06/09/2026
নীরবতার পরিণতি- দুর্বৃত্তায়ন
সমাজ, সামাজিকতা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর কোনোটিই একদিনে গড়ে ওঠেনি। মানুষই তার প্রয়োজন, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে তিলে তিলে এসব গড়ে তুলেছে। এভাবেই মানুষের হাত ধরে সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। গড়ে উঠেছে সামাজিকতা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক চিন্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামো।
পৃথিবীর যে কোনো দেশ, জনপদ কিংবা প্রান্তে তাকালেই দেখা যায়, মানুষ তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা, উদারতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি নিজস্ব সামাজিক জগৎ নির্মাণ করেছে। এই সামাজিক জগৎ কেবল মানুষের বসবাসের একটি কাঠামো নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের মূল্যবোধ, নৈতিকতা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।
এই সমাজ, সামাজিকতা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার দায়িত্বও নিয়েছিলেন একদল মানুষ। তাঁদের নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা, উদারতা ও মানবিকতার কারণে মানুষ সংগঠিত হয়েছে। তাঁরা মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজকে পরিচালিত করেছেন। সমাজকে বিকশিত করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি আলোকিত পথ নির্মাণ করেছেন। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে তাঁদের অনেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে মহান হয়ে উঠেছেন।
হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ধারা চলমান রয়েছে, তার প্রধান চালক ও চালিকাশক্তি মানুষই। সভ্যতার বিবর্তন, পরিবর্তন ও অগ্রগতিসহ পৃথিবীর প্রায় সব অর্জনের পেছনেই রয়েছে মানুষের জ্ঞান, শ্রম, মেধা ও সৃজনশীলতা।
ঠিক এর বিপরীত চিত্রটা যদি আমারা দেখি।
তাহলে দেখবো মানুষের দ্বারাই সৃষ্টি হয় অচলাবস্থা, অনিশ্চয়তা, দুর্বিপাক, সংকট ও সমস্যা। সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে যখন অসৎ, সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্বেষী মানুষের প্রভাব বাড়তে থাকে, তখন সেই সমাজের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রজ্ঞাবান, উদার ও মানবিক নেতৃত্ব যখন সমাজের দুর্বৃত্ত অপরাধীদের দ্বারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। তখন সমাজ তার স্বাভাবিক চরিত্র ধরে রাখতে পারে না। হাজার বছরের অর্জিত সামাজিকতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ ক্রমে পঙ্গু হয়ে পড়ে। কর্তৃত্ব চলে যায় অসৎ, দস্যু ও দুর্বৃত্তদের হাতে। সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির গতিপথ বদলে যায়। আজকের দিনে এই চরম বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।
তখন সমাজে ভণ্ড, সুবিধাবাদী ও দুর্বৃত্তদের তাণ্ডব শুরু হয়। তাঁদের দাপট ও চ্যালেঞ্জের মুখে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উদার, মানবিক ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব ভয়ে-শঙ্কায় কোণঠাসা হয়ে পড়েন। একসময় এটি হয়ে ওঠে একটি সভ্য, মানবিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সংস্কৃতিবান্ধব সমাজের পরাজয়।
সমাজ শুধু কিছু মানুষের সমষ্টি নয়। সমাজকে সমাজে পরিণত করতে সামাজিকতার নিয়ম, রীতি, নীতি, মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার চর্চা হয়।
কিন্তু যখন সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম-নীতি, রীতি-নীতি ও মূল্যবোধ দুর্বৃত্তায়নের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, তখন সংকট আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা থাকে না। তা সমাজের কাঠামোর গভীরে প্রবেশ করে সবকিছু ওলট-পালট করে দেয়।
