Mahmudul Hasan Jahid

Mahmudul Hasan Jahid ইতিহাস,ঐতিহ্য,সংস্কৃতি ও ভ্রমন বিষয়ক কনটেন্ট পেতে Follow দিয়ে পেইজের সাথে থাকুন 😊
(3)

09/06/2026

ইউরোপের ইতিহাসে ভাইকিং যুগ এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ, রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং অবিশ্বাস্য অভিযাত্রার গল্প। সাধারণত আমরা যখন 'ভাইকিং' শব্দটা শুনি, চোখের সামনে ভেসে ওঠে শিংওয়ালা হেলমেট পরা কিছু হিংস্র যোদ্ধা, যারা তরবারি হাতে চারদিকে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, তারা শুধু দুর্দান্ত যোদ্ধাই ছিল না, বরং ছিল অসাধারণ নাবিক, দূরদর্শী ব্যবসায়ী এবং দক্ষ কারিগর।

ইউরোপের বুকে কীভাবে এই ধমকানো ঝড়ের মতো ভাইকিং যুগের সূচনা হয়েছিল, তা নিয়েই আজকের আলোচনা।

শুরুটা যেখানে: লিন্ডিসফার্ন মঠ আক্রমণ (৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ)
ইতিহাসবিদরা সাধারণত **৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের৮ই জুন** তারিখটিকে ভাইকিং যুগের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে গণ্য করেন। দিনটি ছিল ইংল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত পবিত্র **লিন্ডিসফার্ন (Lindisfarne)** দ্বীপের মঠের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ।

স্ক্যান্ডিনেভিয়া (বর্তমান নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক) থেকে আচমকা কিছু দীর্ঘ ও দ্রুতগতির কাঠের জাহাজ এসে ভেড়ে দ্বীপে। সেই জাহাজ থেকে নেমে আসে একদল অস্ত্রধারী বুনো যোদ্ধা। তারা মঠের সমস্ত ধন-সম্পদ ও সোনা-দানা লুট করে, খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের নির্মমভাবে হত্যা করে এবং অনেককে দাস হিসেবে বন্দি করে নিয়ে যায়।
তৎকালীন ইউরোপীয় খ্রিস্টান সমাজের জন্য এই আক্রমণ ছিল এক অভাবনীয় ধাক্কা। কারণ, তারা ভাবতেও পারেনি ঈশ্বরের পবিত্র ঘরের ওপর কেউ এভাবে হামলা চালাতে পারে। এই একটি ঘটনাই পুরো ইউরোপকে জানিয়ে দেয়—উত্তর দিক থেকে এক নতুন শক্তির উত্থান ঘটেছে।

ভাইকিংদের হঠাৎ এই আগ্রাসনের কারণ কী?
ভাইকিংরা কেন হুট করে নিজেদের চেনা ভূখণ্ড ছেড়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অন্য দেশে আক্রমণ শুরু করল? এর পেছনে নির্দিষ্ট একটি কারণ ছিল না, বরং কয়েকটি বিষয়ের সমষ্টি কাজ করেছিল:

জমির অভাব ও অতিরিক্ত জনসংখ্যা:স্ক্যান্ডিনেভিয়ার আবহাওয়া অত্যন্ত ঠাণ্ডা এবং ভূখণ্ড ছিল পাথুরে ও পাহাড়ি, যা চাষাবাদের জন্য মোটেও অনুকূল ছিল না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জীবনধারণের জন্য তারা নতুন উর্বর ভূমির খোঁজ করতে বাধ্য হয়।

উন্নত জাহাজ নির্মাণ শৈলী: ভাইকিংদের সাফল্যের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি ছিল তাদের তৈরি **'লংশিপ' (Longship)**। এই জাহাজগুলো যেমন ছিল দ্রুতগামী, তেমনি অগভীর নদীতেও অনায়াসে চলাচল করতে পারত। ফলে তারা সমুদ্র পার হয়ে অনায়াসে ইউরোপের ভেতরের নদীপথগুলো দিয়ে আকস্মিক হামলা চালাতে পারত।

ইউরোপের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা: সে সময় ইউরোপের রাজ্যগুলো (বিশেষ করে ইংল্যান্ড ও ফ্রাঙ্কিশ সাম্রাজ্য) নিজেদের মধ্যে ছোটখাটো যুদ্ধে ব্যস্ত ছিল। তাদের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্বল প্রতিরক্ষার পূর্ণ সুযোগ নেয় ভাইকিংরা।

রক্তক্ষয়ী আক্রমণ থেকে বাণিজ্যের প্রসার
শুরুর দিকে ভাইকিংদের মূল লক্ষ্য কেবল লুটতরাজ এবং ধন-সম্পদ কেড়ে নেওয়া হলেও, সময়ের সাথে সাথে তাদের কৌশলে পরিবর্তন আসে। নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তারা বিভিন্ন অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
তারা কেবল ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড ছাড়িয়ে তারা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে উত্তর আমেরিকায় (যা তারা 'ভিনল্যান্ড' বলত) পা রেখেছিল—যা কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের প্রায় ৫০০ বছর আগের ঘটনা! অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপের নদীপথ ধরে তারা কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) এবং বাগদাদ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে।

লিন্ডিসফার্ন মঠের সেই রক্তাক্ত দিনটি দিয়ে যে যুগের সূচনা হয়েছিল, তা প্রায় তিন শতাব্দী ধরে পুরো ইউরোপের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ভূগোলকে বদলে দিয়েছিল। ভাইকিং যুগ শেষ পর্যন্ত একাদশ শতাব্দীতে এসে থিতিয়ে পড়ে, যখন তারা নিজেরা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে এবং ইউরোপীয় মূলধারার সংস্কৃতির সাথে মিশে যায়। তবে তাদের সেই দুঃসাহসিক সমুদ্রযাত্রা আর অনমনীয় মনোভাবের গল্প আজও মানব ইতিহাসের অন্যতম আকর্ষণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।

ইতিহাসের আয়নায়: এক মহানায়কের সান্নিধ্যে ও খুলনার সেই রক্তাক্ত অধ্যায়১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে যখন পাকিস্তান...
09/06/2026

ইতিহাসের আয়নায়: এক মহানায়কের সান্নিধ্যে ও খুলনার সেই রক্তাক্ত অধ্যায়

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে যখন পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে, তখন বাঙালির নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। তবে সদ্য স্বাধীন দেশের সর্বত্র শান্তি ফিরিয়ে আনা সহজ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিহারীদের একাংশের অমানুষিক ও বর্বর ভূমিকা বাঙালি মানসে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। ফলে দেশ স্বাধীন হলেও বেশ কিছু বিহারী অধ্যুষিত এলাকা, বিশেষ করে শিল্পনগরী খুলনা তখনও ছিল বারুদের স্তূপের মতো উত্তপ্ত। সামান্য উসকানিতেই সেখানে জ্বলে উঠত বাঙালি-বিহারী দাঙ্গার আগুন।

