13/09/2026
১৯৭২ সালের ২ থেকে ৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর ছিল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন এবং বিশ্বপরিসরে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করা—এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে রেখেই বঙ্গবন্ধুর এই সফর অনুষ্ঠিত হয়।
মস্কো সফরে বঙ্গবন্ধু শুধু কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও নৈতিক সমর্থনই আদায় করেননি; বাংলাদেশের পুনর্গঠনের জন্য অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন, যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং বৈদেশিক সম্পর্কের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করা। মুক্তিযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছিল। বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ভেটো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে স্বাধীনতার পর মস্কো সফর বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিকভাবেই একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।
মস্কোর উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ ও জনগণের জন্য বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের শুভেচ্ছা নিয়ে যাচ্ছি।” তবে এটি নিছক সৌজন্য সফর ছিল না। যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের যে বাস্তব সহায়তা প্রয়োজন, তার একটি সুনির্দিষ্ট তালিকাও নিয়ে তিনি মস্কো গিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন, ওষুধপত্রসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও পুনর্বাসন-সংক্রান্ত সহায়তা।
মস্কোর ভানুকোভো বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদার এক বিশেষ অভ্যর্থনা। তাকে স্বাগত জানাতে সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সি কোসিগিন এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি—দুজনই উপস্থিত ছিলেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কের প্রতি এই অভ্যর্থনা ছিল দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বের একটি প্রতীকী প্রকাশ।
সফরকালে ক্রেমলিনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিদ ব্রেজনেভ ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নির বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সি কোসিগিনের সঙ্গেও অনুষ্ঠিত হয় একাধিক বৈঠক। এসব আলোচনায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল ছিল ৩ মার্চ ১৯৭২ বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের যৌথ ঘোষণা। পরবর্তীকালে এটি “মুজিব-কোসিগিন ঘোষণা” নামে পরিচিতি পায়। ঘোষণায় বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়।
সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য সম্পর্কও নতুন ভিত্তি পায়। ১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশ-সোভিয়েত অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। একই সময়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক সমঝোতার মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও সহায়তা পাওয়ার পথও উন্মুক্ত হয়।[1][5]
এই সহযোগিতা বাংলাদেশের যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ ১৯৭১ সালের নয় মাসের যুদ্ধে দেশের শিল্প, যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো ও অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া দ্রুত পুনর্গঠন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।
সোভিয়েত সফরের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি একদিকে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতা বজায় রাখছিলেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিসরে সম্পর্ক বিস্তারের পথও খোলা রাখছিলেন।
তার পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ছিল—“সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।” এর সঙ্গে যুক্ত ছিল জোটনিরপেক্ষতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণের নীতি।
সোভিয়েত আতিথেয়তার প্রশংসা করে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের পুনর্গঠনে সোভিয়েত নেতাদের সহযোগিতার আশ্বাসের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ইউরোপ, জাপান, কানাডাসহ অন্যান্য বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতার প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো একটি শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
মস্কো সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা সুসংহত করা। সোভিয়েত সংবাদপত্র প্রাভদা ও ইজভেস্তিয়াসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অভ্যুদয় এবং নতুন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা প্রকাশিত হয়। সেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, জোটনিরপেক্ষতা এবং সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতা বিরোধিতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মস্কো সফর তাই শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরবর্তী কয়েক বছর বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৭৩ সালে খাদ্যসংকটের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশে খাদ্যশস্য পাঠায়। সামরিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সোভিয়েত সহায়তা পায়; মিগ-২১ যুদ্ধবিমান, পরিবহন বিমান ও হেলিকপ্টার সরবরাহ করা হয়।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরকে মাইনমুক্ত করার ক্ষেত্রেও সোভিয়েত নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করে। যুদ্ধের সময় সমুদ্রবন্দরে পুঁতে রাখা মাইন অপসারণ বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও নৌ যোগাযোগ স্বাভাবিক করার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।
এই সহযোগিতার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু সরকার পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী কাঠামো গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যায়।
১৯৭২ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধুর সোভিয়েত সফরকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের প্রাথমিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। এর মাধ্যমে একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক ও নৈতিক সমর্থন আরও সুদৃঢ় হয়, অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনের জন্য অর্থনৈতিক, কারিগরি ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সফরের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতির একটি সুস্পষ্ট রূপরেখাও সামনে আসে—বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির ছায়ায় আবদ্ধ থাকবে না; বরং জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে।
১৯৭২ সালের মার্চের সোভিয়েত সফরকে তিনটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়—প্রথমত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান ও স্বীকৃতি সুসংহত করা; দ্বিতীয়ত, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা নিশ্চিত করা; এবং তৃতীয়ত, “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এই শান্তিকামী ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা।
স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর এই সফর তাই ছিল একটি নবীন রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ, পুনর্গঠনের প্রয়োজন এবং বিশ্বরাজনীতিতে নিজের জায়গা করে নেওয়ার সম্মিলিত প্রয়াস। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে ১৯৭২ সালের মস্কো সফর সেই কারণেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে।
#ইতিহাস #মাহমুদুল_হাসান_জাহিদ