Mahmudul Hasan Jahid

Mahmudul Hasan Jahid ইতিহাস,ঐতিহ্য,সংস্কৃতি ও ভ্রমন বিষয়ক কনটেন্ট পেতে Follow দিয়ে পেইজের সাথে থাকুন 😊
Contact: [email protected]
(2)

১৯৭২ সালের ২ থেকে ৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর ছিল স্বাধীন...
13/09/2026

১৯৭২ সালের ২ থেকে ৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর ছিল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন এবং বিশ্বপরিসরে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করা—এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে রেখেই বঙ্গবন্ধুর এই সফর অনুষ্ঠিত হয়।

মস্কো সফরে বঙ্গবন্ধু শুধু কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও নৈতিক সমর্থনই আদায় করেননি; বাংলাদেশের পুনর্গঠনের জন্য অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেন।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন, যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং বৈদেশিক সম্পর্কের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করা। মুক্তিযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছিল। বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ভেটো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে স্বাধীনতার পর মস্কো সফর বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিকভাবেই একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।

মস্কোর উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ ও জনগণের জন্য বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের শুভেচ্ছা নিয়ে যাচ্ছি।” তবে এটি নিছক সৌজন্য সফর ছিল না। যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের যে বাস্তব সহায়তা প্রয়োজন, তার একটি সুনির্দিষ্ট তালিকাও নিয়ে তিনি মস্কো গিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন, ওষুধপত্রসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও পুনর্বাসন-সংক্রান্ত সহায়তা।

মস্কোর ভানুকোভো বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদার এক বিশেষ অভ্যর্থনা। তাকে স্বাগত জানাতে সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সি কোসিগিন এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি—দুজনই উপস্থিত ছিলেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কের প্রতি এই অভ্যর্থনা ছিল দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বের একটি প্রতীকী প্রকাশ।

সফরকালে ক্রেমলিনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিদ ব্রেজনেভ ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নির বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সি কোসিগিনের সঙ্গেও অনুষ্ঠিত হয় একাধিক বৈঠক। এসব আলোচনায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল ছিল ৩ মার্চ ১৯৭২ বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের যৌথ ঘোষণা। পরবর্তীকালে এটি “মুজিব-কোসিগিন ঘোষণা” নামে পরিচিতি পায়। ঘোষণায় বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়।

সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য সম্পর্কও নতুন ভিত্তি পায়। ১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশ-সোভিয়েত অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। একই সময়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক সমঝোতার মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও সহায়তা পাওয়ার পথও উন্মুক্ত হয়।[1][5]

এই সহযোগিতা বাংলাদেশের যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ ১৯৭১ সালের নয় মাসের যুদ্ধে দেশের শিল্প, যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো ও অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া দ্রুত পুনর্গঠন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।

সোভিয়েত সফরের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি একদিকে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতা বজায় রাখছিলেন, অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিসরে সম্পর্ক বিস্তারের পথও খোলা রাখছিলেন।

তার পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ছিল—“সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।” এর সঙ্গে যুক্ত ছিল জোটনিরপেক্ষতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণের নীতি।

সোভিয়েত আতিথেয়তার প্রশংসা করে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের পুনর্গঠনে সোভিয়েত নেতাদের সহযোগিতার আশ্বাসের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ইউরোপ, জাপান, কানাডাসহ অন্যান্য বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতার প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো একটি শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

মস্কো সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা সুসংহত করা। সোভিয়েত সংবাদপত্র প্রাভদা ও ইজভেস্তিয়াসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অভ্যুদয় এবং নতুন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা প্রকাশিত হয়। সেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, জোটনিরপেক্ষতা এবং সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতা বিরোধিতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মস্কো সফর তাই শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরবর্তী কয়েক বছর বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৭৩ সালে খাদ্যসংকটের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশে খাদ্যশস্য পাঠায়। সামরিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সোভিয়েত সহায়তা পায়; মিগ-২১ যুদ্ধবিমান, পরিবহন বিমান ও হেলিকপ্টার সরবরাহ করা হয়।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরকে মাইনমুক্ত করার ক্ষেত্রেও সোভিয়েত নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করে। যুদ্ধের সময় সমুদ্রবন্দরে পুঁতে রাখা মাইন অপসারণ বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও নৌ যোগাযোগ স্বাভাবিক করার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।

এই সহযোগিতার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু সরকার পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী কাঠামো গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যায়।

১৯৭২ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধুর সোভিয়েত সফরকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের প্রাথমিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। এর মাধ্যমে একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক ও নৈতিক সমর্থন আরও সুদৃঢ় হয়, অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনের জন্য অর্থনৈতিক, কারিগরি ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সফরের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতির একটি সুস্পষ্ট রূপরেখাও সামনে আসে—বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির ছায়ায় আবদ্ধ থাকবে না; বরং জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে।