মধ্যরাতের জরুরি তলব এবং খালিশপুরের মিশন
সময়টা ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগ। সদ্য স্বাধীন দেশে তখন পুনর্বাসন আর শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার এক কঠিন যুদ্ধ চলছে। আমি তখন যশোরে ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘টু-আই-সি’ (সেকেন্ড-ইন-কমান্ড) হিসেবে দায়িত্বরত।
একদিন গভীর রাতে—ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় বারোটা—হঠাৎ বেজে উঠল টেলিফোন। ওপাশ থেকে ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার মেজর মতিন অত্যন্ত জরুরি কণ্ঠে জানালেন, খুলনায় বাঙালি ও বিহারীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আগামী দুই ঘণ্টার মধ্যে আমাকে এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে ঘটনাস্থলে রওনা হতে হবে।
এর কিছুক্ষণ পরেই ৫৫ ব্রিগেডের তৎকালীন ব্রিগেড কমান্ডার লে. কর্নেল এম এ মঞ্জুর (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) আমাকে সরাসরি ফোনে খুলনার খালিশপুর অঞ্চলের ভয়াবহ পরিস্থিতির বিবরণ দিলেন। তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল:
"যেকোনো মূল্যে, যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।"

সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা আর দায়িত্ববোধকে সঙ্গী করে আমরা দ্রুত খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই আমরা দাঙ্গা কবলিত এলাকায় সামরিক অবস্থান নিশ্চিত করলাম। কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে মেশিনগান পজিশন সেট করা হলো। আমাদের কঠোর ও নিয়মতান্ত্রিক তৎপরতায় ভোরের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, বড় ধরনের রক্তপাত থেকে রক্ষা পায় খালিশপুর।

এক জননেতার আগমন এবং সার্কিট হাউজের সেই মুহূর্ত
পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কয়েকদিন পর স্বয়ং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দাঙ্গা কবলিত এলাকা পরিদর্শনে এলেন। বিধ্বস্ত এলাকাগুলো ঘুরে দেখে তিনি খুলনা সার্কিট হাউজে এসে উঠলেন। আমাদের ব্রিগেড কমান্ডার লে. কর্নেল এম এ মঞ্জুর বঙ্গবন্ধুকে প্রটোকল দিয়ে রিসিভ করেছিলেন।
সব কাজ শেষ করে লে. কর্নেল মঞ্জুর যখন বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন আমাকে বললেন, "ভূইয়া, আমি সার্কিট হাউজে যাচ্ছি, বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকেছেন।"
একথা শুনে আমার ভেতরের বাঙালি সত্ত্বা আর সামরিক অফিসারের মন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। যে মানুষটির একটি তর্জনীর ইশারায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাঁকে চোখের সামনে দেখার প্রবল ইচ্ছা চেপে রাখতে পারলাম না। কোনো প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে সরাসরি আমার কমান্ডারকে বলে বসলাম, "স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে যেতে পারি? আমি কখনো বঙ্গবন্ধুকে সামনাসামনি দেখিনি।"
মঞ্জুর সাহেব আমার আবেগটা বুঝতে পারলেন। হেসে বললেন, "ঠিক আছে চলো, গাড়িতে ওঠো।"

"ওর নাম কি? ঠিক আছে, ওকে ডাক"
সার্কিট হাউজে গিয়ে লে. কর্নেল মঞ্জুর খুলনার সার্বিক নিরাপত্তা ও পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে আলোচনা করলেন। আলোচনা শেষে যখন তিনি বিদায় নিতে যাবেন, তখন আমার কথা বঙ্গবন্ধুর কাছে পাড়লেন, "স্যার, আমার সঙ্গে একজন তরুণ অফিসার এসেছে। সে আপনাকে কখনো দেখেনি, শুধু আপনার দর্শন পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।"
বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বভাবসুলভ পিতৃসুলভ কণ্ঠে বলে উঠলেন, "ও তাই নাকি! ওর নাম কি? ঠিক আছে, ওকে ডাক।"
আমি কক্ষে প্রবেশ করে সামরিক কায়দায় স্যালুট ঠুকলাম। বঙ্গবন্ধু আমার দিকে তাকিয়ে সহাস্যে বললেন, "ভূইয়া, তুমি কেমন আছ?"
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি চিরচেনা সেই ভরাট গলায় হেসে বললেন, "আরে তুমি মেজর ভূইয়া না ক্যাপ্টেন ভূইয়া?" আমি তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো এক গাল হাসি নিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
বঙ্গবন্ধু আমার দিকে চেয়ে যোগ করলেন, "তুমি যুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে ছিলে, তোমরা চট্টগ্রামে যে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছ তা আমি শুনেছি।" একজন নবীন অফিসারের পূর্ব ইতিহাস পর্যন্ত তাঁর নখদর্পণে ছিল, যা আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। বিদায় নেওয়ার আগে তিনি আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন, "আমি এখন নাসিরের (শেখ আবু নাসের) বাসায় যাচ্ছি। ইউ বোথ ফলো মি।"

খাবার টেবিল এবং এক মহানায়কের অনন্য উদারতা
আমরা বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হয়ে শেখ আবু নাসের সাহেবের বাসায় পৌঁছালাম। সেখানে চমৎকার খাবারের আয়োজন করা হয়েছিল। খাবার টেবিলে বসার বিন্যাসটি ছিল প্রায় ২০ ফিট বাই ৪ ফিট আকৃতির, যা উত্তর-দক্ষিণে সাজানো।
বঙ্গবন্ধু বসলেন টেবিলের দক্ষিণ প্রান্তে। তাঁর দুই পাশে এসে আসন নিলেন তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যরা। প্রটোকল অনুযায়ী, আমি আর লে. কর্নেল মঞ্জুর গিয়ে বসলাম টেবিলের একেবারে অন্য প্রান্তে, অর্থাৎ উত্তর দিকের শেষ সীমানায়, একে অপরের মুখোমুখি হয়ে।
টেবিলে বসার পর বঙ্গবন্ধু হঠাৎ চারদিকে চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আরে দেখতো, আমার সঙ্গে যে দুজন সামরিক বাহিনীর অফিসার এসেছে, ওরা কোথায়?"
আমাদের অবস্থান যখন তাঁকে জানানো হলো, তখন তিনি এক অভূতপূর্ব কাণ্ড করলেন। নিজের ডানে এবং বামে বসা দুজন মন্ত্রীকে সসম্মানে অন্য আসনে সরে যেতে বলে আমাদের ইশারা করে বললেন, "তোমরা এখানে এসে আমার পাশে বসো।"
আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহূর্তটি ডানা মেলল তখন, যখন আমি গিয়ে বসলাম বঙ্গবন্ধুর ঠিক ডান পাশে, আর আমার কমান্ডার লে. কর্নেল মঞ্জুর বসলেন তাঁর বাম পাশে। ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে থেকেও সামরিক বাহিনীর দুজন জুনিয়র অফিসারের প্রতি তাঁর এই সম্মান, স্নেহ এবং অতুলনীয় আন্তরিকতা আমাদের চোখ ভিজিয়ে দিয়েছিল। তিনি শুধু একজন নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের পিতা, যিনি জানতেন কীভাবে মানুষকে আপন করে নিতে হয়।

মূল স্মৃতিকথা: মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূইয়া
সম্পাদনা ও বিন্যাস: (মাহমুদুল হাসান জাহিদ)

বঙ্গবন্ধুর জনসম্পৃক্ততা ও নিরাপত্তার প্রতি উদাসীনতাইতিহাসে এমন রাষ্ট্রনেতা বিরল, যিনি ক্ষমতার শীর্ষে বসেও নিজেকে সাধারণ ...
08/06/2026

বঙ্গবন্ধুর জনসম্পৃক্ততা ও নিরাপত্তার প্রতি উদাসীনতা

ইতিহাসে এমন রাষ্ট্রনেতা বিরল, যিনি ক্ষমতার শীর্ষে বসেও নিজেকে সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। সোনার সিংহাসনে আরোহণ করেও যিনি কৃষকের ধানক্ষেতের কাদামাটিকে ভুলতে পারেননি, জেলেপল্লির ছেঁড়া জালের গন্ধকে যিনি নিজের নিঃশ্বাসের সাথে মিশিয়ে রেখেছিলেন সারাটা জীবন — জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ঠিক সেই রকম একজন মানুষ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে কখনো শঙ্কিত ছিলেন না। তাঁর অফিস ও বাসভবনের দরজা ছিল দেশের সকল নাগরিকের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত। এই অলিখিত নীতিটি কেবল শাসনশৈলীর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল না — এটি ছিল একটি সভ্যতার দলিল, একটি ভালোবাসার প্রকাশ, যা বাংলার মানুষ ও তাদের নেতার মধ্যকার অনন্য বন্ধনের সাক্ষ্য বহন করে।

মানুষের নেতা, মানুষের কাছের মানুষ

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে মানুষের প্রতি এক গভীর মমত্ববোধ ছিল। ছোটবেলায় নিজের জামা খুলে শীতার্ত দরিদ্র মানুষকে দিয়ে দেওয়ার যে সংস্কৃতি তিনি গড়ে তুলেছিলেন, রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার পরেও তা অপরিবর্তিত রয়েছিল।

১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফেরা এই নেতাকে ঘিরে সেদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছিল। রেসকোর্স ময়দানে সেই বজ্রকণ্ঠ যখন উচ্চারণ করলেন, "আমার বাংলার মানুষের কাছে আমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই" — তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে এই মানুষটি রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের ভালোবাসার জন্যই রাজনীতি করেন।

স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তিনি। কিন্তু গণভবন বা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি — কোথাও তিনি সাধারণ মানুষের প্রবেশের পথ বন্ধ করেননি। ভোরবেলা থেকে রাত পর্যন্ত সারিবদ্ধ মানুষ আসতেন — কেউ বিচার চাইতে, কেউ সাহায্যের আবেদন নিয়ে, কেউবা শুধু একটু দেখার জন্য। বঙ্গবন্ধু সবাইকেই সময় দিতেন।

সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সতর্কবার্তা ও বঙ্গবন্ধুর নির্ভীকতা

বঙ্গবন্ধুর এই উন্মুক্ত জীবনযাপনের ধরন নিয়ে দেশে-বিদেশে উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছিল। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান তাঁর "Bangladesh: 1975" গ্রন্থে লিখেছেন যে শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারসহ বাসভবনে কোনো নিরাপত্তা-প্রোটোকল ছাড়াই জীবনযাপন করতেন। বহু মানুষ তাঁকে নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন; বিদেশি কূটনীতিকরাও এ ব্যাপারে তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন।

তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ফ্রমিন একবার অধ্যাপক আহসানকে বলেছিলেন, "আপনাদের রাষ্ট্রপ্রধান যে বাড়িতে থাকেন, সেখানে কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। এটা মোটেই ভালো নয়। এভাবে অরক্ষিত থাকলে বিপদের আশঙ্কা থাকতে পারে।" — কিন্তু বঙ্গবন্ধু এই সব সতর্কবার্তাকে তেমন গুরুত্ব দিতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাঙালিরা কখনো তাঁকে হত্যা করবে না। কারণ তিনি ছিলেন বাঙালির সন্তান, বাঙালির জন্যই তাঁর সমস্ত জীবন উৎসর্গীকৃত।

বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা যখন বারবার হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা তাঁর কাছে তুলে ধরেছে, তখনও তিনি বলতেন — "বাঙালি কখনই আমাকে হত্যা করতে পারে না।" এই দৃঢ়তা ছিল ভালোবাসার শক্তি থেকে জন্ম নেওয়া নির্ভীকতা।

১৯৭২ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত: গণভবনে পথশিশু

বঙ্গবন্ধুর মানবিক সারাৎসার কতটা গভীর ছিল, তার এক অপূর্ব নজির পাওয়া যায় ১৯৭২ সালের মে মাসের একটি ঘটনায়।

স্বাধীনতার পর সদ্য পুনর্গঠিত বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অংশগ্রহণ করে। নির্বাচন শেষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মী ও নেতারা আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে একটি বিজয়ী মিছিল নিয়ে গণভবনে গমন করেন। সেখানে তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে মাল্যভূষিত করেন এবং দীর্ঘ সময় আলাপ-আলোচনায় মিলিত হন।

কিন্তু সেই মিছিলের সঙ্গে ঘটে একটি অপ্রত্যাশিত ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। কয়েকটি অনাথ ও পথশিশু মিছিলের ভিড়ের সুযোগে গণভবনে প্রবেশ করে ফেলে এবং বঙ্গবন্ধুর একেবারে পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কোনো নিরাপত্তারক্ষী তাদের সরিয়ে দেননি, কেউ বাধা দেননি — কারণ বঙ্গবন্ধুর দরজায় থামার কোনো অধিকার ছিল না কারো। ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পুরো সময়জুড়ে সেই শিশুরা বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।

সেই মুহূর্তের একটি ছবি পরে প্রকাশিত হলে তা বিপুল আলোচনার জন্ম দেয়। একটি ছবিতে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ভবনে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি পথশিশু, আর তাদের পাশে সহাস্যবদনে দাঁড়িয়ে আছেন জাতির পিতা — এই দৃশ্যটি ছিল বঙ্গবন্ধুর সমগ্র রাজনৈতিক দর্শনের এক অনুপম চিত্রায়ণ।

এই ঘটনা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উন্মোচন করেছিল:

**প্রথমত**, বঙ্গবন্ধুর জনসম্পৃক্ততা কতটা গভীর ও অকৃত্রিম ছিল। রাষ্ট্রপ্রধানের কার্যালয়ে পথশিশুর অনায়াস প্রবেশ কোনো পরিকল্পিত প্রচারণা ছিল না — এটি ছিল একটি উন্মুক্ত দরজার স্বাভাবিক পরিণতি।

**দ্বিতীয়ত**, বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার প্রতি উদাসীনতা। কোনো কড়া প্রোটোকল না থাকলেই কেবল এটি সম্ভব হতে পারে যে অচেনা শিশুরা রাষ্ট্রপ্রধানের পাশে দাঁড়াবে এবং কেউ তাদের সরিয়ে দেবে না।

**তৃতীয়ত**, তৎকালীন ছাত্রনেতাদের সহনশীলতা ও আদর্শিক বৈশিষ্ট্য। তাঁরাও কোনো উচ্চমন্যতা দেখাননি; সেই শিশুদের উপস্থিতিকে তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছিলেন।

আ স ম আবদুর রব — একজন ছাত্রনেতার পরিচয়

যে মিছিলের নেতৃত্বে সেদিন গণভবনে যাওয়া হয়েছিল, সেই মিছিলের নেতা আ স ম আবদুর রব ছিলেন তখনকার ছাত্র আন্দোলনের এক উজ্জ্বল তারকা। তিনি ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর ভিপি। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় তিনিই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানকে 'জাতির পিতা' উপাধিতে ভূষিত করার সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাটিও পাঠ করেছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠক পরবর্তীকালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ভিন্ন রাজনৈতিক পথে হেঁটেছেন — কিন্তু ১৯৭২ সালের সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের দৃশ্যটি ছিল দেশের তরুণ প্রজন্ম ও তাদের নেতার মধ্যকার আস্থার এক অসাধারণ নিদর্শন।

উন্মুক্ত দরজা — একটি রাজনৈতিক দর্শনের প্রতীক

বঙ্গবন্ধুর উন্মুক্ত দরজার নীতিটি কেবল একটি ব্যক্তিগত অভ্যাস ছিল না — এটি ছিল তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনের মূলনীতির প্রতিফলন। ছাত্রাবস্থা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া পর্যন্ত তিনি সর্বদা মানুষের সাথে মিলেমিশে থেকেছেন। গরিব মানুষের ঘরে খেয়েছেন, তাদের সুখ-দুঃখের কথা শুনেছেন, তাদের সংগ্রামে সঙ্গী হয়েছেন।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত বাসভবন। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর থেকে তিনি সেখানে বসবাস করতেন। এই বাড়িতেই ১৯৬২ সালের আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফার আন্দোলন, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু এই বাড়ির দরজাও সাধারণ মানুষের জন্য সবসময় খোলা ছিল।

দেশের নেতা হিসেবে গণভবনে উঠলেও সেখানেও তিনি প্রোটোকলের শৃঙ্খলে নিজেকে আটকে রাখেননি। মানুষ আসতেন, কথা বলতেন, বঙ্গবন্ধু মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাক্ষাতপ্রার্থীদের লম্বা লাইন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা ছিল।

ভালোবাসার মূল্য ও ইতিহাসের নির্মম পরিণতি

এই অফুরন্ত ভালোবাসা ও সহজলভ্যতাই শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্য ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই উন্মুক্ত বাড়িতে ঢুকে পড়ে এবং বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের প্রায় সকল সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেই রাতে শহীদ হন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের এবং আরও অনেকে।

বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রনেতারা এই হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। পশ্চিম জার্মানির প্রখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা "ডার স্পিগেল" লিখেছিল, "মুজিব নিহত হয়েছেন তাঁর নিজের বাকচাতুর্য ও উদারতার কারণে।" নোবেলজয়ী কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, "আমি হিমালয়কে দেখিনি, তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। সাহস ও ব্যক্তিত্বে তিনি হিমালয়ের সমকক্ষ।"

যে দেশের জন্য তিনি ৪,৬৮২ দিন কারাগারে কাটিয়েছিলেন, পাকিস্তানি ফাঁসির মঞ্চের মুখোমুখি হয়েছিলেন নির্ভীকভাবে — সেই দেশের মাটিতেই তাঁকে প্রাণ দিতে হলো। কিন্তু ইতিহাস এই সত্যকে কখনো মুছে ফেলতে পারবে না যে, বঙ্গবন্ধু কখনো সাধারণ মানুষকে প্রত্যাখ্যান করেননি — এমনকি যখন সেই সাধারণত্বই তাঁর নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠছিল।

যে ছবি কথা বলে — ইতিহাসের এক অমর দলিল

১৯৭২ সালের মে মাসে গণভবনে তোলা সেই ছবিটি — যেখানে পথশিশুরা বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে আছে — শুধু একটি আলোকচিত্র নয়, এটি একটি জাতির আত্মার প্রতিচ্ছবি। এই ছবিটি আমাদের বলে দেয় যে ক্ষমতা কখনো কখনো মানুষকে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় — কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেই ব্যতিক্রম ছিলেন, যিনি ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তাঁর শিকড়কে ধরে রেখেছিলেন।

সেই শিশুরা জানতো না তারা কার পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা জানতো না এই মানুষটি দেশের প্রধান প্রশাসক। তারা শুধু একটি উষ্ণ, আপন মুখ দেখেছিল — এবং সেই মুখের কাছে চলে গিয়েছিল। আর বঙ্গবন্ধুও তাদের সরিয়ে দেননি।

এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূলসত্য — ভালোবাসার রাজনীতি, মানুষের রাজনীতি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটাই — প্রকৃত নেতৃত্ব সুরক্ষিত দূরত্বে নয়, মানুষের মাঝে বেঁচে থাকে। যিনি সত্যিকার অর্থেই মানুষকে ভালোবাসেন, তিনি দেওয়াল তোলেন না। তিনি পাহারা বসান না। তিনি দরজা বন্ধ করেন না।

১৯৭২ সালের সেই মে মাসের দুপুরে গণভবনের একটি কক্ষে ছাত্রনেতাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পথশিশুগুলো আজ আর নেই হয়তো। কিন্তু সেই দৃশ্যের স্মৃতি আমাদের বলে দেয়, কোথায় ছিল এই জাতির পিতার আসল শক্তি — প্রোটোকলে নয়, প্রহরীবেষ্টিত প্রাসাদে নয়; বরং সেই শিশুটির বিস্মিত চোখে, সেই উন্মুক্ত দরজায়, সেই নির্ভয় মুখে।

বঙ্গবন্ধু চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সেই দরজা — মানুষের জন্য উন্মুক্ত সেই দরজা — ইতিহাসের পাতায় চিরকাল খোলা থাকবে।

