26/07/2026
হিজাব/নিকাব মেইনটেইন করাটা যদি এতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে পর্দানশীল নারীরা ভার্সিটিতে পড়তে এসেছে কেন?
নিকাব খুলতে যদি এতোই সমস্যা হয়, তাহলে ভার্সিটি ছেড়ে
দিলেই পারে, ভার্সিটিতে পড়তে হলে এখানকার নিয়ম মেনেই
পড়তে হবে — ভার্সিটিতে নিকাব পরা সংক্রান্ত কোন ইস্যু উঠলেই এমন কথা বহু মানুষের কাছ থেকেই শোনা যায়।
আমি একটু সত্যিকার অর্থেই যাচাই করে দেখাতে চাই যে ভার্সিটির আইন সত্যিকার অর্থেই কী বলে? নিকাব/ হিজাব পরিধান করার ক্ষেত্রে দেশীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক
আইনই বা কী বলে। যেহেতু আমি আইনের ছাত্র, সেইজন্য
মানুষের মুখে শোনা কথা নয়, বরং আইনের টেক্সট ধরে ধরেই কথা বলার চেষ্টা করব। আমার স্ট্যান্ড আইনের বিধান মতোই প্রমাণ করার চেষ্টা করব।
সবার আগে একটা দারুণ জিনিস দেখাই চলেন।
ক্রিমিনাল অফেন্স সংক্রান্ত মামলা কীভাবে রেগুলেটেড হবে,তার জন্য ব্রিটিশরা ১৮৯৮ সালে যে আইন করেছিল,
তার নাম Code of Criminal procedure, সংক্ষেপে CrPC.
উল্লেখ্য যে ওই সেইম CrPC-ই পরবর্তীতে ভারত,পাকিস্তান
ও স্বাধীন বাংলাদেশের আইন হিসাবে এখনও চলমান টুকটাক কিছু পরিবর্তন সাপেক্ষে।
ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্টটা হল সেই সময়ে ব্রিটিশরা কর্তৃক যে আইন প্রনয়ন করা হয়েছিল সেখানে পর্দানশীল নারীদের জন্য বিশেষ বিধান রাখা ছিল। ওই আইনে পর্দানশীল বলতে
জাস্ট স্রেফ হিজাবী নয়, বরং নিকাবী মানে চক্ষু ব্যতীত পুরো
শরীর যারা ঢেকে রাখতো( Full veiled except eyes) এমন
নারীদের বুঝানো হয়েছে।
CrPC এর ৪৮ নং ধারাতে বর্ণিত আছে একজন আসামীকে ধরতে যাওয়ার সময় যদি উক্ত আসামী ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে রাখে এবং বলার পরও সেগুলো না খুলে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে রাখে,সেক্ষেত্রে জানালা কিংবা ঘরের কোনো অংশ ভেঙে পুলিশ ভেতরে প্রবেশ করে ওই
আসামী ধরতে পারে।
ঠিক ওই পরিস্থিতিতেও যদি এমন হয় যে ওই ঘরে অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথে এমন কোন নারী আছেন যিনি পর্দানশীল
অসূর্যম্পশ্যা, তাহলে ওই ঘরের দরজা জানালা ভাঙার আগে
অবশ্যই ওই পর্দানশীল নারীকে জানাতে হবে যে রুমের ভেতর এইভাবে প্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছে তারা, তাই উনাকে সময় দেওয়া হচ্ছে যাতে করে উনি ওই সময়ের ভেতর নিজেকে সরিয়ে নিতে পারে, যাতে করে তার ওই ধর্মীয়
পর্দার কোন খেলাপ না হয়।
ব্রিটিশরা ঠিক যে ভাষায় ওই সেকশনটা ড্রাফট করেছিল,
সেই হুবহু ভাষাটা হল–
“ If any such place is an apartment in the actual occupancy of a woman (not being the person to be arrested) who, according to custom, does not appear in public such person or police-officer shall, before entering such apartment, give notice to such woman that she is at liberty to withdraw and shall afford her every reasonable facility for withdrawing, and may then break open the apartment and
enter it."