যেখানে যুক্তির বদলে ভয় কথা বলে। নীতির বদলে সুবিধা বড় হয়ে ওঠে। যোগ্যতার বদলে আনুগত্য মূল্য পায় এবং সত্যের চেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তির বক্তব্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানে সামাজিকতার স্বাভাবিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে।
একটি সমাজের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় তখনই ঘটে, যখন সমাজচিন্তার জায়গাটি সমাজচিন্তাশীল মানুষের হাত থেকে সরে গিয়ে দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সমাজচিন্তার মানুষের কাজ হলো সমাজের অসঙ্গতি চিহ্নিত করা। মানুষের মধ্যে ন্যায়বোধ ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা এবং ভবিষ্যৎ সমাজের পথ নির্দেশ করা। আর দুর্বৃত্তের স্বার্থ হলো- সমাজের দুর্বলতা, বিভাজন, ভয় ও অজ্ঞতাকে ব্যবহার করে নিজের প্রভাব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এই দুই শক্তির সংঘাতেই নির্ধারিত হয় একটি সমাজ কোন দিকে যাবে। কে কোন পক্ষে যাবেন- থাকবেন।
রাজনীতি মূলত মানুষের সমষ্টিগত জীবন পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রাষ্ট্র, সমাজ, নাগরিক অধিকার, অর্থনীতি, ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণ সবকিছুর সঙ্গে রাজনীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু রাজনীতি যদি রাজনীতিবিদদের হাতে না থেকে দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তখন রাজনীতির চরিত্রই বদলে যায়। নীতি ও আদর্শের জায়গা দখল করে নেয় ব্যক্তিস্বার্থ। জনকল্যাণের জায়গায় আসে ক্ষমতার হিসাব। রাজনৈতিক নেতৃত্বের জায়গায় উঠে আসে পেশিশক্তি, অর্থবল, ভয়, প্রভাব ও ব্যক্তিগত আনুগত্য। এর ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ধীরে ধীরে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। দেউলিয়া রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- সে আর সমাজকে নেতৃত্ব দেয়না। বরং সমাজে বিদ্যমান দুর্বৃত্ত শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। তখন রাজনীতি হয়ে ওঠে ক্ষমতা রক্ষার কলা কৌশল। যখন রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নীতি, আদর্শ ও জনগণের পরিবর্তে দুর্বৃত্তায়নের হাতে চলে যায়, তখন শুধু রাজনৈতিক দল দুর্বল হয় না। দুর্বল হয়ে পড়ে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, সামাজিক মূল্যবোধ এবং নাগরিকের ন্যায়বোধও।
মানবসভ্যতার আদিকাল থেকে যুগে যুগে যেসব জ্ঞানী, মনীষী, সমাজচিন্তক ও মানবতাবাদী মানুষ আমাদের আলোকিত, সভ্য ও শিক্ষিত হওয়ার বার্তা দিয়ে গেছেন। সমাজকে কীভাবে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক পথে পরিচালিত করতে হবে, সে বিষয়ে যাঁরা তাঁদের চিন্তা, দর্শন ও নির্দেশনার বাণী রেখে গেছেন। তাঁদের দেখানো পথ ও উপদেশ কি আজ মূল্যহীন?
পৃথিবীর কোন সমাজকে দুর্বৃত্তের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায়না। বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মানবিকতা, ন্যায় ও উদারতার শক্তিকে পুনরায় সংগঠিত করাই সভ্য সমাজের দায়িত্ব। যে সমাজ তার আলোকিত উত্তরাধিকারকে ধারণ করতে পারে। সেই সমাজই সংকট অতিক্রম করে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে।
অন্যায় যখন ঘটে, তখন সবাই অন্যায়কারী হয় না। কিন্তু সবাই প্রতিবাদীও হয় না। কেউ ভয় পায়, কেউ সুবিধা হারানোর আশঙ্কায় চুপ থাকন। কেউ সংঘাতে যেতে চায় না। আবার কেউ মনে করেন “এতে আমার কী?”
