01/07/2026
Tanbir Hasan Bin AbdurRofiq ভায়ের পোস্ট
-------------------------------------------------------------------
বর্তমানে কিছু দীনদার ভাইদের ভেতর চিরকুমার থাকা একটা ফ্যান্টাসিতে পরিণত হয়েছে। ইল্মের ভালোবাসায় তাঁরা চিরকুমার থাকতে চান। এ ধরণের অনেক তালিকাও তৈরি হয়েছে যে, কোন কোন উলামারা বিবাহ করেননি। বাস্তবতা হলো, নবুওয়াত যুগের সূচনাকাল থেকে অধিকাংশ আলিম, নেককার ও বুযুর্গ ব্যক্তিরা বিবাহিতই ছিলেন, ইতিহাস এমনই বলে।
শুধু তাই নয় পুরুষদের মধ্যে একাধিক বিবাহ করা ছিলো খুবই মামুলি ব্যাপার, আল্লাহর দেয়া বিধান হিসেবে তা পালিত হতো। ইতিহাসের পাতা হতে বাস্তবে গুনে দেখলে দেখা যাবে যে, অবিবাহিত উলামাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। শুধু বিবাহিতই নয়, একাধিক স্ত্রী ছিল এমন আলিমদের সংখ্যাও গুনে শেষ করার মতো নয়। বলতে পারেন, ভাই তালিকা দিন! আসলে একাধিক বিবাহ আমাদের সময়ে এসে, বিশেষ করে আমাদের উপমহাদেশে এসে যে রকম ট্যাবু হয়ে দাঁড়িয়েছে মুসলিমদের ইতিহাসে কোনো কালে এমনটা ছিল না, এমনকি আরব বিশ্বে এখনও ধূমধামের সহিতই একজন পুরুষের দু' চারটা বিয়ে হয়।
আসলে একাধিক বিবাহ রোজকার জিন্দেগীর আর দু' চারটা ঘটনার মতোই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল; ফলে ইতিহাসে সেভাবে স্থান পায়নি। আর ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে আলিমদের ইল্মী প্রশংসাই জায়গা করে নিয়েছে বেশি। অনেকের তো স্ত্রী ছিল, না ছিল না তা সুস্পষ্টভাবে জানাই যায় না, তাই ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে অনেক লম্বা ইখতিলাফের ফিরিস্তি। বিপরীতে বিবাহহীন থাকা ছিল এক তাজ্জব ব্যাপার; তাই যে উলামারা বিয়ে করেননি সে ঘটনাগুলো ইতিহাসের পাতায় খুব আগ্রহের সহিতই জায়গা করে নিয়েছে। তবুও সামান্য কিছু আলোচনা করার প্রয়াসী।
গোড়া থেকেই আসি। আমাদের সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোট ১৩ জন স্ত্রী ছিলেন। একসঙ্গে সর্বোচ্চ ৯ জন স্ত্রী ছিলেন। অবশ্য মহান আল্লাহ মু'মিনদের জন্য ৪টির বেশি স্ত্রী রাখা বৈধ করেননি, ২ জন, ৩ জন ও ৪ জন স্ত্রী ছিল এমন অনেক সাহাবীকেই আমরা পাবো। আবূ বাক্র, উমার, উসমান ও আলী রদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন সকলেরই একাধিক স্ত্রী ছিল। আশারায়ে মুবাশশারা থেকে শুরু করে ছোট-বড় সকল সাহাবীদের ভেতর কাদের কাদের একাধিক স্ত্রী ছিল তা গণনা শুরু করলে শেষ করা মুশকিল। এমনকি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ২ জন, ৩ জন বা ৪ জন স্ত্রী করে রেখে রেখে দেখা গেছে অনেকের মোট স্ত্রীর সংখ্যা ১০-১২ জনেও পৌছেছে।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي
''বিবাহ আমার সুন্নাতের অন্তর্ভূক্ত।''
[ইবনু মাজাহঃ ১৮৪৬; আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাসান বলেছেন]
প্রখ্যাত সাহাবী সাঈদ ইবনু জুবাইর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
''আমাকে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ''তুমি বিয়ে করেছো?''
