললেন, "আমার বাসায় আজ কেউ নেই। চা কেমন হয়েছে জানি না, নিজেই রেডি করলাম।" একজন সাবেক এমপির হাতের চা খাওয়া—আমার জন্য ছিল এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি!
চা খাওয়া শেষ হলে তিনি পরম স্নেহে জিজ্ঞেস করলেন, "এবার বলো, তুমি কেন আসছ?"
আমি যখন তুরস্কের বিষয় ও উনার ছেলের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যটা জানালাম, তিনি হেসে বললেন, "এটা তো আমার জানার বিষয় নয়, আমার ছেলে এই বিষয়ে ভালো বুঝবে।"
উনার ছেলে নাজমুস সাকিব ভাই তখন আম্বরখানায় একটা জরুরি কাজে ছিলেন। এমপি সাহেব নিজেই ফোন হাতে নিয়ে ছেলেকে বললেন, "বাসায় তাড়াতাড়ি চলে আসো। তোমার সাথে দেখা করার জন্য একজন মেহমান এসেছেন।"
নাজমুস সাকিব ভাই বাসায় আসার সাথে সাথেই এমপি সাহেব রসিকতা করে বললেন, "আমি চা বানিয়ে মেহমানকে দিয়েছি, ভালো হয়নি। তোমরা আলাপ করার আগে আমাদের সবার জন্য ভালো করে আরেকবার চা বানিয়ে আনো।"
সাকিব ভাই চমৎকার চা বানিয়ে নিয়ে এলেন। এরপর চা খেতে খেতে আমাদের মূল বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা হলো। এমপি সাহেব সাকিব ভাইকে বললেন, "ফয়জুল ইসলাম চৌধুরী পাঠিয়েছে ছেলেটিকে। তুমি সব ভালো করে শুনে কী করতে হবে সঠিক পরামর্শ দাও।"
দীর্ঘ আলোচনা শেষে যখন আমি বিদায় নেব, তখন এমপি সাহেব সাকিব ভাইকে নির্দেশ দিলেন, "মেহমানকে তুমি নিজে একটা রিকশা করে আম্বরখানায় পৌঁছে দিয়ে আসবে, আর রিকশা ভাড়াও তুমিই দিয়ে দিবে।"
এমপি সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নাজমুস সাকিব ভাইর সাথে আম্বরখানায় চলে আসলাম। রিকশা থেকে নামার পর আমি অনেক চেষ্টা করেও রিকশা ভাড়া দিতে পারলাম না, সাকিব ভাই-ই জোর করে ভাড়াটা দিয়ে দিলেন।
এই দিনটির স্মৃতি আমার জীবনে আজীবন অম্লান থাকবে। একজন সাবেক সংসদ সদস্য, অথচ যার মধ্যে অহংকারের লেশমাত্র নেই! যিনি নিজেই আমাকে রাস্তা থেকে রিসিভ করে এনে নিজ হাতে চা বানিয়ে খাওয়ালেন।
আজকের সমাজে সামান্য পদ-পদবি বা অর্থবিত্তের মালিক হলে মানুষের অহংকার আকাশচুম্বী হয়ে যায়। অনেকের সন্তানদের আচরণ দেখে মনে হয় তারা যেন দেশের মন্ত্রী-এমপির সন্তান! কিন্তু আমাদের শ্রদ্ধেয় এমপি সাহেবের ছেলের সাথে সাক্ষাৎ করে বুঝলাম—এরাই আসল আদর্শবান পিতার আদর্শবান সন্তান। কোনো অহংকার নেই, কথাবার্তা ও আচরণ একদম অমায়িক।
আজ যখন ফেসবুকের পাতায় দেখতে পেলাম আমাদের সবার প্রিয় এমপি সাহেব অসুস্থ হয়ে আইসিইউতে ভর্তি আছেন, মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। মহান আল্লাহর দরবারে আকুল প্রার্থনা—তিনি যেন এই মহৎ, সরল ও নিরহংকার মানুষটিকে দ্রুত সুস্থতা দান করেন এবং আমাদের মাঝে দীর্ঘায়ু করেন। আমিন।
বিনীত,
সাইফুর রহমান
প্রিন্সিপাল, শাহগলী আদর্শ শিশু বিদ্যানিকেতন।
সাবেক সহ-সভাপতি, সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন, সিলেট জেলা।
সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, সিলেট জেলা।