CrPC এর ৫২ ধারায় বলা আছে কখনও যদি কোন নারীকে
সার্চ করার দরকার হয়, অবশ্যই একজন নারী ব্যক্তি দিয়েই তা করাতে হবে এবং তা হতে হবে অত্যন্ত ডিসেন্সি(শালীনতা)
মেইনটেইন করে।
Section 52 of CrPC speaks —
“Whenever it is necessary to cause a woman to be searched, the search shall be made by another woman, with strict regard to decency.”
একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখুন, ব্রিটিশরা যে আইন করে গিয়েছিল সেখানেও একজন পর্দানশীল নারীর জন্য বিশেষ প্রভিশন রাখতে ভুল করেনি। একজন ক্রিমিনালকে ধরা কিংবা ক্রিমিনাল অফেন্স ইস্যুতে সার্চ করার মত গুরুত্বপূর্ণ
কাজেও তারা পর্দানশীল নারীকে বিশেষভাবে ট্রিট করেছে
এবং একজন নারীকে যাতে করে শুধুমাত্র অন্য একজন নারী কর্তৃকই সার্চ করা হয় খুবই ডিসেন্সি মেইনটেইন করে, সেই বিধান তৈরী করেছে।
এখন কোন বিশ্ববিদ্যালয় যদি বলে যে একটা পর্দানশীল মেয়েকে পরীক্ষায় বসতে হলে তাকে শুধুমাত্র একজন ম্যাডাম নয়, বরং ওই বোর্ডের অন্য পুরুষ পরীক্ষক কর্তৃকও
চেক করে দেখতে হবে, সেটা রীতিমতো অযৌক্তিক।
এখন পর্দানশীল কোন নারী শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার হলে
নিশ্চিত হওয়ার জন্য যদি মুখের নিকাব খুলে চেক করার
প্রয়োজন পরে, সেক্ষেত্রে তাকে অন্য একজন নারী শিক্ষক কিংবা কোন নারী অফিসিয়াল স্টাফ দ্বারা চেক করে নিশ্চিত হওয়াটাই যথেষ্ট। আর কোন কর্তৃপক্ষের যদি নারী লোকবলের অভাব থাকে,তাহলে প্রযুক্তিগত বহু উপায় আছে, ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণ কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই হয়ে যায়। এই সিম্পল কাজটার জন্য এত জলঘোলা করার কোন প্রয়োজন হয়না।
একটু ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড নিয়ে কথা বলি। সেটা এই নিকাব/হিজাব ইস্যুটার লিগ্যাল স্ট্যান্ড বুঝতে সুবিধা হবে।
২০১০ সালে ফ্রান্স নিকাব পরা ব্যান করে একে ক্রিমিনাল অফেন্স হিসাবে ট্রিট করা শুরু করে। ফরাসি ওই আইন
ধর্মীয় ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করেছে বলে ফ্রান্সে বাস করা
দুইজন মুসলিম নারী শেষমেশ জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (UNHRC) এর দারস্থ হয়। ২০১৮ সালে এসে দীর্ঘ তদন্তের পর জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এইমর্মে রুলিং দেয় যে ফ্রান্সের ওই নিকাব ব্যান করার সিদ্ধান্ত ছিল Right to Freedom of Religion এবং Right to equality এর পরিপন্থী।
আগ্রহীরা Miriana Hebbadj v. France এবং Sonia Yaker v. France মামলাগুলো লিখে গুগল করলেও বেশকিছু তথ্য জানতে পারবেন।
এই Right to Freedom of Religion এবং Right to Equality বর্ণিত আছে International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR) এর যথাক্রমে ১৮ এবং
২৬ নাম্বার আর্টিকেলে।
ICCPR এর 18(1) আর্টিকেল একদম হুবহু তুলে দিচ্ছি—
“Everyone shall have the right to freedom of thought, conscience and religion. This right shall include freedom to have or to adopt a religion or belief of his choice, and freedom, either individually or in community with others and in public or private, to manifest his religion or belief in worship, observance, practice and teaching.”
আবার আরও একটা ইউরোপীয় আইন দেখাই চলেন।
European Convention on Human Rights( ECHR)
এর আর্টিকেল ৯(১) হুবহু তুলে দিচ্ছি দেখেন—
“Everyone has the right to freedom of thought, conscience and religion; this right includes freedom to change his religion or belief, and freedom, either alone or in community with others and in public or private, to manifest his religion or belief, in worship, teaching, practice and observance.”
এই দুইটা আর্টিকেল পড়লে একেবারে স্পষ্ট যে ধারণাটা পাবেন তা হল, কোন ধর্মীয় রীতি, সেটা দলগত কিংবা
একাকীও যদি হয়, সেই রীতি বা কালচারকে Manifest
করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।
এখন এই হিজাব/ নিকাব করা যেহেতু মুসলিমদের ধর্মীয় রীতিনীতির অংশ, তাই তা প্রকাশ্যে Manifestation মানে
পালন করার স্বাধীনতা একজন মুসলিমের আছে এবং সেই
নিকাব পালন করার স্বাধীনতা কেউ লঙ্ঘন করতে পারেনা।
তবে ওই ICCPR এর ১৮ নং আর্টিকেলের সাব সেকশন ৩
এ কিছু রিজার্ভেশন রাখা আছে। সেখানে বলা হয়েছে —
“Freedom to manifest one's religion or beliefs may be subject only to such limitations as are prescribed by law and are necessary to protect public safety, order, health, or morals or the fundamental rights and freedoms of others.”
মানে সহজ ভাষায় বলতে গেলে উল্লিখিত ওই রিলিজিয়াস মেনিফেস্টেশন করতে গেলে যদি অন্যদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য,
পাবলিক অর্ডার লঙ্ঘন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে,তখন রাষ্ট্র ওই মেনিফেস্টেশন বন্ধ করতে পারে।
এখন জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন পরখ করে দেখেছিলো যে মুসলিম নারীর নিকাব পরার জন্য ICCPR এর Article 18(3) এ বর্ণিত বিধানের কোনমতেই লঙ্ঘিত
হয় না। তখন UNHRC রুলিং দিয়েছিল যে ফ্রান্স কর্তৃক ওই
নিকাব ব্যান করার আইন ICCPR এর অধীনে বর্ণিত
Right to Freedom of Religion এর স্পষ্ট লঙ্ঘন।
বলে রাখা প্রয়োজন কিছু কিছু বিশেষ শর্ত রিজার্ভেশনে রেখে বাংলাদেশও কিন্তু ওই ICCPR কে Ratify করেছে।
কাজেই আন্তর্জাতিক এই আইন মেনে চলার ব্যাপারে
বাংলাদেশও অঙ্গীকারবদ্ধ।
এরপরও কিছু মানুষ বলতে পারেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে যেভাবে বর্ণিত আছে সেভাবেই পরীক্ষায় বসতে হবে।
ঠিক আছে, আপনাদের কথাটা একটু যাচাই করে দেখি চলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে আইনে চলে সেই আইনটার
নাম Dhaka University Order,1973. ওই আইনের সবগুলো সেকশন তন্নতন্ন করে খুঁজেও এটা কেউ দেখাতে পারবেন না যেখানে পরীক্ষার হলে ( সেটা রিটেন কিংবা ভাইভা যাইহোক) নিকাব পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তবে হ্যাঁ, ওই Dhaka University Order,1973 এ উল্লেখ
না থাকলেও Exam committee এর একটা Customary
নিয়ম আছে পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষার সময় যাচাই-বাছাই করে দেখার যে সে অরিজিনাল ওই ব্যক্তিই কিনা।