১৯৭২ সালের মার্চের সোভিয়েত সফরকে তিনটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়—প্রথমত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান ও স্বীকৃতি সুসংহত করা; দ্বিতীয়ত, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা নিশ্চিত করা; এবং তৃতীয়ত, “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এই শান্তিকামী ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা।

স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর এই সফর তাই ছিল একটি নবীন রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ, পুনর্গঠনের প্রয়োজন এবং বিশ্বরাজনীতিতে নিজের জায়গা করে নেওয়ার সম্মিলিত প্রয়াস। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে ১৯৭২ সালের মস্কো সফর সেই কারণেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে।

#ইতিহাস #মাহমুদুল_হাসান_জাহিদ

13/09/2026

সেই জীবনকে আদিম বিবেচনা করে আমরা আধুনিক-নিঃসঙ্গ-স্বাধীনতা বেছে নিয়েছি ঠিক, কিন্তু হারিয়েছি সঙ্গ,মায়া ও বন্ধন!

বুয়েটের প্রকৌশলী থেকে অভিনয়ের কিংবদন্তি আবুল হায়াতবাংলাদেশের অভিনয়জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আবুল হায়াত। মঞ্চ, টেলিভিশন ও ...
13/09/2026

বুয়েটের প্রকৌশলী থেকে অভিনয়ের কিংবদন্তি আবুল হায়াত

বাংলাদেশের অভিনয়জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আবুল হায়াত। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—তিন মাধ্যমেই ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি অভিনয়ের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তবে তার জীবনকাহিনির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—পেশাগত জীবনে তিনি একজন প্রকৌশলী, আর আত্মিক পরিচয়ে একজন শিল্পী। বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের অভিনয়জগতের এক কিংবদন্তি মুখ।

আবুল হায়াতের জন্ম ১৯৪৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুর্শিদাবাদে। দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে তিনি চট্টগ্রামে চলে আসেন। সেখানেই তার শৈশব, কৈশোর ও শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটে। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করার পর ১৯৬২ সালে তিনি তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে ভর্তি হন, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট নামে পরিচিত হয়। বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে ১৯৬৭ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরের বছর ঢাকা ওয়াসায় প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

প্রকৌশল পেশা তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হলেও অভিনয়ের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল শৈশব-কৈশোর থেকেই। বুয়েটে পড়ার সময়ই তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। প্রকৌশলের কঠিন হিসাব, নকশা ও নির্মাণকাজের পাশাপাশি অভিনয়ের সংলাপ, চরিত্র বিশ্লেষণ এবং মঞ্চের আলো তাকে টানত। সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—অভিনয় তার কাছে নিছক শখ নয়; বরং এটি তার সৃজনশীল অস্তিত্বের অপরিহার্য অংশ।

ষাটের দশকের শেষভাগে আবুল হায়াত মঞ্চনাটকে সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেন। মঞ্চ তাকে অভিনয়ের শৃঙ্খলা, সংযম এবং চরিত্র নির্মাণের গভীর শিক্ষা দেয়। পরে টেলিভিশনের প্রসার ঘটলে তিনি ছোট পর্দায় নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন। স্বাভাবিক সংলাপ বলার ভঙ্গি, পরিমিত অভিব্যক্তি, ব্যক্তিত্বময় কণ্ঠস্বর এবং চরিত্রের অন্তর্গত মনস্তত্ত্ব ধরার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে দ্রুত দর্শকের প্রিয় করে তোলে।

বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের বিকাশের সঙ্গে আবুল হায়াতের অভিনয়জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বাবা, শিক্ষক, কর্মকর্তা, অভিভাবক, রক্ষণশীল মানুষ কিংবা মানবিক ও দ্বন্দ্বময় চরিত্র—বিভিন্ন ভূমিকায় তিনি নিজেকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করেছেন। তার অভিনয়ে অতিনাটকীয়তার বদলে থাকে সংযত আবেগ, বাস্তবতার স্পর্শ এবং চরিত্রের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। ফলে পর্দায় তাকে দেখলে চরিত্রটিকে কখনোই কৃত্রিম মনে হয় না; বরং মনে হয়, তিনি যেন সেই মানুষটির জীবনই যাপন করছেন।

চলচ্চিত্রেও আবুল হায়াত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ২০০৭ সালে ‘দারুচিনি দ্বীপ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার সম্মান অর্জন করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি নাট্যকার, পরিচালক ও লেখক হিসেবেও তিনি নিজের বহুমাত্রিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তার আত্মজীবনীর নাম ‘রবি পথ’, যা দীর্ঘ সময় ধরে তিনি রচনা করেছেন।

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৫ সালে আবুল হায়াত একুশে পদকে ভূষিত হন। প্রকৌশলী হিসেবে শিক্ষিত হয়েও তিনি প্রমাণ করেছেন—পেশা মানুষের পরিচয়ের একটি অংশ মাত্র; শিল্পীসত্তা তাকে আরও বৃহত্তর পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। ২০২৫ সালেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অবদানের জন্য তিনি মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন।

আবুল হায়াতের জীবন তাই কেবল একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়; এটি অধ্যবসায়, বহুমুখী প্রতিভা এবং সৃষ্টিশীলতার এক অনন্য উদাহরণ। বুয়েটের প্রকৌশলী থেকে মঞ্চ ও পর্দার কিংবদন্তি হয়ে ওঠার এই যাত্রা প্রমাণ করে—মানুষ চাইলে যুক্তি ও কল্পনা, পেশা ও শিল্প, দায়িত্ব ও সৃষ্টিশীলতা—সবকিছুকেই একই জীবনে ধারণ করতে পারে।

বাংলাদেশের অভিনয় ইতিহাসে আবুল হায়াত তাই শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নন; তিনি এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক। তার অভিনয়জীবনের দীর্ঘ পথচলা প্রমাণ করে, প্রকৌশলের সুনির্দিষ্ট হিসাবের পাশাপাশি শিল্পের অনন্ত কল্পনাকেও ধারণ করা সম্ভব—যদি মানুষের ভেতরে থাকে প্রতিভা, অধ্যবসায় ও সৃষ্টির প্রতি গভীর ভালোবাসা।

#ইতিহাস #অভিনয় #মাহমুদুল_হাসান_জাহিদ

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাসে এ. এফ. এম. আহসানউদ্দিন চৌধুরীর অধ্যায়টি ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎ...
13/09/2026

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাসে এ. এফ. এম. আহসানউদ্দিন চৌধুরীর অধ্যায়টি ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে সে সময় রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা ছিল প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাতে। ফলে আহসানউদ্দিন চৌধুরীর রাষ্ট্রপতিত্ব বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক সংকটময় ও সংক্রমণকালীন অধ্যায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরী ১৯১৫ সালের ১ জুলাই তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার বোকাইনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর বিচার বিভাগে যোগ দিয়ে দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪২ সালে মুন্সেফ হিসেবে তার বিচারিক কর্মজীবনের শুরু। পরবর্তী সময়ে তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

দীর্ঘ বিচারিক জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে দেশের আইন ও সংবিধানিক কাঠামো সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর) ঘোষণা করেন।

এর কয়েক দিন পর, ২৭ মার্চ বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তার শপথবাক্য পাঠ করান বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন।

তিনি ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ থেকে ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। এই সময়ে দেশে কার্যত সামরিক শাসন চলছিল। রাষ্ট্রপতির পদটি সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল এরশাদের নেতৃত্বাধীন সামরিক প্রশাসন। ফলে আহসানউদ্দিন চৌধুরীর রাষ্ট্রপতিত্ব মূলত একটি সীমিত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক ভূমিকার মধ্যেই আবদ্ধ ছিল।

এই কারণেই তার রাষ্ট্রপতিত্বকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সংক্রমণকালীন অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়—একদিকে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক কাঠামো, অন্যদিকে সামরিক আইনের অধীনে পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থা।

১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে আহসানউদ্দিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন।

পরবর্তী সময়ে এরশাদ সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে বেসামরিক ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থায় ফেরার উদ্যোগ নিলেও ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শুরু হওয়া শাসনপর্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তীকালে সংবিধানের সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে এরশাদের সামরিক শাসনামলে জারি করা বিভিন্ন ফরমান, আদেশ ও আইনকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

আহসানউদ্দিন চৌধুরীর রাষ্ট্রপতিত্বকাল ছিল সময়ের বিচারে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসের দৃষ্টিতে তাৎপর্যপূর্ণ। একজন অভিজ্ঞ বিচারপতি হিসেবে তার দীর্ঘ পেশাগত জীবনে যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল, রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হওয়ার পরও তার সেই পরিচয়ই ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু যে সময়ে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন, সেটি ছিল সামরিক শাসনের সূচনালগ্ন।

ফলে তার রাষ্ট্রপতিত্বকে শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অধ্যায় হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যায় না। বরং এটি ছিল এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো সামরিক ক্ষমতার প্রভাবের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছিল।

২০০১ সালের ৩০ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এ. এফ. এম. আহসানউদ্দিন চৌধুরী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।