আমি বললাম, ''না।''
তিনি বললেন, ''তাহলে বিয়ে করো, কেননা এ উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তির অধীনে অধিক স্ত্রী ছিল।''
[বুখারীঃ ৫০৬৯]
প্রকৃত আলিম/ত্বলিবুল ইল্ম তো তাঁর কাছে থাকা ইল্মের উপর আমল করবে। ইল্ম আর আমলের সমন্বয়েই আলিম।
ইমাম নাসাঈ রহিমাহুল্লাহ। বিখ্যাত ৬টি হাদীস গ্রন্থের (কুতুবে সিত্তাহ) একটির রচয়িতা। তিনি ৪ জন স্ত্রীর অধিকারী ছিলেন। শুধু তাই নয়, কয়েকজন ক্রীতদাসীও তাঁর ছিল। এতদসত্ত্বেও তিনি ইল্ম-আমলে বেশ যত্নবানও ছিলেন, তিনি সাওমে দাঊদ বা একদিন পরপর সিয়াম রাখার আমল করতেন। তিনি ৮৯ বছর হায়াৎ পেয়েছিলেন। দামেশকে তিনি একবার ইল্মী খেদমতে সফর করলে তাঁর উপর আক্রমণ করা হয়, যার ফলে তিনি মারা যান।
ইমাম শাইখ নাসীরুদ্দীন আলবানী রহিমাহুল্লাহকে কে না চিনে! তিনি ছিলেন বর্তমান যুগে হাদীস শাস্ত্রে এক উজ্জল নক্ষত্র। বলা হয়, তিনি ১ লক্ষ হাদীসের হাফিয ছিলেন। হাজার হাজার হাদীসের রাবীদের নাম ছিল যার ঠোটের কিনারায়। তিনি গ্রন্থ অধ্যয়ন ও রচনায় পূর্ববর্তী অনেক আলিমের থেকেও অগ্রণী ছিলেন। খন্ডের সংখ্যার বিচারে প্রায় শত শত খন্ড গ্রন্থ রচনা করেছেন। জীবনের সূচনায় তিনি ঘড়ি মেরামতও করতেন আবার ইল্ম অর্জনও করতেন। মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও ছিলেন তিনি। মুসলিম বিশ্বের নোবেল প্রাইজ বলে খ্যাত বাদশাহ ফয়সাল এওয়ার্ডও লাভ করেন। এ মহান শাইখেরও ৪ জন স্ত্রী ছিল। তিনি ৮৮ বছর হায়াৎ পেয়েছিলেন।
ইমাম শাইখ ইবনু বায রহিমাহুল্লাহকে কে না চিনে। যিনি কিশোর বয়সেই অন্ধ হয়েও ইল্মে দীনের যে খেদমত করেছেন সে জন্য তিনি যুগের বিষ্ময় হয়ে থাকবেন। ১৬ বছর বয়সে তাঁর চোখে একটি গুরুতর সংক্রমণ হয় এবং ২০ বছর বয়সে তিনি পুরো অন্ধ হয়ে যান। প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি। যা শুনতেন তাই মুখস্থ হয়ে যেত। তাঁর সামনে কিতাবাদি পড়ে শোনানো হতো। এমনকি কোথাও সফরে যাওয়ার সময়ও গাড়িতে তাঁর পাশে বসে বই পড়ে শুনাতো হতো। সলাতে যাতায়াতের সময়ও একইভাবে পড়া শুনানো হতো।
শাইখ আবুল হাসান আলী নাদভী রহিমাহুল্লাহ যার সম্পর্কে বলেন,
''হক কথা বলার ক্ষেত্রে তিনি বেশ নির্ভীক ও স্পষ্টভাষী, তবে প্রাজ্ঞ ও বিচক্ষণ বলে সর্বমহলে তাঁর বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বহু বছর ধরে তিনি দৃষ্টিহীনতার শিকার, কিন্তু তাঁর অন্তর্দৃষ্টি অতিশয় প্রখর।''
তিনি সৌদির গ্রেন্ড মুফতী ছিলেন, এছাড়াও ছিলেন মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। দু' চোখে কিছু না দেখলেও ৩০ খন্ডের ফাতওয়ার কিতাব আমাদের জন্য রেখে গেছেন। তাঁর আরেকটি ফাতওয়ার কিতাব ১৪ খন্ডে। সব মিলিয়ে প্রায় ষাটোর্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি বাদশাহ ফয়সাল এওয়ার্ডও লাভ করেন। তাঁরও স্ত্রী ছিল ৩/৪ জন। তিনি ৯০ বছর হায়াৎ পেয়েছিলেন।
অনেকে মনে করেন বিয়ে করলে জ্ঞানার্জনের স্রোতে বাঁধ পরে। কথাটা একেবারে অসত্য নয়। তবে এটাও সত্য যে, বিবাহে মনে প্রফুল্লতা আসে, মাথা ঠান্ডা থাকে এবং পড়াশোনায় মন বসে। শাইখ সলিহ আল-মুনাজ্জিদ তাঁর কোনো এক বইয়ে বিষয়টি সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। একইভাবে দামেশকের শরীয়া কোর্টে প্রায় বিশ হাজারের মতো বৈবাহিক জটিলতা নিরসনকারী শাইখ আলী তানতাবী রহিমাহুল্লাহও ছাত্র জীবনে বিয়েকে বেশ প্রাধান্য দিয়েছেন। বিশেষত ফিতনাহর যুগে ভালো থাকতে পারলেও কিছু সময় যে অপ্রস্তুত আজেবাজে ভাবনায় চলে যাবে না তাঁর কী গ্যারান্টি!?