"আমি বাংলার মানুষকে ভালোবাসি, বাংলার মানুষ আমাকে ভালোবাসে।"
— শেখ মুজিবুর রহমান

বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত বাংলাদেশের প্রথম ১০ টাকার নোট
08/06/2026

বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত বাংলাদেশের প্রথম ১০ টাকার নোট

ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচিবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক দলিলবাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১...
07/06/2026

ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক দলিল

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা কর্মসূচি একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত এই ছয়টি দাবি শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিই ছিল না — এটি ছিল পূর্ব বাংলার কোটি কোটি শোষিত মানুষের বুকের কথা, তাদের বেঁচে থাকার অধিকারের ঘোষণা। ইতিহাসবিদরা একে বাঙালির ম্যাগনাকার্টা বলে অভিহিত করেছেন। ব্রিটেনের ১২১৫ সালের ম্যাগনাকার্টার মতোই এই দলিল বাঙালি জাতির অধিকার ও মর্যাদার এক অপরিহার্য দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্য ও শোষণের শিকার হয়ে আসছিলেন। এই অবিচারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ প্রতিরোধ সংগ্রামের সুষম সংকলন ও পরিপক্ব রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটেছিল ছয় দফার মধ্য দিয়ে। এই কর্মসূচি বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ দিয়েছিল এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি রচনা করেছিল।

ঐতিহাসিক পটভূমি
পাকিস্তানি শাসনে পূর্ব বাংলার বঞ্চনা
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই দুই অংশের মধ্যে বৈষম্যের বীজ বপন করা হয়েছিল। পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৫৫-৭০ শতাংশ আসত পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। অথচ এই আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে। কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চ পদে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য। সামরিক বাহিনীতে বাঙালিরা যেখানে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ, সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানিরা ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী সংখ্যাগরিষ্ঠ।
শিক্ষা, শিল্প, যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা — প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলা অবহেলিত থেকেছে। দুটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পশ্চিম পাকিস্তানে বিনিয়োগ হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। মাথাপিছু আয়ের পার্থক্য ক্রমেই বাড়তে থেকেছে। এই চরম অসাম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে এবং তা রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ নেয়।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধ ও তাসখন্দ চুক্তি: ছয় দফার তাৎক্ষণিক কারণ
১৯৬৫ সালের ৬ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও নিরাপত্তাহীন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এক হাজার মাইলেরও বেশি দূরে অবস্থিত পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য কোনো কার্যকর সামরিক ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এই উপলব্ধি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। যুদ্ধ শেষে ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় তাসখন্দ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়, যা পূর্ব বাংলার জনগণকে আরও বেশি হতাশ করে।
তাসখন্দ-উত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতারা ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে এক জাতীয় সম্মেলন আহ্বান করেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৪ ফেব্রুয়ারি লাহোর পৌঁছান। পরদিন সম্মেলনের বিষয় নির্বাচনী কমিটির সভায় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দাবি হিসেবে 'ছয় দফা' প্রস্তাব পেশ করেন। কিন্তু সম্মেলনের উদ্যোক্তারা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরদিনই পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় শেখ মুজিবকে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' হিসেবে চিত্রিত করা হয়। ফলে বঙ্গবন্ধু ৬ ফেব্রুয়ারির সম্মেলন বর্জন করেন।

ছয় দফার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও প্রচার
লাহোর থেকে ঢাকায় ফেরার পর বঙ্গবন্ধু সারা পূর্ব পাকিস্তানে ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম শুরু করেন। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয় দফা কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিন আহমদের ব্যাখ্যাসহ ছয় দফা কর্মসূচির একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে 'আমাদের বাঁচার দাবি: ৬ দফা কর্মসূচি' শীর্ষক একটি পুস্তিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার করা হয়।
ছয় দফাকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে সারা দেশে গণসংযোগ সফর করেন এবং প্রতিটি সভায় লক্ষ লক্ষ মানুষের মুহূর্মুহু সংবর্ধনা লাভ করেন। বাঙালির হৃদয়ের গভীরে ছয় দফা যে সাড়া ফেলেছিল তা ছিল অভূতপূর্ব। ছয় দফা আর শুধু একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ছিল না — এটি হয়ে উঠেছিল সমগ্র বাঙালি জাতির কণ্ঠস্বর।

ছয় দফার বিস্তারিত বিষয়বস্তু
ছয় দফা কর্মসূচিতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মুদ্রা, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক ছয়টি সুস্পষ্ট দাবি উপস্থাপন করা হয়েছিল। নিচে প্রতিটি দফার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

প্রথম দফা: শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংবিধান রচনা করে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। এই রাষ্ট্রে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে এবং কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচন হবে প্রত্যক্ষ ও সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে। প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হবে জনসংখ্যার অনুপাতে। প্রদেশগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে।

দ্বিতীয় দফা: কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার পরিধি
ফেডারেল সরকারের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকবে কেবল দুটি বিষয়ে — প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে ফেডারেশনভুক্ত রাজ্যগুলো পূর্ণ আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী ক্ষমতা ভোগ করবে। এই দফার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানে প্রকৃত যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা।

তৃতীয় দফা: মুদ্রা ও অর্থব্যবস্থা
মুদ্রা বিষয়ে দুটি বিকল্প প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। প্রথম বিকল্প হলো পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক অথচ সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা প্রচলন করতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে সমগ্র পাকিস্তানের জন্য একটি মুদ্রাব্যবস্থা থাকবে, তবে একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ও দুটি পৃথক আঞ্চলিক রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো — পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে পুঁজি পাচার বন্ধ করার সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিধান থাকতে হবে।

চতুর্থ দফা: রাজস্ব, কর ও শুল্ক সংক্রান্ত ক্ষমতা
রাজস্ব ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে প্রদেশের হাতে। দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক পৃথক হিসাব রাখতে হবে এবং অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা দুই অঞ্চল থেকে সমান হারে কিংবা উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে নির্ধারিত হারে সরবরাহ করা হবে। এই দফায় মূলত পূর্ব পাকিস্তানের উপার্জিত অর্থের উপর পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার দাবি করা হয়।

পঞ্চম দফা: বৈদেশিক বাণিজ্য
ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক হিসাব রাখতে হবে। বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব এখতিয়ারে থাকবে। দুই অঞ্চলের মধ্যে দেশীয় পণ্য চলাচলে কোনো শুল্ক বা কর আরোপ করা যাবে না। সংবিধানে প্রদেশগুলোকে বিদেশে নিজ নিজ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণের এবং স্বীয় স্বার্থে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে। এই দফা পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও পাটজাত পণ্যের আয়ের উপর পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ষষ্ঠ দফা: আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা
আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সংবিধানে অঙ্গরাজ্যগুলোকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা-সামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানকে প্রতিরক্ষায় স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে সেখানে অস্ত্র কারখানা স্থাপন করতে হবে। কেন্দ্রীয় নৌবাহিনীর সদর দফতর পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করতে হবে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাহীনতার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এই দাবি উত্থাপিত হয়েছিল।