এই নীরবতা নিরপেক্ষ নয়। কারণ অন্যায়ের সামনে দীর্ঘস্থায়ী নীরবতা একসময় অন্যায়কে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। অন্যায়কারী তখন বুঝতে পারে তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ নেই। এই সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নেই। অন্যায়ের সাহস তত বাড়ে। যে সমাজে অন্যায়কে সহ্য করা হয়, রাজনীতিতেও অন্যায়ের জায়গা তৈরি হয়।
যে সমাজে জ্ঞান ও যুক্তির চেয়ে গুজব, আবেগ ও অন্ধ আনুগত্য বেশি শক্তিশালী, সেই সমাজের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না। তখন মানুষ নীতির পরিবর্তে ব্যক্তির অনুসারী হয়। যুক্তির পরিবর্তে স্লোগান গ্রহণ করে এবং সত্য যাচাইয়ের পরিবর্তে গুজবকে বিশ্বাস করে। রাজনীতিতে তখন একটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়। মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায়। কিন্তু প্রশ্নহীন রাজনীতি কখনো সুস্থ রাজনীতি হতে পারে না। যেখানে নেতৃত্বকে প্রশ্ন করা যায় না। সেখানে নেতৃত্ব জবাবদিহিহীন হয়ে পড়ে। যেখানে জবাবদিহি নেই, সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়ে। আর যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো কার্যকর প্রতিরোধ নেই। সেখানে দুর্বৃত্তায়ন দ্রুত বিস্তার লাভ করে। অতএব রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্ন কেবল রাজনৈতিক দলের প্রশ্ন নয়। এটি পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং ব্যক্তির নৈতিক চেতনার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
আইনের শাসন দুর্বল হলে, জবাবদিহি কমে গেলে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান প্রশ্নহীন হয়ে পড়লে। নাগরিক সমাজ ভয় বা স্বার্থের কারণে নীরব হয়ে গেলে- দুর্বৃত্তায়নের জন্য একটি উর্বর পরিবেশ তৈরি হয়। তখন ব্যক্তি নয়, পুরো ব্যবস্থাই সমস্যার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। একজন দুর্বৃত্ত যতটা ক্ষতিকর, তার চেয়েও ভয়ংকর হলো এমন একটি সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ। যেখানে দুর্বৃত্ত বুঝতে পারে যে তার কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হয় না। তাই দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে লড়াই নয়। এটি এমন একটি পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই। যা দুর্বৃত্তকে জন্ম দেয়। শক্তি দেয় এবং টিকে থাকার সুযোগ করে দেয়।
আমাদের সামনে প্রশ্ন কেবল কে ক্ষমতায় আছে বা কে ক্ষমতায় আসবে তা নয়।
প্রশ্ন হলো কেমন সমাজ আমরা চাই?
কেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমরা চাই? কেমন নেতৃত্ব আমরা চাই? কী ধরনের সামাজিক মূল্যবোধ আমরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যেতে চাই? আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে ভয় সত্যের চেয়ে শক্তিশালী? নাকি এমন একটি সমাজ চাই। যেখানে সত্য বলার অধিকার ও সাহস দুটোই থাকবে? আমরা কি এমন রাজনীতি চাই, যেখানে ব্যক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্যই যোগ্যতার মাপকাঠি? নাকি এমন রাজনীতি চাই, যেখানে যোগ্যতা, নীতি, সততা, জ্ঞান ও জনকল্যাণ নেতৃত্বের ভিত্তি হবে? সমাজকে দুর্বৃত্তের হাতে ছেড়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মানবিকতা, ন্যায়, যুক্তি, উদারতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধের শক্তিকে পুনরায় সংগঠিত করাই সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কারণ সভ্যতার মূল শক্তি কোনো ব্যক্তি নয়, কোনো গোষ্ঠী নয়, কোনো সাময়িক ক্ষমতাও নয়।
যে সমাজ তার আলোকিত উত্তরাধিকারকে ধারণ করতে পারে। যে সমাজ অন্যায়ের সামনে নীরব না থেকে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারে। যে সমাজ দুর্বৃত্তের ক্ষমতার চেয়ে মানুষের বিবেককে শক্তিশালী করতে পারে। সেই সমাজই সংকট অতিক্রম করে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে। অতএব আমাদের দায়িত্ব শুধু দুর্বৃত্তকে চিহ্নিত করা নয়। বরং এমন একটি সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে দুর্বৃত্তায়নের কোন ক্ষেত্র থাকবে না।
লেখক- শরিফুল হক মনজু, সাংবাদিক ও সমাজ অনুশীলক।