বিবাহের উসীলায় মানুষ দীর্ঘ হায়াতও লাভ করে। যা উক্ত শাইখদের জীবনের সঙ্গে মেলালেও স্পষ্ট হয়, যথাক্রমে ৮৯, ৮৮ ও ৯০ বছর হায়াৎ তাঁরা পেয়েছিলেন। যা আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারাও প্রমাণিত। বিপরীতে অবিবাহিত অনেক উলামাদের জীবনিতে দেখবেন যে, তাঁরা ৪০/৪৫/৬০ বছর হায়াৎ পেয়েছিলেন। হায়াতের মালিক আল্লাহ। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে সময় দিলেই আপনার সময় কমে যাচ্ছে এমনটা ভাবা কি সর্বাংশে সঠিক!? আল্লাহ অন্যদিক দিয়ে আপনার সময় বাড়িয়েও দিতে পারেন, তিনি চাইলে সময়ে বারকাহও ঢেলে দিতে পারেন।
কিছু সময় যদি স্ত্রীর সঙ্গে এদিক-ওদিক দিয়ে চলেও যায় তবুও তো তাঁরা দীর্ঘ হায়াৎ লাভ করেছেন। স্ত্রীর সঙ্গে প্রতিদিন কতো ঘন্টা ব্যয় হয়, ১ ঘন্টা, সর্বোচ্চ ২ ঘন্টা। অর্থাৎ, তাঁরা অন্য অনেক আলিমদের তুলনায় দেড়গুন বা দ্বিগুন জীবন লাভ করেছেন। অবিবাহিত অনেক আলিমগণ তাঁদের থেকে অর্ধেক হায়াৎ লাভ করেছেন। কিন্তু বিপরীতে বিবাহিত শাইখগণ স্ত্রীকে দিনের অর্ধেক সময়ও তো দেননি; বড়জোর আধ ঘন্টা/এক ঘন্টা, এর কমও ব্যয় হয়। খাওয়া-দাওয়া তো সবারই করতে হয়, ঘুমাতে হয় সবারই; এ সময়টুকু তো স্ত্রীকেই দেওয়া যায়, বলা যায় প্রায় সবাই দেয়। তাহলে আর বাড়তি কতক্ষণ দিতে হয়!? স্ত্রীও যদি ইল্ম অর্জনে প্রয়াসী হয় তাহলে দুজন মিলেই ভাগজোগ করে ইল্ম অর্জন করা যায়। একে অপরকে কিতাব এগিয়ে দেয়া যায়। জানা-অজানা বিষয়গুলো শেয়ার করা যায়। আরো তো কতো উপকার হয়। আর শেষ বয়সে হাতের লাঠির প্রয়োজন তো আছেই!
উপরে আমরা ইমাম নাসাঈ রহিমাহুল্লাহকে নিয়ে আলোচনা করেছি। তিনি তাঁর সুনানে নাসাঈতে এ বিষয়ে বাব (অধ্যায়) বেঁধেছেন যে, ''ঐ বিবাহকারী ব্যক্তিকে আল্লাহর সহায়তা করা সম্পর্কিত অধ্যায় যে পবিত্রতা কামনা করে''। এ অধ্যায়ে তিনি হাদীস এনেছেন,
আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
''তিন ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহর উপর দায়িত্ব হয়ে যায়।''
এ হাদীসের দ্বিতীয় ব্যক্তি হচ্ছে, وَالنَّاكِحُ الَّذِي يُرِيدُ الْعَفَافَ ''ঐ বিবাহকারী যে (বিয়ের মাধ্যমে) পবিত্রতা কামনা করে''।
[নাসাঈঃ ৩২১৮; আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাসান বলেছেন]
শেষ কথা হলো, মাখলুকাতের সর্বশ্রেষ্ট মাখলুক, মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহিত ছিলেন। বিবাহ নববী সুন্নাহ। ফিকহী পরিভাষায়, কখনো কখনো ওয়াজীব বা ফরয। উম্মাহর সোনালী যুগের মানুষেরাও বিবাহিত ছিলেন। অনেক উলামায়ে কেরাম ইল্মের ভালোবাসায়, নানা কারণে বিবাহ করেননি বা করতে পারেননি সকলকেই মহান আল্লাহ তাঁদের নিয়্যাত অনুযায়ী উত্তম কাজের উত্তম জাযা দান করুন। আল্লাহ উম্মাহর সকল আলিম, ইমাম ও শাইখদের কবরকে নূরান্বিত করুন, গুনাহখাতা মাফ করুন এবং জান্নাতের উচ্চ মাক্বাম দান করুন।
[লেখাটির উদ্দেশ্য আমার নিজের ও অন্য বিবাহিত ভাইদের প্রশান্তি। তাঁরাও ভাবুক আমাদের দ্বারাও অনেক কিছু হবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের আদর্শ আছে, সালাফ আছে। আর উলামাদের সবাই যে অবিবাহিত ছিলেন এমন নয়, বিষয়টা খোলাসা করা। যারা ইল্মের ভালোবাসায় চিরকুমার থাকতে চান, থাকতে পারেন। কারো উপরে বিবাহ ফরয না হয়ে গেলে, সাধারণ মুবাহ পর্যায়েও যদি থাকে তার জন্য বিবাহ না করে থাকা বৈধ রয়েছে।]