এর মানেটা এই যে নিকাব পরিহিত কারো সত্যতা যাচাই করার প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রে তাকে যাচাই করা যেতে পারে।
সেই যাচাই করার মেথড যাতে Decency এর সাথে করা হয়
এবং কীভাবে সেই যাচাই হতে পারে তা পূর্বেই উল্লেখ করে দিয়েছি।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি আইন করে
হিজাব/নিকাব বন্ধ করতে পারে কিনা। উত্তর আছে সেটার।
কোন স্পেশালাইজড শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করলে ফিক্সড ড্রেসকোড চালু করতে পারে। আমি নিজেই ক্যাডেট কলেজে
পড়াশোনা করেছি। গার্লস ক্যাডেট কলেজে যারা পড়াশোনা করতো, তারা ইচ্ছে করলেই নিকাব পরতে পারতো না কিংবা
আমরা যারা বয়েজ ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনা করেছি, তারা ইচ্ছা করলেই দাড়ি রাখতো পারতো না। একেবারে সকালে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে আলাদা আলাদা ফিক্সড ড্রেসকোড তো ছিলোই, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় স্লিপিং ড্রেসও ফিক্সড করা থাকতো। ফিক্সড নিয়মের বাইরে কোনকিছুই করার অবকাশ ছিলোনা।
কিন্তু কথা হলো, ওই স্পেশালাইজড শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে
ড্রেসকোডের ফিক্সড আইন আছে। কিন্তু একটা পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়ে তো সেইরকম ড্রেসকোডের আইন নাই, সেটা থাকা যুক্তিসঙ্গতও নয়। তাই ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ কোনভাবেই
বলতে পারেনা যে নিকাব পরা যাবেনা।
এখন যারা যারা এই দাবি করছেন যে এইভাবে যদি পর্দা
মেইনটেইনই করতে ইচ্ছে থাকে, তার তো ভার্সিটিতেই আসা
উচিত না, কিংবা ভার্সিটিতে পড়াশোনা করার সময় পর্দার
অধিকার সে কোনমতেই চাইতে পারেনা, তাদের দাবি একেবারেই চূড়ান্ত লেভেলে এবসার্ড।
একজন নারী শিক্ষার্থী যদি হিজাব/নিকাব করে ভার্সিটিতে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়, কোনভাবেই ভার্সিটি তার সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারেনা। যদি করে, তা হবে ওই নারী
শিক্ষার্থীর প্রতি তার শিক্ষা ও ধর্মীয় মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনের স্পষ্ট প্রভিশন দেখালাম
যেখানে পর্দানশীল নারীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে বিধান আছে। তাছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের রায় দেখালাম, দেখালাম ICCPR ও ECRC এর
স্বীকৃতি মানবাধিকারের বিধানও।
এরপরও যারা যারা শুধুমাত্র গায়ের জোরে এই দাবি তুলেন যে নিকাবের অধিকার চাইতে গেলে একজন নারী শিক্ষার্থীর
ভার্সিটিতে পড়ার কোন অধিকার নাই, তারা পারলে আমাকে
ভুল প্রমাণ করে দেখান। আমি যেসব লিগ্যাল ডকুমেন্টস তুলে ধরলাম সেগুলোকে ভুল প্রমাণ করেন।
চ্যালেঞ্জটা ছুঁড়ে দিলাম আপনাদের উদ্দেশ্যে। মুখেমুখে শুধু ন্যাকাতর্ক না, উপযুক্ত দলিলসহ কথা বলতে হবে কিন্তু। চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করে আমাকে এখন ভুল প্রমাণ করে দেখান তো একটু। ফিল ফ্রি টু এক্সসেপ্ট দিজ চ্যালেঞ্জ।
-সাইয়েদ আবদুল্লাহ©
#নির্বাচিত_কলাম