ছয় দফার রাজনৈতিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য
ছয় দফা কেবল একটি শাসনতান্ত্রিক দাবিনামা ছিল না, এটি ছিল বাঙালির সামগ্রিক মুক্তির সুচিন্তিত রোডম্যাপ। প্রতিটি দফা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং মিলিতভাবে এগুলো পূর্ব পাকিস্তানকে কার্যত সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত করে দেওয়ার দাবি ছিল। আইয়ুব খান সরকার সে কারণেই এটিকে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' আখ্যা দিয়েছিল। তবে ইতিহাস সাক্ষী — ছয় দফার মধ্যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল।
বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেন, ছয় দফা মূলত একটি দফাই ছিল — পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা। ছয়টি দাবি একত্রিত করলে যা দাঁড়ায় তা হলো এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো যেখানে কেন্দ্র শুধু খোলস, আর প্রকৃত ক্ষমতা থাকবে প্রদেশের হাতে। এটি পাকিস্তানের কেন্দ্রীভূত শাসনকাঠামোর বিরুদ্ধে এক সম্পূর্ণ বিপরীত দর্শন উপস্থাপন করেছিল।

ছয় দফার বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের প্রতিক্রিয়া
পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধী দলীয় নেতারা শেখ মুজিবের ছয় দফা কর্মসূচিকে পাকিস্তানের অখণ্ডতাবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রত্যাখ্যান করেন। আইয়ুব খান সরকার ছয় দফাকে 'রাষ্ট্রদ্রোহ' আখ্যা দেয়। সরকার ছয় দফার বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করে। ১৯৬৬ সালের ৮ মে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা আইনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। শুধু মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগের কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে কারাবন্দি করা হয়।

ঐতিহাসিক ৭ জুন ১৯৬৬: হরতাল ও রক্তের দাম
ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এবং বঙ্গবন্ধুসহ গ্রেফতারকৃত নেতাদের মুক্তির দাবিতে আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালের ৭ জুন সারা পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করে। এই হরতাল ছিল অভূতপূর্ব সফল। কিন্তু সেদিন পুলিশ ও ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) নিরস্ত্র জনতার উপর গুলিবর্ষণ করে। টঙ্গী, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হক, মুজিবুল হকসহ মোট ১১ জন বাঙালি শহীদ হন। ছয় দফা আন্দোলনে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন সিলেটের মনু মিয়া।
৭ জুনের রক্তদান ছয় দফাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। শহীদদের রক্ত বাঙালির মুক্তির চেতনাকে আরও গভীর ও অবিচল করে দেয়। এরপর থেকে প্রতি বছর ৭ জুন বাংলাদেশে '৬ দফা দিবস' হিসেবে পালিত হয়।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও গণ-অভ্যুত্থান ১৯৬৯
ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলন যত শক্তিশালী হতে থাকে, আইয়ুব সরকার তত বেশি দমনপীড়নে মেতে ওঠে। ১৯৬৮ সালের ১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে আরও ৩৪ জন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে কথিত 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' দায়ের করা হয়। ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি রাতে বঙ্গবন্ধুকে জেল থেকে নামমাত্র মুক্তি দিয়ে আবার গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে রুদ্ধদ্বার কক্ষে আটক রাখা হয়।
এই মামলার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা ও ছাত্রসমাজের এগারো দফার প্রতি সমর্থন জানাতে ১৯৬৯ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের ৮টি রাজনৈতিক দল মিলে 'গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ' (ডাক) গঠন করে। এই সংগ্রাম পরিষদ আইয়ুব-বিরোধী ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। প্রচণ্ড জনচাপের মুখে আইয়ুব সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তিদানে বাধ্য হয়। আগরতলা মামলাও প্রত্যাহার করা হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লক্ষাধিক মানুষের সামনে শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচন: ছয় দফার গণরায়
আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ছয় দফা কর্মসূচির পক্ষে জনমত যাচাইয়ের অঙ্গীকার নিয়ে মাঠে নামে। নির্বাচনের ফলাফল ছিল ইতিহাস-নির্ধারণকারী। আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে বিজয়ী হয়। প্রাদেশিক পরিষদেও আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ভোটের মাধ্যমে প্রমাণ করে দেয় — ছয় দফাই তাদের কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ভবিষ্যৎ।
কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এই গণরায়কে মেনে নিতে রাজি ছিল না। জুলফিকার আলী ভুট্টো জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। ইয়াহিয়া খান সরকার ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি ঘোষণা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় বসেন, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।

ছয় দফার উত্তরাধিকার ও স্বাধীনতার পথে
২৫ মার্চের গণহত্যার পর একদিকে ছয় দফার স্বায়ত্তশাসনের দাবির পরিসমাপ্তি ঘটে, অন্যদিকে শুরু হয় সশস্ত্র স্বাধীনতার লড়াই। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। ইতিহাসের বিচারে বলা যায়, ছয় দফা ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা এতটা সুশৃঙ্খল ও জনসমর্থনপুষ্ট হতে পারত না।
ছয় দফা বাঙালি জাতিকে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য দিয়েছিল, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং স্বাধীনতার দাবিকে একটি আইনগত ও নৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এই কর্মসূচি বঙ্গবন্ধুকে পরিণত করেছিল সমগ্র বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতায়। বাঙালি জাতির ইতিহাসে ছয় দফার স্থান তাই চিরকাল অক্ষুণ্ণ থাকবে।

ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অপরিহার্য অধ্যায়। এটি শুধু ছয়টি দাবির তালিকা নয় — এটি একটি জাতির স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ঘোষণাপত্র। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন এই দাবি উত্থাপন করেছিলেন, তখন হয়তো কেউ ভাবেননি মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের ভূমিকা পালন করবে।
৭ জুনের শহীদদের রক্ত, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগুন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট — সবকিছু মিলে ছয় দফা রূপান্তরিত হয়েছিল একটি স্বাধীন বাংলাদেশের দিকনির্দেশনায়। আজও যখন বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের অধিকার ও মর্যাদার কথা ভাবে, তখন সেই ভাবনার শিকড় ছয় দফার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে ছয় দফা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।

07/06/2026
পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স, ১৯৭১একটি কালো আইনের ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার স্...
04/06/2026

পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স, ১৯৭১

একটি কালো আইনের ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার স্বেচ্ছাসেবক ঘাতক বাহিনী গঠনের দলিল