বাংলাদেশের সংবিধানিক ইতিহাসে তাই তার নামটি থেকে গেছে এক জটিল সময়ের সাক্ষ্য হিসেবে—যে সময়ে আইন ও বিচারব্যবস্থার একজন প্রবীণ ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রপতির আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, অথচ রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র ছিল সামরিক নেতৃত্বের হাতে। তার সংক্ষিপ্ত রাষ্ট্রপতিত্ব সেই অস্থির সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।

#ইতিহাস #মাহমুদুল_হাসান_জাহিদ

13/09/2026

মস্তিষ্কের চেয়ে বড় কোনো কবরস্থান নেই,কত স্বপ্ন, কত শখ দাফন করলাম, অতচ কেউ জানল না

-মির্জা গালিব

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪–১৯৫০) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী। তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ শুধু বাংলা সাহিত্যে...
12/09/2026

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪–১৯৫০) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী। তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ শুধু বাংলা সাহিত্যের নয়, বিশ্বসাহিত্যেরও এক কালজয়ী সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃত। সাধারণ মানুষের জীবন, প্রকৃতি, দারিদ্র্য, স্বপ্ন ও মানবিক অনুভূতিকে তিনি যে গভীর মমতা ও শিল্পবোধে তুলে ধরেছেন, তা তাঁকে বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর (বাংলা ১৩০১ সালের ২৮ ভাদ্র) পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণার কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী মুরাতিপুর গ্রামে তাঁর মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের আদি নিবাস ছিল বসিরহাট মহকুমার পানিতর গ্রামে এবং পৈতৃক নিবাস বারাকপুরে।

শৈশব থেকেই তাঁকে দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে হয়। জীবনের এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি ও গভীর মানবিক সংবেদনশীলতার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, তাদের সুখ-দুঃখ এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্ক তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

শিক্ষাজীবনে বিভূতিভূষণ কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বি.এ. এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি শিক্ষকতা ও বিভিন্ন চাকরির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন।

বিভূতিভূষণের প্রথম প্রকাশিত গল্প ১৯২২ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এরপর ‘বিচিত্রা’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর গল্প, প্রবন্ধ ও অন্যান্য লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। তবে তাঁর সাহিত্যিক খ্যাতির প্রকৃত ভিত্তি গড়ে ওঠে ১৯২৯ সালে ‘পথের পাঁচালী’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে। উপন্যাসটি প্রথমে ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং পরে সজনীকান্ত দাসের রঞ্জন প্রকাশনালয় থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

‘পথের পাঁচালী’ মূলত নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের একটি দরিদ্র পরিবারের জীবনসংগ্রামের কাহিনি। অপু ও দুর্গার শৈশব, গ্রামীণ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, দারিদ্র্যের নির্মমতা, স্বপ্ন, আনন্দ, বেদনা ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে এই করুণ-মধুর আখ্যান।

উপন্যাসটি তিনটি খণ্ডে বিভক্ত—‘বল্লালী বালাই’, ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ ও ‘অক্রূর সংবাদ’—এবং মোট পঁয়ত্রিশটি পরিচ্ছেদে রচিত। বাংলা সাহিত্যে গ্রামীণ জীবনের এমন বাস্তব, কাব্যিক ও মানবিক চিত্রায়ন ছিল অত্যন্ত বিরল। প্রকৃতি ও মানুষের জীবনকে একসূত্রে গেঁথে বিভূতিভূষণ যে অনন্য সাহিত্যিক জগৎ নির্মাণ করেছেন, তার কারণেই ‘পথের পাঁচালী’ আজও কালজয়ী।

পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায় এই উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৫৫ সালে নির্মাণ করেন একই নামের চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’। চলচ্চিত্রটি শুধু ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসেই একটি মাইলফলক হয়ে ওঠেনি, বাংলা ও ভারতীয় সিনেমাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।

‘পথের পাঁচালী’-র পর বিভূতিভূষণ রচনা করেন ‘অপরাজিত’ (১৯৩১)। এটি ‘অপু ত্রয়ী’-র দ্বিতীয় পর্ব, যেখানে অপুর কৈশোর ও যৌবনের জীবনযাত্রা এবং মানসিক বিকাশের কাহিনি উঠে এসেছে।

তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘আরণ্যক’ (১৯৩৯), ‘অশনি সংকেত’ (১৯৪১) এবং ‘ইছামতী’ (১৯৪৭)। উপন্যাসের পাশাপাশি ছোটগল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি ও শিশুসাহিত্যেও তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

বিভূতিভূষণের সাহিত্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং সাধারণ মানুষের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা। তাঁর লেখায় দার্শনিক চিন্তা, জীবনবোধ ও এক ধরনের আধ্যাত্মিক অনুভূতিও লক্ষ করা যায়।

তাঁর ভাষা সহজ, ছন্দময়, স্বাভাবিক এবং চিত্রাত্মক। তাঁর বর্ণনায় গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ, ঋতুর পরিবর্তন, নদী-খাল, মাঠ-ঘাট এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। প্রকৃতিকে তিনি কেবল পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই তুলে ধরেছেন। এ কারণেই তাঁর সাহিত্য পাঠকের মনে গভীর আবেগ ও মমত্ববোধ সৃষ্টি করে।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর ঝাড়খণ্ডের ঘাটশিলায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শেষকৃত্য সুবর্ণরেখা নদীর তীরে ‘পঞ্চপাণ্ডব ঘাট’-এ সম্পন্ন হয়।

ঘাটশিলায় তাঁর বাসভবন ‘গৌরীকুঞ্জ’ নামে পরিচিত। বাড়িটির সামনের রাস্তাটিও ‘অপুর পথ’ নামে পরিচিত, যা তাঁর সাহিত্যকর্ম ও জীবনের সঙ্গে ঘাটশিলার গভীর সম্পর্কের স্মারক হয়ে আছে।

মৃত্যুর বহু দশক পরও বিভূতিভূষণের সাহিত্য সমানভাবে পাঠকপ্রিয়। তাঁর রচনা বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য ও আলোচনার অংশ হয়ে আছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

‘পথের পাঁচালী’-র মতো একটি উপন্যাসে তিনি শৈশব, দারিদ্র্য, প্রকৃতি, স্বপ্ন, বেদনা ও মানবিকতার যে সার্বজনীন চিত্র এঁকেছেন, তা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের জীবন ও অনুভূতির সেই চিরন্তন সত্যই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যকে আজও জীবন্ত রেখেছে এবং তাঁকে বাংলা সাহিত্যের একজন সত্যিকারের কালজয়ী কথাশিল্পীতে পরিণত করেছে।

#ইতিহাস #মাহমুদুল_হাসান_জাহিদ

12/09/2026

আলোর সারি

12/09/2026

হঠাৎ পেইজের রিচ ডাউন আর এর পিছনে রয়েছেন আমার কিছু মুখোশধারী শুভাকাঙ্ক্ষী তারা স্বযত্নে রিপোর্ট করেছেন!

শামসুল হক: ইতিহাসের বিস্মৃত এক নায়কআওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ব...
12/09/2026

শামসুল হক: ইতিহাসের বিস্মৃত এক নায়ক

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিস্মৃত নায়ক। ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অথচ সময়ের প্রবাহে তার নাম ও অবদান অনেকটাই ইতিহাসের আড়ালে চলে গেছে।

শামসুল হক ১৯১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার মাইঠান গ্রামে তার মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি একই উপজেলার টেউরিয়া গ্রামে। তার পিতা দবিরউদ্দিন মিয়া এবং মাতা শরীফুননেসা।

তিনি সন্তোষ জাহ্নবী হাইস্কুল থেকে ১৯৩৮ সালে ম্যাট্রিক, করটিয়া সাদত কলেজ থেকে ১৯৪০ সালে আইএ এবং ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৪৩–৪৪ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের সময় শামসুল হক আবুল হাশিমের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মুসলিম লীগ কর্মী শিবিরের অন্যতম সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

১৯৪৪ সালের ৯ এপ্রিল ঢাকার ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে প্রতিষ্ঠিত এই কর্মী শিবির থেকেই পরবর্তীকালে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়।

শামসুল হকের নেতৃত্বে ১৯৪৫–৪৬ সালে পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগকে একটি গণভিত্তিক সংগঠনে রূপান্তরিত করার কাজ এগিয়ে যায়। এর ফলে পাকিস্তান আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হয়। ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিজয় এবং সিলেট গণভোটে সিলেটকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রেও তার সাংগঠনিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৯৪৭ সালের পর পূর্ব পাকিস্তানে খাজা নাজিমুদ্দিন, নুরুল আমীন ও ইউসুফ আলী চৌধুরী (মোহন মিঞা)-সহ মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতারা দলটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলে গণতান্ত্রিক ও বাঙালির স্বার্থভিত্তিক একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলনে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ।

দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন মওলানা ভাসানী এবং প্রথম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শামসুল হক। শেখ মুজিবুর রহমান ও খন্দকার মোশতাক আহমেদ যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। পরবর্তীকালে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ নামটি গ্রহণ করা হয়।

দলের প্রথম দিককার রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মসূচি প্রণয়নেও শামসুল হকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি দলের প্রথম খসড়া ম্যানিফেস্টো বা ‘মূলবাদী’ নামে একটি পুস্তিকা প্রণয়ন করেন, যা আওয়ামী লীগের প্রাথমিক রাজনৈতিক দলিল হিসেবে প্রচারিত হয়।

