01/01/2026
ভোট-পরবর্তী জোটের সম্ভাবনা খোলা রাখল জামায়াত, বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের ইঙ্গিত
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা :
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সঙ্গে ভোট-পরবর্তী জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একসময় নিষিদ্ধ ঘোষিত এবং ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কট্টরপন্থী রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে পরিচিত দলটির আমির শফিকুর রহমান আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন।
রয়টার্সের প্রতিনিধিকে শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা অন্তত পাঁচ বছর একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ দেখতে চাই। সেই লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলো যদি একত্রিত হয়, তাহলে আমরা সম্মিলিতভাবে সরকার পরিচালনায় প্রস্তুত।”
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এক দফায় অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের নির্বাচন। একই দিনে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনে জামায়াত আটটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেছে, যার মধ্যে রয়েছে জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা ছাত্র-যুব নেতৃত্বের দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)।
প্রাক-নির্বাচনী কয়েকটি জনমত সমীক্ষায় ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে—বিএনপি প্রথম এবং জামায়াত দ্বিতীয় স্থান অর্জন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে জামায়াত হতে পারে আগামী সংসদের প্রধান বিরোধী দল।
উল্লেখ্য, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সহযোগী হিসেবে ক্ষমতায় ছিল জামায়াত। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হলেও ‘বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে’ আবারও বিএনপির সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন জামায়াত আমির।
ভারত প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত ভারতের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। যদিও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জামায়াত। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, চলতি বছরের শুরুতে বাইপাস সার্জারির পর তিনি এক শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাঁর ভাষায়, “নয়াদিল্লি এখন এমন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে চাইছে, যারা পরবর্তী সরকার গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।”
জামায়াতের বিতর্কিত অতীত:
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক অভিযোগ রয়েছে। রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর নেতৃত্বে গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির একাধিক শীর্ষ নেতার বিচার ও সাজা কার্যকর হয়েছে।
২০১৩ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে এবং ২০১৬ সালে দলটির নির্বাচনী প্রতীক বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার জামায়াত ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবিরকে ‘মৌলবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধী’ সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। বর্তমানে জামায়াতকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা, জাহাঙ্গিরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়েছে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবির। এসব নির্বাচনে বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল উল্লেখযোগ্যভাবে পরাজিত হয়েছে।
অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে পরিচিত বিএনপি রাজনৈতিকভাবে একটি ভিন্ন ঐতিহ্য বহন করে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রথম বাঙালি কর্মকর্তা যিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তিনিও স্বাধীনতার ঘোষকদের একজন হিসেবে স্বীকৃত।
ভোট-পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়—সেদিকেই এখন দেশ-বিদেশের নজর।