04/02/2026
আন্তর্জাতিক আইন (এলএল.বি-শেষ পর্ব)
প্রশ্ন-১: (খ) আন্তর্জাতিক আইন কাকে বলে? এর ভিত্তি সংক্রান্ত মতবাদ কি? এই আইন বিকাশের বিবরণ অথবা আন্তর্জাতিক আইনের বৈশিষ্ট্য কি কি? 'শক্তিধর রাষ্ট্রের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের উপর আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যত নির্ভর করে' -আলোচনা কর। "আন্তর্জাতিক আইন হলো আইনবিজ্ঞানের বিলিয়মান বিন্দু" আলোচনা কর।
রাষ্ট্রীয় আইন হতে আন্তর্জাতিক আইনের পার্থক্য কিভাবে হয়ে থাকে? আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় আইনের তত্ত্ব ও সম্পর্ক আলোচনা কর। আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব কাকে বলে? আন্তর্জাতিক ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর অথবা সকল শ্রেণির রাষ্ট্র কি আন্তর্জাতিক ব্যক্তি? কোন ব্যক্তি কি আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের মর্যাদা ও গুণাবলী অর্জন করতে পারে? এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের অবস্থান
সম্পর্কে আলোচনা কর।
ভূমিকা : স্বভাবগতভাবে মানুষ শান্তিপ্রিয়। শান্তি চায় না এমন কোন মানুষ বা জাতি নেই। সকল জাতি ও সকল মানুষের একান্ত কাম্য হলো শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। তারপরও বিভিন্ন কারণে যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত হয়। ইতিমধ্যে দু'টি বিশ্বযুদ্ধও অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় জাতিসংঘ। প্রতিষ্ঠার পর জাতিসংঘ ঘোষণা করে যে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের বৈধতা বা আচার-আচরণের মাপকাঠি হবে আন্তর্জাতিক আইন।
আন্তর্জাতিক আইন (International Law) কাকে বলে:
জা. বি. ২০১২, ২০১৪, ২০১৫, ২০১৬, ২০১৮, ২০২১
বিভিন্ন আইনবিদগণ আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করেছেন।
অধ্যাপক ওপেনহাম এর মতে, আন্তর্জাতিক আইন বলতে প্রথাযুক্ত আইনের সমষ্টি ও সন্ধির সমষ্টিকে বোঝায়, যার ভিত্তিতে সভ্য দেশগুলোর পারস্পরিক কাজে আইনগত বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে।
অধ্যাপক হল এর মতে, আন্তর্জাতিক আইন বলতে এমন কিছু নিয়মাবলীকে বোঝায় যা আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে অবশ্য পালনীয় বলে গ্রহণ করে।
দুই বা ততোধিক দেশের সম্পর্ক কেমন হবে, অর্থাৎ যুদ্ধকালীন সময়ে তাদের সম্পর্ক কেমন হবে বা স্বাভাবিক সময়ে তাদের সম্পর্ক কেমন হবে তা আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়। সুতরাং বলা যায়, ন্যায়-নীতি ও আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে আইন প্রয়োগ করা হয় তাকে আন্তর্জাতিক আইন বলে।
আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি সংক্রান্ত মতবাদ:
জা. বি. ২০১৫, ২০১৭
আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি মূলত: দুইটি নীতি বা মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত:
(১) মৌলিক অধিকার বিষয়ক মতবাদ প্রত্যেকটি মানুষ জন্মগতভাবে কিছু অধিকার ভোগ করে। আবার প্রত্যেকটি রাষ্ট্রও কিছু সহজাত অধিকার ভোগ করে। যেমন: স্বাধীনতা
রক্ষা করা, বহিঃশত্রুর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা, নিজেদের আইন অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করা ইত্যাদি। আলোচ্য মতবাদ অনুযায়ী এই সকল সহজাত অধিকার থেকে আইনের উৎপত্তি। অর্থাৎ আইন থেকে এই সকল অধিকারের উৎপত্তি হয় নি। রাজনৈতিক শূন্যতার উপর ভিত্তি করে আইন তৈরি হয় না। তবে রাষ্ট্রের দ্বারা আইন উপস্থাপিত হয়।
(২) সম্মতিমূলক মতবাদ সম্মতিমূলক মতবাদে যারা বিশ্বাস করেন তাদের ধারণা সম্মতি হলো আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যতামূলক ভিত্তি। যেমন:
অধ্যাপক হল এর মতে, আধুনিক রাষ্ট্রগুলি তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে যে সকল আচরণ অবশ্য পালনীয় মনে করে তাকে আন্তর্জাতিক আইন বলে।
অধ্যাপক ওপেহাম এর মতে, রাষ্ট্রসমূহকে যে সকল পারস্পরিক আদান-প্রদান মেনে চলতে হয় আন্তর্জাতিক আইন হলো সেই সকল প্রথাভিত্তিক নিয়ম।
এই মতবাদীরা মনে করেন, রাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া আন্তর্জাতিক আইন হতে পারে না।
আবার অনেকে এই মতবাদ সঠিক বলে মনে করেন না। এই শ্রেণির মতে রাষ্ট্রর সম্মতি থাক বা না থাক আন্তর্জাতিক আইন সকল সভ্য রাষ্ট্রের জন্য প্রযোজ্য।
আন্তর্জাতিক আইন বিকাশের বিবরণ অথবা আন্তর্জাতিক আইনের বৈশিষ্ট্য:
নিম্নে আন্তর্জাতিক আইন বিকাশের বিবরণ আলোচনা করা হলো:
(১) ইসলাম ধর্ম: ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক আইনের অনেক বিধি-বিধান এই গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে।
(২) হিন্দু ধর্ম: হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থ থেকেও আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন তত্ত্ব গ্রহণ করা হয়েছে।
(৩) রোমান আইন: রোমান আইন একটি অতি প্রাচীন আইন। এই আইন থেকে বিভিন্ন আইনের উৎপত্তি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের অনেক দর্শন রোমান আইন থেকে নেয়া হয়েছে।
(৪) গ্রোসিয়াসের বই: গ্রোসিয়াসের "De jura Belli ac pacis" গ্রন্থটি মূলত: আন্তর্জাতিক আইনের মূল ভিত্তি।
গ্রন্থটির ইংরেজি ভার্সন হলো- Law of war and peace.
(৫) রিচার্ড জোচীর বই: রিচার্ড জোচীর লিখিত "Juris et ludicil Facialis, sive juris Gentes." গ্রন্থটিও আন্তর্জাতিক আইনকে সমৃদ্ধ করেছে।
(৬) ভিয়েনা সম্মেলন: ১৮১৫ সালের ভিয়েনা সম্মেলনে মূলত: আন্তর্জাতিক নদী ও কূটনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
(৭) প্যারিস সম্মেলন: প্যারিস সম্মেলন হয় ১৮৫৬ সালে। এই সম্মেলনে যুদ্ধ জাহাজ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
(৮) জেনেভা কনভেনশন: ১৮৬৪ সালের জেনেভা কনভেনশনেও যুদ্ধ সংক্রান্ত বিধান প্রণীত হয়। সর্বমোট ৪টি জেনেভা কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়।
(৯) লীগ অব নেশন: প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর 'লীগ অব নেশন' গঠিত হয়। আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে এটি যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে।
(১০) জাতিসংঘ সনদ: জাতিসংঘ সনদ তৈরি হয় ১৯৪৫ সালে। আন্তর্জাতিক আইনে এটি কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
প্যারামাউন্ট ল' সহায়িকা পৃষ্টা ৭২৮/৭২৯/৭৩০