10/09/2026
এটি একটি মারাত্মক ভুল কথা, ভুল দৃষ্টিভঙ্গি, অনৈসলামিক এবং সেক্যুলার মতবাদ ও দ্বীন বিকৃতির প্রয়াস। "কওমী মাদ্রাসার লক্ষ্য রাজনৈতিক নেতা তৈরি নয়..." নিঃসন্দেহে এই বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে কওমী মাদ্রাসা তথা দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং এটি ইসলামবিরোধীও বটে। কারণ, ইসলামের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে রাজনৈতিক নেতা ছিলেন এবং নিজ হাতে আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী (রা.) প্রমুখের মতো রাজনৈতিক নেতা তৈরি করে যান। তাই রাজনীতি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক নেতা তৈরির দায়িত্ব একটি নবুওয়াতী ও ফরজ দায়িত্ব, যা এড়িয়ে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর অনেক হুকুম-আহকাম ও পূর্ণাঙ্গ শরিয়ত বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সুতরাং শরিয়ত বাস্তবায়নের এই ফরজ দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে কেউ কখনো মুত্তাকি হতে পারে না। কিন্তু যারা সেক্যুলার তারা রাসুল সা. তথা আল্লাহর দেওয়া এই খেলাফত বা রাজনৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে রাজনীতিমুক্ত ধর্ম চর্চা করে, যা গ্রিক দর্শন, রেনেসাঁ এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ রাষ্ট্রচিন্তক জর্জ জ্যাকব হোলিওক (১৮৫১) একটি রাজনৈতিক ও জীবন দর্শন হিসেবে প্রমোট করেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই রাজনীতিমুক্ত ধর্ম চর্চার ধারণা সম্পূর্ণরূপে ইসলামবিরোধী, রাসুল সা.-এর জীবনাদর্শ বিরোধী, তাকওয়া বিরোধী এবং কওমী ও দেওবন্দ বিরোধী।
অপরদিকে ভারতীয় স্বাধীনতাকামী মানুষের চেতনার বাতিঘর, ব্রিটিশ খেদাও ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয় এক বিশাল ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মিশন নিয়ে। মূলত বালাকোট ও সিপাহী বিপ্লব সফল না হওয়াতে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে একটি সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওবন্দ প্রতিষ্ঠালাভ করে। যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ ও উদাহরণ দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম সন্তান মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (র.) থেকে শুরু করে হাফেজ্জী হুজুরের (র.) রাজনৈতিক সংগ্রামে রয়েছে। যারা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী, হুসাইন আহমদ মাদানী, শাব্বির আহমদ উসমানীর (র.) রাজনৈতিক জীবন ভুলে গেছেন, তাদের জন্য হাফেজ্জী হুজুরের একটি ছোট্ট রাজনৈতিক অনুভূতি দিয়ে শেষ করছি। হাফেজ্জী হুজুর জীবনের প্রথম দিকে রাজনীতিমুক্ত ইসলাম চর্চা করতেন এবং তিনি মনে করতেন ইসলামে রাজনীতি নেই। অবশেষে তিনি যখন বৃদ্ধ বয়সে রাজনীতির ময়দানে দিওয়ানা হয়ে ছুটছিলেন, তখন এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, তিনি কেন বৃদ্ধ বয়সে রাজনীতিতে আসলেন? জবাবে হাফেজ্জী হুজুর বলেন, "ইসলামে রাজনীতি নেই, রাজনীতি নেই বলে সারা জীবন যে ভুল করেছি, তার কাফফারা আদায় করতে রাজনীতিতে এসেছি।"
এই হলো রাজনীতির ব্যাপারে কওমীর প্রকৃত আকাবিরদের অনুভূতি, আকিদা, দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শন।
এবার পথভোলা তথাকথিত ও নব্য আকাবিরদের সমীপে জানতে ইচ্ছে করে—জামায়াতকে ক্ষমতায় যেতে দেবেন না, আবার কওমী জেনারেশনকেও জাতির রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখবেন, এ কেমন বন্ধ্যা, অদূরদর্শী ও আকাবির বিরোধী চিন্তা জাতিকে আর কত দিন গেলাতে পারবেন? নাকি শরিয়ত , ইতিহাস ও বাস্তবতা বিবর্জিত দৃষ্টি ও দর্শনের পরিণামে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন?