09/10/2025
🌿 গল্পের নাম: থাকার হলে কারণ লাগে না
রাত তখন প্রায় এগারোটা।
ঘরের কোণে ছোট্ট দোলনায় ঘুমোচ্ছে তাদের তিন মাসের সন্তান — রাফি।
চুপচাপ বসে আছে নীলা, মুখে অভিমান, চোখে অশ্রু জমে আছে নিঃশব্দে।
অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে এসেছে রাহাত, তবুও স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারল — কিছু একটা গভীরে গেঁথে আছে।
রাহাত মৃদু গলায় বলল,
— “তুমি সারাদিন একা বাচ্চাকে সামলাও, আমি জানি কষ্ট হয়। কিন্তু আমি তো তোমাদের জন্যই পরিশ্রম করছি।”
নীলা মুখ ঘুরিয়ে নরম অথচ কাঁপা স্বরে বলল,
— “তুমি বুঝবে না রাহাত… সন্তান জন্মের পর আমার কতটা ভয় লাগে। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি ফিরে না আসো, রাফি কাঁদলে আমি একা থাকি। রাতের খাবার খেতে পারি না, মনে হয় আমি একা হয়ে গেছি… পুরোপুরি একা।”
রাহাত কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— “নীলা, আমি তোমার পাশে থাকতে চাই, কিন্তু সংসারের দায়িত্ব সামলাতে টাকার প্রয়োজন হয়। কাজের ব্যস্ততায় সবসময় পারি না, তবু মনটা থাকে তোমাদের কাছেই। তুমি রাগ করো, চুপ থাকো, দূরে সরে যাও… অথচ আমি সারাদিন অপেক্ষা করি, তুমি একবার বলবে — ‘তুমি ছাড়া পারব না।’”
নীলার চোখে পানি জমল, তবুও মুখে কঠিন স্বর,
— “আমি বাবার বাড়ি যাব কিছুদিন।”
রাহাত দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
— “যাও, যদি মনে হয় সেখানে শান্তি পাবে। তবে একটা কথা মনে রেখো — থাকার হলে কারণ লাগে না, আর চলে যাওয়ার হলে অজুহাতও কম পড়ে না।”
নীলা কিছু না বলে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে চুপচাপ চলে গেল।
---
🕰️ দুই সপ্তাহ পর...
বাবার বাড়িতে নীলাকে সবাই ভালোবাসে, যত্ন নেয়।
তবুও যখন রাতের নীরবতায় রাফি কাঁদে, তখন তার মনে পড়ে — রাহাতের সেই উষ্ণ হাত, যে হাতটা একবারেই রাফিকে শান্ত করে ঘুম পাড়িয়ে দিত।
এক রাতে মায়ের কোলে মাথা রেখে নীলা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “মা, রাফি যখন কাঁদে, মনে হয় রাহাতের কণ্ঠ শুনতে পায়। ওর কোলে ছাড়া বাচ্চাটাও যেন ঘুমাতে চায় না।”
মা মৃদু হেসে বললেন,
— “ভালোবাসা বুঝতে অনেক সময় লাগে মা। বাচ্চার মতোই সম্পর্ককেও যত্নে বড় করতে হয়।”
নীলা চুপচাপ ফোনটা হাতে নিল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে অবশেষে কল দিল।
ফোনের ওপাশে ক্লান্ত কিন্তু কোমল কণ্ঠে রাহাত বলল,
— “হ্যালো?”
নীলার কণ্ঠ কেঁপে উঠল,
— “রাফি ঘুমাচ্ছে না… তোমাকে খুঁজছে, আমিও।”
ওপাশে নিঃশব্দ কান্নার মতো কণ্ঠ,
— “ফিরে এসো নীলা, আমি এখনো অপেক্ষা করছি। কারণ ভালোবাসা থাকলে কখনোই কারণ লাগে না।”
---
সেদিন রাতে নীলা ফিরে এলো।
দরজা খুলে রাহাত দেখল — কোলে রাফি, মুখে অশ্রু, কিন্তু চোখে এক শান্ত আলো।
রাহাত এগিয়ে এসে বলল,
— “চলে যেও না আর কখনো।”
নীলা মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
— “আর যাব না। এখন বুঝেছি, যাকারণে থেকেও থাকা যায় — ভালোবাসার জন্য।”
ছোট্ট রাফি দু’জনের মাঝখানে শান্ত ঘুমে ঢলে পড়ল।
বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হলো,
আর ঘরের ভিতর নিঃশব্দে বাজল সেই অমলিন সত্য—
💫 “থাকার হলে কারণ লাগে না।”