১৯৪৯ সালের মার্চ–এপ্রিলে টাঙ্গাইলের দক্ষিণ মুসলিম আসনে উপনির্বাচন ঘোষণা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে শামসুল হককে প্রার্থী করা হয়।

তিনি মুসলিম লীগের প্রার্থী করটিয়ার জমিদার খুররম খান পন্নীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।

এই নির্বাচন ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ভোটের মাধ্যমে প্রকাশ্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে এটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। নির্বাচনী এই সংগ্রাম সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী-তেও শামসুল হকের সাহস ও ত্যাগের কথা স্মরণ করেছেন।

বাংলা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ও সক্রিয় কর্মী ছিলেন শামসুল হক।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রধর্মঘট ও আন্দোলনের সময় তিনি শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদসহ অন্যান্য নেতার সঙ্গে গ্রেফতার হন। কারাগারে থাকা অবস্থায় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে একটি চুক্তিপত্র দেখিয়ে তার সম্মতি নেওয়া হয়।

চার বছর পর, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়েও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

২০ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের বৈঠকে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিষয়ে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্রসভায় শামসুল হক উপস্থিত ছিলেন। তিনি ছাত্রদের সংযত থাকতে এবং সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের স্বার্থ রক্ষার পরামর্শ দেন।

কিন্তু ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে শেষ পর্যন্ত শামসুল হকও তাদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারির পর সরকার জননিরাপত্তা আইনে শামসুল হকসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করে।

ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের অভিযোগে ১৯৫২ সালে শামসুল হক গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাবরণ করেন। কারাগারে নির্যাতন ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের ফলে ১৯৫৩ সালে তিনি অসুস্থ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় মুক্তি পান।

এই সময়ে তাকে আওয়ামী লীগ থেকেও বহিষ্কার করা হয়।

লেখক আবু জাফর শামসুদ্দীন তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন, কারাগারে থাকাকালীন শামসুল হকের মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এমনকি নিজের পরিবারের সদস্যদের প্রতিও তার মনে সন্দেহ তৈরি হয়। পরবর্তীকালে তার স্ত্রী আফিয়া খাতুনও তাকে ত্যাগ করেন।

একজন রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে যে মানুষটি একসময় হাজারো কর্মীকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সেই শামসুল হক জীবনের এই পর্যায়ে ক্রমেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন।

কারামুক্তির পর শামসুল হকের জীবন হয়ে ওঠে আরও করুণ। প্রায় এক দশক তিনি পথে পথে ঘুরে বেড়ান। কখনও বন্ধুদের কাছে অর্থ সাহায্য চাইতেন, আবার কেউ তাকে স্নেহ করে আশ্রয় দিলে সেখানেই আহার করতেন।

১৯৬৪ সালের দিকে তিনি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তার অবস্থান কিংবা মৃত্যুর বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য জনসমক্ষে আসেনি।

প্রায় চার দশক পর শামসুল হকের জীবনের শেষ অধ্যায় সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে আসে।

২০০৭ সালে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কদিমহামজানি গ্রামের চিকিৎসক ডা. আনসার আলী তালুকদার একটি ক্যালেন্ডারে শামসুল হকের ছবি ও পরিচিতি দেখে বহু বছর আগের একটি স্মৃতি মনে করতে পারেন।

তার বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেস নেতা মহিউদ্দিন আনসারী কলকাতা থেকে ফেরার পথে মানসিকভাবে অসুস্থ শামসুল হককে দেখতে পান এবং তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন।

প্রায় সাত দিন পর প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ১৯৬৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, শনিবার, দুপুর ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে শামসুল হক মৃত্যুবরণ করেন বলে জানা যায়। স্থানীয় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক শুকলাল দাস তার চিকিৎসা করেছিলেন।

মহিউদ্দিন আনসারীর বাড়ির সামনের মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে তাকে কদিমহামজানি কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ধারণা করা হয়, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিরোধ এড়াতে তার মৃত্যুর খবর গোপন রাখা হয়েছিল।

শামসুল হক ছিলেন একজন সাহসী রাজনৈতিক সংগঠক, ভাষাসৈনিক এবং আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। পাকিস্তান আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তার অবদান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে দীর্ঘদিন তার নাম ও অবদান ইতিহাসের আড়ালে থেকে যায়। এমনকি যে রাজনৈতিক দলটির প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই দলেও দীর্ঘ সময় তার যথাযথ স্মরণ বা মূল্যায়ন দেখা যায়নি।

২০০৭ সালে তার কবরের সন্ধান পাওয়ার পর তার জীবন ও রাজনৈতিক অবদান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ধীরে ধীরে ইতিহাসের এই বিস্মৃত নেতার ভূমিকা জনসমক্ষে ফিরে আসতে থাকে।

