27/04/2026
"১৭ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রার ত্যাগ! ৯০০ মাইল দীর্ঘ পথে হাজিদের সেবায় সম্রাজ্ঞী
মহীয়সী নারী জুবাইদার অমর কীর্তি।"
আলহামদুলিল্লাহ
ইসলামি ইতিহাসের পাতায় মহীয়সী নারী বলতেই যার নাম উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তিনি হলেন জুবাইদা বিনতে জাফর (রাহিমাহুল্লাহ)
আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের স্ত্রী এবং খলিফা আল-মানসুরের নাতনি এই নারী কেবল একজন সম্রাজ্ঞীই ছিলেন না, ছিলেন এক অসামান্য দূরদর্শী ও দানবীর ব্যক্তিত্ব।
💧
হিজরি ১৯৩ সাল। হজ পালন করতে গিয়ে জুবাইদা (র.) দেখলেন মক্কায় পানির তীব্র হাহাকার। জমজম কূপ ছাড়া আর কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস ছিল না। হাজিরা চড়া মূল্যে পানি কিনছেন; এক বালতি পানির দাম তৎকালীন ২০ দিরহাম পর্যন্ত ঠেকেছিল! হাজিদের এই নিদারুণ কষ্ট দেখে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন এবং এক ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ করেন।
# # # 🏗️ এক অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প: 'নহরে জুবাইদা'
জুবাইদা বিনতে জাফর (রাহিমাহুল্লাহ)
তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বাগদাদ থেকে মক্কা অভিমুখে হাজিদের পথের পাশে খাল খনন করবেন। প্রকৌশলীরা যখন খরচের দোহাই দিয়ে একে অসম্ভব বলেছিলেন, জুবাইদা তখন দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন,
"কোদালের প্রতিটি কোপের বিনিময়ে যদি আমাকে এক একটি স্বর্ণমুদ্রাও (দিনার) ব্যয় করতে হয়, তবুও আমি এই কাজ থেকে পিছু হটব না।"
এটি ইরাকের নু’মান উপত্যকা থেকে শুরু হয়ে তায়েফ ও আরাফাহ হয়ে মক্কায় পানি সরবরাহ করত।
খরচঃ- তৎকালীন প্রায় ১৭ লক্ষ দিনার (যা বর্তমান হিসেবে কয়েক হাজার কোটি টাকা)।
প্রকৌশল শৈলী, কঠিন শিলা কেটে খাল তৈরি করা এবং বাষ্পীভবন রোধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ।
রোড অফ জুবাইদাঃ প্রায় ৯০০ মাইল দীর্ঘ এই পথে তিনি কেবল খালই নন, বরং বিশ্রামের জন্য সরাইখানা, পুকুর এবং বাতিঘর নির্মাণ করেছিলেন।
তিনি কেবল সম্রাজ্ঞী নন, এক অনন্য উদ্যোক্তা...
জুবাইদার আসল নাম ছিল আমাতুল আজিজ। শৈশবে দাদা আল-মানসুর তাকে আদর করে 'জুবাইদা' (ছোট মাখনের টুকরা) ডাকতেন।
তিনি কুরআন-হাদিস, ইতিহাস, সাহিত্য ও চিকিৎসা শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।
উদ্যোক্তাঃ- রাষ্ট্রীয় তহবিলের ওপর নির্ভর না করে তিনি নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতেন এবং তা থেকে উপার্জিত অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় করতেন।
প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তাকে নিয়ে লিখেছেন, যদি জুবাইদা এই পথের জন্য উদ্যোগী না হতেন, তবে হাজিদের কষ্ট আরও বেশী হত।
জুবাইদা বিনতে জাফর (রাহিমাহুল্লাহ)
জনকল্যাণকামী নারী প্রজ্ঞা এবং ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি ছিলেন বিনয়ী ও ইবাদতগুজার। এই মহীয়সী নারী ২১৬ হিজরিতে পরলোকগমন করেন। কিন্তু তার নির্মিত সেই 'নহরে জুবাইদা' প্রায় এক হাজার বছর ধরে তৃষ্ণার্ত হাজিদের পানি জুগিয়ে তার অমর কীর্তির সাক্ষ্য দিয়ে গেছে।
আল্লাহ তাআলা উনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। জাযাকাল্লাহু খাইরান।
📜 ঐতিহাসিক দলিল ও তথ্যসূত্রঃ-
১। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইবনে কাসীর) খণ্ড: ১০ম খণ্ড
পৃষ্ঠা নং: ৫৪৩ - ৫৪৫ (জুবাইদা বিনতে জাফরের মৃত্যু ও জীবনী আলোচনা)
এখানে তাঁর আমল, দানশীলতা এবং মক্কার হাজিদের জন্য পানি সরবরাহে খালের অবদানের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
📚সিয়ার আলাম আন-নুবালা (ইমাম আয-যাহাবি) খণ্ড: ৯ম খণ্ড
পৃষ্ঠা নং: ৩৩৪ - ৩৩৬
তাঁর তাকওয়া, ইবাদত এবং বিশেষ করে নহরে জুবাইদা প্রকল্পে তৎকালীন ১৭ লক্ষ দিনার ব্যয়ের কথা এখানে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে।
📚তারিখ-ই-বাগদাদ (আল-খতিব আল-বাগদাদি) পৃষ্ঠা নং ৪৩৩ - ৪৩৪