১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে 'রাজাকার' শব্দটি বাঙালি জাতির কাছে চিরকালের জন্য ঘৃণা ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কেবল তাদের সৈন্য-শক্তির ওপর নির্ভর করেনি — তারা এ দেশের একদল বিভ্রান্ত ও পাকিস্তানপন্থি মানুষকে সংগঠিত করে একটি সহায়ক আধা-সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছিল। এই বাহিনীকে আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি দিতেই পাকিস্তান সরকার জারি করেছিল 'দ্য ইস্ট পাকিস্তান রাজাকার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৭১' — যা বাংলায় 'পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স, ১৯৭১' নামে পরিচিত।
এই অর্ডিন্যান্সটি ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত, সুশৃঙ্খল ও রাষ্ট্রীয় অনুমোদিত গণহত্যার হাতিয়ার তৈরির দলিল। প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা, বেতন কাঠামো, অস্ত্র সরবরাহ, নিয়োগ পদ্ধতি এবং অর্থায়নের ব্যবস্থা সহ বিস্তারিত বিধান রেখে এই অর্ডিন্যান্সটি তৈরি করা হয়েছিল — যা প্রমাণ করে যে রাজাকার বাহিনীর সৃষ্টি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সুচিন্তিত ও পরিকল্পিত প্রকল্প।

'রাজাকার' শব্দের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
'রাজাকার' শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে আগত, যার আক্ষরিক অর্থ 'স্বেচ্ছাসেবী'। ভারতীয় উপমহাদেশে এই শব্দের প্রথম ব্যবহার ঘটে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের প্রেক্ষাপটে। তৎকালীন হায়দ্রাবাদের নিজাম ভারত-সংযুক্তিতে অনিচ্ছুক থাকায় ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য 'রাজাকার' নামে একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ এই ধারণাটি পূর্ব পাকিস্তানে প্রয়োগ করে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় 'রাজাকার' শব্দটির। মুক্তিযোদ্ধাদের দমন করতে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা দিতে এই দেশীয় দোসর বাহিনী তৈরি করা হয়। সময়ের ব্যবধানে 'রাজাকার' শব্দটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে 'বিশ্বাসঘাতক' ও 'দেশদ্রোহী'-র সমার্থক হয়ে ওঠে।

রাজাকার বাহিনীর প্রাথমিক গঠন: ১৯৭১ সালের মে মাস
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশব্যাপী প্রতিরোধ আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। এই প্রতিরোধকে দমন করতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী স্থানীয় পাকিস্তানপন্থি মানুষদের নিয়ে একটি সহায়ক বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা করে।
১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনার খানজাহান আলী রোডের একটি আনসার ক্যাম্পে প্রথম রাজাকার বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়। এই বাহিনীতে প্রথম দফায় ৯৬ জন পাকিস্তানপন্থি কর্মীকে ভর্তি করা হয়। সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রথম নিয়োগপ্রাপ্তরা মূলত জামায়াতে ইসলামীর সদস্য ছিলেন। তবে জামায়াতের তৎকালীন নেতা গোলাম আযম এই দাবি অস্বীকার করেছিলেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে রাজাকার বাহিনী ছিল স্থানীয় 'শান্তি কমিটি'র নেতৃত্বাধীন। এই শান্তি কমিটি গঠিত হয়েছিল নুরুল আমিন ও খাজা খায়রুদ্দিনসহ বিভিন্ন পাকিস্তানপন্থি নেতাদের উদ্যোগে। পরবর্তীতে রাজাকার বাহিনী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়।

অর্ডিন্যান্সের প্রণয়ন: ১ জুন ১৯৭১
রাজাকার বাহিনীকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান ১৯৭১ সালের ১ জুন 'পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স, ১৯৭১' জারি করেন। বাংলাপিডিয়াসহ একাধিক ইতিহাস-গ্রন্থ এই তারিখকে ১ জুন হিসেবে নিশ্চিত করেছে। ওই অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে টিক্কা খান তৎকালীন আনসার বাহিনীকে বিলুপ্ত করে রাজাকার বাহিনীতে রূপান্তরিত করেন।
পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট ঢাকা গেজেটে একটি পরিশোধিত ও বিস্তারিত অর্ডিন্যান্স প্রকাশিত হয়, যেখানে রাজাকার বাহিনীর সার্বিক কার্যবিধি আরও সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। 'The Dacca Gazette Extraordinary' শিরোনামে প্রকাশিত এই দলিলটিতে বাহিনীর গঠন, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বেতন কাঠামো এবং ক্ষমতার বিবরণ দেওয়া হয়েছিল।

অর্ডিন্যান্সের মূল বিষয়বস্তু
অর্ডিন্যান্সটিতে রাজাকার বাহিনীর সার্বিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর প্রধান বিধানসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
ক) বাহিনীর উদ্দেশ্য ও প্রকৃতি: এই অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, রাজাকার বাহিনী ছিল একটি 'স্বেচ্ছামূলক বাহিনী' যা প্রাদেশিক সরকার কর্তৃক প্রশিক্ষিত ও সজ্জিত হবে। বাহিনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাশাপাশি মুক্তিবাহিনী ও স্বাধীনতাকামীদের দমন করা।
খ) নিয়োগ পদ্ধতি: অর্ডিন্যান্সে 'স্বেচ্ছাসেবী' নিয়োগের কথা বলা হলেও বাস্তবে জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের সক্রিয় কর্মীরা এবং পাকিস্তানপন্থি বাঙালি ও উর্দুভাষী বিহারি অভিবাসীরা এই বাহিনীতে যোগ দেন। তারা মূলত বিহারি মুসলমান এবং পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল বাঙালি মুসলমান ছিলেন।
গ) প্রশিক্ষণ কাঠামো: বাহিনীর প্রাথমিক প্রশিক্ষণের মেয়াদ ছিল মাত্র ১৫ দিন। প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ ১৯৭১ সালের ১৪ জুলাই কুষ্টিয়ায় সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে ২৭ নভেম্বর ১৯৭১ সাভারে রাজাকার কোম্পানি কমান্ডারদের প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি অভিবাদন গ্রহণ করেন।
ঘ) অস্ত্র ও সরঞ্জাম: পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাজাকারদের হালকা পদাতিক অস্ত্র সরবরাহ করে। প্রতিটি রাজাকার ব্রিগেড পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দুটি নিয়মিত ব্রিগেডের সহায়ক হিসেবে মোতায়েন করা হয়েছিল।
ঙ) অর্থায়ন ও বেতন: রাজাকারদের বেতন প্রদান করা হতো পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও প্রাদেশিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে। ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর 'দ্য পাকিস্তান অবজার্ভার' পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয় যে রাজাকারদের বেতন পুনর্নির্ধারণ করে বাড়ানো হয়েছে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্ডিন্যান্স: ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
রাজাকার বাহিনীকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ১৯৭১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর একটি পৃথক অর্ডিন্যান্স জারি করে। এই অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এর ফলে রাজাকার বাহিনী পাকিস্তান আর্মি অ্যাক্টের অধীনে পরিচালিত হয় এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের আওতাভুক্ত করা হয়। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে রাজাকার বাহিনী কোনো অনিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠী ছিল না, বরং তারা সরাসরি পাকিস্তানি সামরিক কমান্ডের অধীনে কাজ করত।

সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্ব
রাজাকার বাহিনীকে ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ সদস্যের ব্রিগেডে সংগঠিত করা হয়েছিল। সামগ্রিক সামরিক কমান্ড অর্পিত হয় মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদের উপর। রাজাকার বাহিনীর সাংগঠনিক কমান্ড দেওয়া হয় আবদুর রহিমকে, যিনি স্বেচ্ছায় পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে রাজাকার বাহিনী একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তরের মর্যাদায় উন্নীত হয়। রাজাকার বাহিনীর দুটি সহযোগী শাখা ছিল — আল-বদর এবং আল-শামস। যেখানে আল-বদর ছিল মূলত বুদ্ধিজীবী হত্যা ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের জন্য গঠিত বিশেষ বাহিনী, সেখানে আল-শামস ছিল আর একটি আধাসামরিক সহযোগী দল।

বাহিনীর বিস্তার ও কার্যক্রম
শুরুতে ৯৬ জন নিয়ে গঠিত এই বাহিনী দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক সূত্র মতে, রাজাকার বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা কোনো পর্যায়ে ৫০,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানপন্থি নেতারা ইয়াহিয়া খানকে আরও বেশি রাজাকার নিয়োগ ও অধিক অস্ত্র প্রদানের আবেদন জানিয়েছিলেন। 'দ্য পাকিস্তান অবজার্ভার' পত্রিকায় ১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর 'রাজাকারের সংখ্যা বাড়াও' শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
রাজাকারদের প্রধান কাজ ছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালি ও জাতীয়তাবাদীদের চিহ্নিত করা, গ্রেপ্তার করা এবং আটকে রাখা। মুক্তিবাহিনীর গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াও ছিল তাদের কাজ। তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর 'কাউন্টার ইনসার্জেন্সি' বাহিনী হিসেবে কাজ করেছিল।

যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ
রাজাকার বাহিনী ১৯৭১ সালে যে নৃশংস অপরাধ সংঘটিত করে তা ইতিহাসে কালো অধ্যায় হয়ে আছে। তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাশে থেকে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। তারা গণকবর পরিচালনা করে এবং যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ধর্ষণকে ব্যবহার করে।
ডাকরা গণহত্যায় ৬৪৬ জন বাঙালি হিন্দু নিহত হন, যাতে রাজাকারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট কুমারখালী উপজেলার পান্টি গ্রামে রাজাকারের হাতে ছয়জন হিন্দু ব্যক্তি নিহত হন। সিলেট, যশোর, গোপালগঞ্জ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামেও রাজাকারদের হাতে একাধিক হিন্দু নাগরিক নিহত হওয়ার খবর তৎকালীন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
রাজাকার বাহিনী যুদ্ধের ৪র্থ জেনেভা কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে অসংখ্য বেসামরিক হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল। আটক ব্যক্তিদের নির্যাতন করা ও হত্যা করা ছিল তাদের নৈমিত্তিক কার্যক্রমের অংশ।

বাহিনীর বিলুপ্তি: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক রাজাকার দলত্যাগ শুরু করে। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রাজাকার বাহিনী কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়। বহু রাজাকার আত্মগোপন করে এবং শীর্ষ রাজাকার নেতারা পাকিস্তানে পালিয়ে যান। জামায়াতে ইসলামী পার্টি নিষিদ্ধ করা হয়, কারণ এটি স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল।
যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পর মুক্তিবাহিনীর কিছু সদস্যের হাতে নিম্নপদস্থ রাজাকারেরা প্রতিশোধের শিকার হয়। সরকার প্রায় ৩৬,০০০ ব্যক্তিকে রাজাকার হিসেবে সন্দেহে গ্রেপ্তার ও আটক করে। তবে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের চাপ এবং পশ্চিম পাকিস্তানে আটক বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক কর্মীদের মুক্তির লক্ষ্যে কূটনৈতিক লেনদেনের অংশ হিসেবে অনেক আটককৃত রাজাকারকে মুক্তি দেওয়া হয়।

যুদ্ধাপরাধ বিচার ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য বাংলাদেশ সংসদ ১৯৭৩ সালে 'আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩' পাস করে। এই আইনটি বছরের পর বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর ২০০৯ সালে সংশোধনীর মাধ্যমে সক্রিয় করা হয়। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ প্রথম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি-১) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০১২ সালের ২২ মার্চ দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি-২) গঠিত হয়।
ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় আসে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি — আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, যিনি রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত করেছিলেন বলে প্রমাণিত হয়, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি পালিয়ে পাকিস্তানে চলে যাওয়ায় তার অনুপস্থিতিতেই রায় ঘোষিত হয়। দুটি ট্রাইব্যুনাল মিলিয়ে ৪৬টি মামলায় রায় হয়েছে।
গোলাম আযমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ৯টিতে দোষী সাব্যস্ত করে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি ২০১৪ সালের অক্টোবরে আপিল নিষ্পত্তির আগেই কারাগারে মারা যান। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা, মীর কাসেম আলীসহ একাধিক রাজাকার নেতাকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

রাজাকার তালিকা প্রকাশ
২০১৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর, বিজয় দিবসের দিনে, বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতাকারী ১০,৭৮৯ জন রাজাকারের নাম প্রকাশ করে। এই তালিকা প্রকাশের সময় 'দ্য ডেইলি স্টার' পত্রিকা বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রকাশ করে। তালিকা নিয়ে বিতর্কও দেখা দেয়, কারণ কিছু মুক্তিযোদ্ধার নাম ভুলবশত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

২০২৪ সালে 'রাজাকার' শব্দের পুনরুজ্জীবন
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের 'রাজাকারের নাতি-নাতনি' বলে অভিহিত করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনকারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে 'রাজাকার' শব্দটি নিজেদের পরিচয় হিসেবে ব্যবহার শুরু করে, ঘৃণাসূচক অভিধাটিকে প্রতিবাদী পরিচয়ে পরিণত করে। এই ঘটনা 'জুলাই বিপ্লব' হিসেবে পরিচিত আন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে।


পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স, ১৯৭১ কেবল একটি আইনি দলিল নয়, এটি হলো পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যামূলক কৌশলের স্বীকৃতিপত্র। এই অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বিশ্বাসঘাতক বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল — যে বাহিনী বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধেই অস্ত্র তুলে নিয়েছিল।
এই অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে আনসার বাহিনীকে রাজাকারে রূপান্তর, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়ন, বেতন কাঠামো নির্ধারণ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃতি — সব কিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নীলনকশা তৈরি হয়েছিল। এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া, বিচারের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা এবং শহিদদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা বাঙালি জাতির নৈতিক দায়িত্ব।

Address

Sylhet

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Mahmudul Hasan Jahid posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Mahmudul Hasan Jahid:

Share