শামসুল হকের জীবন তাই শুধু একজন রাজনীতিকের জীবনী নয়; এটি ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়। যে মানুষটি একসময় একটি রাজনৈতিক আন্দোলনকে সংগঠিত করেছিলেন, ভাষার অধিকারের জন্য কারাবরণ করেছিলেন এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন—জীবনের শেষভাগে তাকেই কাটাতে হয়েছিল নিঃসঙ্গতা, অসুস্থতা ও বিস্মৃতির অন্ধকারে।

তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাসের সব নায়ক আলোয় থাকেন না। কেউ কেউ জাতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নির্মাণ করেও সময়ের স্রোতে হারিয়ে যান।

তাদের অবদান খুঁজে বের করা, যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং নিরপেক্ষভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

#ইতিহাস #বাংলাদেশ #মাহমুদুল_হাসান_জাহিদ

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম: যে গানের জন্য গ্রামছাড়া, আজ সেই গানেই বিশ্বজয়বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে শাহ আব্দুল করিম এক ...
12/09/2026

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম: যে গানের জন্য গ্রামছাড়া, আজ সেই গানেই বিশ্বজয়

বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে শাহ আব্দুল করিম এক কিংবদন্তিতুল্য নাম। জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা, কুসংস্কার ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। একসময় যে গান গাওয়ার কারণে তাঁকে বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল, এমনকি গ্রাম ছাড়তেও বাধ্য হতে হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে—আজ সেই গানই তাঁকে এনে দিয়েছে ‘বাউল সম্রাট’-এর মর্যাদা। তাঁর সৃষ্ট গান এখন শুধু বাংলাদেশের মানুষের নয়, বিশ্বজুড়ে বাংলাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক সম্পদ।

শাহ আব্দুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার বর্তমান সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল/ধলগ্রাম অঞ্চলে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ইব্রাহিম আলী এবং মা নাইওরজান বিবি। অভাব ছিল তাঁদের পরিবারের নিত্যসঙ্গী।

শৈশব থেকেই তাঁকে জীবিকার তাগিদে নানা কঠিন কাজ করতে হয়েছে। কখনো গৃহস্থের বাড়িতে কাজ করেছেন, কখনো গরু চরিয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগও ছিল খুব সীমিত। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, রাতের স্কুলে তিনি মাত্র কয়েক রাত পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন।

তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সীমিত হলেও জীবনই হয়ে উঠেছিল তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়। হাওরের প্রকৃতি, ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম, তাঁদের সুখ-দুঃখ এবং গ্রামের সাধক-ফকিরদের আসর থেকে তিনি অর্জন করেছিলেন জীবনের গভীরতম শিক্ষা।

ছোটবেলা থেকেই মরমী সাধকদের গান তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করত। বাউল, মারফতি, দেহতত্ত্ব ও ভাটিয়ালি গানের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে তাঁর পরিচয় গড়ে ওঠে। বাউল কামাল উদ্দীন, সাধক রশীদ উদ্দীন এবং শাহ ইব্রাহিম মাস্তান বকশের মতো সাধকদের সংস্পর্শে এসে তিনি বাউল ও আধ্যাত্মিক সংগীতের দর্শনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে পরিচিত হন। ধীরে ধীরে শুরু হয় তাঁর নিজস্ব সাধনা ও সৃষ্টির পথচলা।

শাহ আব্দুল করিমের জীবনের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় তাঁর গানকে ঘিরে সামাজিক বিরোধিতা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তিনি যখন বাউল গান গাইতে শুরু করেন, তখন গ্রামের কিছু মানুষ এবং রক্ষণশীল ধর্মীয় মহল তাঁর সংগীতচর্চাকে ভালো চোখে দেখেনি। তাঁর গানকে কখনো ‘অশালীন’ কিংবা ‘কাফেরি’ কাজ হিসেবেও আখ্যা দেওয়া হতো। এমনকি গান গাওয়ার কারণে তাঁকে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।

কিছু সূত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঈদের জামাতে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁকে বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল এবং গান ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে তওবা করার চাপ দেওয়া হয়েছিল।

এই সামাজিক চাপ, অপমান ও বাধার মধ্যেই একসময় তাঁকে নিজের গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু এই প্রতিকূলতাই তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং দোতারা হাতে তিনি আরও বিস্তৃত মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে শুরু করেন। ভাটি বাংলার মানুষের জীবন, দুঃখ-কষ্ট, প্রেম-বিরহ, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক অন্যায় তাঁর গানের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।

যে গান একসময় তাঁর জন্য ছিল সামাজিক বিরোধিতার কারণ, সময়ের সঙ্গে সেই গানই হয়ে ওঠে তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।

শাহ আব্দুল করিম প্রায় দেড় হাজার গান রচনা ও সুর করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর গান বিভিন্ন গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘আফতাব সংগীত’, ‘গণ সংগীত’, ‘কালনীর ঢেউ’, ‘ধলমেলা’, ‘ভাটির চিঠি’ ও ‘কালনীর কূলে’।

তাঁর গানের বিষয়বস্তু ছিল বিস্তৃত। প্রেম ও বিরহের পাশাপাশি এসেছে দেহতত্ত্ব, মারফতি ও শরিয়তি দর্শন, হাওরপাড়ের মানুষের জীবন, দারিদ্র্য, শোষণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গণমানুষের অধিকার।

তাঁর অসংখ্য গানের মধ্যে আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে—

* ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’
* ‘বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে’
* ‘গাড়ি চলে না’
* ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইছ’
* ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’
* ‘বসন্ত বাতাসে সইগো’

তাঁর গান শুধু বিনোদনের জন্য সৃষ্টি হয়নি। প্রতিটি গানের ভেতরে যেন ভাটি বাংলার মানুষের জীবনকথা, অভিজ্ঞতা, আকাঙ্ক্ষা ও বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।

দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনেও তাঁর গান মানুষের মধ্যে চেতনা ও সাহস জাগিয়েছে।

তাঁর সংগীতের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—তিনি মানুষের ভাষায় মানুষের কথাই বলেছেন।

জীবনের শুরুতে যে শিল্পীকে সামাজিক বাধা ও অবহেলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, জীবনের শেষদিকে তিনিই পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় মর্যাদা।

২০০১ সালে বাংলাদেশ সরকার শাহ আব্দুল করিমকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক প্রদান করে।

এছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশ-বিদেশের নানা আয়োজন থেকে তিনি সম্মানিত হয়েছেন। তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০১৬ সালে দেশে নানা অনুষ্ঠান ও বিশেষ আয়োজন করা হয়। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমেও তাঁর জীবন ও সংগীত নিয়ে প্রকাশিত হয় নানা প্রতিবেদন ও বিশেষ অনুষ্ঠান।

তাঁর মৃত্যুর পরও প্রতি বছর ১২ সেপ্টেম্বর তাঁর প্রয়াণ দিবসে দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা, স্মরণসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করা হয়।

শাহ আব্দুল করিমকে শুধু একজন বাউল গায়ক হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টির ব্যাপ্তি বোঝা যায় না। তিনি ছিলেন একজন গীতিকার, সুরকার, দার্শনিক এবং গণমানুষের কণ্ঠস্বর।

তাঁর গানে বারবার ফিরে এসেছে মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য, প্রেম ও মুক্তচিন্তার কথা। সমাজের বৈষম্য, ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে তাঁর গান ছিল এক ধরনের নীরব অথচ শক্তিশালী প্রতিবাদ।

আজকের সময়েও তাঁর গান সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ সমাজ বদলালেও মানুষের ভালোবাসা, বঞ্চনা, বৈষম্য, স্বপ্ন এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বদলে যায়নি।

সবচেয়ে বড় কথা, যে শিল্পী একসময় তাঁর গান নিয়ে সামাজিক বাধার মুখে পড়েছিলেন, আজ সেই সমাজই তাঁর গানকে নিজেদের গর্বের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে।

শাহ আব্দুল করিমের জীবন আমাদের সামনে এক অনন্য সত্য তুলে ধরে—কুসংস্কার ও সংকীর্ণতা কোনো সৃষ্টিশীল কণ্ঠকে দীর্ঘদিন আটকে রাখতে পারে না।

যে গান একসময় তাঁকে সামাজিক বিরোধিতা ও নির্বাসনের মুখে ফেলেছিল, সেই গানই শেষ পর্যন্ত তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে মানুষের হৃদয়ের গভীরে। তাঁর গান আজ শুধু ভাটি বাংলার সম্পদ নয়; বাংলা সংস্কৃতির বৃহত্তর ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ কিংবা ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’ যখন আমরা গাই, তখন শুধু একটি গান গাই না। সেই সুরের ভেতর দিয়ে শুনতে পাই ভাটি বাংলার মানুষের জীবন, বেদনা, প্রেম, প্রতিবাদ এবং স্বপ্নের কথা।

শাহ আব্দুল করিম তাই কেবল একজন শিল্পীর নাম নন। তিনি এমন এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যাঁর গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষের মুখে বেঁচে থাকবে।

যে গানের জন্য একদিন তাঁকে বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল, আজ সেই গানই তাঁকে অমর করে রেখেছে।

#ইতিহাস #মাহমুদুল_হাসান_জাহিদ #শাহ_আব্দুল_করিম #বাউল

Address

Sylhet

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Mahmudul Hasan Jahid posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Mahmudul Hasan Jahid:

Shortcuts

Share